শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার প্রাসঙ্গিক উচ্চারণ

১০ মে ২০১৭, ০৯:২২ | আপডেট: ১০ মে ২০১৭, ১৭:৫৪

আজ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে ২৫৬১ বুদ্ধাব্দের শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বৌদ্ধজগতে এই মহান পূর্ণিমার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম মহিমায় অবিস্মরণীয়। মহান পুণ্যপুরুষ মানবপুত্র বুদ্ধ এ পূর্ণিমা তিথিতে সিদ্ধার্থ গৌতমরূপে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী উদ্যানে জন্মগ্রহণ বা ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষতলে ছয় বছর ঊনপঞ্চাশ দিন কঠিন এবং কঠোর ধ্যান সাধনার মধ্য দিয়ে তাঁর পঁয়ত্রিশ বছরের বয়ক্রমকালে এ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতেই সম্যক সম্বুদ্ধত্বজ্ঞানে অধিষ্ঠিত হয়ে সোপাদিশেষ নির্বাণ অধিগম করেছিলেন এবং এ পূর্ণিমা তিথিতেই বুদ্ধ আশি বছর বয়ক্রমকালে কুশিনারার যুগ্ম শালবৃক্ষতলে পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। এ জন্য গোটা বিশ্ব বৌদ্ধজগতে এ পূর্ণিমাটি ত্রিস্মৃতিবিজড়িত মহান বুদ্ধ পূর্ণিমা হিসেবে বিশ্ব বিশ্রুত ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সমাদৃত  এবং অন্তরের আত্মনিবেদিত ভালোবাসা উজাড় করে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীযের্র মধ্য দিয়ে প্রতিপালিত হয়।

অহিংসা মহামানবিকতা, পৃথিবীর তাবৎ প্রাণী-প্রজাতির প্রতি অমলিন কল্যাণকামিতা, মৈত্রী ও করুণার স্বপ্ন-সম্ভাবনার সংশ্লেষণে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দীপ্তোজ্জ্বল কাণ্ডারী—এ মহামানব বুদ্ধের ত্রিস্মৃতিবিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা দিবসটি তাবৎ বৌদ্ধ বিশ্বসহ জাতিসংঘ কর্তৃক মহা সাড়ম্বরে প্রতিপালিত হয়ে আসছে। আমাদের বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশে সমতল ও আদিবাসী বৌদ্ধদের প্রতি প্রাণময় সহযোগিতা, স্বীকৃতি ও সম্মাননার বাতাবরণে এ দিবসটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সদাশয় সরকার তাদের প্রতিবছর এ পূর্ণিমা যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় ও ভাব-গম্ভীর পরিবেশে প্রতিপালন করার অবকাশ দেওয়ার পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে চলেছেন। এ জন্য সদাশয় সরকারসহ প্রধানমন্ত্রীকে অমলিন কৃতজ্ঞতা ও বুদ্ধ পূর্ণিমার পুণ্যপুত শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করি।

আজ ১০ মে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যগত পারম্পর্য বজায় রেখে বাংলাদেশি সমতল ও আদিবাসী বৌদ্ধ জনগণ অহিংসার মূর্ত প্রতীক মানবপুত্র বুদ্ধের পাদমূলে তাঁদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য নিবেদনপূর্বক বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনায় অভিষিক্ত হওয়ার প্রত্যাশাপূর্ণ অঙ্গীকারের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়াস পাচ্ছে। এ প্রয়াসের সংশ্লেষণে বৌদ্ধ জনগণ—দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে বুদ্ধ পূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, ধর্মশ্রবণ, ধর্মপর্যালোচনা, পরমপূজ্য ভিক্ষুসংঘকে সশ্রদ্ধচিত্তে দান-দক্ষিণা প্রদানসহ নানাবিধ পুণ্যপুত পুণ্য কর্ম সম্পাদন করবে। তার পাশাপাশি বাংলাদেশের তাবৎ জনগোষ্ঠী, বিশ্বের তাবৎ প্রাণী-প্রজাতীর সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন ও মঙ্গল কামনাসহ বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে বিশেষ প্রার্থনানুষ্ঠানের আয়োজন করবে। রাজধানী ঢাকার বুকে মিরপুরস্থ ১৩ নম্বর সেকশনে পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত শাক্যমুনি বৌদ্ধবিহারে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যগত পারম্পর্য বজায় রেখে ঢাকাস্থ তাবৎ আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী নানাবিধ অনুষ্ঠানমালা সাজিয়ে আত্মগত নিবিড় পূজা ও প্রার্থনানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছে।

বুদ্ধ মহাকারুণিক। তিনি মৈত্রী, প্রেম ও অহিংসার মূর্ত প্রতীক। বিশ্বের তাবৎ প্রাণী-প্রজাতির দুঃখ মুক্তিই হলো তাঁর ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী। তাঁর ধর্ম-দর্শনের আরেকটি মর্মবাণী হলো—শত্রুতার দ্বারা শত্রুতা নিরসন বা শত্রুতার স্থায়ী নিরসন বা নির্মূলকরণ অসম্ভব। শত্রুতা শত্রুতা ডেকে আনে। সন্ত্রাস সন্ত্রাস ডেকে আনে। হিংসা হিংসা ডেকে আনে। শত্রুতা, সন্ত্রাস, হিংসা, রক্তের বদলা রক্ত, চোখের বদলা চোখ বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী নয়। এসবের বিপরীত ক্ষমা, মৈত্রী, করুণা, অহিংসা, সমচিত্ততার উৎকর্ষ সাধনই বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী। নর-নারীর যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিমুর্হূতের কায়-বাক্য-মনো কর্মে কথায়-বার্তায়, চলনে-বলনে, আচারে-ব্যবহারে, মননে-অনুশীলনে সদাসর্বদা অপ্রমত্ততা বা সংযমতা সুসংরক্ষণই বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী।

বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের আরেকটি অনন্যসাধারণ মর্মবাণী হলো- জন্মসূত্রে কেউ বৌদ্ধ হয় না। একমাত্র কর্মসূত্রেই বৌদ্ধগণ বৌদ্ধ হিসেবে দাবি করতে পারেন। কারণ, একজন বৌদ্ধকূলে জন্মগ্রহণ করে যদি সে প্রাণী হিংসা করে, প্রাণী হত্যা করে, চুরি করে, দুর্নীতিবাজ হয়, ঘুষখোর হয়, আত্মস্বার্থ চরিতার্থকরণের লক্ষ্যে ছলচাতুরীসহ ধান্ধাবাজি, মতলববাজি ও কুচক্রী হিসেবে কাজ করে, ব্যভিচার করে, মিথ্যা কর্কশ, ভেদ ও সম্প্রলাপ বাক্য বলে আর মদ-গাঁজা  অহিফেন বা মরণঘাতী নেশাদ্রব্য সেবন করে তাহলে তাকে কোনোমতেই সত্যিকার বৌদ্ধ বলা যাবে না। বৌদ্ধকূলে জন্মগ্রহণ করলেও বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনায় সে কোনোকালেই বৌদ্ধ নয়।এ প্রসঙ্গে মানবপুত্র বুদ্ধের দীপ্তকণ্ঠের উচ্চারণ হলো :

ন জচ্চা বসলো হোতি ন জচ্চা হোতি ব্রাহ্মণো,

কম্মনা বসলো হোতি কম্মনা হোতি ব্রাহ্মণো।-বসল সূত্ত

অনুবাদ, জন্মসূত্রে কেউ চণ্ডাল হয় না, জন্মসূত্রে কেউ ব্রাহ্মণ হয় না। একমাত্র কর্মসূত্রেই মানুষ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হিসেবে আখ্যা প্রাপ্ত হন। তেমনি কেউ গৈরিক বসনধারণ করলে ভিক্ষু হয় না। গৈরিক বসনধারণ করে কেউ বাড়িতে বাড়িতে পিণ্ডাচরণের মাধ্যমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করলেও ভিক্ষু হিসেবে পরিচয় দেওয়ার যোগ্যতার অধিকারী হন না। যিনি জাগতিক সর্ববিধ পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে উঠে ব্রহ্মচর্যপরায়ণ হয়ে সত্যিকার জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত অবস্থায় জগতের সকল প্রাণী-প্রজাতির সার্বিক কল্যাণ কামনায় সর্বমাঙ্গলিক কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন বুদ্ধ তাঁকেই সত্যিকার ভিক্ষু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তবে বর্তমান এ একবিংশ শতাব্দীর দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ, হিংসা-কুটিল, বক্র মন-মানসিকতা তাড়িত, চর্চিত, অনুশীলিত, ক্ষমতা-মদমত্ত, ক্ষমতালিপ্সু, বেনিয়া মনোবৃত্তির বদৌলতে সুকৌশলে সর্বময় ক্ষমতা, অর্থবিত্তের অধিকারী হয়ে নিজ নিজ আধিপত্যের চিরস্থায়ী অবস্থান পাকপোক্ত করার তাগিদে লাগামহীন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিশ্ব ব্যবস্থায় জন্মগ্রহণ করা নরনারীর মাঝে বৌদ্ধভিক্ষুরাও তাঁদের সমালোচনামুক্ত রাখতে পারছেন না। ভিক্ষুসংঘের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে অনন্ত জ্ঞানী বুদ্ধও সন্ত্রাসী আখ্যায় আখ্যায়িত হচ্ছেন।

মানবপুত্র বুদ্ধের নববিধগুণ—যেমন ভগবান, অর্হৎ, সম্যক-সম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ, অনুত্তর, দম্য পুরুষগণের সারথী, দেব-মনুষ্যগণের শাস্তা বুদ্ধ ভগবান-এ মন্ত্রটিতে এখন সন্ত্রাসের বীজ অন্বেষিত হচ্ছে। তাঁর সুব্যাখ্যাত, স্বয়ং সন্দৃষ্টিক, কালাকালহীন বা অনন্তকালব্যাপী অনুশীলনযোগ্য, এস, দেখ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কর, উপযুক্ত মনে করলে গ্রহণ কর—এরূপ বলার যোগ্য, তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা নিরীক্ষারযোগ্য, প্রত্যক্ষভাবে অধিগত হওয়ারযোগ্য ধর্মের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের বীজ বপিত রয়েছে বলে বলা হচ্ছে। নবগুণ সম্পন্ন সংঘের মধ্যে খোঁজা হচ্ছে ভেদ-বিভেদ ও কলহ বিবাদের এবং হিংসা বিদ্বেষের বাতাবরণ। প্রতিহিংসা পরায়নতার কি নির্মম উচ্চারণ!

তাই আজকের এ ত্রিস্মৃতিবিজড়িত মহাপবিত্র বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত প্রার্থনানুষ্ঠানে অমলিন প্রত্যাশাভরে কামনা করি আমাদের এ প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের সর্বস্তরের, সর্ব-সম্প্রদায়ের, সর্বধর্মাবলম্বী প্রিয়ভাজন জনগণসহ বিশ্বের সাতশ কোটি জনগণের অন্তরের অন্তস্তলে বুদ্ধের অহিংসা মন্ত্র, সর্বকাজে সমচিত্ততার চেতনা, সর্বপ্রাণী-প্রজাতির নির্বিঘ্নে, নিরুপদ্রবে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকারও অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসসংবলিত কর্ম-সংস্কৃতির উৎসর্জন ঘটুক। বিশ্বের  মধ্যে শান্তি, সুস্থিতি, প্রগতি ও সমৃদ্ধিসহ সর্বমাঙ্গলিক ঐক্য চেতনার বাতাবরণে অমলিন শান্তির সুবাতাস বয়ে চলুক অনন্ত অনন্তকাল।

লেখক : সভাপতি, পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ বাংলাদেশ।