Beta

লিট ফেস্টের শেষ দিনে শ্রীলংকার সাহিত্যিক পুরস্কৃত

১৯ নভেম্বর ২০১৭, ১০:৩৮ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৭, ১০:৩৯

ফিচার ডেস্ক

ঢাকা লিট ফেস্টের তিন দিনের আয়োজন শেষে পর্দা নামল গতকাল শনিবার। সকালে বাউল গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শেষ দিনের আলোচনা। এরপর একে একে ছয় মঞ্চে আলোচনা শুরু হয়।

সকাল ১০টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মঞ্চে শুরু হয় প্রথম আয়োজন। ‘ওমেন আর্ট অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক আলোচনায় বি রোলেটের সঞ্চালনায় অংশ নেন এস্থার ফ্রয়েড, নন্দনা সেন, বিগো চৌল ও সাদাফ সায্‌। নারীদের আলোচনায় উঠে আসে নারীদের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং তার প্রতিকারে করণীয়। বক্তাদের আলোচনায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথাও উঠে আসে। আলোচনায় আমেরিকার নির্বাচন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারির রাজনীতিও উঠে আসে।

ব্রিটিশ লেখক জন বার্জারকে সম্মাননা জানালেন তাঁরই বন্ধু অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী টিলডা সুইন্টন। চলতি জানুয়ারি মাসে মারা যান জন বার্জার। লেখক বন্ধুকে অনন্য অসাধারণ বলেই দাবি করেন টিলডা। এই আলোচনার পরেই টিলডারসহ চার পরিচালকের দ্বারা নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। এটির নাম ‘দ্য সিজন্স ইন কুইন্সি : ফোর পোর্ট্রেইটস অব জন বার্জার’।  এই ডকুমেন্টারিতে টিলডা অভিনয়ও করেছেন।

কলমকে কেনও এত ভয় নামক সেশনে অংশ নেন লেখক আহমেদ মোস্তফা কামাল, সাংবাদিক ও লেখক মাহবুব আজীজ।

উইলিয়াম ডালরিম্পল রচিত  কোহিনূর : দ্য হিস্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট ইনফেমাস ডায়মন্ড বইয়ের গল্প নিয়ে স্টোরি অব কোহিনূর সেশনটি শুরু হয়। সেশনটি সঞ্চালনা করেন সাদাফ সায্‌ সিদ্দিকী।  ডালরিম্পলের কথায় জানা যায় এটি একটি ঐতিহাসিক বই। এখানে কোহিনূরের নানা অধ্যায় উঠে আসে। তিনি বলেন, যদিও কোহিনূরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বেশি, কিন্তু আকৃতির দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ শতাধিক হীরার মধ্যেও এটির অবস্থান নেই। কিন্তু বরাবরই এটি আলোচিত একটি হীরা।

সকালে ভাস্কর নভেরা হলে চলছিল ‘ডিসপ্লেসমেন্ট শীর্ষক আলোচনা’। এতে অংশ নেন লেখক জেস বল, ডেভিড জেলে এবং সঞ্চালনা করেন কথাসাহিত্যিক সর্বরী আহমেদ। বক্তাদের আলোচনায় উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর দুর্দশার কথা ফুটে ওঠে। তবে সব ছাপিয়ে তাঁদের মূল পরিচয় তাঁরা মানুষ।

কমিউনিজম অ্যান্ড জায়ানিজম : আনএক্সপেক্টেড ফিউচার—চার্লস গ্লাস, সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, ডমিনিক জিগলার, রিচার্ড লয়েড পেরি—আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন বি রোলেট। আলোচনায় ইহুদিবাদ ও বামপন্থা নিয়ে নানা মতামত উঠে আসে। ইহুদিবাদ নিয়ে বেলফোর ঘোষণা সবচেয়ে মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেন চার্লস গ্লাস। অন্যদিকে, কাজী নাবিল আহমেদ  ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের আবাসস্থল ঘোষণাটিকে কলোনিয়াল ইমপ্ল্যান্ট বলে আখ্যা দেন। এটিকে পুঁজিবাদীদের চাপিয়ে দেওয়া একটি পরিকল্পনা বলেই জানান তিনি। এদিকে কমিউনিজম নিয়ে বক্তাদের আলোচনায় একটি কথাই উঠে আসে যে, রুশ বিপ্লবের সেই কমিউনিজম এখন আর নেই। অনেক ধারা বদলেছে। সে ক্ষেত্রে চীন বড় উদাহরণ।

‘১৯৭৪ দ্য সাইলেন্ট ইয়ার’ শীর্ষক আলোচনায় উঠে আসে চুয়াত্তরের মন্বন্তরের কথা। এতে গর্গ চ্যাটার্জির সঞ্চালনায় অংশ নেন নাওমী হোসেন ও সৈয়দ বদরুল আহসান। বাংলাদেশের ইতিহাসে যত দুঃসময় ছিল, তার মধ্যে ’৭৪-এর মন্বন্তর একটি বড় ঘটনা।

কবি শামসুর রাহমান অডিটরিয়ামে ব্লোন টু ইটস বিডস শীর্ষক একটি আলোচনায় অংশ নেন অনুক অরুপ্রাগাজম, ক্যাথরিন ল্যাসি, করণ মহাজন। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন এলিনর শ্যান্ডলার। এই তরুণ সাহিত্যিকরা সাহিত্য সৃজনে তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তাঁদের মধ্যে অনুক ও করণ ডিএসসি প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন।

সিজলেজ চ্যাটার অব ড্যামন শীর্ষক আলোচনায় বাংলাদেশের তরুণ লেখক ইখতিসাদ আহমেদের সঙ্গে বসেছিলেন শ্রীলংকার বর্ষীয়ান সাহিত্যিক অশোক ফেরি। আলোচনায় বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার সাহিত্যচর্চার বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেন। শ্রীলংকা একটি দ্বীপদেশ, জনসংখ্যাও অনেক কম। তাই দুই দেশের সাহিত্যবাস্তবতাও ভিন্ন।

দুপুরে কবি শামসুর রাহমান হলে চলছিল ভাষার রাজনীতি ও ভাষার অর্থনীতি শীর্ষক আলোচনা। এই আলোচনায় অংশ নেন কিন্নর রায়, সেবন্তি ঘোষ ও আলতাফ শাহনেওয়াজ। সঞ্চালনায় ছিলেন হামিম কামরুল হক। বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে ভাষার নানা প্রেক্ষাপট। তাঁরা দাবি করেন, শাসক ও শোষকের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই ভাষার প্রকৃত মুক্তি ঘটবে।

দুপুরের পর পর লনে সিরিয়া ওয়ার উইদাউট এন্ড শীর্ষক আলোচনায় বিবিসির সাংবাদিক জাস্টিন রোলেট, সাংবাদিক চার্লস গ্লাস এবং অধ্যাপক আজিম ইব্রাহিম অংশ নেন। সিরিয়ার যুদ্ধবিষয়ক সংকটের ইতিহাস, পটভূমি এবং ফলাফল নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, অচিরেই  মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

মধ্যদুপুরে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে খাদেমুল ইসলামের সঞ্চালনায় বসেন ব্রিটিশ নাট্যকার ডেভিড হেয়ার। দ্য ব্লু টর্চ পেপার শীর্ষক আলোচনায় ডেভিড হেয়ারের জীবনী উঠে আসে। এটি ডেভিড হেয়ারের আত্মজীবনী। তাঁর দীর্ঘ নাট্যযাত্রা নিয়েই কথা হয়। ১৯৬০ সালে কীভাবে সেই ব্রিটেনে নাটক নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেই গল্পগুলোই দ্বিতীয়বারের মতো বলেন ডেভিড হেয়ার।

মধ্যদুপুরে ধর্ষণ পুরুষের ক্ষমতা, পৌরুষের অক্ষমতা শীর্ষক একটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন আনোয়ারা সৈয়দ হক, সাদেকা হালিম, রিতা দাস রয় এবং বীণা বিশ্বাস।  বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে পুরুষরা ধর্ষণকে নিজের জন্মগত অধিকার বলেই মনে করে। তাঁরা দাবি করেন, নারীর প্রতি সহিংসতার সর্বোচ্চ নৃশংসতা হচ্ছে ধর্ষণ এবং এটি স্বাভাবিক। এর জন্য দায়ী আমাদের সামাজিক অবকাঠামো। আলোচনা শেষে বক্তারা দাবি করেন, পারিবারিক অনুশাসনই পারে ধর্ষণ রুখতে।

দিন শেষ সমাপনীর ঠিক আগেই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ হলে ছিল ব্রিটিশ সাহিত্য ম্যাগাজিন গ্রান্টার মোড়ক উন্মোচন।  মোড়ক উন্মোচনে ছিলেন গ্রান্টার অনলাইন এডিটর।

এদিকে শেষ বিকেলে লন ছিল লোকে লোকারণ্য, কারণ সে সময় মঞ্চে ছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। কবি এই উৎসবের আয়োজকদের অভিনন্দিত করেন এবং স্বকণ্ঠে স্বরচিত সাতটি কবিতা পাঠ করেন। এর পরপরই নাইজেরিয়ান সাহিত্যিক বেন ওকরি ও টিল্ডা সুইন্টন নিজেদের লেখা থেকে পাঠ করেন একই মঞ্চে।

দিন শেষে সবারই অপেক্ষা ছিল সমাপনী আয়োজন নিয়ে। সমাপনী আয়োজনে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনিই ঘোষণা করেন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার ডিএসসি প্রাইজ। এবার পুরস্কার পান শ্রীলংকার সাহিত্যিক অনুক অরুদপ্রগাসম, তিনি তাঁর দ্য ‘স্টোরি অব অ্যা ব্রিফ ম্যারেজ’ উপন্যাসটির জন্য পুরস্কার পান। সে সময় মঞ্চে ছিলেন ডিএসসি সাহিত্য পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সারিনা নারুলা ও অন্যান্য বিচারক।

পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠানকে দান করে দিচ্ছেন শ্রীলংকার এই তরুণ সাহিত্যিক।

অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, এ বছরের লিট ফেস্ট সবচেয়ে সেরা আয়োজন বলেই মনে করছেন তিনি। এমন উৎসবই তাঁদের প্রত্যাশা। মান এবং গুণগত বিচারে এটি দেশি-বিদেশি সবারই হৃদয় কেড়েছে। তিনি আরো বলেন, এর আগে হে ফেস্টিভ্যালে বহুবার দাওয়াত পেলেও তিনি সেটিকে নিজের বলে ভাবতে পারেননি তাই যাওয়া হয়নি। ঢাকা লিট ফেস্ট ঢাকার নিজস্ব অনুষ্ঠান, তাই তিনি এখানে বারবার আসেন। এটি তাঁর মন কেড়ে নিয়েছে।

এরপর একে একে লিট ফেস্টের তিন পরিচালক সাদাফ সায্‌, কাজী আনিস আহমেদ এবং  মঞ্চে উঠে সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সবশেষে আহসান আকবর সবাইকে চমকে দিয়ে ওকচা  নামক একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ঘোষণা দেন। সমাপনী আয়োজনে এটিই ছিল দর্শকদের জন্য উপহার। এর আগে কান উৎসবে এই ছবিটি প্রদর্শিত হয়। ছবিটি নেটফ্লিক্স পরিবেশনা করে।

নানা আয়োজনে শিশুদের জন্যও ছিল চার থেকে পাঁচটি শেসন। অঙ্ক শেখা, গল্প বলা, নন্দনা সেনের গল্প বলাসহ আরো কয়েকটি আয়োজন। 

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement