Beta

কৃষকের জন্য বিমা কতটা জরুরি …

২৫ জুলাই ২০১৯, ১৬:১৯

কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ও সাফল্যকে অনেক সময়ই ‘বিরাট বিস্ময়’ বলে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে গত এক দশকে কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অভাবনীয়, ঈর্ষণীয়। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সবজি ও মাছ উৎপাদনেও তৃতীয় এবং ধান উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এর পরও বাংলাদেশের কৃষির মূল চ্যালেঞ্জ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

এক দশক আগেও যে জলবায়ু পরিবর্তনকে নিতান্তই বিজ্ঞান ও দূরবর্তী বিষয় বলে পাশ কাটিয়ে রাখা হচ্ছিল, সেটি যে এখন এই বিষয়ে সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের উদ্যোগে তৈরি সিনেমা ‘ডে আফটার টুমরো’ অর্থাৎ পরশুর মতোই নিকটবর্তী এবং এটি যে শুধু বিজ্ঞানের বিষয় নয় বরং রুঢ় বাস্তব—সেটি বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের জীবন দিয়ে হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ ১০০ বছর আগেও এই ভূখণ্ডে ছিল; কিন্তু এখন এসব দুর্যোগের ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতা যে বেড়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না।

কৃষিকে বলা হয় বাংলাদেশে অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে অনেক সময়ই কৃষকের মেরুদণ্ডই ভেঙে যায়। সম্প্রতি যা হয়েছে ধানের দাম নিয়ে। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষক তার নিজের জমিতে আগুন দিয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই যে প্রশ্নটি কৃষিসংশ্লিষ্টদের মনে আছে তা হলো, কৃষকের জন্য এমন একটি বিমা ব্যবস্থা কেন থাকবে না যেখানে মূল অংশীদার হবে খোদ রাষ্ট্র?...

আমরা দেখি, বিভিন্ন সময়ে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া হয়। সেটা হতে পারে বীজ-সার-কীটনাশক কেনায়; হতে পারে ঋণ মওকুফে। এমনকি এক টাকায় কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করার মতো পদক্ষেপও সরকার নিয়েছে। কিন্তু কৃষকের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে এবং বিস্তৃত পরিসরে বিমার বিষয়টি সেভাবে আলোচনায় আসছে না কিংবা এ বিষয়ে নীতি ও পরিকল্পনাও যথেষ্ট নয়। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতেই কৃষকদের জন্য কৃষি বিমা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয় এবং কৃষকের বিমার যে প্রিমিয়াম, তার একটা বড় অংশই দেয় সরকার। শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরো অনেক দেশ যেমন ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডেও সরকার কৃষি বিমার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আমাদের দেশেও এটি সম্ভব।

২২ জুলাই রাজধানীতে সিভিক এনগেজমেন্ট অ্যালায়েন্স প্রোগ্রামের আওতায় হেলভেটাস বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে একটি গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন উত্তরের জেলা গাইবান্ধার বেশ কয়েকজনক কৃষক-কৃষাণি। তারাও কৃষি বিমার বিষয়ে নিজেদের আগ্রহের কথা জানান। কৃষি বিমা বিষয়ে জাতীয় সংলাপ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং দেশের ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ফলে সেখানে বিষয়টি নিয়ে বেশ খোলামেলা আলোচনা হয় এবং সবাই যে বিষয়ে একমত হয় তা হলো, কৃষি বিমা চালু করতে হলে সেখানে মূল ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকেই।

উন্নত বিশ্ব তো বটেই, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেও কৃষকের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষিভিত্তিক বিমা একটি বড় ধরনের সুরক্ষা অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সরকার। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো কৃষিভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মূলধারায় আসেনি। বাংলাদেশে বিমা শিল্প অনেকদূর এগোলেও দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত যে পেশায়, সেই কৃষিখাত এখন পর্যন্ত বিমার আওতায় আসেনি, এটি হতাশার। বিভিন্ন সময়ে দুর্যোগের শিকার কৃষককে সরকারের তরফে নানারকম প্রণোদনা দেওয়া হলেও কৃষি বিমা এখানে একটি বড় ও টেকসই সমাধান হতে পারে বলে মনে কর হয়।

প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা মূলত দরিদ্র এবং অস্বচ্ছল যাদের মধ্যে একটা বড় অংশই জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন এবং জমির মালিকের সাথে উৎপাদিত পণ্য ভাগাভাগি করেন। এই ধরনের কৃষকদের হাতে ফসল উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকে না। আবার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফসল উৎপাদিত না হলে বা কোনো কারণে ফসল মার খেলে তাদের আরো বিপদে পড়তে হয়। সব মিলিয়ে প্রান্তিক কৃষকরা বরাবরই একটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এসব কারণে তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে এই সহায়তায় রাষ্ট্রকেই মূল ভূমিকা নিতে হয়। তা ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের একটা বড় অংশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় প্রচলিত ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে সেখান থেকে সুবিধা নেয়াও সব সময় সম্ভবপর হয় না। বরং তাদের যোগাযোগটা তৃণমূল পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। সে কারণে কৃষকরা তাদের প্রয়োজনে যেসব ধারদেনা করেন, তা তৃণমূল পর্যায়ে কর্মরত বিভিন্ন এনজিও এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে যারা দাদনের ব্যবসা করে, তাদের সঙ্গেই সম্পন্ন  হয়। দ্বিতীয়ত আর্থিক বিষয়াদিক জটিল বলে অনেক সময় এই কৃষকরা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বা ব্যক্তির কাছ থেকে দাদন নিয়ে সর্বস্বও হারান। ফলে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে আর্থিক সহায়তা নিয়ে অনেকে বড় ধরনের বিপদেও পড়েন।

কিন্তু এরকম বাস্তবতায়ও স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতকেও বাংলাদেশে এই কৃষকদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিমা চালু হয়নি যার মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সহায়তা পাবেন। এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ এর আগে নেওয়া হলেও সেগুলো সফল হয়নি। ফলে এখন আলোচনায় উঠছে কৃষককে বাঁচাতে বা তাকে দুর্যোগগের  ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিষয়টির সুরাহা করা। এখানে একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশেন। এটি সম্ভব হলে প্রাকৃতির দুর্যোগে কৃষকের ফসল নষ্ট হলে বা তার গবাদি পশুর মৃত্যু হলে বিমার আওতায় থাকা কৃষক ক্ষতিপূরণ পাবেন।

কৃষি বিমা থাকলে ঝড়, শিলাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, প্লাবন, খরা, অতি বৃষ্টি বা পোকার আক্রমণের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষক ক্ষতিপূরণ পাবে। অনেক সময় দেখা যায় কোনও একটি অঞ্চলে বৃষ্টির অভাবে অথবা মৌসুমী  আবহাওয়ার বিরূপতার কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হয়। সেক্ষেত্রে বিমাকৃত কৃষক, যার পুরোদমে চাষের ইচ্ছে রয়েছে এবং তার জন্য কিছু খরচও করেছে, অথচ রোপণ করতে পারছে না, তিনিও ক্ষতিপূরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। কোনো ধরনের শস্যের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, তারও একটি গাইডলাইন নিশ্চয়ই থাকবে।

সরকারের একার পক্ষে কৃষি বিমা চালানো কঠিন। সেক্ষেত্রে এখানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি একটি হাতিয়ার হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার চাইলে শ্রীলঙ্কার মডেলও অনুসরণ করতে পারে। সেখানে সরকার আইন করে আর্থিক সংস্থা যেমন ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির বাৎসরিক মুনাফার ওপর নির্ধারিত করপোরেট ট্যাক্সের ওপর অতিরিক্ত শতকরা ২ ভাগ লেভি বা কর বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। এই অতিরিক্ত টাকা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা না হয়ে সরাসরি কৃষি বিমা ফান্ডে জমা হয়। মোটা অঙ্কের এই ফান্ড থেকে প্রথম বছরেই ৫০০ কোটি টাকা আসে।

এখন মূল সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব এবং বিমা সম্পর্কে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে নেতিবাচক ধারণা। ইদানীং ব্যক্তি পর্যায়ে জীবন বিমা বা শিক্ষা বিমার বিষয়গুলো জনপ্রিয় হলেও বা প্রচুর মানুষ এই খাতে আগ্রহী হলেও প্রান্তিক পর্যায়ে যেহেতু বিমা সম্পর্কে মানুষের ধারণা পরিষ্কার নয় এবং নানারকম ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত, ফলে কৃষি বিমার মতো পদ্ধতি তৃণমূল পর্যায়ে এবং বিস্তৃত পরিসরে চালু করার আগে এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। আর এই কাজে প্রধানত সম্পৃক্ত করতে হবে গণমাধ্যমকে যারা বিষয়গুলো সহজ ভাষায় মানুষের সামনে তুলে ধরবে।

সরকার নানা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে এবং সেখানে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারই নয়, বরং সংবাদপত্র, প্রাইভেট টিভি ও রেডিও এবং কমিউনিটি রেডিওকেও কাজে লাগায়। কৃষি বিমার বিষয়টি জনপ্রিয় করা তথা এ বিষয়ে মানুষকে জানাতেও সরকার এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতে পারে। এ জন্য নানারকম স্লোগান বা ঘোষণা (পিএসএস), নাটিকা বা তথ্যচিত্র তৈরি করতে হবে। প্রচুর সচিত্র পোস্টার ছেপে সেগুলো তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। জেলা তথ্য অফিসের ভিডিও প্রজেক্টরের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে এ বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে। অর্থাৎ সরকার যদি অন্তত একটি বছর শুধু এই প্রচার কাজ চালায় এবং তৃণমূল পর্যায়ে একটি কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়, তাহলে দেখা যাবে সর্বস্তরের কৃষক নিজেরাই উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের জীবন-জীবিকার স্বার্থে কৃষি বিমার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং সেখানে যদি সরকার একটি বড় অংশের প্রিমিয়াম দেয়, তাহলে বাকি অংশ দিতে কৃষক খুব একটা আপত্তি জানাবে বলে মনে হয় না।

সবকিছুর মূলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অর্থাৎ কৃষককে বাঁচাতে সরকার কী ধরনের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে, সেখানে তারা নিজেরা কৃষি বিমার ব্যাপারে কতটা আন্তরিক বা কনভিন্সড—সেটিও আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার। কেননা সরকার নিজে যখন এটি উপলব্ধি করতে পারবে যে, কৃষককে বাঁচাতে কৃষি বিমা প্রয়োজন, তখন তার পক্ষে নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী এবং এই খাতে কাজ করতে আগ্রহী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ হওয়া দরকার। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় অবশ্যই গণমাধ্যমকে রাখতে হবে। কারণ আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক যাই হোক, সেটি সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। সহজ ভাষায় সেটি পরিবেশন করতে হবে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেমিনার কক্ষেই চাপা পড়ে যায় এর পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে। অর্থাৎ যাদের জন্য এই আলোচনা, তাদের কাছে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার কোনো বিকল্প নেই। ফলে কৃষি বিমার বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে এখানে ওয়াচডগ হিসেবে গণমাধ্যমকে রাখতেই হবে। 

লেখক : বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

Advertisement