Beta

যিনি আলোতে থাকেন, আলোতে রাখেন

২০ মার্চ ২০১৯, ১৫:২১

মো. মহিবুবুল হক

আবদুর রহিম আমার আদর্শ শিক্ষক। জগতের অনেক কিছু নিয়েই তিনি উদাসীন। সমসাময়িকদের মতো জনদশেক মিলে সরকারি ঋণের টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনবেন, এটা তাঁর কাছে অচিন্তনীয়। তিনি সময় ব্যয় করেন সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের শুভকামনা পড়ে।

গত বছর জুনে স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হালদারপাড়ায়। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন বলে আমার ক্যাডারের এক নবীন সহকর্মীকে আমন্ত্রণ জানালেন। চাকরি শুরুর সময়কার খণ্ড খণ্ড স্মৃতি তুলে ধরলেন আর কিছু বিখ্যাত গানের অন্তরা গাইলেন। তিনি প্রতিনিয়তই আড্ডা দিতে পছন্দ করেন আর স্বপ্নের কথা বলেন।

স্যারকে ১৯৯৫ সালে আমি কুমিল্লা জিলা স্কুলে আমার শ্রেণিশিক্ষক হিসেবে পাই। তিনি ইংরেজি পড়াতেন। কিন্তু পড়া ধরতেন না। ছাত্রদের বিতর্ক, গান আর ইংরেজি লেখালেখিতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। সেই সময় একটি কবিতায় তিনি তাঁর ২৬ জন সহকর্মীকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তোলেন। তিনি ক্লাসে বেত নিতেন না, কিন্তু আমরা নিশ্চুপ থাকতাম, কারণ স্যারের সহাস্যবদনে উপস্থিতি আমাদের কাছে নায়ক উত্তম কুমারের মতো মনে হতো। পরিপাটি ও পরিমিত। গুন গুন করে গান গাইতেন আর হরেক রকমের স্বপ্নের কথা বলতেন।

সাবেরা সোবহান সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, যা তাঁর বর্তমান কর্মস্থল, সেখানেও তাঁর সহজাত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল। সেদিন দেখলাম বিটিভিতে বর্তমানে স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে ইংরেজি বিতর্কে চ্যাম্পিয়ন হলে এলেন। ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে তাঁর বেশ কিছু ভাবনার কথা ছাপা হয়েছে বেশ গুরুত্ব সহকারে, এগুলোর প্রায় সবই সমকালীন ইংরেজি শিক্ষার গতিপ্রকৃতি নিয়ে।

স্বপ্নবাজ মানুষটির জীবন মসৃণ ছিল না আদৌ। শুরু থেকে আজও সংগ্রাম করছেন, কখনো পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে আর কখনো প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে। হাজারো দীপান্বিত শিক্ষার্থীর চলার পথের প্রেরণা জুগিয়েছেন নিরলসভাবে। তাঁর সম্ভাবনাময় তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রচারণা দেখে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। একেকটি শিক্ষার্থী তার কাছে সোনালি সন্তানের মতো। নিজ সন্তানের অনেক অতৃপ্তি ভুলেছেন পর সন্তানের হাসিমাখা সাফল্যে। আদরের ছোট ছেলেটি গত হয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতায়। অনেক দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পরে ২০০৯ সালে সে মারা মারা যায়। অসুস্থতার কারণে স্যার কখনো ছুটি নেননি। শুক্রবারগুলোতেই ঢাকা আসা-যাওয়া করতেন।

সন্তান হারানোর হাহাকারটা স্যার লুকাবার চেষ্টা করেন, কিন্তু পারেন না। কুঁকড়ে যান, কিন্তু বলেন না। এই অতৃপ্তিই স্যারকে অনন্য প্রাণের সন্ধান দিয়েছে মনে হয়। যে প্রাণে স্নিগ্ধতা আছে মরুময়তা অনুপস্থিত।

স্যারকে আমি সোনালি দেশের সোনালি মানুষ মনে করি। তিনি স্বপ্ন জগতের রাজা। তার ছোট ছোট গান আর স্বপ্নের অস্পষ্ট স্বর ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হচ্ছে তার দীপান্বিত উত্তর সারথিদের দ্বারা। বিন্দু বিন্দু ঘাম ব্যয় করে তিনি আজ শত প্রাণে আলো ছড়াচ্ছেন।

বিন্দু বিন্দু ঘাম ব্যয় করে তিনি আজ শত প্রাণে আলো ছড়াচ্ছেন। এই ঘাম অব্যাহত থাকুক। সুস্থ থাকুন প্রিয় স্যার। বেঁচে থাকুন আলোর অভিযাত্রার কাণ্ডারি হয়ে।

আহা!! এই তো

এক জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য, শ্রেষ্ঠ স্মারক।

আজ স্যারের জন্মদিন। এ রকম নান্দনিক জন্মদিন আসুক বারবার।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজ, পিরোজপুর

Advertisement