Beta

রাজনীতি

নির্বাচন দ্বারপ্রান্তে, দলে অনুপ্রবেশ

১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:৪৬

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়েছে। নানা পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের মাঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ তথা ক্ষমতাসীনদের দলের নেতাকর্মী বেড়েছে অনেক। ভোটারও হয়তো বেড়েছে। কিন্তু যারা নতুন করে দলে এসেছে কিংবা এখনো আসছে, তাদের অবস্থান এবং ভূমিকা নিয়ে কিছু চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর এই চিন্তা থেকেই আজকের এই লেখা।

আওয়ামী লীগে বিগত কয়েক বছরে দলে দলে যোগ দিয়েছে হাজারও মানুষ। আপাতদৃষ্টিতে প্রতিটি আসনেই আওয়ামী লীগের ভোট বেড়েছে। সে হিসাব থেকে হলেও আওয়ামী লীগের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। আবার দলে নেতাকর্মী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রেষারেষিও বেড়েছে যথেষ্ট। আওয়ামী লীগে নতুনদের যোগদান ইস্যুতে দলের বুনিয়াদি অনেক নেতার মধ্যে কিছুটা ক্ষোভও দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। অনেকে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, অনুপ্রবেশকারীরা কি আসলে দলের জন্য লাভ করছে নাকি ক্ষতি? নির্বাচনী প্রচারের দিক থেকে বিএনপি অনেক পিছিয়ে আছে, এটা সত্য। মনোনয়ন নিয়েও তাদের দলের অফিস ভাঙচুরসহ নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। তাদের এমন অপ্রীতিকর ঘটনার মূল কারণ হচ্ছে নেতৃত্বের সংকট।

কিন্তু আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও এমন অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা নির্বাচনী রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে বিব্রতকর। সংগত কারণেই সম্প্রতি সংঘটিত বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর বিষয়ে দলের হাইকমান্ডকে আরো সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। উল্লেখ্য, ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে মহাজোট মনোনীত নৌকার প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এ টি এম পেয়ারুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলিবিনিময়ের ঘটনায় সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়। নির্বাচনের আগে এমন সব ঘটনা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর একটানা দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্ণ করতে চলেছে। দলের সাংগঠনিক দিক মজবুত করার অন্যতম লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের আদর্শ ও লক্ষ্য অভিন্ন রেখে ২০১৭ সালের ২০ মে আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন অভিযান কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই কোটি সদস্য সংগ্রহের টার্গেট নিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে এ কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল। অত্যন্ত ইতিবাচক মাত্রায় এই অভিযান শুরু হলেও বেশ কিছু নেতিবাচক দিক এই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দলের সদস্য সংগ্রহ কিংবা সদস্য নবায়ন অভিযানে এরই মধ্যে জামায়াত-শিবির থেকে আসা বহু নেতাকর্মী যুক্ত হয়েছে। তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছে। ৭ এপ্রিল দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘জামায়াত-শিবির থেকে আওয়ামী লীগে পদধারী’ শিরোনামে শীর্ষ প্রতিবেদনটি দেখে শঙ্কিত হয়েছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে জামায়াত-বিএনপির লোকেরা গুরুত্বপূর্ণ পদও লাভ করার সংবাদ পেয়েছি।

বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগে কিংবা যুবলীগে এমন অনুপ্রবেশকারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। যারা দীর্ঘদিন থেকে মূল সংগঠনে আছে, তাদের বাদ দিয়ে কোনো ক্ষেত্রে এমন অনুপ্রবেশকারীদের পদ পাওয়ার বিষয়টি প্রকৃত আদর্শের মানুষদের ব্যথিত করে তুলছে। এসব ইস্যুতে প্রায়ই দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। যারা ’৭৫-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধাচারণসহ দলের নেতাকর্মীদের নানাভাবে শোষণ করার চেষ্টা করেছে, তাদের অনেকই এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাস করে না, এমন কেউ আওয়ামী লীগের আদর্শের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না। কেউ যদি জামায়াত-শিবির থেকে এসে আওয়ামী লীগের ঝাণ্ডা হাতে নেয়, তাহলে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। ভেতরে থেকে তারা যে আওয়ামী লীগকে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে এই অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। তারা কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা ক্ষতির সুযোগ নিতে না পারে, সেদিকটা দলের নেতাদেও সচেতন হতে হবে।

২০১৭ সালের ২২ মার্চ সিলেটে বিভাগীয় তৃণমূল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংগঠনে ‘কাউয়া’ (কাক) ঢুকছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। আগামী নির্বাচনের আগে দলকে আরো সুশৃঙ্খল, আরো আধুনিক করার তাগিদও দিয়েছিলেন ওই সমাবেশে। প্রায়ই জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোনা শুনতে পাই। কিন্তু দলের হাইকমান্ডের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যারা এই অনুপ্রবেশ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে সহায়ক হিসেবে দুঃসাহস দেখাচ্ছে, তারা দলের প্রকৃত মিত্র কি না তা নিয়ে ভাবতে হবে। যাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে কিংবা দলে প্রবেশ করানো হচ্ছে, তারা কি আদর্শিকভাবে কখনোই আওয়ামী লীগকে মেনে নিতে পেরেছে? নাকি সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। জামায়াত-বিএনপি থেকে এসে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী হয়েছে কিংবা হচ্ছে তারা কি প্রকৃতপক্ষেই আওয়ামী লীগার হচ্ছে? তারা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মনেপ্রাণে কখনোই লালন করতে পারবে?

চলতি বছরের ৯ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের অনুপ্রবেশে ক্ষুব্ধ ত্যাগী নেতাকর্মীরা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জামায়াত-শিবিরসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ডের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেক জেলায় তা মানা হচ্ছে না।’

আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী এই দলটির কর্মী সংকটের প্রশ্নই আসে না। ১৯৭৫-পরবর্তী আওয়ামী লীগের দুর্দিনেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীর অভাব ছিল না। নানা প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। তারপর আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে একটানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন রয়েছে।

নির্বাচনের আগে দলের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে দলের আদর্শে বিশ্বাসী নয় এমন বহু নীরব ঘাতক দলটিতে স্থান করে নিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিচ্ছে। তবে দলটির নানান স্তরে সেই রং দূষণকারী উপাদানের উপস্থিতি দলটির ভবিষ্যৎ তথা আসন্ন নির্বাচনের জন্য কতটুকু এবং কেমন সম্ভাবনা হিসেবে ধরা যায়, সেটি নিয়েও ভাবার সুযোগ রয়েছে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement