Beta

বয়স্করা কী খাবেন

৩১ মার্চ ২০১৫, ১৩:০৩

তামান্না চৌধুরী
অতিরিক্ত মসলা দেওয়া খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। ছবি : ট্রান্সলেট ডট চিনাডেইলি

বৃদ্ধ বয়সে নারী-পুরুষ উভয়েরই পুষ্টির গুরুত্ব অনেক বেশি। এ সময়ে শারীরিক ও মানসিক বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে। এ ছাড়া অনেকের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রোগবালাইও দেখা যায়। তাই খুব সতর্কতার সঙ্গে এই বয়সে পুষ্টির বিষয়টি খেয়াল রাখতে হয়। এ সময় শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যে সাধারণত চোখে ছানি পড়া, দুর্বলতা, দুর্বলতার কারণে হাঁটাচলার অসুবিধা, দাঁত পড়ে যাওয়া বা দাঁত না থাকা, ত্বক কুঁচকে যাওয়া। এ ছাড়া আরো সমস্যা হতে দেখা যায়। আর এই পরিবর্তনগুলো মানসিক অবস্থার ওপর ভীষণভাবে প্রভাব ফেলে। তাই তারা শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য তাই সঠিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা প্রয়োজন।

ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেট

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিপাকের হার অনেকটা কমে আসে। সে সময় পরিশ্রম করতে হয় না এবং অনেকেই হাঁটাচলা করতে পারে না। তাই তরুণ অবস্থায় ক্যালরি গ্রহণের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের কম ক্যালরি গ্রহণ করতে হয়। সাধারণত প্রতি কেজি ওজনের জন্য ২০ থেকে ২৫ কিলোক্যালরি বরাদ্দ করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ও হৃদরোগ ইত্যাদি থাকলে ক্যালরির মাত্রার তারতম্য হতে পারে। শারীরিক অসুবিধার কারণে কেউ যদি কম খাবার বা কম ক্যালরি গ্রহণ করে, তবে শারীরিকভাবে সে আরো অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। চাহিদার তুলনায় কম ক্যালরি গ্রহণ করলে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই বৃদ্ধ বয়সে ক্যালরির চাহিদা ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার থেকে গ্রহণ করা হয়। এটি কার্বোহাইড্রেট কমপ্লেক্স জাতীয় খাবার থেকে গ্রহণ করতে হবে। তবে সিম্পল কার্বোহাইড্রেট বা সরল শর্করা জাতীয় খাবার বর্জন করা উচিত। যেমন : চিনি, মিষ্টান্ন, গুড়ের তৈরি খাবার, অতিরিক্ত ভাত ইত্যাদি বর্জন করা উচিত। ভালো কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের মধ্যে লাল আটার রুটি, চিড়া, ওটস, লাল চালের ভাত ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

প্রোটিন

বয়স্কদের জন্য প্রোটিনের গুরুত্ব অনেক বেশি। এ সময়ে শরীরে ক্যালরির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা প্রোটিন থেকে বরাদ্দ করা হয়। সাধারণত প্রতি কেজি ওজনের জন্য পয়েন্ট আট থেকে এক গ্রাম পার কেজিতে দেওয়া যেতে পারে। তবে কিডনিতে সমস্যা থাকলে এই চাহিদার কিছুটা তারতম্য হতে পারে। ত্বকের সুস্থতায় শারীরিক দুর্বলতা প্রতিরোধে এবং শরীরের মাংসপেশি ভেঙে গিয়ে যেন শরীরে কোনো ক্ষতি না হয়, এই লক্ষ্যে প্রোটিন কাজ করে থাকে। সাধারণত ননিহীন দুধ, ডিমের সাদা অংশ, নরম কাঁটা ছাড়া মাছ, মুরগির মাংস, ডাল ইত্যাদি থেকে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা হয়। এ ছাড়া প্রোটিনের চাহিদা পূরণে দুধ, দই খেতে পারেন।

চর্বি

এই বয়সে যে খাবারগুলো সবচেয়ে বেশি এড়িয়ে চলা উচিত, তার বেশির ভাগই চর্বিযুক্ত খাবারের অন্তর্ভুক্ত। সাধারত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ক্যালরির চাহিদা চর্বিজাতীয় খাবার থেকে পূরণ করা হয়। এই চর্বিযুক্ত খাবারের বেশির ভাগই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিডসমৃদ্ধ খাবার থেকে গ্রহণ করলে ভালো। সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, যেমন : ঘি, মাখন, ভাজা-পোড়া, গরুর মাংস, খাসির মাংস ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিত। এ ছাড়া অনেকেরই এই বয়সে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের সমস্যা থাকায় এসব খাবার এড়িয়ে চলতে হয়। তবে অনেকেই বৃদ্ধ বয়সে চর্বিযুক্ত খাবার বন্ধ করে দেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কেননা, চর্বিযুক্ত খাবারের অভাবে অনেক সময় শরীরে ক্ষতিও হতে পারে। যেমন : হাড়ের অসুস্থতা, চোখের সমস্যা, ত্বকের সমস্যা ইত্যাদি।

ভিটামিনস ও মিনারেলস

বৃদ্ধ বয়সে পুষ্টির ক্ষেত্রে ভিটামিনস ও মিনারেলস জাতীয় খাবারের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষত আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিংক, পটাশিয়াম, ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন-ডি ইত্যাদির অভাবজনিত নানা সমস্যায় বৃদ্ধদের ভুগতে দেখা যায়। এ ছাড়া বৃদ্ধ বয়সে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। তাই ভিটামিনস, মিনারেলস এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবারগুলো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রোগ প্রতিরোধসহ বিভিন্ন পুষ্টির অভাবজনিত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে। এই বয়সে অনেকেরই রক্তস্বল্পতা, রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়া, সোডিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি দেখা দেয়। তাই প্রতিদিনের খাবারে রঙিন শাকসবজি, নরম ভিটামিন-সি যুক্ত ফল, ডাবের পানি রাখতে হবে। তবে রোগভেদে এই খাদ্যগুলোর গ্রহণ নির্ভর করবে। এ ছাড়া এই বয়সে খাবারে অতিরিক্ত লবণ, প্যাকেটজাতীয় খাবার, চানাচুর, আচার ইত্যাদি এড়িয়ে চলতে হবে।

তরল

তরল খাবার বৃদ্ধ বয়সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে এই সময়ে হাঁটাচলা, পরিশ্রম ইত্যাদি করে না বলে পিপাসা বোধ করে না। তাই পানির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার ফলে ইউরিনের সমস্যা হতে দেখা যায়। সারা দিনে দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করতে হবে। তবে এ সময় কোল্ড ড্রিংক, অতিরিক্ত চা-কফি ও বাজারের প্যাকেটজাত ফ্রুট জুস এড়িয়ে যাওয়া উচিত।

ধরন ও প্রকৃতি

পুষ্টির উপাদান ছাড়াও বৃদ্ধ বয়সে খাবারের ধরনের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেননা, অনেকে দাঁত না থাকার কারণে চিবিয়ে খেতে পারে না। এ ছাড়া অনেকেরই এসিডিটির সমস্যা থাকে। তাই যেকোনো খাবার নরম করে দিলে তাদের খেতে সুবিধা হয়। নরম ভাত, চটকানো আলু, চটকানো কলা পাকা, চিড়া ইত্যাদি খাওয়া যায়। খাবারে অল্প তেল ব্যবহার করা ভালো। অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সারা দিন অল্প পরিমাণ খাবার আর সে সঙ্গে যথাযথ খাবার মেনে চলতে হবে। বেশি মসলাযুক্ত খাবার, উত্তেজক খাবার, অতিরিক্ত শক্ত খাবার এ বয়সের মানুষের জন্য ক্ষতিকর।

খাবারের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটতে হবে এবং হালকা ব্যায়াম করতে হবে। পাশাপাশি কোনো রোগ আছে কি না, তা জানতে নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।

লেখক : তামান্না চৌধুরী, প্রধান পুষ্টিবিদ, অ্যাপোলো হাসপাতাল

Advertisement