Beta

ছুটির দিনে

রেলপথে ঢাকা থেকে মানালি খরচ কত?

২০ মার্চ ২০১৭, ২৩:২৭ | আপডেট: ২১ মার্চ ২০১৭, ১০:০১

দূর থেকে ট্রেন দেখলে মনে হয় ছুটে আসছে লোহার অজগর। কিন্তু অজগর যতটা ভয়ংকর, ট্রেন ততটাই বিপরীত। তাই আনন্দময় আর নিশ্চিন্ত ভ্রমণের অন্যতম মাধ্যম ট্রেন।

আর সেই ট্রেনে যদি আপনি ভ্রমণ করতে পারেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায়, তবে তা হবে আনন্দ আর রোমাঞ্চের মহামিলন। নিশ্চয়ই অনেকে আন্দাজ করতে শুরু করেছেন আমি ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সিমলা-মানালি পর্যন্ত ট্রেন ভ্রমণের কথাই বলছি।

বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তাই এ দুই দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভালো। আপনি চাইলেই বাস কিংবা ট্রেনে চলে যেতে পারেন ঢাকা থেকে কলকাতাসহ ভারতের নানা দর্শনীয় স্থানে। তবে যাঁরা মানালি ভ্রমণের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নিয়ে রেখেছেন, তাঁরা জেনে নিন ট্রেনে কীভাবে যেতে পারেন ঢাকা থেকে সিমলা-মানালি পর্যন্ত। তবে এ ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে ভারতের ভিসা নিতে হবে গেদে স্থলবন্দর দিয়ে।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা-সিমলা-মানালি
ঢাকা থেকে ট্রেনের টিকেট নিয়ে উঠে পড়ুন মৈত্রী এক্সপ্রেসে। প্রথমেই চলে যান কলকাতা। দুই দেশের অপরূপ শোভা দেখতে দেখতে আপনি ভুলেই যাবেন নিজের দেশকে কখন পেছনে ফেলে চলে এসেছেন আরেক দেশে। কলকাতা পৌঁছে চাইলেই একটা দিন দেখে নিতে পারেন টিভিতে দেখা সেই ব্যস্ত নগরীকে। তারপর শিয়ালদহ থেকে কেটে নিন কালকা মেলের টিকেট, যা আপনাকে কলকাতা থেকে ৩২ ঘণ্টার আনন্দময় ভ্রমণের মধ্য দিয়ে সরাসরি পৌঁছে দেবে চণ্ডিগড়ের উত্তরে পাহাড়ি জনপদে অবস্থিত কালকা রেলস্টেশনে। ট্রেন থেকে নামলেই আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে স্টেশনের ঠিক বাইরে থেকে শুরু হওয়া আকাশের মেঘ ফুঁড়ে ওঠা পাহাড়গুলো দেখে। ঘণ্টা দুই সময় নিয়ে এই কালকা স্টেশনের আশপাশের ছবি তুলে পরে দুপুরের খাবার সেরে নিন। কালকা রেলস্টেশন থেকে অল্প দূরেই সিমলা মানালি যাওয়ার সব বাসস্ট্যান্ড।

তবে কালকা রেলস্টেশনের ঠিক পাশেই রয়েছে পাহাড়ি পথের দুরন্ত গাড়ি জিপ কিংবা টেম্পো ট্র্যাভেলার। এগুলো করে আপনি অনায়াসে কালকা থেকে পাঁচ ঘণ্টায় সিমলা কিংবা ১০ ঘণ্টায় চলে যেতে পারেন মানালি। কিন্তু আমাদের এবারে ভ্রমণের মূল মাধ্যম ট্রেন, তাই সড়কপথকে টাটা বাই বাই জানিয়ে কালকা স্টেশন থেকে কেটে নিন সিমলা যাওয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় মাধ্যম টয় ট্রেনের টিকেট। আর এই টয় ট্রেনে যেতে যেতে আপনার হৃদয় জুড়িয়ে যাবে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে। সঙ্গে বাড়তি পাওয়া হিসেবে পেয়ে যাবেন পাহাড় কেটে তৈরি করা ছোট-বড় অনেক টানেল। পাহাড়ের সৌন্দর্য আর অন্ধকার এসব টানেলের রোমাঞ্চে আপনার হাত-পা শীতল হয়ে আসবে। ভাবতে পারেন, মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় আপনি পেরিয়ে যাবেন ১০৩টি টানেল!

তারপর সময় করে একটা দিন সিমলা ঘুরে রওনা হতে পারেন মানালির উদ্দেশে। মানালির আসল সৌন্দর্য ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত। এই সময়ে মানালি ভ্রমণে আপনি পেয়ে যাবেন প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর রূপ। মানালি পৌঁছার অনেক আগে থেকেই হাড় কাঁপানো শীত আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। আর মানালি পৌঁছেই অনুভব করবেন শীতের চূড়ান্ত মাত্রা। বিশেষ করে রাতে মানালি পৌঁছালে হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা মুহূর্তে জমিয়ে দেবে আপনাকে। মনে হবে স্ট্যাচু হয়ে যাচ্ছেন আপনি। দিনে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তবে পরে সহ্যসীমার মধ্যে চলে আসে। তবে ভাববেন না তা আমাদের দেশে তীব্র শীতের মতো। হাঁড়কাঁপানো শীতের মধ্যেই চারদিকে শুভ্র বরফ নিঃসন্দেহে আপনার হৃদয়কে প্রশান্ত করবে। পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচ পর্যন্ত বরফ, প্রতিটি গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায় বরফ, রাস্তার পাশে দোকানপাট, ঘরের চালায় বরফ, ছুটে চলা গাড়ির ছাদে বরফ, আপনার হাতের কাছে সর্বত্র মিলবে বরফ। চোখ জুড়িয়ে যাবে প্রকৃতির এই লীলা দেখে। আর সোলাং ভ্যালিখ্যাত সেই বরফ সাগর দেখতে সকালের নাশতা খেয়ে চলে যান। বরফের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করুন আপনার জন্য তৈরি করে রাখা আশ্চর্য সব মাধ্যম দিয়ে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রুফওয়েতে বরফের বুক চিরে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাওয়া। অভিজ্ঞ প্যারাগ্লাইডারদের সঙ্গে প্যারাসুটে চড়ে চারিদিকে বরফঘেরা পাহাড় পাখির মতো উড়ে দেখতে দেখতে পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে নেমে আসা। এ ছাড়া স্কেটারদের জন্য স্কেটিংয়ের সব ধরনের ব্যবস্থা। এ ছাড়া নির্ধারিত মূল্যে বিভিন্ন রাইডের চড়ে আপনি উপভোগ্য করে তুলতে পারেন আপনার আনন্দময় ভ্রমণ। আর সঙ্গে প্রতিটি অ্যাডভেঞ্চারের সাক্ষী হয়ে থাকবে আপনার তোলা ছবিগুলো। এখানে এসে আনন্দে আত্মহারা হবে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সোলাং ভ্যালি দেখে চলে যেতে পারেন মানালির অন্যান্য দর্শনীয় জায়গাগুলো দেখতে। এর মধ্যে রয়েছে হাদিম্বা টেম্পল, যাখ্যো টেম্পল, মানিকারন। এই হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যেও মনিকারন গিয়ে আপনি পেয়ে যাবেন গরম পানির ঝরনা।
ভ্রমণ ব্যয়
একা অথবা দুজন মিলে মানালি বেড়াতে গেলে ঢাকা থেকে রওনা করে সব দেখে ঢাকায় ফিরে আসা পর্যন্ত আপনার ব্যয় হবে জনপ্রতি ৩০ হাজার বাংলাদেশি টাকা। কিন্তু দলটা একটু বড় করে নিয়ে আট থেকে ১০ হলেই ভ্রমণ ব্যয় নেমে আসবে অর্ধেকে। মাথাপিছু মাত্র ১৫ থেকে ১৮ হাজারের মধ্যেই আপনি সম্পন্ন করতে পারবেন আপনার ভ্রমণ।

থাকা-খাওয়া
ভ্রমণে আপনার সর্বাবস্থায় শরীর ভালো থাকতে হবে। তাই সব সময় লক্ষ রাখবেন থাকার জায়গা, খাবার এবং বিশুদ্ধ পানি পানের নিশ্চয়তার দিকে। যেহেতু ঢাকা থেকে মানালি ট্রেনে দীর্ঘ্সময়ের পথ, তাই প্রথম শ্রেণির যাত্রী হওয়াই উত্তম। ভ্রমণ করার সময় প্রয়োজনীয় সব খাবার পেয়ে যাবেন ট্রেনেই। এ ছাড়া কলকাতা, সিমলা, মানালিতে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মানের হোটেল, মোটেল। আপনার সাধ্যের মধ্যে যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন। আর সব জায়গাতেই রয়েছে বাঙালি খাবারের ব্যবস্থা। একটু খুঁজলেই হাতের কাছে পেয়ে যাবেন এগুলো।
টিকেট ও হোটেল বুকিং
ঢাকা থেকে কলকাতা মৈত্রী এক্সপেসে প্রথম শ্রেণিতে খরচ হবে চৌদ্দশত টাকা। কলকাতা থেকে কালকা ‘কালকা মেল’ প্রথম শ্রেণিতে থ্রি-টার এসির টিকেট মিলবে ১৮০০ টাকার মধ্যে। আর টয় ট্রেনের টিকেট মিলবে ৩০০ টাকায়। প্রতিটি টিকেট আপনি কাটতে পারবেন স্টেশনের টিকেট কাউন্টার থেকে। তবে ভ্রমণকারীরা সাধারণত ভ্রমণের সময় কোনো ধরনের বিপাকে পড়তে চান না। তাই ভ্রমণ সিজনগুলোতে যখন টিকেটস্বল্পতা সৃষ্টি হয়, তখন আগে থেকে টিকেট নিশ্চিত করে রওনা হওয়াই উত্তম। সে ক্ষেত্রে আপনি আপনার নিজস্ব ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ইন্ডিয়ান রেলওয়ের ওয়েবসাইট থেকেও টিকেট কেটে নিতে পারেন। অথবা কোনো ভ্রমণ গাইডের সহযোগিতায় টিকেট কেটে রাখতে পারেন। কলকাতা, সিমলা ও মানালিতে যেসব হোটেল রয়েছে, সেগুলোতে থাকতে প্রতিদিন আপনাকে খরচ করতে হবে ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে। তবে আরো অধিক মূল্যেরও অনেক হোটেল রয়েছে।

সতর্কতা
•    যেহেতু মানালি ভ্রমণে আগ্রহী, তাই অবশ্যই আপনাকে মোকাবিলা করতে হবে তীব্র শীত। প্রয়োজনীয় শীতের কাপড় সঙ্গে রাখুন।
•    ভ্রমণে শারীরিক সুস্থতা আবশ্যক। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না যেন।
•    পাহাড়ি পথে ভ্রমণে চালককে সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে সহায়তা করুন।
•    সঙ্গে ছোট বাচ্চা থাকলে তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন থাকুন।

Advertisement
Advertisement