Beta

বস্ত্রশিল্পে বাড়ছে বিদেশনির্ভরতা

০২ মার্চ ২০১৬, ১৫:৪৯ | আপডেট: ০৩ মার্চ ২০১৬, ০৮:০৬

নিজস্ব সংবাদদাতা
দেশের বস্ত্রশিল্পের বিকাশ যে হারে হচ্ছে, সে তুলনায় তুলার উৎপাদন বাড়ছে না। ছবি : সংগৃহীত

দেশের বস্ত্রশিল্পের পরিসর বেড়েছে। বড় হয়েছে এ শিল্পের লক্ষ্যও। কিন্তু উদাসীনতা, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে সেই হারে বাড়েনি এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলার উৎপাদন। ফলে বস্ত্র খাত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তুলার আমদানিনির্ভরতাও প্রকট হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপর। তবে এ সংকট নিয়ে তেমন ভাবনা নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

দেশে তুলা উৎপাদন কম হওয়ার কারণ, যে পরিমাণ জমিতে তুলার আবাদ হওয়া প্রয়োজন, তা হচ্ছে না। খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে খাদ্যশস্যের আবাদি জমি হেক্টরের পর হেক্টর বেড়েছে। কিন্তু দেশের শিল্প বিকাশের জন্য প্রধানতম পণ্যগুলোর উৎপাদনে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতেও দেখা যাচ্ছে না।

দেশে আগের চেয়ে তুলার উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও তা দিয়ে মিটছে না বার্ষিক চাহিদা। আর ক্ষমতাসীন সরকারের রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়ন করতে হলে ওই বছর নাগাদ পণ্যটির যে পরিমাণ চাহিদার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা-ও পূরণ হওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০২১ সালে দেশে তুলার চাহিদা তৈরি হবে প্রায় এক কোটি বেল (১৮২ কেজিতে এক বেল)। তবে ওই সময় মোট চাহিদার ১৫ শতাংশ বা কিছু বেশি দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তুলা উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়। 

তথ্যমতে, চলতি অর্থবছর (২০১৫-১৬) ৪২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার বেল।

দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তুলার আবাদ হয় ৪২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে। এ সময় উৎপাদন হয় এক লাখ ৫২ হাজার ৫৩০ বেল তুলা।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৪৯৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় এক লাখ ৪৪ হাজার ৬১৬ বেল তুলা। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৭৫৬ হেক্টর জমিতে আবাদ করে তুলা উৎপাদন হয় এক লাখ ২৯ হাজার বেল।

বর্তমানে দেশের স্পিনিং ও অন্যান্য খাতে বছরে মোট তুলার চাহিদা রয়েছে ৫০ লাখ বেল। তবে দেশে উৎপাদন মাত্র দেড় লাখ বেল, যা চাহিদার তুলনায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বাকি সাড়ে ৪৮ লাখ বেল বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

তুলা আমদানির পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবমতে, দেশে বর্তমানে টেক্সটাইল মিলের সংখ্যা ৪০৭টি। এসব মিলের বার্ষিক তুলার চাহিদা ৫০ থেকে ৫৫ লাখ বেল। চাহিদা পূরণে দেশে উৎপাদিত তুলার পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিবছর বাংলাদেশকে ১৩ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা তুলা আমদানিতে ব্যয় করতে হয়।

বাংলাদেশ সাধারণত ভারত, চীন, উজবেকিস্তান,  তাজিকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাম্বিয়া, মালি ও জিম্বাবুয়ে থেকে তুলা আমদানি করে থাকে।

বিশ্বে তুলার উৎপাদন ও চাহিদা

বর্তমানে বিশ্বে বছরে প্রায় তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ বেল তুলার চাহিদা সৃষ্টি হয়। তুলা উৎপাদনে বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে আছে চীন ও ভারত। আর পণ্যটি আমদানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। চীনের অবস্থান প্রথম।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। ১৯৯৫-২০১২ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে বাংলাদেশে তুলা আমদানি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিশ্ববাজার থেকে বাংলাদেশ মোট ৫৭ লাখ ৫০ হাজার বেল তুলা আমদানি করবে। এই পরিমাণ ২০১৫ সালের চেয়ে সাড়ে ৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে চীনের তুলা আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৫ লাখ বেল।

সারা বিশ্বে তুলার মজুদ বর্তমানে ১০ কোটি ৪৪ লাখ বেল। এর সিংহভাগই মজুদ করেছে চীন। এতে দেশটির আমদানি কমেছে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতে চায়না শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি বাড়ায় তুলার চাহিদা কমেছে।

বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ড. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ করতে সরকারের রোডম্যাপ অনুযায়ী পোশাকশিল্পকে রপ্তানিতে বড় একটি অবদান রাখতে হবে। সে লক্ষ্যে দেশের গার্মেন্ট শিল্প কাজ করছে। বিটিএমইর পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালে দেশের স্পিনিং মিলগুলোতে প্রায় এক কোটি বেল তুলার প্রয়োজন হবে। দেশে তুলা উৎপাদন না বাড়লে এর বিপরীতে ব্যয় হবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।’

২০২১ সালে স্থানীয়ভাবে ১৫-১৬ শতাংশ চাহিদা মেটাতে এক লাখ হেক্টর জমিতে তুলা চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে এক লাখ ৮৪১ কোটি টাকার সাত লাখ বেল তুলা উৎপাদনের আশা করছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড।

প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা এস এম আবদুল বাতেন বলেন, ‘তুলাগাছের মূল সাধারণত দেড় ফুট নিচে যায়। চর এলাকায় ওপর অংশে বালু থাকলেও দেড় ফুট নিচে পলি মাটি রয়েছে। ফলে চর ও পাহাড়ি উঁচু ভূমিতে তুলা চাষ ভালো হয়। আমরা এখন অনাবাদি ও উঁচু জমি, যেখানে অন্য ফসল তেমন হয় না, সেসব জায়গায় চাষিদের উৎসাহ দিচ্ছি।’

বাতেন বলেন, ‘অব্যবহৃত ও অবহেলিত জমিকে তুলা চাষের জন্য নির্বাচন করা হয়। সাধারণত বরেন্দ্র, বালুময়, পাহাড়ি, চর এলাকার উঁচু ও বালুময় জমিতে ফসল ভালো হয় না। এসব এলাকায় তুলা চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য

দেশে বস্ত্রশিল্পে তুলার চাহিদা প্রসঙ্গে বিটিএমইএর আমদানি, গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা ফারাহ দিবা বলেন, ‘দেশে যে তুলা উৎপাদন হয়, তার মান আসলে তেমন ভালো নয়। আর দেশের তৈরি পোশাকশিল্প ব্যাপক হারে সম্প্রাসারণ হচ্ছে। তবে সে তুলনায় দেশে তুলার উৎপাদন বাড়ছে না। যে পরিমাণ তুলা প্রতিবছর উৎপাদন হচ্ছে, তা নিয়ে বিটিএমইএ আশাবাদী নয়। ফলে আমদানিই আমাদের ভরসা। বর্তমানে মোট আমদানির অর্ধেকই ভারত থেকে আসে। এর পর রয়েছে উজবেকিস্তান। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে তুলা উন্নয়ন বোর্ডকে আমরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে আসছি।’    

খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে তুলা চাষে অবহেলা

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানিসম্পদ গবেষণা বিশ্লেষক ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, “অর্থকরি ফসল হিসেবে বিশ্বে তুলাকে ‘হোয়াইট গোল্ড’ বা ‘সাদা সোনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের তুলার মান যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো। দেশেই তুলার নিজস্ব বাজার রয়েছে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ায় তুলা চাষের জমির পরিমাণ বাড়ানো যায়নি। ফলে চাহিদার পরও উৎপাদন সম্ভব হয়নি। এখন অব্যবহৃত জমিতে তুলার চাষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তাই খাদ্যের পাশাপাশি অবহেলিত কিন্তু সম্ভাবনাময় ফসলের উৎপাদনে গুরুত্ব বেড়েছে। এরই অংশ হিসেবে তুলা চাষ সম্প্রসারণে ইতোমধ্যে ১০৫ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান আছে।’

তামাককে না, উৎসাহ তুলায়

দেশে ৮২ হাজার চাষি সরাসরি তুলা আবাদ করেন। তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করে তুলা আবাদে বেশি উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে ক্ষতিকর তামাকের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে তুলার ফলন বাড়ছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে তুলাচাষিদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

তুলার হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনে গবেষণা

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানিসম্পদ গবেষণা বিশ্লেষক ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, ‘তুলা সাধারণত জুলাই-আগস্টে আবাদ করা হয়। ফসল ওঠে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে। সাধারণত দুই ধরনের তুলা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে রয়েছে সমভূমির তুলা ও পাহাড়ি তুলা। যেকোনো ফসলের তুলনায় তুলা চাষ লাভজনক। দেশে প্রতি বিঘা জমিতে গড় উৎপাদন ১০-১২ মণ। হাইব্রিড জাতের ক্ষেত্রে ১৫-১৬ মণ। প্রতি মণ তুলার বাজারদর দুই হাজার ২০০ টাকা। সব খরচ বাদে বিঘাপ্রতি তুলা আবাদে লাভ থাকে ১৪-১৫ হাজার টাকা।’

বাংলাদেশের পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ও ফলন বাড়াতে তুলার হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চলছে বলে জানান মুর্তজা। তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে সমভূমির ১৪টি ও দুটি পাহাড়ি জাত উদ্ভাবিত  হয়েছে। ভারত ও চীনে ৯০ শতাংশ বিটি কটন তুলা উৎপাদন হচ্ছে।’

তুলার আবাদ ও বহুমুখী ব্যবহার

ফসল সংগ্রহের পর তুলাগাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবমতে, প্রতি বিঘা থেকে ৮-১০ মণ তুলাগাছ জ্বালানি হিসেবে পাওয়া যায়। শুকনা তুলাগাছ কাগজ ও পার্টিকেল বোর্ডের পাল্প তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তুলা বীজ থেকে ভোজ্যতেল ও খৈল উৎপাদন করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। এ ছাড়া তুলার গাছ ও পাতা মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। একই জামিতে মেহগনি, বিভিন্ন প্রজাতির ফুল, ভুট্টা, গম, শসা, হলুদ, মরিচসহ অন্য ফসলের সঙ্গেও তুলার চাষ করা যায়।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement