Beta

ছুটির দিনে

দৃষ্টিনন্দন পিরোজপুরের 'কাঠ মসজিদ'

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৭:৪৫

সোহেলুর রহমান

কাঠের তৈরি সবচেয়ে প্রাচীন ও ছোট আকৃতির মসজিদের একক নিদর্শন 'মমিন মসজিদ'। মসজিদটি এখন দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, বিশ্বেরই একমাত্র কাঠের তৈরি দৃষ্টিনন্দন মুসলিম স্থাপত্যকলার অনুপম নিদর্শন।আর এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন বরিশাল অঞ্চলের পিরোজপুরের ধর্মপ্রাণ যুবক মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন।

মমিন মসজিদের পেছনের গল্প

বুড়িরচর গ্রামের সম্ভ্রান্ত আকন বাড়ির মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন অনন্যসুন্দর এ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। তবে মমিন মসজিদের প্রতিষ্ঠা নিয়ে দুই রকম তথ্য পাওয়া যায়।

১৯০০ সালে তৎকালীন বরিশালের রায়বাহাদুরের স্টেট থেকে স্থানীয় কচা ও পোনা নদীর জলকারের দায়িত্ব পান মমিন উদ্দিন আকন।

মমিন উদ্দিন আকনের নাতি মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ 'মমিন মসজিদ : স্মৃতি বিস্মৃতির কথা' গ্রন্থে  বলেছেন, ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়ার ছেলে বাদশা মিয়ার অনুসারী ছিলেন মমিন উদ্দিন আকন। নিজ বাড়িতে কাঠ দিয়ে মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এ লক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে  কাঠের নানা নকশা দেখে নিজেই সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্বজনদের আর্থিক সহায়তায় ১৯১৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

সে সময়ের বরিশাল অঞ্চলের কাঠশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র পিরোজপুরের নেছারাবাদ (বর্তমানে স্বরূপকাঠি) থেকে তিনি হরকুমার নাথ নামে প্রসিদ্ধ এক মিস্ত্রিকে মাসিক ৪০ টাকা বেতনে মসজিদ তৈরির কাজের দায়িত্ব দেন। ২২ জন মিস্ত্রি ৭ বছর ধরে কাজ করে ১৯২০ সালে শেষ করেন নির্মাণকাজ। মমিন উদ্দিন আকন সর্বদা মিস্ত্রিদের কাজ পরিচালনা করতেন এবং সূক্ষ্মভাবে কারুকাজ পরীক্ষা করে দেখতেন।

মসজিদ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঠ মমিন উদ্দিন সংগ্রহ করেছিলেন মিয়ানমার, ত্রিপুরা ও আসাম থেকে। মসজিদের ফলকে এমন তথ্য খোদাই করা রয়েছে।

অন্যদিকে জনশ্রুতি রয়েছে, বাড়ি থেকে দূরের মসজিদে নামাজ পড়তে যেতে কষ্ট হতো বলে যুবক মমিন উদ্দিন আকন নিজ বাড়িতেই মসজিদ নির্মাণের চিন্তা করেন। দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন মসজিদ পরিদর্শন শুরু করেন। প্রথমে ইট দিয়ে মসজিদ নির্মাণের চিন্তা করলেও পরে কাঠ দিয়ে তৈরির পরিকল্পনা করেন। মসজিদটির কাঠামো ও আকার এ জনশ্রুতির পক্ষেও কথা বলে।

মমিন মসজিদের সৌন্দর্যকাহন

বিশ্বব্যাপী এটি প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে মমিন মসজিদ নামে পরিচিত হলেও স্থানীয়ভাবে সবাই 'কাঠ মসজিদ' নামেই চেনেন।

সারা বিশ্বে এ ধরনের মসজিদ আর নেই বলেই দাবি করলেন স্থানীয়রা। গুগল ঘেঁটেও জানা গেল, পুরো কাঠের তৈরি মসজিদ আর রয়েছে মাত্র ইরানের খোরাসানে। তবে সেটি বৃহৎ আকৃতির ও বৈশিষ্ট্য কিছুটা ভিন্ন। সে হিসেবে মমিন মসজিদ পৃথিবীর একক নিদর্শন।

মসজিদটি তৈরিতে শুধু শাল, সেগুন ও লোহা কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। আনুমানিক ১২ ফুট প্রস্থ ও ২৪ ফুট দৈর্ঘ্যের মসজিদটির প্রতিটি ইঞ্চি অনন্য নকশা করা। তবে মজবুত ও টেকসই এ মসজিদের কাঠামো তৈরিতে লোহার কোনো পেরেক ব্যবহার করা হয়নি। পরিবর্তে কাঠের শলা ব্যবহার করা হয়েছে।

মসজিদটিতে চৌচালা টিন শেড দিয়ে পাটাতন তৈরি করা হয়েছে। ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পাটাতনের মাঝে তৈরি করা হয়েছে দ্বিতীয় আর একটি দোচালা টিনের ছাউনি। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি করে এবং পূর্ব ও পশ্চিমে চারটি করে জানালা। পূর্ব দিকে একটি মাত্র প্রবেশদ্বার। তাতে কারুকার্যখচিত দুটি খাম্বা। খাম্বায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম। প্রবেশদ্বারের ওপরে বাঁ দিকে আরবি হরফে ক্যালিওগ্রাফিতে ইসলামের চার খলিফার নাম ও মাঝখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর নাম অলংকৃত করা হয়েছে। প্রবেশদ্বারের মাঝামাঝি অংশে খোদাই করা ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। ভেতরে মেহরাবের উপরও রয়েছে দারুণ ক্যালিওগ্রাফি।

পুরো ঘর তৈরিতে জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার এবং কাঠের ওপর আরবি ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে মমিন মসজিদের এ নির্মাণশৈলীই একে বিশ্বে একক ঐতিহ্যে পরিণত করেছে। কাঠের কারুকাজের অনন্য উদাহরণ এটি। যা ইন্দো-পারসিক আর ইউরোপীয় ধারার মিশেলে সৃষ্ট জগদ্বিখ্যাত স্থাপত্য। এতে টুকরো টুকরো কাঠ শিল্পকর্মের জ্যামিতিক বিন্যাসে গড়ে তোলা হয়েছে অনুপম নৈসর্গ। ফুটিয়ে তোলা হয়েছে  হরেক ফুল, ফুলদানি ও ফলের নকশার সমন্বয়ে দেশীয় লোকজ উপাদান। এসব কারুকাজে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রং। যা এর আরেক অনন্য দিক।

মমিন মসজিদের ঐতিহ্য ও গুরুত্ব

কাশ্মীরে একই বৈশিষ্ট্যের কাঠের একটি মসজিদ একসময় থাকলেও তা এখন আর নেই। ইরানের খোরাসান প্রদেশের কাঠ মসজিদটিও ১৯৪৬ সালে নির্মিত। সে হিসেবে মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদ বিশ্বের বিশেষ প্রাচীন প্রত্নসম্পদ। নির্মাণশৈলী, অভিনবত্ব আর স্থায়ীত্বের বিবেচনায় যেটি অনায়াসে বিশ্ব ঐতিহ্য হওয়ার যোগ্য।

এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নমূল্য বিবেচনা করে ২০০৩ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিপ্ততর এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। কিন্তু আদতে রক্ষণাবেক্ষণের কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। কেবল মসজিদের সামনে ক্ষুদ্রাক্ষরে লেখা একটি নোটিশ ছাড়া।

মমিন মসজিদ বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ৩০টি শিল্পসম্পৃদ্ধ মসজিদের মধ্যে অন্যতম বলে ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইউনিসেফ প্রকাশিত বিশ্বের অন্যতম মসজিদ নিয়ে প্রকাশিত ৪০০ পৃষ্ঠার এক গ্রন্থে মমিন মসজিদের সচিত্র বর্ণনা রয়েছে। সম্পূর্ণ কাঠের নির্মিত কারুকার্য ও কোরিওগ্রাফি খচিত এই মসজিদটিতে কোনো ধরনের লোহা বা তারকাঁটা ব্যবহার করা হয়নি। বাংলাদেশের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত মসজিদের মধ্যে যেগুলো বেশি গুরুত্ব বহন করে, সেসব মসজিদের ছবি জাতীয় জাদুঘরেও প্রদর্শিত হয়। মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদের কয়েকটি বণর্ণনাসহ আলোকচিত্র জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

যাতায়াত

মমিন মসজিদ দেখতে দেশের স্থান থেকে লঞ্চ, বাস বা যেকোনোভাবে আসতে হবে পিরোজপুর শহরে (তবে আশপাশের কয়েকটি জেলা থেকে মঠবাড়িয়া বা ভান্ডারিয়া দিয়েও তুষখালী আসা যায়)। শহরের পুরান বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় ছেড়ে যায় মঠবাড়িয়াগামী বাস। ৬০ টাকা ভাড়ায় পথে কচা নদীতে একটি ফেরি পেরিয়ে নামতে হবে তুষখালী বাজার। পিরোজপুর থেকে তুষখালী আসতে সময় লাগবে প্রায় দেড় ঘণ্টা। তুষখালী বাজার পেরিয়ে তুষখালী হাইস্কুলের সামনে থেকে অটোরিকশা বা রিকশা করে সরাসরি বুড়িরচর গ্রামের কাঠ মসজিদ। এতে সময় লাগবে ১৫ মিনিট আর ভাড়া অটোরিকশায় জনপ্রতি ১০ আর রিকশায় ২০ টাকা।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

উদয়তারা বুড়িরচর একেবারেই পাড়াগা। তুষখালী বাজারে কোনোরকমে খাবার হোটেল ও নামমাত্র একটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। তবে পিরোজপুর শহরে থাকার জন্য জেলা পরিষদের বাংলোসহ আবাসিক হোটেল রয়েছে। রয়েছে ছোট বড় বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট। এগুলোর ব্যয় সাধ্যের মধ্যে।

সতর্কতা

নদীপ্রধান অঞ্চল হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে মমিন মসজিদ দেখতে আসা ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য দিন এসে দিনে  ফিরে যাওয়া প্রায় অসাধ্য। ফলে দলবেঁধে এবং হাতে দিন দুয়েক সময় নিয়ে আসা উচিত। এতে মমিন মসজিদের পাশাপাশি এক যাত্রায় পিরোজপুর শহরের রায়েরকাঠির বিখ্যাত জমিদারবাড়ি, স্বরূপকাঠির অনন্যসুন্দর ভাসমান বাজারও দেখে যাওয়া সম্ভব। যাদের হাতে আরো সময় থাকবে তারা চাইলে চোখ জুড়িয়ে নিতে পারেন পিরোজপুরের প্রতিবেশী জেলা বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখে।

Advertisement