কুয়েতে গাড়িচালক থেকে সফল ব্যবসায়ী বাংলাদেশের শহিদুল

২৮ আগস্ট ২০১৮, ২৩:১৩

কুয়েতে সাধারণ এক গাড়িচালক থেকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সফল ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশের এক বাসিন্দা। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নিত্যব্যবহার্য পণ্য আমদানি করে এরই মধ্যে দেশটিতে বিশাল বাজার তৈরি করে ফেলেছেন তরুণ ওই প্রবাসী।

তাঁর নাম মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম (৩৮)। বন্ধুরা তাঁকে সম্মান করে মুফতি নামে ডাকেন। গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার বেকুটিয়া গ্রামে। শহিদুল ইসলামের বাবা মুহাম্মদ সুলতান আলী পেশায় একজন কৃষক। বাংলাদেশে থাকার সময় শহিদুল ইসলাম রাজধানীর মিরপুরের মাদ্রাসা দারুল উলুম থেকে দাওরায়ে হাদিস বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং সর্বোচ্চ ডিগ্রি মুফতি উপাধি অর্জন করেন। এরপর কিছুদিন দেশে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতাও করেন তিনি।

শহিদুল ইসলাম জানান, ২০০৫ সালে কুয়েতে এসে কুয়েতি এক ব্যক্তির গাড়িচালক হিসেবে তিনি দুই বছর কাজ করেন। সে কাজের সূত্রে কুয়েতের বিভিন্ন স্থান ও বাজার সম্পর্কে পরিচিত হন তিনি। পরে গাড়ি চালানো বাদ দিয়ে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয়কর্মীর চাকরি নেন। মার্কেটিং সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞতা থাকায় পরে নিয়োগ পান প্রাণ কোম্পানির কুয়েত ম্যানেজার হিসেবে। দীর্ঘ সাত বছর সেখানে কাজ করে কুয়েতে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বিষয়ে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

সেই সময় আগের পরিকল্পনা অনুসারে নিজে ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবেন শহিদুল। শুরুর দিকে অভিজ্ঞতা ও পুঁজি না থাকায় ব্যবসা শুরু করতে পারেননি। কিন্তু নয়-দশ বছর চাকরির সুবাদে জমানো  পুঁজি আর অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।

ব্যবসার প্রথম দিকে শহিদুল ইসলাম বাংলাদেশ থেকে এলিন ফুড প্রোডাক্টসের বিভিন্ন পণ্য কুয়েতে বাজারজাত করতে শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ থেকে হাসেম ফুডস লিমিটেডের সজীব ব্র্যান্ডের পণ্য, অলিম্পিক বিস্কুট, দুবাই থেকে টাইগার এনার্জি ড্রিংক, ভিয়েতনাম থেকে কোকোনাট ড্রিংক ইত্যাদি পণ্য বাজারজাত করতে শুরু করেন।

শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে ২০১৫ সাল নাগাদ শহিদুল ইসলাম নিজেই ‘আল মাহাসেল’ নামক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। আল মাহাসেল ব্র্যান্ডের নামে হলুদ, ধনিয়া, তেজপাতা, মুড়ি, সরিষার তেল, কারি পাউডারসহ বেশ কিছু পণ্য কুয়েত ও  ইরাকের  বাজারে সরবরাহ করেন। সেসব পণ্যের ওই দুই দেশে এখন বেশ চাহিদা তৈরি করতে পেরেছেন বলে এনটিভি অনলাইনের কাছে দাবি করেন শহিদুল ইসলাম।

কুয়েতের ফরওয়ানিয়া এলাকায় বিশাল এক ভবনের নিচে শহিদুল ইসলামের প্রতিষ্ঠানের গুদাম ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন পণ্যের বাহারি সমাহার। একই সঙ্গে নিজ ব্যবসার পরিধি ও বিদেশে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সাফল্যের পাশাপাশি ব্যবসা নিয়ে নানা প্রতিকূলতার কথাও জানান শহিদুল। বিশ্বের বাজারে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বাংলাদেশকে আরো সহনশীল ও উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

শহিদুল জানান, বাংলাদেশ থেকে একটি পণ্য কুয়েতে পৌঁছাতে প্রায় তিন মাস লেগে যায়। এটি অনেক দীর্ঘ সময়। অথচ পাশের কোনো দেশ থেকে পণ্য আমদানি করলে তা এক থেকে দেড় মাসেই পৌঁছে যায়। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন আন্দোলনের কারণেও পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয় বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া আরেকটি বড় সমস্যার কথা জানান তরুণ এ ব্যবসায়ী। বলেন, যেসব জাহাজে করে পণ্য নেওয়া হয় সেগুলো বেশ বড় হওয়ায় সরাসরি বন্দরে যেতে পারে না। বড় জাহাজে কন্টেইনার লোড করার জন্য প্রথমে ছোট জাহাজে সেগুলো লোড করতে হয়, তাতে গুনতে হয় বাড়তি খরচ। বাংলাদেশ থেকে জাহাজ সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, দুবাই হয়ে কুয়েতে প্রবেশ করে।

কুয়েতে ব্যবসার সুযোগ যে কারো জন্য উন্মুক্ত উল্লেখ করে শহিদুল জানান, এখানে কোনো চক্র না থাকায় বাজারে সব সময় প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে।

শহিদুল বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের মান অনেক ভালো। তবে প্যাকিংয়ের কারণে শুরুর দিকে বাজার ধরতে অনেক হিমশিম খেতে হলেও কুয়েতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে এখন বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করার ব্যাপারে অভিজ্ঞ হয়েছেন।

শহিদুল ইসলামের কোম্পানিতে বর্তমানে বাংলাদেশি ছাড়াও ভারত ও মিসরের লোকজন কাজ করছেন। নিজ দেশের পণ্যের মর্যাদা বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি দেন বলে জানান তিনি। সে কারণে বাংলাদেশ থেকে আরো কিছু অভিজ্ঞ বিক্রয়কর্মী নেওয়ার ব্যাপারে তিনি ভাবছেন। ভিসা (বিশেষ অনুমতি) জটিলতার কারণে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানান শহিদুল।

অজোপাড়াগাঁয়ের একজন কৃষকের সন্তান হয়ে, মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে এ রকম সফল ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখা সহজ হলেও বাস্তবে তা রূপান্তরিত করে সবার সামনে নিজেকে এক উৎকৃষ্ট আর জলন্ত উদাহরণ হিসেবে হাজির করেছেন শহিদুল ইসলাম।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা তাঁর পণ্যগুলো কুয়েতের বাজারে এখন অনেকটা পরিচিত।  নিজের অতীতের কথা মনে করে তিনি সব সময় গরিব দুঃখী মানুষের সেবা করার প্রত্যাশা রাখেন। সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম করলে আল্লাহ অবশ্যই ভাগ্য পরিবর্তন করেন বলে বিশ্বাস শহিদুল ইসলামের।