Beta

পশ্চিমবঙ্গে সিবিআই-পুলিশ ধস্তাধস্তি, ধরনা চলছে মমতার

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৪০

কলকাতা সংবাদদাতা
গণতন্ত্র বাঁচানোর দাবিতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের নিয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলের সামনে সত্যাগ্রহে বসেছেন দলটির প্রধান ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি : সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দেখা দিয়েছে তীব্র সাংবিধানিক সংকট। চিটফান্ড দুর্নীতি নিয়ে জেরা করতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের কর্মকর্তারা গতকাল রোববার সন্ধ্যায় কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাসার সামনে যান। বাড়িতে ঢুকতে তাঁদের বাধা দেয় কলকাতা পুলিশ। প্রকাশ্য রাস্তায় শুরু হয় সিবিআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে কলকাতা পুলিশের ধস্তাধস্তি। পরে সিবিআই কর্মকর্তাদের আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার শেক্সপিয়র সরণি থানায়।

খবর পেয়েই পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে হাজির হন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকেই তিনি সরাসরি জিহাদ ঘোষণা করেন কেন্দ্রের মোদি সরকারের বিরুদ্ধে।

কেন্দ্রীয় সরকারের এই আচরণের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র বাঁচানোর দাবিতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের নিয়ে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলের সামনে সত্যাগ্রহে বসে পড়েন দলটির প্রধান ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে কলকাতা শহরসহ গোটা রাজ্যে। ঘটনার পরই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ, রেল অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করেন পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা।

কেন্দ্রের প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে আজ সোমবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল করবে তৃণমূল কংগ্রেস। গোটা ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে দেখা দিয়েছে সাংবিধানিক সংকট। যে কথা মেনে নিয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমত বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এই ঘটনাকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতি শাসনের আবহ তৈরি হতে চলেছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। তবে সবাইকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছেন মমতা। তিনি মোদি সরকারের উসকানিতে পা না দিতে অনুরোধ করেছেন।

এই ঘটনায় আজ সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছে সিবিআই। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারও সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছে। রাজ্যের হয়ে আদালতে সওয়াল করবেন কংগ্রেসের মুখপাত্র ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত রাজ্যসভার সদস্য ড. অভিষেক মনু সিংভি।

এদিকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এই সংঘাতে এরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন বিরোধীরা। এই ঘটনায় দেশের সংবিধানকে রক্ষা করার দাবিতে সমস্ত বিরোধীদের পাশে চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন মমতা।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী রোববার রাতেই টুইট করে মমতার পাশে থাকার বার্তা দিয়ে বলেন, আমরা একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলব। বাংলায় যেটা হচ্ছে সেটা আসলে ভারতের স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর মোদি ও বিজেপির আক্রমণের একটি অংশ। বিরোধীরা প্রত্যেকেই এই ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবে।

রোববার রাতেই মমতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও তেলেগু দেশম পার্টির সভাপতি (টিডিপি) চন্দ্রবাবু নাইডু, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহ, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির সভাপতি শারদ পাওয়ার, ভারতের বিহার রাজ্যের সাবেক উপমুখ্যমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় জনতা দল নেতা তেজস্বী যাদব এবং উত্তরপ্রদেশের চারবারের মুখ্যমন্ত্রী ও বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী। প্রত্যেকেই মমতার অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছেন।    

জানা যায়, কলকাতা পুলিশের কমিশনার রাজীব কুমারকে জেরা করার জন্য রোববার সন্ধ্যায় সিবিআইয়ের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) তথাগত বর্ধনের নেতৃত্বে কলকাতার লাউডন স্ট্রিটে তাঁর বাসভবনে যায় ৪০ জনের বেশি একটি সিবিআইয়ের টিম। অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থা সারদা ও  রোজভ্যালি চিটফান্ডে রাজীব কুমারের সম্পর্ক ছিল। সেই বিষয়েই তাঁকে জেরা করতে এদিন সিবিআই কর্মকর্তারা তাঁর বাসভবনে যান।

সিবিআইয়ের অন্তর্বর্তী প্রধান এম নাগেশ্বর রাও জানান, চিটফান্ড সংক্রান্ত মামলায় তথ্য লোপাট করার প্রমাণ রয়েছে রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে। সিবিআইয়ের দাবি, এর আগে রাজীব কুমারকে একাধিকবার সিবিআই দপ্তরে হাজির হওয়ার নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি হাজিরা দেননি।

রোববার সন্ধ্যায় সিবিআইয়ের সদস্যরা পুলিশ কমিশনারের বাড়ির গেটের কাছে যেতেই বাধা দেয় কলকাতা পুলিশের বিশাল বাহিনী। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি। পরে সিবিআইয়ের ডিসিপি তথাগত বর্ধনসহ কর্মকর্তাদের জোর করে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় কলকাতার শেক্সপিয়র সরণি থানায়। মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলে কলকাতার সল্টলেকের সিবিআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর সিজিও কমপ্লেক্স, নিজাম প্যালেসসহ সিবিআই কর্মকর্তাদের বাসভবন।

এদিকে ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে পৌঁছে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সেখানে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক করেন। তার পরই মমতা জিহাদ ঘোষণা করেন কেন্দ্রের মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গে এসে নরেন্দ্র মোদি হুমকি দিয়ে যাওয়ার পরই আজ সিবিআই হানা শুরু করেছে। এটা জরুরি অবস্থার থেকেও ভয়ংকর। কেন্দ্রীয় সরকার ভারতে সাংবিধানিক সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মমতা বলেন, বাংলাকে ঘিরে অত্যাচার করছেন মোদি, অমিত শহরা। ২০১৯ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসবে না বুঝেই প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তিনি বলেন, চিটফান্ডের নাম করে প্রত্যেক জায়গায় জোর করে ঢুকে পড়ছে তারা। অথচ আমরাই প্রথম চিটফান্ডের মালিকদের গ্রেপ্তার করি। লোকসভা ভোটের আগে সিবিআইকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যাকে পারছে তাকে ডেকে হেনস্থা করছে সিবিআই। আমরা প্রত্যেকটি এজেন্সিকে সম্মান করি। কিন্তু অন্যায় মেনে নেওয়া যায় না।

মমতা অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ কমিশনারের মতো পদাধিকারীকের বাড়িতে বিনা ওয়ারেন্টে সিক্রেট অপারেশনে এসেছিল সিবিআই। ওদের সঙ্গে কোনো কাগজ ছিল না। দেশের সংবিধান আজ বিপন্ন।

এর পরই কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে ধরনায় বসে পড়েন মমতা। তিনি   জানিয়ে দেন, যতক্ষণ না পরিস্থিতির বদল ঘটে, ততক্ষণ ধরনা চলবে। গান্ধীজির ধাঁচেই চলবে এই সত্যাগ্রহ অবস্থান ধরনা। 

রোববার রাতভর সেখানে থাকেন মমতা ও তাঁদের নেতারা।

আজ পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বাজেট পেশ রয়েছে। তার আগে মন্ত্রিসভার বৈঠক রয়েছে। মমতা জানিয়েছেন, ধরনামঞ্চের পাশেই তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠক করবেন। তারপর নির্দিষ্ট সময়ই রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র বিধানসভায় বাজেট পেশ করবেন।  

অন্যদিকে, এই খবর দিল্লিতে পৌঁছানোর পরই সল্টলেকের সিবিআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর সিজিও কমপ্লেক্স, নিজাম প্যালেসসহ সিবিআই কর্মকর্তাদের বাসভবনের দখল নিতে নামানো হয় সিআরপিএফ (সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) বাহিনীকে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে পিছু হটে রাজ্য পুলিশ বাহিনী। 

এদিকে, আজই সিবিআইয়ের পরিচালক পদে দায়িত্ব নিতে চলেছেন ঋষি শুক্লা। সিবিআই সূত্রে খবর, দায়িত্ব নিয়েই তিনি পশ্চিমবঙ্গে আসতে চলেছেন। আজ বা কাল তিনি পশ্চিমবঙ্গে আসবেন। এসে সিজিও কমপ্লেক্সে গিয়ে সিবিআই কর্মকর্তাদের মনোবল বাড়াতে বৈঠক করবেন। এরই মধ্যেই দিল্লিতে গতকালকের ঘটনায় কলকাতা পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম পাঠানো হয়েছে সিবিআইয়ের পরিচালকের কার্যালয়ে। যার মধ্যে একজন ডিসি, একজন এডিসি, দুজন পরিদর্শকসহ কয়েকজনের নাম রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কাজে বাধা ও মারধর করার অভিযোগ আনতে চলেছে সিবিআই। পাশাপাশি আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল কেশরিনাথ ত্রিপাঠির কাছেও বিষয়টি জানিয়ে সিবিআই অভিযোগ জানাতে চলেছে বলে জানা গেছে।

Advertisement