Beta

সিনেমার আলাপ

সত্যজিৎ রায় ও আন্দ্রে ভায়দা

১০ নভেম্বর ২০১৭, ১১:৩৮ | আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৭, ১১:৫৪

একদিকে ভারতের খ্যাতিমান পরিচালক সত্যজিৎ রায়। ‘পথের পাঁচালী’, ‘চারুলতা’, ‘অপুর সংসার’-এর মতো ছবির নির্মাতা। অন্যদিকে পোল্যান্ডের জগদ্বিখ্যাত পরিচালক আন্দ্রে ভায়দা। ‘ম্যান অব মারবেল’, ‘আশেজ অ্যান্ড ডায়মন্ড’, ‘অ্যা জেনারেশন’-এর মতো ছবি যিনি নির্মাণ করেছেন। এ দুই গুণী পরিচালকের দেখা হয়েছিল ১৯৬৫ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক চলচ্চিত্র উৎসবে। তখন ফিল্মফেয়ার সত্যজিৎ রায়কে আমন্ত্রণ জানায় ভায়দার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। তাঁদের মধ্যে অনুবাদক হিসেবে ছিলেন পোলিশ সমালোচক বি. মিখালেচ। ভারতীয় ওয়েবসাইট তিরছি স্পেলিং থেকে এখানে সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ দেওয়া হলো।

সত্যজিৎ রায় : ভায়দা, আপনি এখন কোন কাজে ব্যস্ত রয়েছেন?

আন্দ্রে ভায়দা : আমি ধীরে অগ্রসর হচ্ছি। আমি এখন একটি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছি। যেটা আমার চায়ের মতো এত দ্রুত তৈরি করা যায় না। 

রায় : তাহলে কেন আপনি এই চলচ্চিত্র তৈরির কাজে হাত দিলেন?

ভায়দা : ছবিটি আসলে একটি জনপ্রিয় বইয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হচ্ছে। পোল্যান্ডে বইটি বেশ বিখ্যাত এবং পোল্যান্ডের জনগণের কাছে খুব প্রিয় একটি বই। তিন বছর ধরে ছবিটি নির্মাণের জন্য আমি অপেক্ষা করেছি। এ সময় আমি অন্য কোনো কিছুতে হাত দিইনি। আমি আমার দর্শকদের কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছি।

রায় : বুঝতে পেরেছি। ‘জেনারেশন’ কি আপনার প্রথম ছবি?

ভায়দা : ওটা আমার প্রথম স্বাধীন ছবি। স্বাধীন বলতে আমি বোঝাতে চাইছি, ছবিটির গোটা কাজ আমি একাই করেছি। আমার প্রথম ফিচার ফিল্ম।

রায় : আমি ভেনিসে ছবিটি দেখেছি। আমার কাছে বেশ লেগেছে। 

ভায়দা : রায়, আপনার জন্য আমার একটা প্রশ্ন রয়েছে।

রায় : করে ফেলুন।

ভায়দা : আপনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিখ্যাত এবং সবচেয়ে প্রতিভাসম্পন্ন পরিচালক। আপনি কি মনে করেন এটা সম্ভব, সম্ভব বলতে আমি বোঝাতে চাইছি ভারতে অদূর ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা? কারো সাহায্য ছাড়া এমন একটি স্বাধীন চলচ্চিত্র আপনি তৈরি করলেন, যেখানে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার কোনো সহায়তা নেই?

রায় : আমি আমার প্রথম ছবি নির্মাণ করি কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার সাহায্য ছাড়াই। আমি যে ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, সেখানে এ রকম সহয়তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমার ছবি তৈরির অর্থ আসে প্রযোজক ও পরিবেশকের ব্যক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যমে। আমার প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’আমার নিজের টাকায় তৈরি করা এবং ছবিটির নির্মাণ করতে গিয়ে যখন আমার অর্থ ফুরিয়ে গিয়েছিল, তখন আমি ছবিটির কাজ বন্ধ করে দিই। এককথায় বলতে গেলে ছবিটি তৈরির আশাই ছেড়ে দিই। তখন সরকারের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ আছে এমন একজন এগিয়ে আসেন এবং সরকারকে ছবিটির গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হন। তখন সরকার এগিয়ে আসে। সরকার বলতে আমি এখানে বোঝাতে চাইছি পশ্চিম বাংলার সরকার।

ভায়দা : আমি আরেকটু, ভয় হচ্ছে, সূক্ষ্ম প্রশ্ন করতে চাই। আমাদের কাছে আপনি এমন একজন মানুষ যিনি অসাধারণ জাতীয় সিনেমা তৈরি করে যাচ্ছেন। যা সত্যিকার অর্থেই জাতীয়, তারপরও আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আপনি মনে করেন যেভাবে আপনি এই ছবিগুলো তৈরি করছেন তাতে এই ধরনের সিনেমা ভারতে বিকাশ লাভ করবে? যেটা শুধু নামেই ভারতীয় সিনেমা নয়, বরং আদর্শিক দিক দিয়ে জাতীয় সিনেমা হয়ে উঠবে?

রায় : তাত্ত্বিকভাবে এটা সম্ভব। আমি বলতে চাইছি আমি যেভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, অন্য কেউ চাইলেই এভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারে। এর জন্য আপনাকে এমন একজন মানুষ হতে হবে, যার মাঝে একই রকম প্রেরণা, নির্দিষ্ট মাত্রায় মেধা এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় জিদ থাকতে হবে।

ভায়দা : অবিচল থাকা...

রায় : হ্যাঁ, অবিচল থাকা। এটাও আপনি সেগুলোর সঙ্গে যোগ করতে পারেন। আপনার ছবি যদি ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়, তাহলে সেখানে কোনো বাধা আসবে না। কিন্তু চিন্তা করুন এমন একটা ছবির কথা যা বক্স-অফিসে সাফল্য পায়নি, কিন্তু সে ছবিরও একটি শিল্পীসুলভ সাফল্য রয়েছে এবং যদি সে আর্থিকভাবে বারবার ব্যর্থ হয়, তাহলে সামনের পথ তাঁর জন্য অনেক কঠিন হয়ে যায়। কারণ যাই হোক না কেন, একজন পরিচালক তাঁর প্রযোজক, পরিবেশকের ওপর নির্ভরশীল। 

ভায়দা : কিন্তু আপনি কি মনে করেন, আপনি যেভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, ভারতের কোনো না কোনো জায়গায় এমন একদল মানুষ রয়েছে, যারা চেষ্টা করছে আপনার মতো করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে?

রায় : আমি আমার জন্মস্থান বাংলার কথা আপনাকে বলতে পারি। সেখানে একদল তরুণ পরিচালক রয়েছে যারা ‘পথের পাঁচালী’ দেখার পর এই ধরনের ছবি নির্মাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, আমি তখন নতুন পরিচালক ছিলাম এবং আমার ছবিটি সফলতার মুখ দেখেছে, এবং কিছু পরিবেশক রয়েছেন যারা আগে তরুণ পরিচালকদের সাহায্য করতেন না, এখন তারা তরুণ পরিচলাকদের সাহায্য করা শুরু করেছেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাফল্যের মুখও দেখেছে। হ্যাঁ, বাংলায় তরুণ পরিচালকদের একটি দল রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের মতো এত সাফল্য পায়নি, তাই তারা আরেকটি কাজের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু সেখানে তাদের সাহায্য করার জন্য অন্তত কিছু লোক রয়েছে। এটা এখনও অত বড় পদক্ষেপ হয়ে ওঠেনি বটে, কিন্তু সেখানে কিছু মানুষ রয়েছেন যারা তরুণ পরিচালকদের সাহায্য করতে চান। এটা ভালো ইঙ্গিত।

ভায়দা : হ্যাঁ, কিন্তু রাষ্ট্র কি ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে উৎসাহ দিতে সমানভাবে আগ্রহী? ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বলতে আমি বোঝাতে চাইছি সামাজিকভাবে ও সৃজনশীল দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলোকে। রাষ্ট্রের কি এ ধরনের চলচ্চিত্রকে উৎসাহ দেওয়ার আগ্রহ রয়েছে?

রায় : সরাসরি উৎসাহ দেওয়ার মতো অবস্থানে রাষ্ট্র নেই। ভারতের চলচ্চিত্রগুলোর জন্য এখন আমাদের রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট চলচ্চিত্রকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। অবশ্যই ছবিগুলো একটি কমিটির সুপারিশে মনোনীত করা হয়। কিন্তু সে কমিটিতে এমন সদস্যরাও থাকেন যাঁরা বিশেষজ্ঞ নন। সরকার চলচ্চিত্রগুলোকে নগদ অর্থ ও মেডেল প্রদান করে এবং যদি একটি ছবি পুরস্কার পায়, সেটা ভালো পরিবেশক পায়, ভালো সমালোচনা পায়। পুরস্কারের জোরে ছবিটা নতুন করে জীবন পায়। এ ছাড়া বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কথাবার্তাও চলছে যারা কিছু নির্দিষ্ট পাণ্ডুলিপিকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের জন্য অর্থ দিয়ে সাহায্য করবে। যদিও প্রতিষ্ঠান তৈরির কাজ বেশিদূর এগোয়নি, তবে কাজ চলছে। আমি কি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি? এ পর্যন্ত কতগুলো ছবি নির্মাণ করেছেন আপনি? পাঁচটা না ছয়টা?  

ভায়দা : দশটা।

রায় : চলুন গুনে দেখি। ‘জেনারেশন’, ‘কানাল’, ‘অ্যাশেজ অ্যান্ড ডায়মন্ডস’, ‘লোটনা’, ‘স্যামসন’…।

ভায়দা : ‘সরসেরাস’...এ ছাড়া সাইবেরিয়াতে একটা ছবি নির্মাণ করেছিলাম ‘লেডি ম্যাকবেথ অফ মিনাস্ক’, এ ছাড়া ফ্রান্সের জন্যও একটা ছবি নির্মাণ করেছিলাম...।

রায় : ও হ্যাঁ হ্যাঁ…।

ভায়দা : ‘লস্ট অন দ্য ফ্রানটিয়ার্স’যেটা আসলেই খুব ভালো পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আমি ছবিটির জন্য দুঃখবোধ করি কারণ ছবিটির বিষয়কে একটি নতুন ছবিতে বসানো হয়েছে। কারণ ওটা ছবির বিষয়বস্তু পুরোনো ছিল। এখন যে ছবিটি আমি তৈরি করছি সেটার দুটি খণ্ড রয়েছে। প্রোডাকশনের দৃষ্টিকোণ থেকে দুই খণ্ডের বেশিই হবে।

রায় : আপনার একটি ছবিই তো রঙিন ছবি। নাকি আরো আছে?

ভায়দা : একটাই। ‘লোটনা’।

রায় : রঙিন ছবিতে কাজ করতে পছন্দ করেন?

ভায়দা : রঙিন ছবিতে কাজ করা আসলেই অসাধারণ, কিন্তু পোল্যান্ডে ছবির ল্যাবগুলোর কারণে ছবির মান একদম পড়ে যায়। শুধু ল্যাবগুলোই নয়, ছবিকে রঙিন করতে ব্যবহৃত রংগুলোরও যাচ্ছেতাই অবস্থা। আগে থেকে কেউ বলতে পারবে না এটা কাজ করবে কি না। তাই আমি রঙের ব্যবহার করার সময় একটু ভয়েই থাকি। হয়তো আমি একজন শিল্পী বলেই এমনটা হয়। আমি রঙের ব্যাপারে স্পর্শকাতর। সাধারণ রঙিন কোনো কাজের ক্ষেত্রে এটা ঠিক আছে। কিন্তু আমার চাওয়া-পাওয়াগুলো এত সহজে পূরণ হয় না। 

রায় : হ্যাঁ, আমারও এমন হয়। আমি একটা রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। অবশ্যই ওটার ব্যাপারটা আলাদা ছিল, কারণ পুরো ছবিটাই আউটডোরে শুট করা। আমি একটু চিন্তিত ছিলাম কারণে ভারতে রঙিন ছবি প্রস্তুতের জন্য বর্তমানে যে সুবিধা রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। তাই কলকাতা নয়, রঙের কাজ করিয়েছি বোম্বে (মুম্বাই) থেকে। আমি খুবই অবাক হয়েছি, ছবিটি স্টুডিওতে শুট করলে এতো ভালো ফল পেতাম না। আমাদের আলো ছিল না আরো বহু কিছু। কিন্তু আউটডোর শুটিং তো ভিন্ন ব্যাপার। আর আমার গল্পটিও ছিল বিশেষ ধরনের—গল্পটি লিখেছিলাম ওই চলচ্চিত্রের জন্যই।

ভায়দা : রং নিয়ে কথা বলতে গেলে, আমাদের কিন্তু আরেকটা অসুবিধা রয়েছে। আমাদের দেশের আবহাওয়া বারবার পরিবর্তন হয়। ভারতের মতো সারা দিন প্রায় একই রকম আলোর অবস্থা থাকে না। 

রায় : যেমনটা এখন দিল্লিতে রয়েছে (হাসি)।

ভায়দা : হ্যাঁ। আমাদের পোল্যান্ডে দিনের মধ্যেই ১০ থেকে ১২ বার রঙের পরিবর্তন হয়।

রায় :  তাহলে আমি আপনাকে বলি, আমরা দার্জিলিংয়ে পাহাড়ের ওপর কীভাবে শুটিং করেছি। আমি জানি, সেখানে রঙের পরিবর্তন হবে কারণ সেখানে প্রচুর মেঘের আনাগোনা থাকে, কুয়াশা থাকে, সূর্যের আলোও থাকে। সেখানেও সকাল হয় এবং বিকেল হয়। শুটিংয়ে সবকিছুই থাকে। এটা দুই ঘণ্টার লম্বা গল্প। দুই ঘণ্টা ধরে টানা চলবে। সেখানে কোনো বিরতি দেখবেন  না আপনি। আমার কাহিনীতে রোদের দৃশ্য থাকে, কুয়াশার দৃশ্য থাকে, ছায়ার দৃশ্য থাকে। আমরা একটি রোদের দৃশ্যের শুটিং শেষ করলাম, এরপর সেখানে যখন কুয়াশা চলে আসে তখন কুয়াশার দৃশ্যের শুটিং শুরু করি। এভাবেই চলচ্চিত্রের শুটিংসম্পন্ন করা হয়। এটা আসলেই অভিনব একটি উপায় যদি পোশাকের কোনো ঝামেলা না থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই সব কাজ চলে। যখন আমরা মনে করি, মেঘ চলে আসছে তখন আমরা সবকিছু গুছিয়ে ফেলি। পরবর্তী স্পটে চলে যাই শুটিংয়ের জন্য এভাবেই কাজকরেছি।  

ভায়দা : আমাদের দেশে আবহাওয়া খুবই খামখেয়ালিপূর্ণ। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে আমি একই সময় অনেক ক্যামেরা ব্যবহার করি। সাদাকালো ছবির ক্ষেত্রে কুরোসাওয়া (আকিরা কুরোসাওয়া) এই কাজটা করতেন। কারণ একটি ক্যামেরার সঙ্গে অন্য একটি ক্যামেরার একই দৃশ্যের পার্থক্য মাঝেমাঝে ভয়াবহ হয়। এরপর দৃশ্যগুলো সেখান থেকে বাদ দিতে হয়। আট থেকে দশটি ক্যামেরা চিন্তাভাবনার মাধ্যমে ভালোভাবে স্থাপন করা হয়। এটা রঙিন চলচ্চিত্রের জন্য ভালো একটি সমাধান হতে পারে।

রায় : ভায়দা আপনি আমাকে বলুন আপনি সব সময় আপনার নিজের পছন্দের ওপর ছবি নির্মাণ করেন? অর্থাৎ আপনি কি আপনার পছন্দের বিষয়ের ওপর ছবি নির্মাণ করেন? সেখানে কি আপনার পছন্দের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা থাকে? আমার মনে হয় আপনার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে।

ভায়দা : উদ্যোগটা আমার। ছবির পাণ্ডুলিপি আমি নির্বাচন করি এবং স্থির করি এটা নিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ করব। তবে শেষ কথাটি বলে কমিটি। যারা ছবিটিকে ছাড়পত্র দেয়। এ ছাড়া আমার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে, যদিও শেষ কথাটি অন্য কেউ বলবে। একটা পর্যায়ে রাষ্ট্র প্রযোজকের ভূমিকা পালন করে, এটা বোঝাই যায়, ছবির শেষে এসে তারাই হ্যাঁ অথবা না বলে। কিন্তু যখনই ছবিটির কাজ শুরু হবে আমি তখন সেই ছবির নিয়ন্ত্রক। সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ চলে না। আমি চাইলে অনেক কিছু বদলে দিতে পারি, এমনকি ছবির স্ক্রিপ্টও। 

রায় : আপনি কি আসলেই পারেন?

ভায়দা : হ্যাঁ। স্ক্রিপ্টটির অনুমোদনের আগে। আমি এখানে সিকোয়েন্সের বদল ঘটাতে পারি অথবা আস্ত একটা দৃশ্যও বদলে দিতে পারি।

রায় : এবং তারা ছবির কাজ শেষ হওয়ার পর দেখে?

ভায়দা : হ্যাঁ, দেখে। ছবি যখন শেষ হয়ে যায় তখন অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে ছবির সব টাকা শেষ হয়ে গেছে (হাসি)। তাই আগ বাড়িয়ে কেউ হস্তক্ষেপ করে না।

রায় : শুধু কমিটি অনুমোদন দেয়নি, এই কারণে কোনো ছবির কাজ কখনো সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন?

ভায়দা : হ্যাঁ। আমি যে ১০টি ছবি করেছি তাঁর মধ্যে কয়েকটা আছে এ রকম। আমি এপর্যন্ত ৩৫টি ছবির চিত্রনাট্য দেখেছি। তাই আমি মনে করি, ছবি নির্মাণের চেয়ে চিত্রনাট্য তৈরিতে আমার অভিজ্ঞতা বেশি (হাসি)। তবে ৩৫টি ছবির চিত্রনাট্য শুধু কমিটি অনুমোদন দেয়নি বলে বাদ দিয়েছি এটা ভাবা ভুল হবে। কিছু আমি নিজেই বাতিল করে দিয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত পোল্যান্ডে কোনো পেশাদার চিত্রনাট্যকার নেই এবং মাঝেমধ্যে আমার মাথায় খুব ভালো গল্প চলে আসে, কিন্তু সেগুলো করা হয় না ভালো চিত্রনাট্যকারের অভাবে।

রায় : আচ্ছা।

ভায়দা : তারপরও আমি নিজে চিত্রনাট্য লিখি। কিন্তু আমি আমার এ কাজের প্রতি সন্তুষ্ট নই। মাঝেমধ্যে পাণ্ডুলিপির বিন্যাস খুব ভালো হয়ে যায়। কারণ গল্প ভালো থাকে। কিন্তু সেখানেও ঘাটতি থেকে যায় চরিত্রের জন্য ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভাবে। এখানেও আবার আমাদের হাত-পা বাঁধা, কারণ আমাদের ভালো পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী নেই। মঞ্চনাটকের কলাকুশলীরা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে। সেখানে নির্বাচনের ক্ষেত্রটা সীমিত এবং সবকিছু মঞ্চনাটকের অভিনেতার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। ওয়্যারসোতে ২০টি নাট্যশালা রয়েছে। কিন্তু ওয়্যারসো কিন্তু অত বড় শহর নয়। ১০ লাখ লোকের বসবাস সেখানে।

রায় : একটি দৃশ্যের জন্য কতগুলো টেক আপনাকে নিতে হয়? আমার মাঝেমধ্যে এক টেকেই সবকিছু ঠিকঠাক চলে আসে। 

ভায়দা : আমরা কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করি। অবশ্যই একজনের মাথায় ছবির গোটা গল্প এবং ছবিটা গঠন সম্পর্কে ধারণা থাকে। সেভাবেই ছবির জন্য টেক নেওয়া হয়। কিন্তু এক টেকে ওকে হওয়ার তুলনায় বারবার টেক নেওয়াতে বিশেষ আনন্দ রয়েছে। একটি ছবি তৈরির আনন্দ দুবার পাওয়া যায়। প্রথমবার যখন আপনি ছবিটির চিত্রনাট্য লিখছেন, দ্বিতীয়বার যখন আপনি ছবিটি সম্পাদনা করছেন।

রায় : হ্যাঁ। এমনকি যখন আপনি শুটিং করছেন তখন আপনার মনে গল্প সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা থাকে। সম্পাদনার টেবিলে আপনি খুব কমই পরিবর্তন করতে পারবেন।

ভায়দা : ঠিক।

রায় : অবশ্য পরিবর্তন করা যাবে না এমন নয়। সব সময়ই পরিবর্তন করা যায়। বিশেষ করে সংলাপের দৃশ্যগুলোর ক্ষেত্রে। 

ভায়দা : আমি আপনার সঙ্গে একমত।

রায় : যখন আপনি একটি দৃশ্য কাটছেন এবং পরে আরেকটি দৃশ্য জোড়া লাগাচ্ছেন, অনেক কিছুই করতে পারছেন কিন্তু আপনি অভিনয়কে পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

ভায়দা : হ্যাঁ।

রায় : তারপরও সেখানে অনেক কিছু থেকে যায়। বাংলাতে আমরা খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকি, কারণ খুব বেশি সময় ব্যয় করার সুযোগ নেই আমাদের। সময়ের অপচয় আমাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কারণ আমাদের বাজারটা খুব ছোট।

ভায়দা : আপনি কি কখনোই ভারতের কোনো জনপ্রিয় তারকাকে আপনার ছবিতে ব্যবহার করেননি?

রায় : আমি বড় কোনো তারকাকে আমার ছবির জন্য ব্যবহার করিনি। তবে তাদের মধ্যে একজন যাকে আমি আমার ছবির মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম সে এখন বড় তারকায় রূপান্তরিত হয়েছে। আবার আরেকজন বোম্বেতে (মুম্বাই) গিয়ে কাজ করছে। সেও এখন বড় তারকা। আপনি যেমনটা দেখতে পাচ্ছেন। কত তাড়াতাড়ি তারা ধরনটা শিখে ফেলছে। তাই এখন আমার ছবির জন্য তাদের ব্যবহার করতে একটু ভয় লাগে।  

ভায়দা : আপনাকে এখন মহড়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি? আমি দুটি কৌশল অনুসরণ করি। যারা তরুণ এবং অনভিজ্ঞ অভিনেতা-অভিনেত্রী তাদের চরিত্রের জন্য আমি খুব বেশি মহড়া বা অনুশীলন করাই না। কারণ তাদের মধ্যে কিছু ব্যাপার থাকে।

রায় : নবীন একটা ভাব থাকে, ঠিকই…

ভায়দা : কিন্তু যারা অভিজ্ঞ অভিনেতা তাদের জন্য মহড়া বা অনুশীলন ভালো। যারা তরুণ অভিনেতা তাদের কৌশলে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তাদের জন্য মহড়ার ভালো অভিনয় শুটিং পর্যন্ত ধরে রাখা খুব কঠিন।

রায় : আপনি কি কখনো এমনটা অনুভব করেছেন, যেমনটা আমি করি? আমার জন্য কোনো বৈঠকখানায় বসে চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যের মহড়া করা খুব কঠিন একটা ব্যাপার। যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা ঠিকঠাক সাজসরঞ্জামের মধ্যে হচ্ছে। এটা ছাড়া আমি মহড়া করতে পারি না। আমি কোনো প্রেরণাই খুঁজে পাই না। 

ভায়দা : এটাও এক ধরনের মহড়া। তবে তখনই আপনি একে মহড়া বলবেন যখন এটা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাজে আসবে। সেটা শুরুর দিকে থাকে। পরে সেটা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে আড্ডার পর্যায়ে চলে যায়। 

রায় : হ্যাঁ। 

ভায়দা : কয়েকটা চরিত্রকে ঠিক-ঠাক করা। তাদের চিত্রনাট্যের লাইনগুলো ধরিয়ে দেওয়া। তারপরও আমার মনে হয় এটার কোনো গুরুত্ব নেই। এটা ফলপ্রসূ নয় যতক্ষণ না পর্যন্ত ছবিটি সংলাপ নির্ভর হচ্ছে। সংলাপ নির্ভর ছবি অবশ্য আলাদা একটা ব্যাপার।

রায় : হ্যাঁ। বিশেষ করে যখন আপনি বড় কোনো টেক নিতে যাচ্ছেন, যেখানে অনেকক্ষণ ধরে অভিনেতা-অভিনেত্রীকে পর্দায় থাকতে হবে। তখন এটা ছাড়া সমস্যা হতে পারে। 

ভায়দা : হ্যাঁ। যতক্ষণ না পর্যন্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কস্টিউম পড়ছে এবং শুটিংয়ের জায়গায় যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা পরিচালকের জন্য অর্ধমৃত।

রায় : একদম ঠিক। আমার সঙ্গেও এমনটা ঘটে। তাই আমি আপনাকে প্রশ্নটা করেছিলাম।

ভায়দা : আপনি দেখলেন আমাদের মধ্যে কিন্তু সেটের বিভিন্ন উপাদান নিয়ে স্বাভাবিক একটা আলোচনা হয়ে গেল।

রায় : একদম ঠিক। আচ্ছা আপনি কি আন্তোনিওনি (আন্তোনিওনি মিকেল্যাঞ্জেলো) সেই কথাটির সঙ্গে একমত? যখন তিনি বলেছিলেন, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আর কিছুই নয়, তারা হল পরিচালকের হাতের পুতুল? তারা সেটাই করে যেটা তাদের করতে তাদের করতে বলা হয়?  

ভায়দা : আমি তাঁর সঙ্গে পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করি।

রায় : আচ্ছা। অবশ্যই আপনি জানেন আন্তোনিওনি কী বলেছিলেন।

ভায়দা : হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই।

রায় : আমি মনে করি আন্তোনিওনি মিথ্যা কথা বলেছেন।

ভায়দা : (হাসি) হতে পারে আন্তোনিওনি মনে করেছেন যে তিনি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রভাবিত করতে পারেন, কারণ তাঁর প্রধান অভিনেত্রী ছিলেন তাঁর স্ত্রী এবং আন্তোনিওনির বেশ প্রভাব ছিল স্ত্রীর ওপর। যদি কেউ তাঁর পদ্ধতি অবলম্বন করে ছবি তৈরি করতে যায়, তখন ভালো অভিনয়ের সম্ভাবনা অর্ধেক হয়ে যায়। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবির চরিত্রের নিজস্ব ব্যাখ্যা ভালো অভিনয়ের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়। তবে অবশ্যই পল নিউম্যান এবং মারলন ব্রানডোর মতো পরিচালক-অভিনেতাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি খাটে। তারা যতগুলো ছবি নির্মাণ করেছেন তাদের সবগুলোর কাহিনী তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। এবং এ ধরনের কাজ এখনও চলছে।

রায় : ঠিক, এটা অনেকটা কনসেরটো’র (concerto) মতো। 

ভায়দা : আমারও কিন্তু এই ধরনের ছবির প্রতি আগ্রহ রয়েছে।

রায় : কারণ সেখানে একজন অভিনেতা অত্যধিক প্রাধান্য পায়। অবশ্য এটা সাধারণ ছাঁচের বাইরে। এগুলো কিন্তু আলাদা করে চোখে পড়ে…

(প্রকাশ : ফিল্মফেয়ার, ১৯৬৫)

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement