Beta

‘আশায় বইসা রইছি, সাত খুনের রায়টা কার্যকর হোক’

২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১১:২৯

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলার বাদী ও নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির দাবি, আইন প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত রায়টা কার্যকর করা হোক। ছবি : এনটিভি

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। দীর্ঘ এ সময়ে সাত খুন মামলার বিচারকাজ দুটি আইনি প্রক্রিয়া শেষে এখন আপিল ডিভিশনে তৃতীয় পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায়। মামলার আইনজীবী, নিহতদের পরিবারসহ সারা দেশের মানুষ এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের অপেক্ষায়। দ্রুত রায় কার্যকরের ব্যাপারে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।   

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দিন দুপুরে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) পোশাকধারী একদল সদস্য অপহরণের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট ও কবি চন্দন সরকারসহ সাতজনকে নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। দুদিন পর একের পর এক তাঁদের লাশ ভেসে উঠলে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে।

পরে ওই ঘটনায় ফতুল্লা থানায় আলাদা দুটি মামলা করেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার।

পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ দেড় বছরের অধিক সময় ধরে বিচারকাজ সম্পন্ন করে নারায়ণগঞ্জের জজ আদালত তৎকালীন র‍্যাব কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, কমান্ডার এম এম রানা ও মেজর আরিফ হোসেন এবং সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

আসামিপক্ষ ওই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে উল্লেখিত চারজনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে একই আদেশ বহাল রেখে বাদবাকি ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোটের আপিল বিভাগে রয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন ও আওয়ামী লীগের আরেক নেতা প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বিরোধের জেরে ওই সাত খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে আদালত এরই মধ্যে প্রমাণ করতে পেরেছেন। অর্থের বিনিময়ে র‍্যাব সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করেছিলেন নূর হোসেন।

জানা যায়, ঘটনার দিন আদালতে কোনো একটি মামলার হাজিরা শেষে  ফেরার পথে ফতুল্লার খানসাহেব স্টেডিয়ামের কাছে লিঙ্ক রোডে প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তাঁর বন্ধু তাজুল ইসলামসহ পাঁচজনকে মারধর করে টেনেহিঁচড়ে অপহরণ করে র‍্যাব সদস্যরা। সে সময় অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার তা দেখে বাধা দেওয়ায় চালকসহ তাঁকেও অপহরণ করা হয়।

আদালতে আসামিরা জানান, অপহরণের পর মাইক্রোবাসের ভেতর প্রত্যেককে চেতনানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং পলিথিনে মাথাসহ মুখমণ্ডল আটকে দেওয়া হয়। পরে তাঁদের হত্যা করে মরদেহে ইটের বস্তা বেঁধে ও পেট ছিদ্র করে রাতের আঁধারে ট্রলারের মাধ্যমে মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার মোহনায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলার আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান। ছবি : এনটিভি

আলোচিত এ মামলার প্রধান আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান মনে করেন, মামলাটির বিচারের রায় কার্যকর দেখতে শুধু নারায়ণগঞ্জবাসী নয়, সারা দেশের মানুষ অপেক্ষা করছে।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সাত খুনের মামলাটি একটি বীভৎস হত্যাকাণ্ড। এটি সারা বাংলাদেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের নেতৃত্বে, যেভাবে প্রকাশ্যে সাতজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাঁদের হত্যা করে গুম করা হয়েছিল, সেটার জন্য সারা বাংলাদেশে একটা প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। আজকে নারায়ণগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ সেই বিচারের রায়টা কার্যকর দেখতে চায়।’

‘আজকে পাঁচ বছর পূর্ণ করে ষষ্ঠ বছরে পদার্পণ করল এই হত্যাকাণ্ড। আপনারা জানেন যে, নারায়ণগঞ্জ আদালতে এই হত্যাকাণ্ডটির একটি সঠিক বিচার আমরা পেয়েছিলাম। সেই বিচারের পরে উচ্চ আদালতে একটি আপিল করা হয়, আপিলের পরে যে রায় দেওয়া হয় সে রায়েও আমরা সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। কিন্তু সে রায় হওয়ার পরে আসামিরা এ রায় কার্যকরের ব্যাপারে বা আপিলের ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিয়েছে। মামলাটি এখন পর্যন্ত আপিল ডিভিশনে আপিলের পর্যায়ে রয়েছে। আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী চাই যে রায়টা হয়েছে, তা বহাল থাকুক আপিলের ডিভিশনে এবং এই রায়টি যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। এটা শুধু আমি নয়, সারা বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁদের পরিবারগুলোর প্রত্যেক সদস্যেরই এটি চাওয়া,’ বলেন প্রধান আইনজীবী।

নিহতদের পরিবারগুলোর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে আইনজীবী বলেন, ‘যে সাতটা প্রাণ ওই দিন ঝরেছে, প্রত্যেকের পরিবারের আজ বেহাল দশা। প্রত্যেকে কিন্তু ওই পরিবারগুলোর কর্তাব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের রোজগারেই ওই পরিবারগুলো চলত। আজকে ওই পরিবারগুলো অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিন যাপন করছে।’

‘ওই পরিবারগুলো কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে, যদি তারা জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারে যে, খুনিদের বিচার হয়েছে। পরিবারের  সদস্যদের সঙ্গে আমরাও একটু আশ্বস্ত হতে পারব, দেশের মানুষ আশ্বস্ত হতে পারবে যে, বিচার বিভাগের মাধ্যমে এই রায়টি কার্যকর হয়েছে। এবং দেশে একটা বিচার হলো। এই জিনিসটা দেখে মানুষ অন্তত বুঝতে পারবে, এ রকম ঘটনা ঘটলে বিচার হয়। আমি বিশ্বাস করি, সরকার এই মামলার যে বিচার হয়েছে, সেটার আপিলের বিষয়টা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেবে, এবং যে রায় হয় সেটা দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা নেবে,’ বলেন সাখাওয়াত হোসেন।

আসামিদের দোসররা নিহতদের পরিবারগুলকে নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে উল্লেখ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আসামিরা জেলে আছে। যারা মূল আসামি, তারা দানবের মতো। তাদের পরিবারগুলো এখনো নিহতদের পরিবারগুলোকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করতেছে, হুমকি-ধমকি দিতেছে। তা ছাড়া তারা জেলে থাকলেও তাদের সাম্রাজ্য, নারায়ণগঞ্জে যারা এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড তাদের সাম্রাজ্য, তাদের সন্ত্রাসীরা এখনো বহাল তবিয়তে আছে। আমরা মনে করি, যারা ওই সব আসামির দোসর, তাদেরও সরকার  দমন করবে এবং একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজ গড়ে তুলবে।’

এদিকে যতদিন পর্যন্ত না এ মামলার রায় কার্যকর হয়, উদ্বেগ কাটছে না নিহতদের পরিবারগুলোর। প্রতিনিয়ত আসামিপক্ষের হুমকির শিকার হতে হচ্ছে তাঁদের। ভীতিকর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।

মামলার বাদী ও নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘আমি খুবই আতঙ্কিত আছি রায়টার জন্য। আমরা সবাই আশায় বইসা রইছি, কবে এই সেভেন মার্ডারের বিচার হবে। আসল খুনিদের সর্বোচ্চ সাজা পামু আমরা। সারা দেশ দেখুক যে, নরপিশাচগো বিচার কী রকম বাংলাদেশের মাটিতে প্রধানমন্ত্রী করেছে। এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আমার আশা, যাতে এই নরপিশাচদের এমন সাজা দেওয়া হোক যাতে এমন অপরাধ করার সাহস না পায় কেউ। আমি চায়, এই রায়টা দ্রুত কার্যকর করা হোক। এই মামলার সর্বোচ্চ যে রায়, ফাঁসি আমরা হাইকোর্টে পেয়েছি, সুপ্রিম কোর্টেও যাতে ওই রায়টাই বহাল থাকে এবং তাড়াতাড়ি এই রায়টা যেন কার্যকর করা হয়। আমার সংসারটাসহ সাতটা ফ্যামিলি ধ্বংস হইছে, আমি চাই না কারো সংসার এইভাবে আর ধ্বংস হউক।’

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের। ছবি : এনটিভি

নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘২০১৪ সালের এপ্রিলের ২৭ তারিখ থাইকা, আজকে একদিন পরেই ২০১৯-এর ২৭ এপ্রিল, এই টোটাল মিলিয়ে পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছরের মধ্যে দুইটা আইনি প্রক্রিয়া এ পর্যন্ত শেষ হলো। আরেকটা আইনি প্রক্রিয়া চলমান আছে। আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে কথা দিয়েছেন, এই কথা বাস্তবায়ন হবে। হয়তো আমাদের আরেকটু সময় অপেক্ষা করতে হবে।’

‘আমরা আশা করি, আল্লাহর তরফ থেকেও খুনিদের বিচার হবে, বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী আশা করি এ বছরের মধ্যে এটা শেষ হবে। সরকারের কাছে দাবি, যারা এই ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, প্রকৃত দোষী যারা, তাঁদের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়। আর এই রায়টা যেন দ্রুত কার্যকর হয়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটা আমাদের জোর দাবি’, বলেন আবুল খায়ের। 

Advertisement