Beta

অভিমত

মহান স্বাধীনতা দিবসে বাক স্বাধীনতা প্রসঙ্গ

২৬ মার্চ ২০১৯, ১০:৪৯ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৯, ১৬:২৪

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

মহান স্বাধীনতার কথা স্মরণ করলেই মাথায় চলে আসে নাগরিকদের অন্য সকল স্বাধীনতার প্রসঙ্গ। মহান স্বাধীনতা দিবসে নাগরিকদের বাক স্বাধীনতার প্রশ্নটি কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। কারণ বাক স্বাধীনতা না থাকলে অন্য স্বাধীনতার স্বাদ যথাযথভাবে উপলব্ধি করা যায় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধু সেদিন শুধু স্বাধীনতার কথাই বলেনননি, প্রথমেই বলেছিলেন মুক্তির কথা। মুক্তি বলতে তিনি সামাজিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয়। স্বাধীন রাষ্ট্রে নাগরিকদের বাক স্বাধীনতার প্রশ্নটি অত্যন্ত ন্যায্য এবং যথাযথ। স্বাধীনতাকে যথাযথভাবে উপভোগ করার লক্ষ্যে নানা ধরনের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ লিপিবদ্ধ রয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে। অনেক আগে মার্কিন স্টেট্সম্যান প্যাট্রিক হেনরি (Patrick Henry)  বলেছিলেন: “অন্যদের কথা জানি না, আমার চাই স্বাধীনতা অথবা মৃত্যু।” আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরাও স্বাধীনতাকে আনতে বরণ করে নিয়েছিল মৃত্যুকে। দেশের স্বাধীনতা এসেছিল লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট একটা স্বাধীন দেশের মানুষের জন্য চার ধরনের স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন এক. বাক-স্বাধীনতা; দুই. ধর্ম পালনের স্বাধীনতা; তিন. অভাব থেকে স্বাধীনতা; চার. সব ধরনের ভয়-ভীতি থেকে স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার পর কয়েক দশক কেটে গেছে। এখনো খুঁজে ফিরি, দেশে বাক-স্বাধীনতা আছে কি না। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে- ‘আইনের দ্বারা আরোপিত বিধি-নিষেধ’ সাপেক্ষে। ৩৯(১)- ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ ৩৯(২)- ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃংখলা, স্বাধীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইল।’

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। সংবিধানে বর্ণিত অনুচ্ছেদ বলেই বাংলাদেশের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার মূলমন্ত্র হচ্ছে বাক স্বাধীনতা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হবার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দল গড়ার স্বাধীনতা সবই বাক স্বাধীনতার আওতাভুক্ত। গণতন্ত্র বলতে শুধু পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনকেই বোঝায় না। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও পরিধি অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। আমাদের দেশে নির্বাচনের পর পরই সুক্ষ্ম কারচুপি, স্থূল কারচুপি ইত্যাদি নানা অভিযোগ ওঠে। ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর অধীনে কেউ নির্বাচন করতে চায় না। অভিযোগ, সরকারগুলো নির্বাচনকে প্রভাবিত করে। তাই নির্বাচনের পূর্বে, কেউ চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কেউ চায় দল-নিরপেক্ষ সরকার, কেউ বা চায় সহায়ক সরকার ইত্যাদি।

ফরাসি বিপ্লবের প্রধান পুরুষ ভলতেয়ার গণতন্ত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, তোমার মতের সাথে আমি ভিন্ন মত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন দিতে প্রস্তুত। পারিপার্শ্বিক জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জানার স্বাধীনতা নিয়েই মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে। জন্মগতভাবেই মানুষ চিন্তা-চেতনা ও বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে। তাই বলা যায় প্রত্যেক মানুষ জন্মসূত্রেই তথ্যজগতে প্রবেশ করার অসীম যোগ্যতা অর্জন করে রেখেছে। জানার এই অসীম যোগ্যতা থাকলেও যুগে যুগে মানুষ জানতে গিয়ে এবং জানাতে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা কখনো কখনো শাসকগোষ্ঠী অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। সত্য কথা বলার দায়ে বহু গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা কঠোর শাস্তিরও সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু জানা ও জানানোর ইচ্ছে ও চেষ্টাকে কেউ কোনোদিন অবদমন করতে পারেনি। জানার স্বাধীনতা মানুষের এমন এক স্বাধীনতা যা দমন করা যায়ও না। তাই তো মুক্তভাবে জানার ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমরা ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে বিশ্বখ্যাত ইংরেজ কবি মিল্টনকে লড়াই করতে দেখি। কবির ভাষায় ‘‘দাও আমায়, জ্ঞানের স্বাধীনতা দাও, কথা কইবার স্বাধীনতা দাও, মুক্তভাবে বিতর্ক করার স্বাধীনতা দাও। সবার ওপরে আমাকে দাও মুক্তি।’’

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ৪৭ বছর আগে যখন তারা এই সংবিধান রচনা করেছিলেন তখন তাদের মনে হয়েছিল পরাধীনতা থেকে আমরা স্বাধীন হচ্ছি। মন মানসিকতার পরিবর্তন রাতারাতি হবে না। ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তারা সংবিধানে মত প্রকাশকে মান্যতা দিয়েছিলেন। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও স্বাধীনতা বার বার হোঁচট খেয়েছে। সংবিধান রচনার অল্প দিন পরই এই স্বাধীনতা খর্ব হতে থাকে।

সেনাশাসনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আশা করা যায় না। দীর্ঘ সময় সেনা শাসনের কবলে ছিল বাংলাদেশ। এই সময়ে দাবি উঠেছে মত প্রকাশের। সেনাশাসকরা স্বাধীন গণমাধ্যমে বিশ্বাস করতেন না। তাদের বড্ড ভয় ছিল এই স্বাধীনতা। তাই বারবার সাংবাদিকরা নিগৃহীত হয়েছেন। জেলে গেছেন। স্বাধীনতার দাবি জোরালো হলেও কোনো সরকারই তা মেনে নেয়নি। বরং কথায় কথায় সংবাদপত্র বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকে। এরশাদ আমলের শেষ দিকে একটি যুগান্তকারী রায় আসে আদালত থেকে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে রায় দিয়েছিলেন। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিষয়টি আদালতে নেওয়া হলে শাহাবুদ্দীন বিশেষ ক্ষমতা আইনের কতিপয় ধারা বাতিল করে দেন। ‘দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য’ কলাম লেখার কারণে পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করেছিলেন এরশাদ। মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখা এই কলামে রূপক অর্থে সমালোচনা করা হয়েছিল এরশাদের। এরপর থেকে পত্রিকা বন্ধ করার প্রবণতা কমে যায়। দুয়েকটি টেলিভিশন ও পত্রিকা যে বন্ধ হয়নি তা নয়। নব্বইয়ের পর সাংবাদিকরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে থাকেন। বের হয়ে আসেন কলঙ্কিত অধ্যায় থেকে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এই দুটো বিষয় বাইরের দুনিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। গণতান্ত্রিক শাসনামলে কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তা বহাল ছিল। জরুরি জমানায় আবার ধাক্কা খায়। ফের গণতান্ত্রিক শাসন। শুরুতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ। আস্তে আস্তে  নিয়ন্ত্রণ আরোপ হতে থাকে। আমাদের সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা যেমন আছে তেমনি আবার ক্ষেত্রবিশেষে সীমাবদ্ধতার কথাও বলা হয়েছে। ডিজিটাল টেকনোলজির প্রসারের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে এ টেকনোলজি ব্যবহারের সীমানা টেনে আইন হতেই পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারাগুলো যে এতটাই একতরফা, শঙ্কাটা সেখানেই। এর অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ অবারিত। আর তা করতে পারবেন ক্ষমতাসীনরা।

স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার লক্ষ্যে সব নাগরিকের মতামত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই মতামত প্রকাশের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে সর্বান্তকরণে সংবর্ধিত করা প্রয়োজন- কেননা এই অধিকার কেবল গণতন্ত্রকেই সুসংহত, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে না জনগণের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মতামত প্রকাশের পথও সুগম করে দেয়। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন মত প্রকাশে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নিরাপদ মত প্রকাশে গণমাধ্যম মুক্ত কিনা, এই আলোচনার জন্য গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বিশ দশকের পূর্বে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল আন্দোলন বা অধিকার হিসেবে ‘স্বীকৃতি আদায়ের’ বিষয়। কারণ কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্র ছিল স্বৈরতান্ত্রিক এবং জনসম্মুখে নিজের মতামত প্রকাশ করাটাই তখন মুখ্য ছিল। লক্ষণীয় যে, শর্তহীন বাকস্বাধীনতার অধিকার আজও আমরা অর্জন করতে পারিনি।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, অর্থনৈতিক সমতাভিত্তিক ও মৌলিক মানবাধিকার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। আমাদের সংবিধানের মূল বক্তব্য বা প্রস্তাবনা নিম্নরূপ- ‘আমরা আরো অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে- গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য- আইনের শাসকগণ, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ আমাদের দেশে সাধারণত গণতন্ত্র বলতে যেকোনো প্রকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভোট প্রদানকেই বুঝানো হয়ে থাকে- অর্থাৎ যার যা খুশি তাই করা বা বলা। এটা মোটেও পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নয়। একটা অবুঝ শিশু বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলের হাতে ‘আগুন বা আগ্নেয়াস্ত্র’ প্রদান করলে যে রকম বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে আমাদের সমাজেও সে রকম পরিস্থিতি বিরাজমান। গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে, গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে বা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের বিরুদ্ধে অবলীলায় মিথ্যা প্রচার-প্রপাগাণ্ডা চালানো হয়। কাজেই পরিশেষে বলা যায় বাক স্বাধীনতার অর্থ যা খুশি তাই বলা নয়। এই প্রসঙ্গটি হলো এমন যাতে নিজে সব কিছুই করা যাবে যাতে অন্যের কোনো কিছুতে আঘাত না লাগে। আর আঘাত লাগলে তার জন্য কোনো বিধান থাকারও ন্যায্যতা রয়েছে। মূল কথা হলো, অন্যের ক্ষতি না করে সংযত ও সহনশীল চিন্তার প্রকাশই হলো বাক স্বাধীনতা। বিভিন্ন আইনের দ্বারা বাক স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ নয় বরং পরিশীলিত করার প্রয়াসটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে পরিশীলিত না হয়ে নিয়ন্ত্রিত হলে দেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা ভুলুণ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement