Beta

কিশোরগঞ্জে এক দিনে চারজন খুন

২১ আগস্ট ২০১৯, ২২:৩৪

নিহত চারজনের মধ্যে দুজনের মরদেহ কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে। ছবি : এনটিভি

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, মিঠামইন, করিমগঞ্জ ও সদর উপজেলায় একদিনে চারজন খুন হয়েছে। আহত হয়েছে ২৩ জন। এর মধ্যে পাকুন্দিয়ায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই, মিঠামইনে রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় একজন, করিমগঞ্জে ছোটদের খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে একজন এবং সদর উপজেলায় জামাতার হাতে শাশুড়ি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজুর রহমানের দেওয়া তথ্য মতে জানা যায়, উপজেলার চরটেকি গ্রামের মৃত হারুন অর রশিদের ছেলে আলী আজগর মোস্তফা মুকুলের (৬২) সঙ্গে জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ছোট ভাই শামসুল মুসলিমীন মতি ওরফে কেজি মতির (৫৫) বিরোধ চলে আসছিল। এ নিয়ে বহুবার সালিশ-দরবার হলেও কোনো ফয়সালা হয়নি। ওই বিরোধের জের ধরে আজ সকাল ৬টার দিকে বাড়ির সামনে ছোট ভাই মতির সঙ্গে বড় ভাই মুকুলের পারিবারিক জায়গা-জমির হিস্যা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে মতি ঘরে থাকা ছুরি দিয়ে বড় ভাই মুকুলের বুকে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এতে আলী আজগর মোস্তফা মুকুল ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন এবং মারা যান। এ ঘটনায় পুলিশ  মতিউর রহমানকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন পাকুন্দিয়া থানার ওসি।

অপরদিকে মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের ভরা গ্রামে রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় শাহজাহান মিয়া (৫৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, ঘাগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ভরা চড়িয়াবাড়ির আইয়ুব আলীর সঙ্গে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ভরা নয়াহাটির হাবিব সরকারের দীর্ঘদিন ধরে গোষ্ঠীগত বিরোধ চলে আসছিল।

মিঠামইন থানার ওসি জাকির রব্বানি জানান, গ্রামের একটি কাঁচা রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে আইয়ুব আলী ও হাবিব সরকারের সমর্থকদের মধ্যে গতকাল বিকেলে ঝগড়া হয়। সেই ঝগড়ার জের ধরে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আইয়ুব আলীর শতাধিক লোকজন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ভরা নয়াহাটি গ্রামে গিয়ে হাবিব সরকারের বাড়িতে অতর্কিতে হামলা চালায়। এ সময় আত্মরক্ষার্থে হাবিব সরকারের বাড়ির লোকজন এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। তখন হাবিব সরকারের ছোট ভাই শাহজাহান মিয়াকে সামনে পেয়ে হামলাকারীরা তাঁর বুকে বল্লম দিয়ে সজোরে আঘাত করে এবং ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই শাহজাহান মিয়ার মৃত্যু হয়।  এ সময় দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত শাহজাহান ওই গ্রামের মৃত কাছুম আলীর ছেলে।

এ ছাড়া আজ দুপুরে কিশোরগঞ্জ সদরে পারিবারিক কলহের জের ধরে মেয়ের জামাইয়ের হাতে শাশুড়ি খুন হয়েছেন। এ সময় শাশুড়ির কোলে থাকা জামাইয়ের তিন বছর বয়সী শিশু আনন্দ হোসেন বাবার ছোরার আঘাতে আহত হয়েছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আজ দুপুর ১২টার দিকে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার দানাপাটুলী ইউনিয়নের দানাপাটুলী পশ্চিমপাড়ায় ঘটনাটি ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সাত-আট বছর আগে দানাপাটুলী পশ্চিমপাড়ার মো. সায়াম উদ্দিনের মেয়ে অরুণার সঙ্গে হাবিবুল ইসলামের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। হাবিবুল মাদকসেবী হওয়ায় বিয়ের কিছু দিন পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। তিনি নেশা করে এসে প্রায়ই স্ত্রী অরুণাকে মারধর করতেন। বছর তিনেক আগে তাঁদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়।

কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মো. আবুবকর সিদ্দিক জানান, স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অরুনা কিছুদিন আগে বাবা সায়াম উদ্দিনের বাড়িতে চলে আসেন। বুধবার দুপুরের দিকে হাবিবুল ইসলাম শ্বশুরবাড়িতে এসে শাশুড়ি হালিমা খাতুনের ওপর চড়াও হন। এ সময় সঙ্গে নিয়ে আসা ছুরি দিয়ে তিনি হালিমা খাতুনকে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এ সময় শাশুড়ির কোলে থাকা তিন বছর বয়সী ছেলে আনন্দ হোসেনও ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত হয়। পরে শাশুড়িকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে হাবিবুল ইসলাম পালিয়ে যেতে চাইলে স্থানীয় লোকজন তাকে আটকানোর চেষ্টা করে। এ সময় হাবিবুল ইসলাম কয়েকজনকে আঘাত করে আহত করলেও স্থানীয় লোকজন সম্মিলিতভাবে তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। পরে রক্তাক্ত হালিমা খাতুন ও তাঁর নাতি আনন্দকে উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক হালিমা খাতুনকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া আনন্দকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাবিবুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার দানাপাটুলী ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বাসিন্দা। নিহত হালিমা খাতুন (৫০) দানাপাটুলী পশ্চিমপাড়ার সৌদি প্রবাসী মো. সায়াম উদ্দিনের স্ত্রী।

এদিকে করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ সুতারপাড়ায় ছোটদের খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে সুলাল মিয়া (৫২) নামের এক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো একজন আহত হয়েছে।

করিমগঞ্জ থানার ওসি মমিনুল ইসলাম জানান, আজ সকাল ১০টার দিকে গ্রামের ছোটদের খেলার মধ্যে ঝগড়া হয়। ছোটদের এই ঝগড়ার সূত্র ধরে দুপুর আড়াইটার দিকে বয়স্ক পুরুষেরাও ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে। ঝগড়ার একপর্যায়ে চাচাতো ভাই সবুজ (৫০) সুলালকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সুলাল। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সবুজসহ ছয়জনকে আটক করা হয়েছে বলে করিমগঞ্জ থানার ওসি জানিয়েছেন।

প্রতিটি ঘটনায় নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে নিজ নিজ থানার ওসিরা জানিয়েছেন।

Advertisement