Beta

ম্যাকের মুখোমুখি

‘মেলায় যাইরে’ গানটি লিখতে লেগেছিল দুই মাস!

১৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:৩৪

সংগীতশিল্পী মাকসুদুল হক। ছবি : সাইফুল সুমন

‘জেগেছে বাঙালির ঘরে ঘরে, এ কি মাতন দোলা, বছর ঘুরে এলো আরেক প্রভাত নিয়ে, ফিরে এলো সুরের মঞ্জুরি, পলাশ শিমুল গাছে লেগেছে আগুন, এ বুঝি বৈশাখ এলেই শুনি, মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে’ বৈশাখের এই জনপ্রিয় গানের সুর ও কণ্ঠ দিয়েছেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী মাকসুদুল হক। গানটি ১৯৯০ সালে অ্যালবামের শিরোনাম সংগীত হিসেবে প্রকাশ করে জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিডব্যাক। তখন মাকসুদ ছিলেন ফিডব্যাকে। ১৯৯৬ সালে ফিডব্যাক ছেড়ে ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ ব্যান্ড গড়ে তোলেন মাকসুদুল হক।  এ বছর ২৯ বছর বয়সে  পা দিয়েছে ‘মেলায় যাইরে’ গানটি। গানের বয়স বাড়লেও এর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি একটুও।  প্রজন্মের পর প্রজন্ম গানটি শুনছে  সববয়সী শ্রোতা।  ‘মেলায় যাইরে’ নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতি নিয়ে এনটিভি অনলাইনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মাকসুদুল হক, নিয়েছেন নাইস নূর।

প্রশ্ন : সম্প্রতি ‘মেলায়  যাইরে’ গানের লিরিক আপনি ফেসবুকে প্রকাশ করে লিখেছেন ‘জি তখনো আমি ইংরেজি হরফ দিয়ে বাংলা শব্দ গঠন করতাম’। এ প্রসঙ্গে জানতে চাই।

মাকসুদুল হক  :  এখন মানুষ যেভাবে এসএমএসে বাংলা লিখে তখনকার সময়ে ওভাবে আমি বাংলা লিখতাম। রোমান হরফে বাংলা। তখন আমার লেখা কেউ বুঝত না, আমার লেখা আমিই বুঝতাম।  এভাবে অবশ্য রুনা আপা (রুনা লায়লা) লিখতেন। গানটি লিখি ১৯৮৮ সালে । স্টেজে আমরা গানটা পারফর্ম করাও শুরু করি। অ্যালবামে গানটি আমরা বের করি দুই বছর পর। 

আজকে থেকে ছয় কিংবা সাত বছর আগে প্লে-লিস্ট নামে একটি সংগীতের ম্যাগাজিন (আপতত বিলুপ্ত) থেকে আমাকে বলা হয়, ‘মাকসুদ ভাই, মেলায় যাইরে গানের লিরিকটা যে লিখেছিলেন সেটা কী আছে?’ সেই সময় বাসার পুরোনো কাগজের মধ্যে কিছু একটা খুঁজতে গিয়ে এটা আমি ভাগ্যবশত খুঁজে পাই। পরে সেই ম্যাগাজিনের কাজী রাকাকে ফোন করে বললাম, ‘লিরিক পাওয়া গেছে, তুই আয়।’ তারপর তারা বাসায় এসে আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। লিরিকের কাগজটাও নিয়ে গিয়েছিল। পরে সেটা ম্যাগাজিনে  প্রিন্ট করে ছাপিয়েছিল। কিছুদিন আগে ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লিরিকটির  প্রিন্টের ফটোকপি স্ক্যান করে  আমি ফেসবুকে দিয়েছি। আমার কাছে অরজিনাল কপিটা এখন আর নেই।  হয়তো কেউ যত্ন করে রেখে দিয়েছে।

প্রশ্ন :  গানটির রেকর্ডিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মাকসুদুল হক : প্রথমত গানটি আমি একবারে লিখতে পারিনি। আমার সময় লেগেছিল দুই মাস। লেখার পর  সাত-আটবার সংশোধন করেছি। এরপর  সুর করেছি। রেকর্ডিং একদিনে হয়নি। অনেক সময় লেগেছে।  আমরা  সেই সময়  ডিজিটালে রেকর্ডিং  করেছি। সেজন্যই সময় বেশি লেগেছিল।  ঢাক, ঢোল, মন্দিরার শব্দ লাইভে বাজানো সম্ভব নয়। ব্যান্ডের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের কথা কাটাকাটি কত কিছু যে হয়েছে। রেকর্ডিং স্টুডিওতে গিয়েও বেগ পেতে হয়েছে অনেক। পুরো গান তৈরি হতে  প্রায় এক থেকে দেড় বছর সময় লেগেছিল। 

প্রশ্ন :  আপনার সংগীত জীবনের ক্যারিয়ার ৪২ বছর। ‘মেলায় যাইরে’ গানটি ২৯ বছরে পা রেখেছে। কেমন লাগছে আপনার?

মাকসুদুল হক  :  ভালোই লাগছে।  অনেকে আমাকে চিনেও না।  নামও জানে না। এখন এমন হয় কেউ একজন জিজ্ঞাসা করছে  ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ কে রে? তখন কেউ বলে, ‘ওই যে মেলায় যাইরে গানটা যে গাইছে, সেই মাকসুদ।’ কনসার্টে স্টেজে উঠার পর থেকে ‘মেলায় যাইরে’ গানের অনুরোধ আসতে শুরু হয়। আমরা সবার শেষেই এই গানটা করি। কারণ গানটি শুনে সবাই এত নাচানাচি করে, ধুলাবালি ওড়ে।  তাই স্টেজে সবার শেষে এই গানটি আমরা করে থাকি।

প্রশ্ন : গানটি নিয়ে প্রথমে কোথায় কনসার্ট করেছিলেন?  সেই স্বর্ণালি স্মৃতি সম্পর্কে জানতে চাই।

মাকসুদুল হক  : ১৯৮৮ সালে  চট্টগাম মেডিকেল কলেজ হলে ফিডক্যাকের প্রথম কনসার্ট হয়।  সেই কনসার্টে আমরা প্রথম এই গান গাই। একেবারে নতুন গান। কিন্তু এটা শোনার পর  ডাক্তার ও ছাত্র সবাই একসঙ্গে নেচেছে।  সবার অনুরোধে সেদিন এই গান আমাদের দুবার গাইতে হয়েছিল।  

 প্রশ্ন : নব্বই দশকে যখন গানটি তুমুল  জনপ্রিয় তখন ভক্তদের কাছ থেকে এই গান নিয়ে  বিশেষ স্মরণীয় ঘটনা আছে কি?

মাকসুদুল হক  :  অনেক ঘটনাই আছে। একটা বলছি। ১৯৯২ সালে  তো ল্যান্ডফোন ছিল । এক ভদ্রমহিলা বাসার ল্যান্ডফোনের নাম্বারে বারবার ফোন করেছিলেন আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য। যখন ফোন করতেন আমাকে তিনি বাসায় পেতেন না। আমার স্ত্রী এটা বলার পর একদিন আমি সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে ফোনে কথা বললাম।  তিনি আমাকে বলেছিলেন,  ‘আপনার  কাছে এই গান  কি  আমি জানি না।  তবে  আমার কাছে  এই গান  অনেক কিছু। আমার কোলে তিন মাস বয়সী শিশু এখন।  তাকে কিছুতেই দুধ খাওয়ানো যেত না। অনেক কষ্ট হতো।  একদিন আপনার গানটা ঘরে বাজছিল তখন আমার বাচ্চা হঠাৎ করেই দুধ  খাওয়া  শুরু করল। এখন এই গান না শুনলে আমার বাচ্চা দুধ খায় না।’

এই কথা শোনার পর  আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি চলে এসেছিল। এখন মনে হয়, এটুকু ভালো কাজের জন্য ঈশ্বর আমাকে দিয়ে গানটা করিয়েছিলেন। সবার এসব ভালোবাসার  আমার কাছে  গুরুত্বপূর্ণ, ওটা  খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় যে ‘মেলায় যাইরে’  কত হাজার লোক তালি দিল,  নাচল।

প্রশ্ন :  এই সময়ে  বিদেশে কনসার্ট করতে গেলে কেমন সাড়া পান?

মাকসুদুল হক : কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও  আমেরিকার অনেক জায়গায় আমরা কনসার্ট করেছি।  সাংঘাতিক সাড়া পাওয়া যায়। সব থেকে বিস্মিত হই যখন দেখি  বিদেশিরাও এ গানটা  শুনতে কনসার্টে আসে। পরে জেনেছি স্থানীয় বাঙালিদের কাছ থেকে অনেক বিদেশি এই গান শুনেছে।  এ কারণে তাঁরা আমার  কনসার্টে আসত। 

প্রশ্ন :  ‘মেলায় যাইরে’ নিয়ে এবার টি-শার্ট হয়েছে। এ রকমটা কখনো আগে ভেবেছিলেন?

মাকসুদুল হক : আমি প্রচারবিমুখ মানুষ। আমার গান নিয়ে টি-শার্ট হবে এটা আমার ধারণায় ছিল না।  আবার টি-শার্টে আমার  ছবিও আছে। এর সবকিছুই আমার ভক্তকুল করেছে। সব থেকে বড় বিষয় এই টি-শার্ট বিক্রির অর্থের একটা অংশ বিশেষ শিশুদের কল্যাণে ব্যয় হবে।

প্রশ্ন : আপনি তো অনেক উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত কিন্তু সেগুলো আপনাকে প্রচার করতে দেখা যায় না। এর কারণ কী?  

মাকসুদুল হক : এটা  আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। আমার মনে  ভালো কাজ গোপনে করাই ভালো হয়। এটা জানাজানি বেশি হলে ভালো হয় না।

প্রশ্ন :  আগামীকাল পয়লা বৈশাখে কোথায় কনসার্ট করছেন?

মাকসুদুল হক  : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকায় আমি দীর্ঘদিন ধরে কনসার্ট করছি না।

প্রশ্ন : ‘মেলায় যাই রে’-এর মতো বৈশাখের আরো গান আপনি কি নতুনভাবে লিখবেন?

মাকসুদুল হক : আমি কোনো কনসেপ্ট রিপিট করি না। তারপরও দেখি কখনো যদি হয় হবে, এ রকম আরেকটা গান। তবে খুব একটা আগ্রহ নেই।  

প্রশ্ন : আপনার জীবনে তো অনেক প্রাপ্তি।  তারপরও কোনো  অতৃপ্তি আছে কি?

মাকসুদুল হক : কোন আফসোস নেই। যেমন এই বয়সে যে আছি, এই বয়সেও  আমি বেশ  ভালো আছি।

Advertisement