মগ ও মুল্লুকের সুলুকসন্ধান

৩০ আগস্ট ২০১৮, ১৩:০০

ঘরে-বাইরে অপরের নানা ধরনের দোষত্রুটির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ঘনঘন মগের মুলুক বা মুল্লুক শব্দবন্ধ ব্যবহার করে থাকি। এসব দোষত্রুটির মধ্যে কী কী আছে সেগুলো একটা তালিকা করা যাক : যানবাহনের ভাড়া বেশি চাইলে বা কম দিলে, ভাড়াটে যখন-তখন বাড়িতে প্রবেশ করলে বা বাড়িওয়ালা অন্যায় আচরণ করলে, বাজারে চালডাল তরিতরকারির বা নিত্যপণ্যের দাম আকস্মিক বেড়ে গেলে বা খুব কমে গেলে, ছেলেমেয়েরা বাড়িতে দেরিতে ঢুকলে, স্পিড মানির পরিমাণ বেড়ে গেলে বা দিতে বাধ্য হলে, বাস বা ট্রেনের টিকেটের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে না পেলে বা সময় বেশি লাগলে, সরকার নতুন কোনো আইন করলে, পথচারীরা আইন না মানলে বা প্রয়োগ করতে গেলে, আইনের ব্যাখ্যা বিভিন্ন রকম হলে, চুরি-ডাকাতি লুটপাট ইত্যাদি নেতিবাচক সব ঘটনার মুখোমুখি হলে চট করেই বলে দেই : ‘মগের মুল্লুক পাইছ?’ তালিকাটি যার যার জায়গা থেকে আরো দীর্ঘ করতে পারবেন।

এককথায় বলা যায়, একটি দেশে বা যেকোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের অনুপস্থিতিতে মগের মুলুকের আবির্ভাব হয় এবং সুশাসন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এটা চলতেই থাকে।

৫৫৯ বছর আগে (১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম অধিকার বা দখল করেন মগরাজা বা স ফিউ (যার উপাধি ছিল কালিমা শাহ)। বলা হয়ে থাকে, সেই সময় বাংলায় মুঘল-পাঠানরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল আর এর সুযোগ নেন মগরাজা। ৩৫৩ বছর আগে চট্টগ্রামের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন মুঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেবের বাংলা সুবার প্রতিনিধি বা সুবাদার (নবাব হিসেবেও খ্যাত) শায়েস্তা খান। মাঝখানের এই ২০৬ বছরের পুরোটা জুড়েই যে মগরাজারা চট্টগ্রাম দখল করে রেখেছিল, তা নয়। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় চাটগাঁ মুসলমান শাসকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের মতে, মগদের নৌবল সবচেয়ে প্রতাপশালী ছিল ১৫৫০-১৬৬৬ এই সময়ের মধ্যে। তার আগেই ফিরিঙ্গিরা (পর্তুগিজ) এই দেশে নোঙ্গর করে এবং তাদের নৌশক্তি ছিল উন্নত। ফলে তাদের সহায়তা নেয় মগরাজারা এবং লুটপাট, দখল অব্যাহত রাখে। এমনকি তারা নোয়াখালী বা ভুলুয়া রাজ্যও দখল করেছিল।

সন্দ্বীপ ও ফিরিঙ্গি

একবার মগরাজার অধীনে যায়, একবার ফিরিঙ্গিরা (পর্তুগিজ) দখল করে আর আরেককার দিলওয়ার নামের এক ব্যক্তি সন্দ্বীপ অঞ্চলকে স্বাধীন রাজ্য ঘোষণা করেন। এ নিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের হর্তাকর্তারা বেশ বিচলিতই ছিলেন। শেষ পর্যন্ত শায়েস্তা খানের সেনারা জায়গাটি মুঘল শাসনের অন্তর্গত করে এবং তারপর চাটিগাঁ নিয়ন্ত্রণের অভিযানে যায়। লুটপাটে মগদের সহায়তা করেছে পর্তুগিজরা অর্থাৎ ফুটবলার রোনাল্ডোর দেশের লোকজন। এমনকি পর্তুগিজরাও সরাসরি লুটপাটে অংশ নিত এবং তার ভাগ মগ রাজদরবারে পৌঁছে দিত। ঢাকায় বণিক সম্প্রদায়ের কিছু ফিরিঙ্গি ছিল, যাদের সহায়তায় মগদের পক্ষে থাকা ফিরিঙ্গিদের নিজেদের পক্ষে নেন মুঘল সুবাদার। অর্থাৎ চাটিগাঁ উদ্ধারের কাজে বিদেশি নৌশক্তির সহায়তা নিতেই হয়।

আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক, চৌদ্দ শতকের শেষ ভাগে উত্তরাধিকার না রেখে আরাকানের রাজা মেং সেমউন মারা যান। ব্রহ্মদেশের (মিয়ানমার) সেনারা এসে আরাকান রাজ্য দখল করে এবং রাজা মেং সেমউনকে (পরে তিনি উপাধি নিয়েছিলেন সুলেমান শাহ) তাড়িয়ে দেয়। তিনি এসে বাংলায় আশ্রয় নেন। বঙ্গে তিনি সপরিবার ২৮ বছর আশ্রয়ে ছিলেন। বঙ্গের পাঠান সুলতান শামসুদ্দিন (রাজত্বকাল ১৪৩১-৪২) সেমউনকে আরাকান রাজ্য পুনরুদ্ধার করে দেন এবং এর প্রতিদানস্বরূপ আরাকান রাজা নিজেকে বঙ্গদেশের করদ সামন্ত (অর্থাৎ অনুগত্) বলে স্বীকার করে নেন। এরপর থেকে কয়েক শতক ধরে রাজারা নিজেদের নামের সঙ্গে নানা মুসলমান পদবি জুড়ে দেন বা আরেকটি নাম পরিগ্রহ করেন। যেমন- সেলিম শাহ, আলী শাহ, আবদুল্লাহ শাহ ইত্যাদি।

একটা বিষয় স্পষ্ট হলো, আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য, পরে সেটা মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনতা স্বীকার করেছিল যদিও। কিন্তু মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। স্মর্তব্য যে, জাতিরাষ্ট্রের ধারণা তখন ইউরোপ পর্যন্ত উদ্ভব হয়নি, এশিয়ায় দূরে থাক। বর্তমান ‘রাষ্ট্র’ ধারণার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।

যাহোক, মগরা দীর্ঘ সময় ধরে লুটপাট, আক্রমণ, ডাকাতি করার ফলে সমাজে এর গভীর প্রভাব পড়ে। এমনকি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার যে নদীপথ ছিল, এর আশপাশে জনবসতি উজাড় হয়ে গিয়েছিল। কারণ মগরাজার সেনারা এসে কেবল লুট্পাটই করত না। মানুষ ধরে নিয়ে যেত, অনেক ক্ষেত্রে হাতের তালু ফুটো করে একসঙ্গে বেঁধে নিয়ে যেত। অন্য কোথাও দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো। এর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মহাকবি আলাওল। তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল এবং ঘোড়সওয়ার হিসেবে কাজ দেওয়া হয়েছিল।

মগের ভাষাগত উৎপত্তি

বাংলা একাডেমির অভিধানে চারটি অর্থের উল্লেখ রয়েছে- ১. ব্রহ্মদেশ বা আরাকান রাজ্য; ২. অরাজক রাষ্ট্র; ৩. যে রাজ্যে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত নয়; ৪. যেখানে যথেচ্ছাচার হয়। এখানে একটু খটকা না লেগে যায় না।

ব্রহ্মদেশ ও আরাকানকে প্রায় একাকার করা হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চল দুটি আলাদা রাজা বা শাসনের অধীন ছিল বলেই মত দিয়েছেন ইতিহাসবিদরা।

এ ছাড়া ভাষাবিদরা বলছেন, রাখাইন শব্দটি পর্তুগিজ উচ্চারণে আরাকানে হয়ে গেছে।

মগবাজার

একবার সুবাদার ইসলাম খানের শাসনামলে (১৬০৮-১৬১৩) আরাকান রাজা মারা যান। আর রাজ্য দখল করেন তাঁরই এক কর্মচারীর ছেলে। এ ঘটনায় আরাকান রাজা ও তাঁর কয়েক হাজার অনুচর ও পরিবার নিয়ে ভুলুয়ায় মুঘল কর্মকর্তাদের কাছে যান। তারা মগরাজাকে স্থলপথে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। সুবাদার ইসলাম খান মগরাজাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং ঢাকার দুই মাইল অদূরে থাকার বন্দোবস্ত করে দেন। সেই জায়গাটিই কালক্রমে মগবাজার নামে পরিচিতি পায়। ইতিহাসবিদ যতীন্দ্রমোহন রায় বলেছেন, মগরাজা ও ভৃত্যদের জন্য মুঘল দরবার থেকে মাসোহারার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা সুকুমার সেন বলেছেন, রোসাঙ্গের (আরাকান) রাজবংশ মগ, তাদের মাতৃভাষা আরাকানি। তবে মনে হয় বাংলা তাদের দ্বিতীয় মাতৃভাষার মতো ছিল। আরাকান রাজসভার কবি দৌলত কাজী ও আলাওলের বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী রাজারা বাংলা ভাষার কদর করতেন। সুকুমার সেন বলেন, ‘পঞ্চম শতাব্দীর শেষ ভাগ হইতে চাঁটিগা বাঙ্গালা সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হইয়াছিল। আরো জানা যায়, রোসাঙ্গ রাজসভার রাজমাত্যেরা বেশির ভাগ ছিলেন সিলেট-চাটিগাঁ অঞ্চলের মুসলমান।’

মিয়ানমারের রাখাইনে যা হচ্ছে বা হয়েছে তাতে করে মগের মুল্লুকের কথা মনে পড়ে যায়। শত শত বছর ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে মেনে নেয়নি মিয়ানমার। বিগত কয়েক দশক ধরেই তাদের ঊনমানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা যে স্বাধীনতার দাবি তুলেছে তার ন্যায্যতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক