Beta

পর্ব ৬

শিল্পকথা

১৮ মে ২০১৮, ১২:০৯

ই এইচ গমব্রিখ

ভাষান্তর : জি এইচ হাবীব

 

প্রথম অধ্যায়

প্রা ম্ভ বি স্ম


প্রাগৈতিহাসিক এবং আদিম জনগোষ্ঠীসমূহ; প্রাচীন আমেরিকা

(শেষাংশ)

 

আদিম শিল্পের একটা বড় অংশ যে দেখতে একেবারেই অদ্ভুত তার কারণ তাহলে কী হতে পারে? সম্ভবত, এ-প্রশ্নের জবাব পেতে আমাদের আরো একবার ফিরে আসতে হবে আমাদেরই কাছে, এবং আমরা সবাই যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি সেসবের কাছে। এক টুকরো কাগজ নিয়ে সেটার ওপর হিজিবিজি করে কোনোরকমে একটা মুখ আঁকা যাক। তেমন কিছু না, মাথা বোঝাতে একটা বৃত্ত, নাকের জন্য একটা টান, আরেকটা টান মুখের জন্য।

 

http://nirmanblog.com/wp-content/uploads/2011/02/Image-24.jpg

২৪. যুদ্ধদেবতা ওরো, তাহিতি থেকে সংগৃহীত, অষ্টাদশ শতক

এবারে সেই চক্ষুবিহীন হিজিবিজিটার দিকে তাকানো যাক। অসহনীয় রকমের বিষণ্ণ বলে মনে হচ্ছে না ওটাকে? বেচারা দেখতে পায় না। আমরা ভাবতে থাকি, তাহলে তো দুটো চোখ দিতেই হচ্ছে ওটাকে। আর, যখন দুটো ফুটকি বসিয়েই ফেলি, এবং শেষ পর্যন্ত ওটা যখন তাকাতে পারে আমাদের দিকে, তখন যে কী স্বস্তি আমাদের! এর সবটাই আমাদের কাছে একটা তামাশা ছাড়া কিছু না হলেও একজন আদিবাসীর কাছে কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। কাঠের একটা খুঁটিতে সে যে সাদামাটা একটা মুখের ছবি এঁকে দিয়েছে তাতে করেই, তার কাছে, সেটা পুরোপুরি বদলে গেছে; মুখটা তার মধ্যে যে প্রভাব সৃষ্টি করেছে সেটাকে লোকটি মুখটার জাদুকরি ক্ষমতার একটি চিহ্ন বলেই ধরে নিয়েছে। দেখার জন্য সেটার দুটো চোখ থাকলেই হলো, মুখটাকে এর চাইতে বাস্তবসম্মত করে তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই।

২৪ নম্বর চিত্রে পলিনেশীয় ‘যুদ্ধ দেবতা’ ওরো-র একটি ছবি দেখা যাচ্ছে। পলিনেশীয়রা খোদাই কাজে তুখোড়, কিন্তু তার পরেও এটাকে মানুষের একটা সঠিক প্রতিরূপ হিসেবেই দেখাতে হবে এমনটি মনে হয়নি তাদের কাছে। আমরা শুধু দেখতে পাই, এক টুকরো কাঠকে বোনা কিছু আঁশ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সেটার দুচোখ আর দুবাহুরই শুধু আভাস দেওয়া হয়েছে এই আঁশের বেণি দিয়ে, কিন্তু একবার সেগুলো লক্ষ করলেই খুঁটিটি আমাদের সামনে আবির্ভূত হয় অশুভ শক্তির একটা চেহারা নিয়ে। এখনো আমরা ঠিক শিল্পরাজ্যে প্রবেশ করিনি, কিন্তু আমাদের হিজিবিজি পরীক্ষাটার কাছে সম্ভবত আরো কিছু শেখার আছে আমাদের।

আঁকিবুকি-কাঁটা মুখের আদলটা সম্ভাব্য সব রকম উপায়ে বদলে দেওয়া যাক। চোখের আকৃতিটাকে বিন্দু থেকে বদলে ক্রস বা চোখের সঙ্গে সুদূরতম সাদৃশ্যও নেই এমন কোনো আকৃতি দেওয়া যাক। নাকটাকে করে দেওয়া যাক একটা বৃত্ত, মুখটাকে একটা হিজিবিজি রেখা। সেগুলোর আপেক্ষিক অবস্থান যতক্ষণ মোটামুটি একই থাকছে ততক্ষণ এসবে প্রায় কিছুই আসবে যাবে না। কিন্তু আদিবাসী শিল্পীর কাছে সম্ভবত এই আবিষ্কারের মূল্য ছিল অপরিসীম। কারণ, যেসব ফর্ম তিনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন এবং যে ফর্মগুলো তাঁর বিশেষ কারুশিল্পের সঙ্গে বেশি সংগতিপূর্ণ, এই আবিষ্কারটি তাকে সেগুলোর সাহায্যেই তাঁর ফিগার বা মুখগুলোকে তৈরি করতে শিখিয়েছে। ফলাফলটা হয়তো ততটা বাস্তবসদৃশ হতো না, কিন্তু তাতে নকশার (প্যাটার্ন) ঠিক এমন একটা বিশেষ ঐক্য এবং সঙ্গতি বজায় থাকতো যা আমাদের সেই প্রথম হিজিবিজিতে সম্ভবত ছিল না।

২৫ নম্বর চিত্রে নিউ গিনির একটা মুখোশ দেখা যাচ্ছে। সুন্দর কোনো সৃষ্টি হয়তো নয় এটি, তবে এটাকে সে-রকম করে তৈরি করাও হয়নি; বরং ওটা তৈরি করা হয়েছে একটা উৎসবের জন্যে, যে-উৎসবে গাঁয়ের তরুণ এবং যুবকেরা ভূত সেজে নারী ও শিশুদের ভয় দেখায়। কিন্তু এই ‘ভূত’টিকে আমাদের কাছে যতই অদ্ভুতুড়ে বা বিরক্তিকর বলে মনে হোক না কেন, কিছু জ্যামিতিক আকৃতির সাহায্যে শিল্পী যে এই মুখটি তৈরি করেছেন তার মধ্যে সন্তুষ্টিদায়ক একটি বিষয় আছে।

২৫. পাপুয়ান উপসাগর অঞ্চলের কৃত্যানুষ্ঠানের মুখোশ, নিউ গিনি, আনু. ১৮৮০

 

বিশ্বের কিছু কিছু স্থানের আদিম শিল্পীরা তাঁদের পুরাণের বিভিন্ন চরিত্র এবং টোটেমকে এরকম আলংকারিক ঢঙে তুলে ধরবার বিশদ কিছু পদ্ধতি বের করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান শিল্পীরা প্রাকৃতিক ফর্মের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমরা যাকে বলি বস্তুর প্রকৃত চেহারা সেটাকে যুক্ত করেন। শিকারি হিসেবে তাঁরা ঈগল পাখির ঠোঁট বা বীবর-এর কানের সঠিক আকৃতি সম্পর্কে আমাদের চেয়ে ঢের বেশি ওয়াকিবহাল। কিন্তু তাঁদের কাছে এ-রকম একটি বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট।

ঈগলের ঠোঁটসহ একটি মুখোশ ঠিক একটা ঈগলই বোঝায়। ২৬ নম্বর চিত্রে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হাইদা উপজাতি প্রধানের বাড়ির একটা মডেল দেখা যাচ্ছে, যার সামনের অংশে রয়েছে তিনটে তথাকথিত টোটেম-খুঁটি। মনে হতে পারে আমরা কুৎসিত কিছু মুখোশের একটা বিশৃঙ্খল সমাবেশ দেখছি। কিন্তু আদিবাসীদের এই খুঁটিটি তাদের উপজাতির একটি প্রাচীন কিংবদন্তির সচিত্র রূপ তুলে ধরছে। খোদ এই কিংবদন্তিটাকেই সেটার চিত্ররূপটির মতো উদ্ভট আর অসংলগ্ন বলে মনে হবে আমাদের কাছে। কিন্তু আদিবাসী ধ্যান-ধারণা যে আমাদের ধ্যান-ধারণার চাইতে অন্যরকম সে-ব্যাপারে আমাদের আর অবাক হওয়া উচিত হবে না।

২৬. ঊনবিংশ শতকের এক হাইদা গোত্রপ্রধানের বাড়ির নমুনা, উত্তর-পশ্চিম উপকূলীয় রেড ইন্ডিয়ানদের তৈরি

কোনো এক কালে গোয়াইস কুন নামের শহরে থাকত এক যুবক। সারাদিনমান বিছানাতেই কাটত তার পি-পু-ফি-শু-তে; একদিন তার শাশুড়ি আর মুখ না খুলে থাকতে পারল না; তখন ভীষণ শরমে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।

এদিকে এক জলাশয়ে থাকত একটা দানো, মানুষ আর তিমিই তার আহার। আমাদের এই কুঁড়ের বাদশা যুবকটি ঠিক করল এই দানোটাকে বধ করবে। একটা জাদুর পাখির সাহায্য নিয়ে গাছের গুঁড়ির একটা ফাঁদ বানাল সে, তারপর টোপ হিসেবে দুটো শিশুকে সেটার ওপর রাখল ঝুলিয়ে। দানোটা ধরা পড়ল। ছোকরাটি সেটার চামড়া গায়ে চড়িয়ে মাছ ধরত আর প্রতিদিনই সেটাকে রেখে যেত তার শাশুড়ির দোরগোড়ায়। অপ্রত্যাশিত এই উপহার পেয়ে মহিলা এমনই গলে গেল যে নিজেকে অতি ক্ষমতাবান এই ডাইনি বলে ভাবতে লাগল সে। কিন্তু তার জামাই যখন সব রহস্য ফাঁস করে দিল তখন লজ্জায় তার জানটাই গেল বেরিয়ে।

এই করুণ ঘটনার সবক’টা চরিত্রকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মাঝের খুঁটিটায়। প্রবেশমুখের নিচের মুখোশটা হচ্ছে দানোটা যেসব তিমি মাছ খেতো সেগুলোরই একটা। প্রবেশমুখের ওপরের বড় মুখোশটা হচ্ছে সেই দানো, আর তার ওপরেই রয়েছে সেই হতভাগিনী শাশুড়ির মানবী মূর্তি। তার ওপরে ঠোঁটঅলা মুখোশটা হচ্ছে সেই পাখি যে আমাদের নায়কটিকে সাহায্য করেছিল, আর খোদ নায়ককে দেখা যাচ্ছে আরো ওপরে, দানোর চামড়া পরিচিত অবস্থায়, সঙ্গে আছে তার ধরা সেই মাছগুলো। সবশেষে যে মানব-অবয়বগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো হলো টোপ হিসেবে নায়কের ব্যবহার করা শিশুরা।

২৭. মৃত্যুদেবতার মাথা, হন্ডুরাসের কোপানে পাওয়া মায়াদের তৈরি পাথুরে বেদি থেকে নেওয়া, আনু. ৫০০-৬০০ খ্রিস্টাব্দ

 

এরকম একটা কাজকে উদ্ভট খেয়ালের প্রকাশ বলে ধরে নিতেই মুখিয়ে থাকি আমরা, কিন্তু এর স্রষ্টাদের কাছে এটি ছিল ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ একটি কর্ম। আদিবাসীদের কাছে যেসব আদিম যন্ত্রপাতি মজুদ ছিল সেগুলোর সাহায্যে এই বিশালাকার খুঁটিগুলো খোদাই করতে বছরের পর বছর সময় লেগেছে, মাঝে মাঝে গাঁয়ের সব পুরুষ হাত লাগিয়েছে কাজটাতে। এবং কাজটা করা হয়েছিল এক ক্ষমতাবান নেতার বাড়িকে চিহ্নিত করতে, সেটার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

২৮. আলাস্কার ইনুইটদের নাচের মুখোশ, আনু. ১৮৮০

যেসব কাজের সঙ্গে এত অনুরাগ আর শ্রম জড়িত সেসবের মানে কী তা খোলাসা করে না বললে হয়তো আমরা বুঝতে পারব না। আদিম শিল্পের বেশিরভাগ সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য। ২৮ নম্বর চিত্রের মুখোশটিকে আমাদের কাছে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেটার মানে আর যাই হোক মজাদার কিছু নয়। মানুষখেকো এক পাহাড়ী দানোর রক্তমাখা মুখকে ফুটিয়ে তুলেছে মুখোশটা। এটার অর্থ হয়তো আমরা বুঝতে পারব না, কিন্তু যে পুঙ্খানুপুঙ্খতার সঙ্গে প্রকৃতির আকার-আকৃতিকে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বিন্যাসে রূপান্তরিত করা হয়েছে তার সমাদর আমরা করতেই পারি।

শিল্পের বিস্ময়কর প্রারম্ভকালের এরকম অনেক মহৎ কাজ রয়েছে যেগুলোর প্রকৃত ব্যাখ্যা হয়তো চিরকালের জন্যে লুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তারপরেও সেগুলোকে তারিফ না করে পারি না আমরা। প্রাচীন আমেরিকার মহান সব সভ্যতার যে অবশেষটুকু আমাদের কাছে রয়েছে তা হচ্ছে সেই সব সভ্যতার ‘শিল্প’। শব্দটা যে আমি উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতর রেখেছি তার কারণ এই নয় যে এসব অদ্ভুত দালান-কোঠা আর প্রতিমূর্তি সৌন্দর্যবিহীন—সেগুলোর কিছু কিছু তো রীতিমত অসাধারণ—বরং তা এই কারণে যে, সেগুলোকে যেন আমরা এই দৃষ্টিতে না দেখি বা বিচার না করি যে সেগুলোকে নিছকই আনন্দ বা সাজসজ্জার জন্যে তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমান হন্ডুরাসের অন্তর্ভুক্ত কোপানের ধ্বংসাবশেষের একটি বেদিতে পাওয়া এক ভয়ংকর দেবতা যমের খোদাই করা মাথা (চিত্র ২৭) আমাদেরকে সেইসব জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিধানমাফিক অনুষ্ঠিত নরবলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ-ধরনের খোদাইকাজের প্রকৃত অর্থ কী সে-বিষয়ে যতো সামান্যই জানা যাক না কেন, যেসব পণ্ডিত ব্যক্তি এসব কাজ পুনরাবিষ্কার করেছেন, সেগুলোর রহস্যোদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন, তাঁদের শিহরন-জাগানো প্রচেষ্টা আমাদেরকে সেই সব কাজকে আদিম সংস্কৃতিগুলোর অন্যান্য কাজের সঙ্গে তুলনা করতে শিখিয়েছে যথেষ্ট রকমে। অবশ্য এই জনগোষ্ঠীগুলো গতানুগতিক অর্থে আদিম ছিল না।

ষোড়শ শতকের হিস্পানি ও পর্তুগিজ বিজেতারা যখন এসে পৌঁছায়, মেক্সিকোর অ্যাজটেক আর পেরুর ইনকারা তখন পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিল। আমরা এ-ও জানি যে, পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোয় মধ্য আমেরিকার মায়ারা বড় বড় শহর তৈরি করছিল, লেখার আর দিন গণনার এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল যাকে আর যাই হোক আদিম বলা চলে না। নাইজেরিয়ার নিগ্রোদের মতো, আমেরিকার প্রাক-কলম্বাস যুগের অধিবাসীরা বাস্তবসদৃশভাবে মানবমুখ আঁকতে বা তৈরি করতে পারত। প্রাচীন পেরুবাসীরা পছন্দ করত কিছু কিছু পাত্রকে মানুষের মাথার আকৃতিতে গড়তে, এবং সেগুলো হতো আশ্চর্যরকমের বাস্তবসদৃশ (চিত্র ২৯)। এই সৃষ্টিকর্মগুলোকে যদি আমাদের অদ্ভুত আর অস্বাভাবিক বলে মনে হয় তার কারণ সম্ভবত নিহিত রয়েছে সেই কাজগুলো যেসব ধারণা বহন করে তার মধ্যে।

২৯. একচক্ষু মানব আকৃতির একটি পাত্র, পেরুর চিকানা উপত্যকায় পাওয়া, আনু. ২৫০-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ

৩০. লালক, অ্যাজটেক বৃষ্টি দেবতা, ১৪শ-১৫শ শতক

চিত্র ৩০-এ আমরা দেখতে পাচ্ছি মেক্সিকোর একটি মূর্তি; বিশ্বাস করা হয় সেটি অ্যাজটেকদের যুগের, মেক্সিকো বিজয়ের ঠিক আগের পর্বের। পণ্ডিতদের ধারণা এটি লালক (Tlaloc) নামের বৃষ্টির দেবতার মূর্তি। এই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় বৃষ্টি প্রায়ই বাঁচা-মরার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়; কারণ, অনাবৃষ্টি ফসলহানির কারণ হতে পারে এবং তারই ফলে লোকজনকে অনাহারে থাকতে হতে পারে। কাজেই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে তাদের মনে বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়ের দেবতা ভয়ংকর শক্তিশালী কোনো শয়তানের মূর্তি নিয়ে বিরাজ করে। তাদের কল্পনায়, বিদ্যুচ্চমক দেখা দেয় বিশাল এক সাপ হিসেবে, এবং কাজেই আমেরিকার অনেক জাতির কাছে ঝুমঝুমি সাপ পবিত্র আর শক্তিশালী সত্তা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।

চিত্রটির দিকে আরো ভালো করে তাকালে আমরা দেখতে পাবো সেটার মুখটি তৈরি হয়েছে দুটো ঝুমঝুমি সাপের মাথার আকারে, যে-মাথা দুটো রয়েছে পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থায়, চোয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে তাদের বড় বড় বিষাক্ত শ্বদন্ত, আর তার নাকটাকেও মনে হচ্ছে দুটো সাপের পেঁচানো শরীরের আকৃতিতে গড়া; হয়তো এমনকী তার চোখ দুটোকেও কুণ্ডলী পাকানো সাপ হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু ফর্ম থেকে একটি মুখ তৈরি করার ধারণাটি বাস্তবসদৃশ মূর্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণা থেকে যে কত দূরে সরে যেতে পারে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেসব কারণ মাঝেমধ্যে এই পদ্ধতিটি ব্যবহারের দিকে শিল্পীকে ঠেলে দিয়েছে তার একটা আবছা ধারণাও পেয়ে যাই আমরা।

বিদ্যুচ্চমকের শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী পবিত্র সাপের শরীরের আদলে বৃষ্টি দেবতার মূর্তি গড়া নিশ্চয়ই যথোপযুক্ত কাজ হয়েছে। যে অদ্ভুত মানসিকতা থেকে এসব ভূতুড়ে দেবমূর্তির সৃষ্টি সেকথা চিন্তা করলে হয়তো আমরা একথাটা বুঝে উঠতে শুরু করব এসব আদি সভ্যতায় প্রতিমূর্তি নির্মাণ কীভাবে কেবল জাদুটোনা আর ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না, বরং ছিল লেখার আদি রূপও। প্রাচীন মেক্সিকান শিল্পের সাপটি নিছকই একটি ঝুমঝুমি সাপের ছবি ছিল না, বরং তা পরিণত হতো বিজলির প্রতীকে, এবং তার ফলে এমন একটি সত্তায় যার মাধ্যমে বজ্রপাতসংকুল ঝড়-বৃষ্টিকে ঘটা করে স্মরণ করা যায় বা সম্ভবত, সৃষ্টি করা যায়। এসব রহস্যময় উৎস সম্পর্কে খুব কমই জানি আমরা, কিন্তু শিল্পের কথা বা গল্পটিকে যদি আমরা বুঝতে চাই তাহলে অবরে-সবরে এ কথাটা স্মরণ করলে আমাদেরই মঙ্গল যে এসব ছবি আর অক্ষর আসলে সগোত্রীয়।

(এনটিভি অনলাইনে শিল্পকথা এখানেই শেষ হচ্ছে)

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement