Beta

গান কথা গল্প

বিনোদনের জন্যই সৃষ্টি হয়েছি : কুমার বিশ্বজিৎ

১৩ এপ্রিল ২০১৫, ১৭:০০ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০১৫, ১৩:১৪

কুমার বিশ্বজিৎ—সাধন রঞ্জন দে ও শোভা রানী দের একমাত্র সন্তান; দুই বোনের আদরের একমাত্র ভাই তুলতুল। জন্ম ১ জুন। সীতাকুণ্ড প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনার শুরু। সংগীতে তালিম নিয়েছেন তেজেন সেন, মৃণাল কান্তি ভট্টাচার্য ও প্রবাল চৌধুরীর কাছে। নামের মতোই তাঁর সুরেলা কণ্ঠস্বর এবং স্বকীয় গায়কীর কারণে পুরো দেশকে সুরের জাদুতে মুগ্ধ করে চলেছেন কয়েক দশক ধরে। সুনাম কুড়িয়েছেন দেশের বাইরেও। তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গানের সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না। কুমার বিশ্বজিৎ স্মৃতির আঁধার থেকে আলোতে নিয়ে এসেছেন সেসব গানের গল্প ও কথা, যে কথা এতদিন ছিল সকলের অজানা।

‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’

মনে আছে, বিটিভির প্রযোজক আল মনসুর আহমেদ তাঁর ‘শিউলি মালা’ অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকলেন। আমি ভাবলাম, ‘তোরে পুতুলের মতো করে’ গানটি রেকর্ড করা হবে। এই গানের গীতিকার আবদুল্লাহ আল মামুন। নাট্যকার মামুন ভাই নন কিন্তু, তখনকার বুয়েটের একজন ছাত্র। নকীব খান ভাইয়ের সুর। তখন ওই সময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদেরও অনুষ্ঠানটির জন্য ডাকা হলো। ভালো ভালো মিউজিশিয়ানকেও ডাকা হলো। তখন তো সব গান বিটিভিতেই রেকর্ড হতো। ওদের গান করতে করতে আমার গান রেকর্ড করতে পারলেন না মনসুর ভাই। রাত ১০/১১টার দিকে টেলিভিশনের স্টুডিও বন্ধ হয়ে যায় তখন। তখন মনসুর ভাই বললেন, রেকর্ডিং যেহেতু হয় নাই, তাহলে বাইরে থেকে করে নিতে পারব কি না? মনটা খুব খারাপ। বাইরে থেকে করতে হলে স্টুডিও পেতে হবে, মিউজিশিয়ান পেতে হবে। আমি তখন সংগীত পরিচালক আবু তাহের ভাইকে গিয়ে বললাম। ‘শিউলি মালা’ অনুষ্ঠানের মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। তাহের ভাই তখনকার বিখ্যাত মিউজিক স্টুডিও ‘ঝংকার’ স্টুডিওতে ফোন করলেন। এই গানের মিউজিশিয়ান ছিল রিদমে ঘটি বাবু, দেবুদা, পিয়ারু খান; গিটারে ছিলেন আলী আকবর রূপু, কিবোর্ডে সম্ভবত মানাম আহমেদ। বেজ গিটারে ছিলেন নাদিম। স্টুডিও বুক করা হলো। যথারীতি গান করব। সব রিহার্সেল হচ্ছে। তখন তো এক টেকেই করতে হতো। আমি চিন্তা করলাম, এই গানের সঙ্গে আরো একটি গান রেকর্ড করে ফেলি। ‘চতুর্দোলায় চড়ে দেখো ওই বধূ যায়’ গানটিও করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিই। বলে রাখি, চতুর্দোলা গানটির গীতিকার ও সুরকার ছিল পাঞ্চু ভট্টাচার্য। বর্তমানে সে ফ্লোরিডায় আছে। দুটি গান রেকর্ড হলে আমার একশিফটে অনেকগুলো টাকা বেচে যাবে।

আজেবাজে হোটেলে খেলে যা হয়! পেট বিট্রে করল। এসব মজার জিনিস কিন্তু এতদিন ভেতরের গল্পই ছিল। তো, খুশুনুর বাসা হচ্ছে দোতলায়। স্টুডিও হলো পাঁচতলা অথবা ছয়তলায়। আমি নামছি টয়লেটে যাচ্ছি, আবার স্টুডিওতে এসে গান করছি। এই গল্প আজকে প্রথম আপনাদের বললাম। আমার মনে আছে, আমি যেভাবে গানটা করেছি, যে শারীরিক অবস্থায় গানটা করেছি, সেটা একজন শিল্পীর জন্য খুবই প্রতিকূল অবস্থা। এত ডিহাইড্রেড হয়ে গেলাম যে স্যালাইন খাবো, সেটাও মনে নেই। কারণ, নির্দিষ্ট শিফটের মধ্যে গান রেকর্ড হতে হবে। চতুর্দোলা গানে আবার কয়ার আছে। কয়ার আর্টিস্টরাও এসে হাজির। দুইটা গান একসাথে রিহার্সেলের পর ভয়েস দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবে আমি এত বেশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম, শরীরের দিকে আমার আর খেয়াল নেই। তার পর গানটা হয়ে গেল। হয়ে যাওয়ার দুদিন পর টেলিভিশনে শুটিং। আমি পুরানা পল্টনের মেট্রোপলিটন হোটেলে থাকতাম। দুদিন হাতে তেমন কাজ ছিল না। জাহাঙ্গীর নামের আমার এক ফ্রেন্ড ছিল। সে ডাক্তার। তাকে বললাম, আমি তো হাঁটতে পারছি না। চোখটা ঘোলা হয়ে আসছে। সে বলল, কী হয়েছে? আমি পেট খারাপ অবস্থায় রেকর্ডিং করার কাহিনী বললাম। তখন তার কথামতো হাসপাতালে গিয়ে স্যালাইন নিলাম এক ব্যাগ। তারপর একটু সুস্থ হওয়ার পর শুটিং করলাম। এর পর তো সবই আপনাদের জানা। ভাই, গানটি গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নাচে ঠিকই, কিন্তু গানটি গাইতে গেলেই পেট খারাপের ওই ঘটনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

‘যেখানে সীমান্ত তোমার’

লাকী আখন্দের সুর আর কাউসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা এই গানটি পল্টনের এলভিস স্টুডিওতে করতে গেলাম। রাতের শিফটে ঢুকব। তখন সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন ভাই কাজ করছিলেন। তিনি বললেন, তুমি একটু সময় দাও, আমার একটা ফিল্মের জরুরি কাজ সাড়তে হবে। আমি তো না করতে পারি না। বললাম, ঠিক আছে ভাই। মনে আছে, আলী আকবর রূপু মামার একটা মাইক্রো ছিল। সেই গাড়িতে আমি, রূপু মামা আর শওকত আলী ইমন তিন দিকে শুয়ে আছি। এই গান আমি কিন্তু প্রথম রেকর্ড করেছিলাম বিটিভির মুসা আহমেদের একটা অনুষ্ঠানের জন্য। ’৮৪ সালের কথা। অনুষ্ঠানের নামটা ভুলে গেছি। স্টুডিওতে আলাউদ্দিন ভাই ঢুকলেন; কিন্তু ১০টা, ১১টা, ১২টা, ১টা বেজে যায়। উনি তো আর স্টুডিও থেকে বের হন না। পরে রাত ২টার দিকে উনি বের হলেন। তখন আমরা ২টার দিকে স্টুডিওতে ঢুকলাম। মিউজিকগুলো সিকুয়েন্স করা ছিল। স্টুডিওতে নামাতে নামাতে রাত সাড়ে ৩টা। ভয়েস যখন দিই, তখন ঘড়িতে ভোর ৪টা। ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ ক্যাসেটটি প্রোডাকশনে এনেছিল এজাজ খান স্বপন। তখন সে নতুন প্রোডাকশনে নেমেছে। আমাকেও কিছু সম্মানী দিয়েছিল। কিন্তু একদিন স্বপন বলল, তোমার জন্য একটা দুঃখের খবর আছে, মাস্টারটা ভালো হয়নি। তার পর শুনে-দেখি পুরো গানটাই ফাটা আসছে। আমি বললাম, এখন কী করব? সে বলল, না রে ভাই, আবার করার মতো টাকা নাই। তার পর আমি পুনরায় মাস্টার করার জন্য সম্মানীর পুরো টাকাটাই ওকে দিয়ে দিই। পরে স্বপনের প্রোডাকশনটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই ক্যাসেটের ব্যবসায়িক সাফল্যকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেনি।

‘এখন অনেক রাত, পৃথিবী ঘুমিয়ে গেছে’

একই শিফটে ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটির সঙ্গে ‘এখন অনেক রাত, পৃথিবী ঘুমিয়ে গেছে’ গানটিও করি। গানটির গীতিকার সালাউদ্দিন সজল। সুর রূপু মামা এবং আমার কিছু ছিল; কিন্তু অধিকাংশই ছিল মিকি মান্নানের। ও আমার খুব ভালো বন্ধু। বর্তমানে ডালাসে থাকে। এই গানটার একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে। ’৯০ সালের দিকে ডালাসে একবার শো করতে গেলাম। আমি স্টেজে উঠব এমন সময় একজন এসে বলল, ‘একজন খুব বেশি করে অনুরোধ করছে, সে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’ আমি বললাম, এখনই স্টেজে উঠব, পরে দেখা করি। বলল, ‘না, এখনই দেখা করতে হবে।’ ছেলেটি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। আমি বললাম, ভাই, কী হইছে? উনি বললেন, ‘দাদা, আমি শুধু আপনাকে টাচ করতে এসেছি। বাংলাদেশ থেকে চলে আসার পর অবৈধ হয়ে যাওয়ায় আর দেশে যাওয়া হয়নি। যার জন্য স্বপ্ন নিয়ে এই দেশে আসা, পরে শুনেছি সেই প্রেমিকা অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলেছে। আপনার এই গানটি আমাকে মানসিকভাবে যে কতটুকু সান্ত্বনা দিয়েছে, তা আমি আপনাকে বোঝাতে পারব না, দাদা। টানা দুই বছর শুধু এই গানটি শুনেছি। আমি আপনাকে না ছুঁয়ে যাবো না।’

‘মা’ একটা চাঁদ ছাড়া রাত আঁধার কালো

আমি প্রথম শখের বশে পি এ কাজলকে বললাম, আপনার সঙ্গে সিনেমায় কাজ করেছি। কিন্তু একটা সিনেমায় সংগীত পরিচালনা করা আমার শখ। যাহোক, তিনি সময়মতো জানাবেন বললেন এবং পরে ‘স্বামী-স্ত্রীর ওয়াদা’ নামের এক ছবিতে প্রথম সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দেন। মজার বিষয় হলো, এই ছবিতে কাজ করে শিল্পী হিসেবে, সুরকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই আমি। এবং গীতিকার হিসেবে কবির বকুল পান পুরস্কারটি। বকুলকে বললাম, গানটার সুর মোটামুটি রেডি, তুমি গানটা লিখে পাঠাও। কিন্তু খুব আশ্চর্যজনকভাবে ও যখন ওই লিরিকটা আমাকে পাঠাল, তখন একটা বারের জন্য হলেও সুর পরিবর্তন করতে হয়নি। মনে হচ্ছে যে ওই গানটার কথা অনুযায়ী আমি সুর সাজিয়েছি।

আমার জীবনে গীতিকারকে বসিয়ে বহু লিরিক পরিবর্তন করেছি। কিন্তু এই গানটির ক্ষেত্রে তা করতে হয়নি। বাংলা গানে কথা প্রধান, কিন্তু আমি উল্টোটাও করতাম, মানে আগে সুর করে তার পর কথা নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। পরে তো এই ‘মা’ গানটি নিয়ে একটি টেলিকমিউনিকেশন একটি বিজ্ঞাপনও তৈরি করল। আমার মনে আছে, এই গান আমি একদিন স্টেজে গাচ্ছিলাম। স্টেজে গাওয়ার পর আমার ফোন এলো যে আমার মা স্ট্রোক করেছে। আমি তখন স্টেজে। পকেটে বারবার ফোন আসছে। তখন আমার সন্দেহ হলো। ঘরে তো জানে আমি শো করছি। পকেটে মোবাইলটা বারবার ভাইব্রেশন হওয়ায় মনে হলো জরুরি কিছু। তখন স্টেজের এক কোণে গিয়ে ফোন ধরলাম। অপর প্রান্ত থেকে স্ত্রী বলল, তুমি স্টেজে জানি, মনটাকে একটু শক্ত করো। অসুবিধা নাই, মা হাসপাতালে আছেন। আমি দেখছি, তুমি গান শেষ করেই আসো। আমি দর্শককে কিছু বললাম না, আবারো গান শুরু করলাম। তখন আমার একটা কথাই মনে পড়ছিল, মান্না দের একটা গান, শিল্পের জন্যই শিল্পী শুধু। আসলেই তাই। আমার দুঃখ-বেদনা থাকতে পারে, কিন্তু এতে পাবলিকের কিছুই যায়-আসে না। আমি বিনোদনের জন্যই শুধু সৃষ্টি হয়েছি।

যখন আমার কোনো স্টেজে পারফরম্যান্স থাকে, তখন আমি মানুষের পর্যায়ে থাকি না। তখন কী জানি কী হয়ে যায়, আমি নিজেও হয়তো জানি না। এটা হয়তো হয়। আমার আশপাশের মানুষ, আমার স্ত্রী-পুত্র বলে, আমি ওদের সঙ্গে ভালো করে কথাও বলি না। আমি কোথায় জানি চলে যাই। অনুষ্ঠানের ১০-১৫ মিনিট থেকেই আমি নাই হয়ে যাই।

‘একদিন কান্নার রোল উঠবে আমার বাড়িতে’

চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে দুবাই গেলাম। নকুলকে বললাম, আমাকে একটা গান দে। নকুল কুমার বিশ্বাস। নকুল বলল, দাদা, আপনাকে দেওয়ার মতো কোনো গান পাচ্ছি না। আপনাকে এমন কিছু একটা দিতে হবে, কড়া কিছু দিতে হবে। আমি বললাম, ঠিক আছে, তুই তাহলে কবে দিবি? এভাবে খোঁচাচ্ছি। কতক্ষণ পর হোটেল থেকে নেমে নকুল বলল, “দাদা, পাইছি একটা লাইন, ‘একদিন কান্নার রোল উঠবে আমার বাড়িতে।’” আমি বললাম, তুই আমারে যাওয়ার আগে একটা মুখের অন্তরা দে অন্তত। সে বলল, ‘দাদা দেখি, অনুষ্ঠান শেষ হোক।’ তার পর সে একটা অন্তরা দিল। পরে রূপু মামার বাসায় গেলাম। মানাম আহমেদও ছিল। ইজাজ খান স্বপনও ছিল। তখন আমি বললাম, কীভাবে সুর করব। তখন সবাই মিলে মাটিতে হারমোনিয়াম নিয়ে সুর করতে বসলাম। তার পর আস্তে আস্তে কিছু সুর আমি, মানাম, কিছু সুর রূপু মামা, কিছু সুর স্বপন করল। স্বপন বলল, মামা, এটা হৃদয়ে স্পর্শ করাতে হলে এই জায়গায় যেতে হবে। ঠিক আছে, আস্তে আস্তে গানটা দাঁড়াল। গানটি করার পর আমি আমার মাকে যখন শোনালাম, মা বলল, ‘তুই আর মৃত্যুর গান গাইস না বাবা।’ এর আগে ‘মুর্দায় কাইন্দা কয়’, ‘একদিন তোমরা সবাই লোবান জ্বালিয়ে’—মৃত্যু নিয়ে এসব গান করেছিলাম। এর পর থেকে আমি আর মৃত্যু নিয়ে গান করিনি। এই গানটার একটা বিশাল স্মৃতি আছে আমার।

স্মৃতিটা হলো, একদিন আমাকে বরিশাল থেকে একজন ফোন করে বলল, ‘আমরা পুরো ফ্যামিলি আপনার ফ্যান, আমার আম্মা একটু আপনার সাথে দেখা করতে চান।’ এ রকম তো অনেকেই বলে। তাই আমি বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, একদিন ফোন কইরেন, আমি কথা বলব নে। বহুদিন দেশের বাইরে থেকে আসার পর ওই ভদ্রলোক আমাকে আবারো ফোন দিলেন। বললেন, ভাইয়া, আমি আম্মাকে নিয়ে আপনার কাছে আসব ভেবেছিলাম; কিন্তু আম্মা তো আর নেই। আমি বললাম, কেন, কী হয়েছে? উনি বললেন, না আসলে আম্মার তখনই ক্যানসার ছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, তিনি হয়তো আর এক মাস বাঁচতে পারবেন। উনি ২০ দিনের মাথায় মারা গেছেন। বিষয়টা হলো, উনি খুবই ধার্মিক মহিলা ছিলেন। জীবনে নামাজ-কালাম ছাড়া কিছুই বোঝেননি। ছেলেরা হয়তো গান শুনত। উনি ছেলেদের বলেছিলেন, ‘এই গানটা আমারে টেপ করে দিবি।’ তার পর যতদিন উনি বেঁচেছিলেন, ততদিন এই গান শুনতেন। তখন উনি ছেলেদের অনুরোধ করেন, ‘এই গায়ক ছেলেটারে আমি একটু দেখতে চাই।’ যাই হোক, এই ঘটনাটি আমাকে খুব বেশি কষ্ট দিয়েছে যে, মানুষটার সঙ্গে আমি দেখা করতে পারিনি। ভীষণ দুঃখ লাগে যখন কথাটি ভাবি।

‘ও ডাক্তার’

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের লেখা ও সুর করা গান এটি। বুলবুল ভাই প্রথম এই গান রেকর্ড করে একভাবে। এই গানটা অনেক বেশি ইম্প্রোভাউজ করা একটা গান ছিল। এই গান যখন পরিবর্তন করা হয়, তখন মানাম আহমেদ খুব কষ্ট পেয়েছিল। শ্রুতি স্টুডিওতে রেকর্ড করলাম। বুলবুল ভাই বললেন, না, গানটি আমার বেশি পছন্দ হয় নাই। বুলবুল ভাই কিন্তু এভাবে কখনো বলেন না। সত্যিকার অর্থে আমার কিন্তু প্রথম কম্পোজিশনটাই খুব পছন্দ হয়েছিল। বুলবুল ভাই আবার সুর করতে চাইলেন। আগের কম্পোজিশনটা র‍্যাগি ফরম্যাটে করা ছিল। বুলবুল ভাই বললেন, এটা করলে এক ধরনের শ্রোতারা নেবে, কিন্তু এটাকে ফিল্মি স্টাইলে করলে সব ধরনের শ্রোতাই নেবে। আবার তিনজন বসে সুর করলাম। বুলবুল ভাইকে বললাম, আমরা একটা কাজ করি, দুই ফরম্যাটেই কিছু লোককে গানটা শোনাই। দেখি, তারা কোনটা পছন্দ করে। গানটি শোনাতে গিয়ে, এই গানটির থিম চুরি করে আরেকজন একটি গান লিখে ফেলে; আমাদের শিল্পীদের মধ্যেই একজন। নাম বলব না। যে বোঝার সে হয়তো বুঝে নেবে। যদি আমার এই সাক্ষাৎকারটা সে পড়ে। আমি তখন বুলবুল ভাইকে বললাম, দেরি করা যাবে না, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে হবে। এখনই এর ভিডিও করে ছেড়ে দিতে হবে। তখন বুলবুল ভাই বললেন, পরের ভার্সনটাই দিয়ে দে।

তখন আমরা তিনটি গান একসঙ্গে করেছিলাম। ‘কিছু প্রহরী সঙ্গে রাখো খুব সাবধানে তুমি থাকো’, ‘আপামর জনতার ধারণা তুমি আমার হতে নাকি পারো না’। তবে আমার কেন জানি মনে হয়েছিল, এই ডাক্তার গানটি মানুষের অন্য রকম ভালো লাগবে। কেননা, ভিন্ন একটি অ্যাপ্রোচ তো। প্রেমের গানে এর আগে এ ধরনের অ্যাপ্রোচ কিন্তু হয়নি। ভিডিও করতে প্রথমে ল্যাবএইডের মালিক শামীম ভাইয়ের কাছে গেলাম। শামীম ভাই বললেন, আমার এখানে খুবই ব্যস্ত, অপারেশন থিয়েটার পাওয়া যাবে না। জাপান-বাংলাদেশের ডাক্তার নাঈমের কাছে যাও। নাঈম ভাইকে বললাম, ভাই, আপনার এখানে শুটিং করতে চাই। উনি বললেন, কতক্ষণ লাগবে? আমি বললাম, নাঈম ভাই, বেশি হইলে দুই ঘণ্টা লাগবে। উনি অবাক হয়ে বললেন, ‘দুই ঘণ্টা? দাঁড়া, সকালে তো অপারেশন ছিল, বিকেলে অপারেশনে রাখতে পারি।’ আমার মনে আছে, এই গানটির সেটিং করতে আমরা সকাল ৮টার দিকে ঢুকেছিলাম, বের হয়েছি রাত ১টার সময়। এই গানে অমল বোসদা ছিলেন। আজ দাদা আমাদের মাঝে নেই। আমার এই জিনিসটা এখনো মনে পড়ে।

একতারা বাজাইও না

একটা বাচ্চা ছেলে গানটি গেয়েছিল। আমি দেখলাম, এত সুন্দর গানটা, কোথা থেকে এলো? গানটি শুনে মাথা খারাপ হয়ে গেল আমার। পরে ভাবলাম, গানটা তো নিতে হবে। আমার কাছে পার্বত্য অঞ্চলসহ পৃথিবীর এমন কোনো মিউজিক নেই যে, আমি শুনিনি। আমার সব ধরনের গান শুনতেই হবে। মেক্সিকান, ক্যারিবিয়ান, ফ্লেমিঙ্গ, স্প্যানিশ, সাউথ ইন্ডিয়ান—কোনো কিছু বাদ নেই। তো যাই হোক, তখন আমি ওইটা নিয়া গানটা করলাম। ওই গানটার মধ্যে এক ধরনের রিলিজিয়াস লিরিক ছিল। সেটাকে আমি কোনো রিলিজিয়াসের মধ্যে না ফেলে বাঙালিদের জন্য, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাইকে মাথায় রেখে, সে হিসেবে লিরিকগুলো কোনো কোনো জায়গায় আমি পরিবর্তন করেছি। করার পরে আমি রেকর্ড করলাম। গানটি ঝুমুরের ওপর ছিল। তখন রিদমার লিটন ডি কষ্টাই ছিল বাংলাদেশের অন্যতম। সে আমাকে বলল, মামা, আপনি মুখে যা বলছেন, সেটা তো বাজাতে হবে! গানটির কোয়ান্টিজে এত আড়ি দেওয়া, কীভাবে করব বলুন, এটা তো মেশিন! ও বলল, মামা, আমাকে এটার জন্য সময় দিতে হবে এবং আমাকে শিখতে হবে। এটা আমাকে বানাতে হবে। রিদম মেশিন দিয়ে আমি এত হিউম্যান ফিলিং দিতে পারব কী করে? আমি বললাম, জানি না, এটা আমার লাগবে। সবচেয়ে রিমার্কেবল বিষয় হলো, এটা কিন্তু আজ ইতিহাস। বাংলাদেশে যত ঝুমুরের গান হয়েছে, এই গানের পরেই কিন্তু এই ছন্দের গান শুরু হয়েছে।

লিটন ডি কষ্টার এত সুন্দর রিদম প্রোগ্রামিং, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, ওই রিদম মেশিন দিয়ে এটা করা যেকোনো রিদমিস্টের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। এখনো বহু প্রোগ্রামারের এটা করতে ঘাম ছুটে যাবে। এটি ছিল ‘দীর্ঘশ্বাস’ অ্যালবামের গান। মজার বিষয় হলো, গানটি যখন টেলিভিশনে দিতে গেলাম, যাক আমি নাম বলব না, তখন একজন বললেন, ‘এখন এটা দেওয়া যাবে না।’ তখন ‘বাঙালি’ আর ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের ব্যাপার চলছে। মন খারাপ করে তখন আমি চুপ করে রইলাম। তখন আমি আমার ‘দীর্ঘশ্বাস’ অ্যালবামটি পিছিয়ে দিতে বললাম। গানটা প্রথমে টেলিভিশনে, তার পরে আমি অ্যালবামটি বের করব। আমি সাধারণত কোনো গান নিয়ে প্রেডিকশন করি না। তবে এই গানটি নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম। এই গানটি মিক্সড ক্যাসেটে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমি দিইনি। প্রায় সাত-আট মাস পর আবদুন নূর তুষার শুভেচ্ছা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে গান করার জন্য ফোন দিল। তখন এই গানটি করলাম। গানটি করার পর তো যা হওয়ার তা-ই হলো, ইতিহাস হয়ে গেল। কথা ও সুর সংগ্রহ হিসেবেই রেখেছিলাম। কিছুটা বর্ধন, সংযোজন বা পরিবর্তনের কিছু অংশের অংশীদারি হয়তো লিটন অধিকারী রিন্টুর।

যখন কোনো গান ‘ওকে’ হয়ে যায়, তার পর থেকে আমি আর গান শুনি না। কোনো বাসায়-টাসায় গেলে বা গাড়িতে ‘আপনার গান শুনি?’ এটা বললে, আমি কিন্তু চালাতে দিই না। কেমন জানি অস্থির লাগে। কারণ, আমি জানি যে গানটি এখন গাইলে আরো ভালো গাইতে পারতাম। বা ওই জায়গাটা ওই রকম করে দিলে ভালো হতো, এ রকম ভাবনা আসে। হয় না এ রকম, কেউ আমার গাওয়া গান হঠাৎ করে বাজিয়ে দিল? তো, সেটা শুনতে অস্বস্তি লাগে।

একটা মজার কথা বলি, হয় না যে গানে আমি জানি কোনো জায়গায় সমস্যা হচ্ছে? শিফটের জন্য বা কোম্পানির তাড়াহুড়োর জন্য ভালো করে করতে পারিনি? শেষ মুহূর্তে মাস্টার জমা দিতে হবে, ক্যাসেট প্রিন্টে চলে যাবে—এসব তাড়া তো থাকতই। কোম্পানির কেউ হয়তো বললেন, দাদা, দেরি করলে কিন্তু মাস্টার দিতে পারবেন না, অ্যালবাম বের হবে না। আপনি ঝামেলায় পড়ে যাবেন। আবার ওই দিকে শুনছি, আপনার মাস্টারটা না দিলে কিন্তু প্রিন্টিংয়ে যেতে পারছি না। তাহলে আপনারটা বাদ দিয়ে দিই। এ রকম নানা তাড়া তো থাকতই। ওই তাড়াহুড়ো করে গাওয়া গানটি গাওয়ার প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর কোনো বাসায় হয়তো দাওয়াত খেতে বসেছি, তারা ওই হুড়োহুড়ি করে গাওয়া গানটিই বাজিয় দিল। গানের ত্রুটির জায়গাটি এলে আমি জোরে কাশি, যেন ভুলটা অন্য কারো কাছে ধরা না পড়ে। এ রকম ঘটনা হয়েছে। তবে যেটা আমার ভুল মনে হচ্ছে, সেটা অন্যের কাছে ভুল মনে নাও হতে পারে।

Advertisement