গান কথা গল্প : আমি গান গাইতে চাইনি : সামিনা চৌধুরী

২৯ জুন ২০১৫, ১৫:৪৩ | আপডেট: ২৯ জুন ২০১৫, ১৬:০১

শুরুর গল্পটা এক বালিকার। যাকে সবাই ‘ঘুমের রানি’ বলে ডাকত। ঘুম ভাঙিয়ে দিলে অথবা গান গাওয়ার কথা বললেই রাজ্যের সব রাগ জেগে উঠত একদম। কী রাগ!  গান তাকে টানত না, টানত নাটকে। কিন্তু একদিন রঙিন ফ্রক পরা এই বালিকা যখন বাড়ির আঙিনা ঝাড়ু দিচ্ছিল, তখন এক স্বনামধন্য সুরস্রষ্টা তাকে প্রথমবারের মতো নিয়ে গেল সুরের জগতে। ছোট্ট সুমা কিছু না ভেবেই অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই গেয়ে ফেলল একটি গান। তার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল গান, কিছুতেই সঙ্গ ছাড়ল না। সেই একটি গানই ‘কাল’ হলো তার। কিন্তু সুদিন এলো বাংলা গানের। দেশের সংগীত আকাশ পেল এক সুরের নক্ষত্র। যে তাঁর কণ্ঠ দিয়ে এক-একটা বর্ণমালা গেঁথে যায় সুরে সুরে। শ্রোতার ভাবনায় সেই দৃশ্যপট আপনাআপনিই ভেসে ওঠে।

পুরো নাম সামিনা চৌধুরী। নামেই যথেষ্ট। নাম শুনলেই শ্রোতাদের মনের ভেতর বেজে ওঠে কিছু অসম্ভব সুন্দর কথা ও সুরের কালজয়ী গান। শিরায় শিরায় তাঁর বাবা, বাংলা গানের প্রবাদপুরুষ মাহমুদুন্নবীর রক্ত প্রবাহমান। পৈতৃক বাড়ি ওপার বাংলার বর্ধমানের কেতুগ্রামে। এক ভাই, তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। ২৮ আগস্ট দিনাজপুর নানাবাড়িতে মা রাশেদা চৌধুরীর গর্ভে জন্ম, আর সংগীতশিল্পী হিসেবে জন্ম হয়েছিল ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’ গানটি দিয়ে। ওস্তাদ মোশাদ আলীর হাতে হাতেখড়ি এই শিল্পীর যাত্রা ‘নতুন কুঁড়ি’ দিয়ে। পরে ১৯৮১ সালে আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ এবং আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে ‘নয়নের আলো’ সিনেমায় গান গেয়ে পেয়েছেন বাচসাস পুরস্কার। ২০০৬ সালে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ক্লাস এইট থেকে প্লে-ব্যাক শুরু করা এই গুণী শিল্পীর সংগীতকাহন শুনুন।

ওই ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায় আমার ইচ্ছে করে

আমার প্রথম অ্যালবামের গান এটি। তখন শুধুই সিনেমার গান গাচ্ছি, টেলিভিশনে গাচ্ছি। ১৯৮৪ সাল হবে। একদিন আমাদের বাসায় সংগীতশিল্পী জানে আলম সুরকার নকীব খানকে নিয়ে আসেন। তারপরে তো নকীব ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তাঁরা একটা অ্যালবাম করতে চান। আমার তো সবকিছুতেই প্রথমেই একটা না না ভাব। এটা ভালো না। অনেকবার বলতে বলতে একপর্যায়ে আমি রাজি হয়ে গেলাম। তারপর একটার পর একটা গান তৈরি হতে লাগল। তখন উনিও আমাদের বাসায় আসতে লাগলেন। আমাদের পারিবারিক বন্ধু হয়ে গেলেন তিনি।

পরে ১৯৮৬ সাল নাগাদ প্রথম অ্যালবামটা শেষ হলো। এই গানটার একটা ঘটনা আছে। এই গানটির রেকর্ড শেষ। ক্যাসেটটি ছাড়ার আগে নকীব ভাই গানগুলো আমাকে শোনাচ্ছেন। শুনতে শুনতে এই গানটির একদম শেষ দিকে গিয়ে আমি খেয়াল করলাম, ‘সাগরবেলায়’ উচ্চারণটা ভুল করে ‘সাগর ব্যালায়’ গেয়ে ফেলেছি। আমি নকীব ভাইকে বললাম, ‘এই ভুল কী করে করলাম?’ উনি বললেন, ‘শোনো সুমা, এটা তো পরশু বের হয়ে যাবে।’ আমি বললাম, ‘ওই যাওয়া টাওয়া নিয়ে আমার কিছুই করার নাই। এখনি ঠিক করতে হবে। এখনি রেকর্ড করব।’ তারপর স্টুডিও বুকিং না করে এলভিস স্টুডিওতে গেলাম। কিন্তু কাজ হলো না। একদম শেষ লাইনের ‘বেলা’ উচ্চারণের ভুলটা থেকেই গেল। কত সিম্পল সুর কিন্তু কী অসাধারণ। গীতিকার ডা. মোহাম্মদ আরিফের এই কথাগুলোও খুব সহজ-সাধারণ, কিন্তু অসম্ভব রোমান্টিক।

ফুল ফুটে ফুল ঝরে

নতুন কুঁড়ির সময় আমরা গান করতাম, নাটক করতাম। আর ওটাই ছিল আমার জীবন। তখন ’৮২ সাল। বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘শিউলি মালা’র প্রযোজক ছিলেন অভিনেতা আল মনসুর বেলাল ভাই। তিনিই এই গানের গীতিকার। বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার খুব জিগরি দোস্তি ছিল। আমার কাছ থেকে ১৫-২০ বছরের বড় তিনি। ছোটবেলা থেকেই আমি ওপরে ওপরে বড় ভাব নিতাম। বেলাল ভাইয়ের প্রতি কথায় কথায় ঝগড়া হতো। আমরা এত ভালো বন্ধু ছিলাম, দুজনে ঘুরতাম, নাটক দেখতাম, রিহার্সেল করতাম। একদিন বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে খুব ঝগড়া। কথা বলি না। তো একদিন আমার বাসায় তিনি বললেন, ‘নুমা (ফাহমিদা নবী), সুমারে কও এই গানটা একটু তুলে নিতে।’ আমার কেন এত রাগ ছিল এখন চিন্তা করি। আমারে তখন কেউ কোনো কথা বলতে পারত না। ওনার সঙ্গে নিঝু ভাইও এসেছেন। প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী আমিনুর রহমান নিঝু। এই গানটির সুরকার।

আমি তখন নিঝু ভাইকে বললাম, নিঝু ভাই, আমি কিন্তু কোনো গান গাইব না, আপনি বলে দেন। নুমা বলল, ‘বেলাল ভাই জানেনই তো, ও তো এ রকমই, বাদ দেন না।’ বেলাল ভাই তখন আবারও বললেন, ‘তুমি কও ওরে গানটা তুলে নিতে।’ আমি আবারও বেলাল ভাইকে শুনিয়ে বললাম, নুমা ওকে বলে দে, আমি কিন্তু গান করতে পারব না। নিঝু ভাই তখন বললেন, ‘বোন না লক্ষ্মী, গানটা শুধু তুলো। কিচ্ছু করতে হবে না।’ গানটা তুললাম। বললাম, ঠিক আছে আমি রেকর্ডিং করে দিচ্ছি কিন্তু কোন শুটিং করব না। পরে বিটিভিতে গিয়ে রেকর্ডিংও করলাম।

তার দু-তিনদিন পর নিঝু ভাই বাসায় এলেন। ‘শোন সুমা, আজকে শুটিংয়ে একটু খালি যাবি।’ আমি বললাম, খবরদার, আমি কিন্তু আগেই বলে দিয়েছি, বেলাল ভাইয়ের গান আর কক্ষনো না। এই করতে করতে এক ঘণ্টা। অনেক পটানোর পর নুমার একটা শাড়ি কোনোমতে পেঁচিয়ে আমি বিটিভিতে চলে গেলাম। আমি চুলটা খোঁপা করে বসলাম। বেলাল ভাইয়ের গান গাব ভেবে আমার কী যে রাগ হচ্ছিল তখন। বেলাল ভাই নিঝু ভাইকে বললেন, ‘ওকে বসতে বলো।’ হাতে একটা বড় ধরনের কুরুস কাঁটা আর সুতা ধরিয়ে দেওয়া হলো। উনি বললেন, ‘ওকে ওই কাঁটাটা হাতে নিতে বলো? আর নিঝু ওরে চুল খুলতে ক।’ নিঝু ভাই আমি কিন্তু চুল খুলব না। আমি যদি চুল খুলি তাহলে এখনি উঠে চলে যাব। এ রকম আলাপ চলতে চলতে হঠাৎ করেই আমার চুলটা খুলে দিলেন বেলাল ভাই। আমার সঙ্গে কথা বলতে পর্যন্ত মানুষ ভয় পায় আর উনি আমার চুল খুলে দিচ্ছেন। এত্ত সাহস! আবার আমি কথাও বলি না! রাগে চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। আর বেলাল ভাই চুল খুলে দিয়েই ‘শুটিং শুটিং ক্যামেরা অন’ বলে কাজে লেগে গেলেন। আমি তো আর মুখ তুলব না। ক্যামেরার দিকে তাকাব না। এই একটা মোক্ষম অস্ত্র। আর পুরো শুটিংটাই আমি মুখ না তুলে, নিচের দিকে অপলক চেয়ে ‘ফুল ফোটে ফুল ঝরে, ভালোবাসা ঝরে পড়ে না’ গাইতে লাগলাম। এই অনুষ্ঠানের পরে তো দেখি সবদিকে এই গানের সুনাম। আর আমার তো রাগ। মা বলে, ‘তোর এত রাগ কেন।’ আমার আর নাটকে ফিরে যাওয়া হলো না, আর গানও আমাকে ছাড়ল না।

জন্ম থেকে জ্বলছি

আমাদের বাংলাদেশের আলাউদ্দিন আলী, লাকী আখন্দ ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এঁরা এ দেশে জন্ম না নিয়ে অন্য কোনো জায়গায় জন্মালে পৃথিবী কাঁপিয়ে ফেলত। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। ১৯৮১ সাল হবে। সেদিন ঘরের বারান্দা ঝাড়ু দিচ্ছিলাম, আলাউদ্দিন চাচা আম্মাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘ভাবি, আপনার মেয়েকে নিয়ে গেলাম’ আমাকে বললেন চলো সুমা। তারপর উনি আমাকে নিয়ে গিয়ে ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ গানটা গাইতে বললেন। ফ্রক পরা অবস্থায় স্টুডিওতে চলে গেলাম। আমি গাইলাম। গানটি লিখেছিলেন আমজাদ হোসেন চাচা।

আমার আর আমার আব্বার ভাগ্যটা আল্লাহ একই রকমভাবে লিখে দিয়েছেন। আজকে এই বয়সে এসে এই কথাগুলো বলতে তো আর কোনো বাধা নাই। আমার আব্বার পেছনে অনেক শত্রু ছিল। আমার মনে হয়, এরা আমার আব্বার বন্ধু ছিল, আব্বা গান গাইতে পারে ভালো। আমার আব্বা কেন ভালো গায় এটাই তাঁর অপরাধ। আব্বাকে কোণঠাসা করে দিল। আব্বার তো কোনো চাহিদা ছিল না। ঠিক আমিও তাই হয়েছি। আমার গান গাওয়ারই কোনো চাহিদা নেই। আমাকে দিয়ে আলাউদ্দিন চাচা গাওয়ালেন। সেটা হিট হয়ে গেল। এটা কি আমার দোষ? আর হিট করানোর জন্য তো আমি কাউকে পয়সাও দেইনি। ভিডিও বানাইনি। মানুষের সামনে তো এক্সপোজডও হইনি। আমাকে চাচা গাইতে বলছেন, আমি গেয়ে দিয়েছি।

একবার যদি কেউ ভালোবাসতো

তারপর আবার ১৯৮১ সালের ২ নভেম্বর আলাউদ্দিন চাচা এসে মাকে বললেন, ‘রেকর্ডিং করলাম ভাবি, আপনার মেয়েকে দিয়ে ছোটদের একটা গান করালাম। কিন্তু আপনার মেয়ের গলা তো স্যুট করে না। মেয়ের তো গান হবে না।’ মা বলেন, ‘তাই? সুমার গান হবে না?’ চাচা বললেন, ‘ওকে দিয়ে এখন ছোটদের গান হবে না। ওকে দিয়ে এখন বড়দের গান করাতে হবে। আমি নিয়ে যাচ্ছি। আবার গান করতে হবে।’ আর আমি তো আলাউদ্দিন চাচাকে কিছু বলতেও পারছি না। কিছু করতেও পারছি না। তারপর আমাকে নিয়ে গিয়ে মগবাজারের শ্রুতি স্টুডিওতে হারমোনিয়াম দিয়ে বসালেন। পরে আমজাদ চাচা এবং আলাউদ্দিন চাচা একসঙ্গে বসলেন। আলাউদ্দিন চাচা প্রথম লাইনটা হারমোনিয়ামে বাঁজিয়ে সুর করে গাচ্ছেন। ‘একবার যদি কেউ ভালবাসতো’। আমি চুপচাপ বসে আছি। সে অর্থে গানটির প্রথম লাইনটি আলাউদ্দিন চাচাই লিখেছেন।

আমজাদ চাচা তখন বললেন, ‘এই লাইনটাই আমি নিব।’ তারপর আমজাদ চাচা আরো যোগ করলেন, ‘আমার নয়ন দুটি জলে ভাসতো/এ জীবন তবু কিছু না কিছু পেত’। আর আমি মনে মনে খুব বিরক্ত হচ্ছি। তারপর গান লেখা শেষে গানটি শিখলাম। বাচ্চা একটা গলা, ওটাকে ওনারা কীভাবে ওকে করলেন বুঝি না। তখন একবারই গাইতে হতো। আর আমি এক টেকেই গানটা গেয়ে দিলাম। আলাউদ্দিন চাচা নিশ্চয় ভাবছিলেন, একটা ওয়ান্ডার গার্ল পেয়েছি। আর আমি ভাবছিলাম, আমাকে ছেড়ে দেন, আমার বারান্দা ঝাড়ু দেওয়া বাকি আছে ভাই‍! আর তখন তো নুমা গান গাইত। আমি ছিলাম ওর অ্যাসিসটেন্ট। তো নুমা এত সুন্দর করে গান গাইত। ও পাগলের মতো গান ভালোবাসত। আমার মনে হতো ওই গান গাক। যাইহোক, গানটি গেয়ে চলে এলাম।

কিছুদিন পর। নুমা তো খুব রেডিও শুনত। তো শুনলাম রেডিওতে ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’ গানটি বাজছে। আমি বললাম, ‘ইয়া আল্লাহ, নুমা এটা তো আমারই গলা রে। কী বিশ্রি গলা! এটা কীভাবে আলাউদ্দিন চাচা গাওয়ালেন? তারপরে তো সবার প্রিয় হয়ে গেল...এই গান। এত্ত ছোট্ট বয়সেই পেয়ে গেলাম বাচসাস পুরস্কার।

আমার বুকের মধ্যেখানে

আগে কোনো কাজই আমি করতে চাইতাম না। আমি জানি কেমন! কখনো গানের শিল্পী হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। যার জন্য কখনোই কারো কাছে ফোন দেওয়া, কেউ কোনো কাজ নিয়ে এলে কখনোই খুশি হতাম না। না হলে আমি বুলবুল ভাইকে বলি, আগে আমি গান শুনব। তখন আমি বালিকামাত্র। এন্ড্রুদা আর উনি এসে আমাকে বললেন, একটা সিনেমার জন্য গান তুমি গাইবে? তখন বললাম, হ্যাঁ, আগে গান শুনব, গানের কথা শুনব, সুর শুনব তারপর যদি আমার ভালো লাগে তাহলে আমি অবশ্যই গাইব। তখন বুলবুল ভাই বললেন, ‘ও আচ্ছা।’ তারপরে দুদিন পর সকাল বেলায় ফোন। আর আমার একটা নাম ছিল, ঘুমের রানি। এখনো ঘুমাতে আমি অনেক ভালোবাসি। আর আমার ঘুমে যদি কেউ বিরক্ত করে, তাহলে তার খবর আছে। ওই সময় তো ছোট ছিলাম। তাই রাগটাও বেশি ছিল। আমাদের বাসায় তখন ফোন ছিল না। মোহাম্মদপুরে নূরজাহান রোডের বাসায় আমরা থাকতাম দোতলায়। নিচের বাসায় ছিল ফোন। টিএনটিতে ফোন এলে আমাদের ডাকা হতো। সেদিন ভোর সাড়ে ৭টায় আমার ফোন এলো। আমাদের বাসায় যে মেয়েটা থাকল ফুলি, ভয়ে ভয়ে আমাকে এসে বলল, ‘সুমা খালা, নিচে আপনার ফোন এসেছে।’ আমি বললাম, তুই ধর আমি পারব না।

যাইহোক আমি গেলাম। আমার আজও সব মনে আছে। আমি বললাম কে? তখন অপর প্রান্ত থেকে উল্টো বলছে হ্যালো, কে? আমি বললাম, আমি। আমি মনে মনে বলছি, তুমি বাবা আমাকে জেনেই জিজ্ঞেস করেছো আমি কে? তাহলে আবার বলছো কেন ‘কে?’ আমি যখন ওনাকে বললাম, আপনি কে বলছেন? উত্তরে উনিও বলছেন, ‘আমি’। আমি তো শুনেই গলা চিনে ফেলেছি। আমি বললাম ও, কী ব্যাপার বলেন? উনি বললেন, ‘তুমি আমাকে বললা, তুমি আমার গান শুনবা, তারপর পছন্দ হবে, তারপরে গাইবা?’ আমি বললাম, হ্যাঁ। উনি বললেন, ‘তোমার এত্ত বড় সাহস, এত্তটুকু একটু মেয়ে, তুমি এত্ত বড় বড় কথা আমাকে বললা?’ আমার এত খারাপ লাগল, আমি বললাম, আপনারও তো সাহস কম না, এই সকাল বেলা আমার ঘুম ভাঙিয়ে আমারে নিচে নামিয়ে আমাকে কথা শুনাচ্ছেন। আপনি কী করে আশা করছেন, আমি আপনার এই কথা শোনার জন্য ঘুম নষ্ট করে নিচে নামব?

তখন বুলবুল ভাই বললেন, ‘ও তাই, আমি কি তোমার ঘুম নষ্ট করেছি নাকি? আমি তো তাহলে খুব সরি।’ আমি বললাম, হ্যাঁ! ঠিক তাই। আর কিছু বলবেন? উনি বললেন, ‘আমি আর কিছু বলব না।’ তারপর ফোন রেখে ফুলিকে বললাম, তুই কেন এসব ফোনটোন আমাকে দিস? এর কয়েকদিন পর মনে হয় এন্ড্রুদা বুলবুল ভাইকে বুঝিয়েছে, ‘সুমা তো একটু আউলা। আপনি কিছু মনে কইরেন না।’ তারপর বুলবুল ভাই বুঝেছেন, কোনো পাগল ছাড়া এসব ভালো প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবে না। তারপরে উনি আবার এলেন, আম্মাকে নিয়ে ওনার এক বন্ধু বাসায় গিয়ে গান তুললাম। গান শুনে তো আমি মুগ্ধ। কিন্তু আমার গাওয়ার কোনো ইচ্ছা নাই। আমি তো নাটক করব। আমি খুব বিরক্ত হচ্ছি। কেন আমাকে ডাকা হচ্ছে। আমি ভাবছি, এবারই শেষ, গেয়েটেয়ে দেই বাবা। এরপরই আমি আর গান করব না। নাটক করব।  

১৯৮২ সালের ১৪ জুলাই ওনারা আমাদের বাসায় আবার এলেন। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর গান রেকর্ডিং হলো। গান শেষ হওয়ার পর কোনো মন্তব্য উনি করেননি। শুধু আমাকে আমার বাসায় পৌঁছে দিলেন। আসলে এরই মধ্যে যতখানি ঝগড়া হলো তার অনেক বেশি ভাব হয়ে গেল। কারণ ওনাদের পরিবারটাও আমাদের মতো খুব সাধারণ ছিল। আর বুলবুল ভাইও আমার ছোট ভাইবোন অন্তরা আর পঞ্চম বলতে পাগল। উনি যখন বাসায় আসতেন তখন কাজুবাদাম, ওভালটিন কেক এগুলো নিয়ে আসতেন। এই সিনেমার ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’ গানটির জন্য বাচসাস পুরস্কার আবারও পেলাম। বাচসাস তখন একসঙ্গে পাঁচ বছরের পুরস্কার দিল। তার মধ্যে দুই বছর আমি পেয়ে গেলাম। দুই বছর সাবিনা ইয়াসমিন এবং এক বছর পেলেন রুনা লায়লা। এখন স্বাভাবিকভাবেই আমার পেছনে শত্রু লেগে গেল। আরে বাবা আমি তো গানই গাইতে চাইনি! এই জিনিসটা আমি এখনো বুঝি না।

কিছু বড় শিল্পী আমার পেছনে লেগে গেল। আমার গলাটা কেন মিউজিক ডিরেক্টরদের পছন্দ হলো, কেন আমি পুরস্কার পেলাম। এটাই আমার হয়ে গেল পাপ। যেন জন্মই আমার আজন্ম পাপ! আর আমি আবার গান শুরু করেছি ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’ দিয়ে। আমার জীবন কাহিনী নিয়ে যদি সিনেমা বানানো যেত, তাহলে সেই সিনেমাটি হতো সুপার ডুপার হিট সিনেমা। প্রতিটা পদে পদেই একটা একটা করে ঘটনা। ‘নয়নের আলো’ সিনেমায় সবগুলো নারীকণ্ঠ আমারই ছিল। আর পুরুষকণ্ঠ ছিল, এন্ড্রুদার। আমি গেয়েছিলাম, ‘আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকব’। তারপর কাভার সং ছিল, ‘কাম অন ডান্স উইথ মি’ ও কিছু খণ্ড খণ্ড কীর্তন ছিল। 

কোনো এক সুন্দর রাতে

এ রকমই আমি ভাবছি, আমি আর গান করর না। তো একদিন টুলু ভাই বললেন, ‘সামিনা তোমাকে কিন্তু আমার একটা গান গাইতে হবে।’ এই গানের সুরকার ও সংগীত পরিচালক আশিকুজ্জামান টুলু ভাই। উনি একজন অসাধারণ মিউজিশিয়ান। আমি ওনাকে বললাম, দেখি কথা দিতে পারছি না। তো একদিন রিকশা করে কোথায় যেন যাচ্ছি। তো সেদিন আমাকে ফোন করে টুলু ভাই বললেন, ‘সুমা, আমি এখন অমুক স্টুডিওতে আছি। তুমি প্লিজ একটু এসে গানটা গেয়ে দিয়ে যাও।’ আমি আবার সেই বিরক্তি নিয়ে গেলাম। আর গীতিকার নিন্টুকে (সেজান মাহমুদের ডাকনাম) বললাম, কি গান করছস বল? তাড়াতাড়ি কর। কী গান গাওয়াতে চাচ্ছিস। আমাকে দিয়ে গাওয়ানোর কী দরকার? অন্য কাউকে দিয়ে গাওয়া। তারপর কোনোমতে গানটা তুলে আধা ঘণ্টার মধ্যে গেয়ে দিলাম। খুব সুন্দর গান। টুলু ভাইয়ের সুরের ঢংটা আমার খুবই পছন্দ। তবে গান নিয়ে এত কিছু ভাবার কিছু ছিল না, আমার কাছে এটা একটা কাজ। একটা অঙ্ক। আমাকে বলছে গাইতে। আমি গেয়ে দিলাম। গেয়ে টুটুল ভাইকে বললাম, ভাই হইছে? টুলু ভাই বললেন, ‘কি কছ্ সামিনা, ওকে মানে! তুমি কী কইরা দিছো তুমি নিজেই জানো না!’ আমি বলেছি, আমার জানার সময় নাই! যাইহোক গান থেকে মুক্তি চাইলেও গান আর ছাড়ছে না, তাই আবারও বিরক্তি নিয়েই ফিরে এলাম। এই গানটি ‘স্টারস’ নামের একটি মিক্সড ক্যাসেটের গান। এটা সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম মিক্সড অ্যালবাম ছিল। যেখানে সব প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডশিল্পীরা গান করেছিলেন। এটা একটা দারুণ প্রজেক্ট ছিল।

কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে

আমার গানের চেয়ে মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট বাজানোর দিকে মনোযোগ ছিল বেশি। আমি চুরি করে করে কিবোর্ড বাজানো শিখতাম। লাকী চাচা হারমোনিয়াম দিয়ে দুই হাত দিয়ে কিবোর্ডের মতো বাঁজাত আর আমি দেখে শেখার চেষ্টা করতাম। আমি হলাম কপি মাস্টার! আমাকে যা দেওয়া হবে, যা শুনব, যা দেখব আল্লাহর অসীম রহমত, আমি কপি করতে পারি। আমি তো গান দেখে গাইতে পারি না। এই গান সম্বন্ধে কী আর বলব, তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘সুরবাণী’ নামের একটা চমৎকার অনুষ্ঠান হতো। একজন সুরকার আর একজন গীতিকারের গান হতো। পাঁচজন শিল্পীর ১০টা গান থাকত সেখানে। ভোটিংও হতো। দর্শকরা অনুষ্ঠানটি শুনে চিঠি পাঠিয়ে ভোট দিত। শুধু শিল্পী না, গীতিকার, সুরকারের জন্য ভোট দিত দর্শক। যে গানটি বেশি ভোট পেত, সেই গানের নামটা অনুষ্ঠানের শেষে ঘোষণা দেওয়া হতো। তো সেবার ওই অনুষ্ঠানের গীতিকার কাউসার আহমেদ চৌধুরী এবং লাকী আখন্দের সুরে গান। তো সবাইকে গান ভাগ করে দেওয়া হলো। আমাকেও দুটো গান দেওয়া হলো। একটা হলো ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’ অন্যটি ‘আমায় ডেকো না’।

যেদিন গান রেকর্ডিং হতো তার পরের দিন অনুষ্ঠান ধারণ হতো। তো যেদিন গান রেকর্ডিং করব সেদিনই আমার গলা বসে গেল। বসা মানে এমন বসা গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হচ্ছে না। আমি তো দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম, কী করব? একে তো দুটো গানই এমন চড়ায়, ফিলিংস টিলিংস পরের কথা। গলা দিয়ে তো আওয়াজই বের হচ্ছে না। তবুও লাকী চাচার ডাকে স্টুডিওতে গেলাম। তখন ১৯৮৫ সাল। মনে আছে এলভিস স্টুডিওতে রেকর্ডিং ছিল। গিয়ে দেখি, গলা দিয়ে একটু একটু আওয়াজ বের হচ্ছে, আবার মিশে যাচ্ছে। কিন্তু গাইতে তো হবেই। কারণ পরের দিন অনুষ্ঠান হবেই। শুধু ওপরের দিকে তাকিয়ে আল্লাহরে বললাম, আল্লাহ তুমি শুধু ইজ্জতটা রক্ষা করে দিও। আমি তো গান গাইতেই চাইনি। তুমিও তো সব করতেছো। এই বলে আল্লাহর দিকে তাকিয়ে আমি স্টুডিওর দরজাটা খুলে ঢুকলাম, দাঁড়াইলাম, হেডফোন নিলাম, গাচ্ছি, ওমা দেখি গাইতে পারছি! একবারই গানটা গেয়ে দিলাম, ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’। শুধু একটা জায়গায় গলাটা ক্রেক করল কিন্তু থামলাম না। ওই ক্রেকটা কেউ বুঝতে না পারলেও আমি বুঝি। দ্বিতীয় অন্তরার ‘পলাতক আমি’র ‘মি’ জায়গাটায় ওই ক্রেক রয়েছে, আজ বলে দিলাম।

আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না

‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’ গানটা গাওয়ার পরপরই আমি বললাম, লাকী চাচা আপনি ‘আমায় ডেকো না’ গানটাও নিয়ে নেন। আমি বের হতে চাই না। আমার গলায় গাইতে পারছি আমি। আপনি তাড়াতাড়ি ভয়েসটা নিয়ে নেন। দ্বিতীয় গান, ‘আমায় ডেকো না’। গাচ্ছি, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুচ্ছে, চলছে। এই গানটিও একবারেই ওকে। রেকর্ডিং শেষ। তারপর স্টুডিওর দরজা খুলে বের হলাম। লাকী চাচা বললেন, ‘সুমা, হয়ে গেছে।’ ওপরে আল্লাহর দিকে আবারও তাকালাম। কিন্তু কী আশ্চর্য স্টুডিওর দরজা খুলে যেই বাইরে বের হয়ে এসেছি দেখি আবারও গলা বন্ধ! এটা কীভাবে সম্ভব? আমার এই ঘটনা মনে হলেই কান্না আসে। কেন আল্লাহকে স্মরণ করব না, ধন্যবাদ দিব না বলুন! তাঁর প্রতি বিশ্বাস কেন আমি আনব না বলুন?

এখন এই গানগুলোর শুটিং হবে। কিন্তু শাড়ি তো নাই আমার। আর মা যে আমাদের গান-বাজনা নিয়ে ‘এই-সেই-যেন-তেন’ করা যা বলে তা করতেন না। শুধু ভালো থাকো, সৎ থাকো, গান এলে গাবে, না এলে নাই- এ রকম একটা অবস্থা ছিল আমাদের পরিবারে। যেখানে আব্বার পরিচয়ে আমাদেরই বেশি গাওয়ার কথা ছিল বেশি, সেখানে আমরা উল্টোভাবে মানুষ হলাম। যাইহোক, শুটিংয়ে ‘কবিতা পড়ার প্রহর’ গানটিতে আমার দিলি খালার কাছ থেকে পার্পেল রঙের একটা শাড়ি এবং ‘আমায় ডেকো না’ গানটিতে অভিনয়শিল্পী লুবনা আহমেদের একটা নীল রঙের শাড়ি পরলাম। ‘কবিতা পড়ার প্রহর’ গানটির জন্য বাতাসের ব্যবস্থা করতে বললাম। কামরুন নেসা হাসান ছিল প্রযোজক। তখন প্রথম বোধহয় ব্লোয়ার মেশিন এসেছিল। লাকী চাচা তখন বললেন, ‘একটা কবিতার বই হলে খুব ভালো হয়।’ যদিও কবিতার বই তখন পাওয়া যায়নি। জোনাকির ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব দেওয়া হলো। পরে অডিয়েন্সের মাথার ওপরের লাইটগুলো একটা বন্ধ একটা চালু করে জোনাকির মতো করা হলো। আমাদের সাজগোজের কোন বালাই ছিল না। আমি তখন টিংটিঙে কঙ্কালের মতো ছিলাম। এর মধ্যে পরেছি সিল্কের শাড়ি। কী যে অবস্থা! পরে আমি বললাম, একটা ফ্লাশ লাইট দেন। সব অন্ধকার থাকবে শুধু একটা লাইট জ্বলবে। তারপর আমি গাইতে লাগলাম ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’। ভোটে আবারও প্রথম হলাম।

এই জাদুটা যদি সত্যি হয়ে যেত

এই গানটিও বিটিভির ‘সুরবাণী’ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হয়েছিল। গানটি আশরাফ মামার সুর। গানটি লিখেছিলেন প্রয়াত লতিফ সিদ্দিকী। সুরকার সেলিম আশরাফ একজন দুর্দান্ত সুরকার। আর যা সুন্দর গান করেন মামা! এই অনুষ্ঠানে আশরাফ মামার সুরে ‘আমি তোমাকে গান শোনাবো বলে’ এবং ‘এই জাদুটা যদি সত্যি হয়ে যেত’ গান দুটি গাইলাম। এই ‘জাদুটা যদি সত্যি হয়ে যেত’ গানটির জন্যও আমি আবার দর্শকদের পাঠানো চিঠির ভিত্তিতে ভোটে প্রথম হয়ে গেলাম। তখনকার ‘সুরবাণী’ এবং ‘কথা ও সুর’ এই অনুষ্ঠানগুলো থেকেই আসলে অধিকাংশ গান বের হয়ে আসত। আসলে আগের অনুষ্ঠানগুলোতে অনেক সততা ছিল। আশরাফ মামারে আমি এত টর্চার করেছি। মামা, ‘ওই জামাটা পছন্দ’ অথবা ‘ওই খাবারটা খাব’। মামা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে আসতেন। এখনো মামাকে টর্চার করি। এই আশরাফ মামাই আমাকে আর নুমাকে ছোটবেলায় প্রথম টেলিভিশনে নিয়ে যান। আমার প্রথম টেলিভিশন অনুষ্ঠান ছিল ছড়া, আবৃত্তি। আর নুমা গান গেয়েছিল। ও গেয়েছিল, ‘ছোট্টবেলা আমি যখন বৈশাখী ঝড়ে’ আর আমি আবৃত্তি করেছিলাম ‘রান্নাঘরে কান্না শুনি’ ছড়াটি।

আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে

১৯৮৪ সালে ‘আঁখি মিলন’ সিনেমার এই গানটি আমি এন্ড্রু কিশোরদার সঙ্গে গাই। এই গানটিরও লেখা ও সুর ছিল আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের। এই গানটার একটা মজার জায়গা আছে। গানটা আমাদের গাওয়া শেষ। একটা জায়গায় ইলিয়াস কাঞ্চন হুঁইসেল দিতে দিতে গরুর গাড়িটা চালিয়ে যাবে। তো সেই হুঁইসেলটা দিতে হবে। একপর্যায়ে বুলবুল ভাই বললেন, ‘এন্ড্রু হুঁইসেলটা দিতে হবে।’ এন্ড্রুদা তখন বললেন, ‘বুলবুল ভাই আমি হুঁইসেল দিতে পারি না, সুমা খুব ভালো হুঁইসেল দেয়। এটা ওকে দিতে বলেন।’ আমি শুনে অবাক হয়ে বললাম, এটা একটা কথা বললেন আপনি? আমার মুখ থেকে হুঁইসেল বাজবে? এন্ড্রুদা বললেন, ‘তুই বুঝছিস না, আমাকে আর বিপদে ফেলিস না, তুই এটা দিয়ে দে।’ আমি বললাম, নো! একটা ছেলের হুঁইসেল আর মেয়ের হুঁইসেলের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তাও আবার সেটা ঠোঁট মেলাবে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ! পরে এন্ড্রুদা তুলে শিখে হুঁইসেলটা দিয়ে দিল। আমি আবার ভুল হলে ঠিক করে দিলাম, হচ্ছে না! হাসতে হাসতে একাকার অবস্থা। এই গানে প্রয়াত শেখ ইশতিয়াক মামা গিটার বাঁজিয়েছিল। বহু মিউজিশিয়ান ছিল তখন। কী সুন্দর সেই দৃশ্য। গানটি শেষ হওয়ার পর বুলবুল ভাই বললেন, ‘তোর গলাটা তো আশা ভোঁশলের মতোই লাগল।’

নদী চায় চলতে, তারা চায় জ্বলতে

এই গানটি যখন রেকর্ড করি, তখন রমজান মাস। গানটা আমার খুবই পছন্দ হলো। রোজা রেখে গান করব, গলা তো শুকায় যাবে ভেবে বুলবুল ভাই তো রেগে যান। কী যে করে সামিনা। তাই আমি আর বলি না আমি রোজা আছি। বুলবুল ভাই বললেন, ‘আমরা কি খাওয়াদাওয়া করে গান রেকর্ড করব?’ আমি রোজা ভাঙার ভয়ে বুদ্ধি করে বললাম, না রেকর্ড করে তারপর খাব। গানটিতে ভয়েস দিলাম। তারপর একটা জায়গায় গানের কথা ‘নদী চায় চলতে, তারা চায় জ্বলতে’ আমাকে উচ্চারণ করে কথায় বলতে হবে। আমাকে বুলবুল ভাই বললেন, খুব রোমান্টিকভাবে এই লাইনটা বলতে হবে। কিন্তু আমার ভেতরে তো রোমান্টিকের ‘র’ও নাই। আমি একপর্যায়ে বললাম, বুলবুল ভাই এই ডায়ালগটি আমাকে দিতেই হবে? বুলবুল ভাই বললেন, ‘আমি তো চিনি তোমাকে, তোমার ভেতর তো রোমান্টিকতার কিছুই নাই। কিন্তু তোমাকেই দিতে হবে।’ তারপর আমি লাইনগুলো বললাম। দু-তিনবার কাট করে বুলবুল ভাই একপর্যায়ে বললেন, শোনো সামিনা, তোমার যে রকম ক্যারেকটার, সে রকম করেই বলো। আমি তো অবাক, বললাম, এটা কি কমপ্লিমেন্ট না কমেন্ট? আমাকে অপমান? আমি আর বলবই না। এই নিয়ে অনেক হাসাহাসির পর অনেক কষ্ট করে ‘ওকে’ হলো। পরে বুলবুল ভাই বললেন, ‘আর ভয়েস দেওয়া লাগবে না। যা হয়েছে যথেষ্ট। মানুষ যে এত কাঠখোট্টা হতে পারে, তা তোমাকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না।’ তারপর তো গানটা হলো। এই গানটা কিন্তু বুলবুল ভাইয়ের লেখা না। এটা মো. রফিকুজ্জামান ভাইয়ের লেখা। আরেক অসাধারণ মানুষ। এই মানুষগুলোর মতো এখন আর কারো তেমন গভীরতা দেখি না। সবাই কেমন জানি স্রোতে ভাসছে। স্রোতে ভাসলেও ভালো স্রোতে ভাসরে ভাই।

আমার মাঝে নেই এখন আমি

সামিয়া জামানের ‘রানী কুঠির বাকি ইতিহাস’-এর গান। পরে শুনেছি, এই গানটি অন্য কাউকে দিয়ে প্রথমে গাওয়ানো হয়েছিল। পরে আমাকে দিয়ে আবার গাওয়ানো হয়। অথচ কত লজ্জার ব্যাপার আমিই জানি না। জানলে আমি গাইতাম না। কারণ একজন শিল্পীর গাওয়া গান আবারও গাওয়া উচিত না। আমি কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি। কবির বকুলের চমৎকার কথার এই গানটি আমার সঙ্গে গেয়েছেন আসিফ। এস আই টুটুলের সুর ও সংগীত। গানটির প্যাটার্নটা টুটুল আর পার্থ মজুমদার এত সুন্দরভাবে করেছে, ওইটাই মানুষের ভালো লেগেছে। আমি কিন্তু ভাবিনি গানটি এত হিট করবে। কিছু না ভেবেই গেয়ে দিয়েছিলাম। কোনো রকম প্রত্যাশাই ছিল না। কিন্তু এই গানটির জন্যই আমি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই। আসলে পুরস্কার টুরস্কার নিয়ে আমার তেমন মাতামাতি নাই। এসআই টুটুলের সঙ্গে আমার আরো একটা গান ‘হও যদি নীল আকাশ’ গানটিও জনপ্রিয়তা পায়। 

আমি জায়গা কিনব কিনব করে

এই গানটি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের কথা ও সুরে ‘আমার দুই চোখে দুই নদী’ অ্যালবামের। এটি আমার খুবই স্মৃতিবিজড়িত অ্যালবাম। এই সময়টাতে আমি গানের ব্যাপারে অনেক প্রফেশনাল হয়ে গেছি। গান গাইতেই হবে আর কোনো উপায় নাই। আমার স্বামী ইজাজ খান স্বপনের খুব শখ যে, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সুরে আমার একটা অ্যালবাম হোক। আমাদের প্রোডাকশন ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’ থেকে সেটা বের হবে। বুলবুল ভাইয়ের এই গানটি লেখার একটা গল্প আছে, ঘটনাটা খুবই সত্য কিন্তু উনি গানটি কত সুন্দর লিখেছেন। আসলে উনি সরকারের কাছ থেকে তিন কাঠা জায়গা পেয়েছিলেন। কিন্তু বহু বছর পার হলেও সেই জায়গা তাঁকে আর বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল না। পরে জায়গার জন্য ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে এই গানটিই লিখে ফেলেন, ‘আমি জায়গা কিনব কিনব করে, পেয়ে গেলাম জায়গা সুদ্ধ বাড়ি’। মানে ওনার ভাবনাটা ছিল এই যে, জায়গা তো পাব না, মারা যাওয়ার পর পাব নাকি?

এই গানটি গাওয়ার সময়টাতে আমার তৃতীয় সন্তান গর্ভে। আর সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায়, গলায় আমি এত শক্তি পেতাম, চিন্তাই করতে পারবেন না। এই অ্যালবামটি শুনলে বোঝা যায় সেটা। বুলবুল ভাই আমার অ্যালবামের জন্য এই গানটি লিখে সুর করে দিলেন। গানটার কথা শুনে আমি বললাম, বুলবুল ভাই গানটা আমি গাব না। আধ্যাত্মিক গান, জায়গা সুদ্ধ বাড়ি, ছোট্ট বাড়ি এদিকে সন্তান আমার গর্ভে। পুরো বিষয়টাই আমার ভালো লাগছিল না। বুলবুল ভাইকে বললাম, আমি গানটা না গাই? বুলবুল ভাই বললেন, ‘না সামিনা, এই গানটা তোমারই গাইতে হবে।’ আমি যত ওনাকে না বলি, উনি ততই আমাকে জোর করেন। এই করতে করতে গানটি গাইলাম। গাওয়ার কয়েক মাস পরে আমার বেবি হলো। কিন্তু বেবিটা হয়ে মারা গেল!..পরে শুনেছি, বুলবুল ভাই খবরটি পেয়ে অনেক নাকি কান্না করেছিলেন। এই শোকে প্রায় বহুদিন গান থেকে দূরে ছিলাম। জানি সবই কাকতালীয়।

সময় যেন কাটে না বড় একা একা লাগে

সন্তান মারা যাওয়ার অনেক অনেক দিন পরে পিলুর অনুরোধে এই গানটি গাইতে স্টুডিওতে গেলাম, গিয়ে তো দেখি আর গান গাইতে পারি না। গানটি অনেক আগের সুর। পিলু খানের সুর। শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ভাইয়ের লেখা। মনে আছে, এই গানটি শুনে তুলেছিলাম ১৯৮৯ সালের দিকে। গানটি রেকর্ডও করা হয়েছিল। কিন্তু হারিয়ে যায়। পরে আবার ২০০৪ সালে পিলু আমাকে আবার বলল, ‘চলেন, গানটা আবার আমরা করি।’ ওর তো সুর অসাধারণ। পিলুর মেলোডির ব্যাপারটা অনেকেই জানে না। কিন্তু আমি তো আর আগের মতো গান গাইতে পারছি না। আমার অবস্থা খুবই কাহিল। গান আর আসছে না। পরে ইবরার টিপু বারবার গান টেক নেয়, আবার গান গাইতে বলে। পিলু আর টিপু অনেক ধৈর্য ধরে। আসলে অনেক সাপোর্ট দিয়েছে ওরা। একপর্যায়ে টিপু সাহস করে আমাকে বলল, ‘আপা গান ভালো হচ্ছে, কিন্তু সামিনা চৌধুরীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ ওই যে কথাটা ও আমাকে বলল, ওই কথাটাই আমার দায়িত্বের মধ্যে চলে এলো। পরে সবকিছু আস্তে আস্তে মনঃসংযোগ করে গানটি আবার গাইলাম। তারপরও মনমতো গাইতে পারলাম না। কিন্তু কী আশ্চর্য, এই গানটিকেও মানুষ ভালোভাবেই নিল। পরে তো একটা বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হলো। আরো মানুষের কাছে গানটি পৌঁছাল। শুধু তাই না, ওই অ্যালবামে পিলু আমাকে জোর করে রেনেসাঁ ব্যান্ডের ‘আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে’ গানটিও করাল। এই অসম্ভব সুন্দর গানটিও যে পিলুর সুর, এটা অনেকেই জানেন না।

আমি কিন্তু গান গেয়েছি দায়িত্বের মধ্য দিয়ে। ফিলিংসের কোনো ব্যাপার ছিল না। গানটা এমনভাবে গাব, মানুষ যে আমাকে গাওয়াচ্ছে, ভরসা করছে, সম্মানী দিচ্ছে, এটা যেন উসুল হয়ে যায়। এই হিসেবেই আমি গান করি। আমার দারুণ এক ভাগ্য, শুরুটা আশরাফ মামাকে দিয়ে, তারপর আলাউদ্দিন চাচা, লাকী চাচা, সমর দাশ জ্যাঠা- মানে চাচা, মামা, জ্যাঠা—এর বেশি বাইরে আমি যাইনি। পরে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের সুরেও কাজ করলাম। আসলে অনেকে বলে আমার গানগুলোই নাকি সম্পদ। কিন্তু আমি বলি, গানের চেয়ে ওই স্মৃতিগুলোই আমার সম্পদ। (শেষ)