নিজের প্রাণ প্রদীপ নিভায়ে সবার প্রাণ জাগাই

২১ আগস্ট ২০১৮, ১৪:১৬

আব্রাহামিক ধর্মের পিতৃপুরুষ ইব্রাহিমের নিজের প্রিয়াস্পদ পুত্র ইসমাইলকে প্রভুর নামে কোরবানি করবার প্রেমময় মাহাত্ম্য ধর্মপুরাণের এক অবিস্মরণীয় দর্শন। কয়েক হাজার বছর ধরে সেই দর্শন অনুকরণ ও অনুসরণ করে ভক্ত শুধু যে ধর্মপুরাণের অনুবর্তী থাকেন তা নয়, নির্লোভ, নিরহংকার আর নিরভিমান ধর্মাচারী আল্লাহর রাহে নিজেকে কোরবান করবার পরীক্ষায়ও অবতীর্ণ হন। অন্তরে চির নওজোয়ানত্ব নিয়ে দানব, দৈত্য, অসুন্দর ও অত্যাচারির বিনাশ এবং লোভীর সাম্রাজ্যরে মিসমার করতে যাদের জন্ম তারাই ফিরদৌস তথা শ্রেষ্ঠ মানুষ। এরাই মানব জাতির খাদেম। মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বকরীদ’ কবিতায় সেই সত্য উচ্চারণ করেন এভাবে : 

এরাই শহিদ, প্রাণ লয়ে এরা খেলে ছিনিমিনি খেলা,

ভীরুর বাজারে এরা আনে নিতি নব নওরোজ-মেলা!

প্রাণ-রঙ্গিলা করে ইহারাই ভীতি-ম্লান আত্মায়,

আপনার প্রাণ-প্রদীপ নিভায়ে সবার প্রাণ জাগায়।

পৃথিবীর অপরাপর মুসলিম রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও বড় উৎসব ঈদুল আজহা। নিজেরে বিলিয়ে দিয়ে অপরের প্রাণ জাগানোর মূলমন্ত্রই হলো এই উৎসবের আসল তাৎপর্য। নির্যাতিতের জন্য আপনার সর্বস্ব ত্যাগ করবার মানসিকতা এই ঈদের মূল মর্মবাণী। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজের সঙ্গে আত্ম-প্রতারণায় যেন ঈদুল আজহার এমন চেতনা ভূলুণ্ঠিত না করি।

বিশ্বজুড়ে একালের মুসলমানের হাজার বদনাম। এন্তার অভিযোগের বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের। আমরা বাঙালি মুসলমানও এর বাইরে নই। ধর্মের সাম্যবাদ ও ত্যাগকে ভুলে গিয়ে সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও ঘৃণা-বিদ্বেষ আমাদের গ্রাস করেছে। সাম্রাজ্যবাদিতার স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মুসলমান নিজেও তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর হাতে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হচ্ছে। তার তুলনায় বরং ভিন্নধর্ম ও ভিন্নভাষাভাষিদের দেশে অভিবাসী মুসলিমানরাই অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন। কিন্তু বিশ্বের কোন মুসলিম দেশে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা খুব ভালো আছে? স্রষ্টা তো কেবল মুসলমানের জন্যই পৃথিবী সৃজন করেননি। তা করলে পৃথিবী তার নান্দনিক বৈচিত্র্য হারাত। এটা ঈশ্বর জানেন বলেই নিখিলবিশ্ব বহুবিধ ও বহুমাত্রিক সুন্দর। কিন্তু আমরা তা মানি না, অনুধাবনও করি না।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গরুকে ভক্তি জ্ঞান করে বলে তারা গরুর আরোপিত মরণে ব্যথিত হন। এমন বাস্তবতায় কিছু সংখ্যক গোঁড়া মুসলমান হিন্দুর মন্দিরের সামনে গিয়েই তাদের কোরবানির রীতি পালন করে। শুধু ধর্মের সাযুজ্য নেই বলে ভিনমানুষের হৃদয় খুঁড়ে আমরা বেদনা জাগাতে ভালোবাসব কেন? এই ভালোবাসা কোনমতেই ধর্মানুগ নয়, স্রেফ ধর্মদ্রোহিতা। আল্লাহ মানুষকে ভালোবাসতে বলেছেন, শুধু মুসলমানকে ভালোবাসলে পৃথিবীতে অন্য মানুষের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়। কিন্তু বিশ্বের দেড়শ কোটি মুসলমান কীভাবে অপর সাড়ে পাঁচশ কোটি মানুষের সভ্যতা বিনির্মাণের অবদান অস্বীকার করবে? সুতরাং আপনিই শ্রেষ্ঠ এমন আত্মঅহংবোধ আমাদেরকে কেবল পশ্চাৎপদতার দিকেই আহ্বান করতে পারে, অগ্রগামিতায় কিছুতেই নয়।

নীতিবিবর্জিত স্বার্থান্ধ বাঙালি কিছু মানুষ বন্যস্বভাবকে এমনভাবে রপ্ত করেছে যে, চতুষ্পদী পশুদেরই সেসব অমানুষের তুল্যমূল্যে শ্রেষ্ঠতর মনে হয়। পশুসমাজে কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় আইন মানার বাধ্যকতা নেই। তারপরও সেই বুনো প্রাণীদের ভালোবাসা, বাৎসল্য, স্নেহ, মায়া-মমতার কাছে কখনো কখনো মানুষও হার মানে। কবি নজরুল সেইসব ফাঁকিবাজ ও ফেরেব-বাজদেরকে সতর্কবাণী দিয়েছেন। পশু কোরবানি দিয়ে পুলসিরাত পার হওয়ার জন্য সওয়াব চাইলে লজ্জিত হতে বলেছেন। ‘শহীদী ঈদ’ কবিতায় নজরুলের দৃপ্ত উচ্চারণ তাই এমন :

শুধু আপনারে বাঁচায় যে,

মুসলিম নহে, ভণ্ড সে!

ইসলাম বলে-বাঁচ সবাই!

দাও কোরবানী জান ও মাল,

বেহেশ্ত তোমার কর হালাল।

স্বার্থপরের বেহেশ্ত নাই।

 

আমরা পারলৌকিক বেহেস্ত খুব করে চাই, কিন্তু রাজার হস্তের সমস্ত কাঙালের ধন চুরি করবার মন মানসিকতার বদল ঘটানোয় আমাদের মন নেই। আমাদের আমিত্বের অহংবোধ বড় সর্বনেশে। অন্যের অনিষ্টে আমরা সুখ খুঁজি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমৃতকথা আমরা বেমালুম ভুলে থাকি, ‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে, পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।' আমরা অধিকসংখ্যক গোঁড়ামানুষ মোহগ্রস্ত ধর্মান্ধ। লোকদেখানো ধর্মাচার সেই অন্ধত্বের অবলম্বন। রবিকবি এখানেও চরম সত্য বলেন, 'ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে'।

মহান ঈশ্বর এই নশ্বর পৃথিবীতে অমূল্য প্রাণ একবারই উপহার দেন। সেই প্রাণের বন্দনা না করে বিনাশ করবার উদ্ভট চিন্তায় আমরা বসত করব নাকি সবার প্রাণে প্রদীপ জ্বালাবো তার হিসাব-নিকাশও করতে হবে বৈকি। নইলে মনুষত্য চিরতরে পরাজিত হবে। বিবেক ও বোধের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।

তবু হাজার নেতিবাচকতা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিস্নানে খাঁটি হওয়া বাঙালির সকল দুঃসাহসী অর্জনকে সারথি করেই আমরা এগিয়ে চলব। ধর্মের নামে গৃহবন্দিত্বের পুরুষতান্ত্রিক ঘেরাটোপ ভেঙ্গে আমাদের মেয়েরা পাদপ্রদীপের আলোয় আসছে। তারা ফুটবল-ক্রিকেটে সুনাম কুড়াচ্ছে। পোশাক কারখানায় শ্রম দিয়ে দেশের জন্য বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স নিয়ে আসছে। এটা বিস্ময়কর আশা জাগানিয়া যে, নারী শিক্ষক হচ্ছেন, প্রশাসক হচ্ছেন, নারী দেশ চালাচ্ছেন। নেপোলিয়ানের কথা ভুল হবে না, একদিন সুশিক্ষিত ও সুসভ্য জাতি আমরা নিশ্চয় পাবো।

ঈদের দিনে জাতি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মুখে হাসি ফোটাতে খানিকটা সময় ও অর্থ ব্যয় নিশ্চয় আমরা করতে পারি। মাঠের প্রার্থনায় দেশটার জন্য কায়মনোবাক্যে চাইতে পারি, আইনের শাসন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পাক। একটা প্রাণও নির্বিচারে শেষ ঠিকানায় না উড়াল দিক। কর্মস্থল থেকে নিঃসংশয় ও নিরাপদে স্বজনের কাছে ফিরবার ফুরসৎ পাক পরিশ্রমী ও ত্যাগী নারী। লোভ আর অর্থের কাছে বিক্রি না হোক শিশু বা শিক্ষার্থীর বিদ্যার্জন। আমাদের যা কিছু খারাপ সবই আমরা কোরবানি দিই আসুন। আর ভালোত্বকে ভালোবেসে বুকের ঘরে যত্নে রাখি। ঘৃণা হোক বর্জিত, আরাধ্য হোক মায়া ও ভালোবাসা। নিজে না খেয়ে আসুন অন্যের মুখে অন্ন জোগাই। কোরবানির খুন জালিম ও জুলুমের চিহ্নবিনাশী অগ্নিশিখা হোক। দীন হোক জুলুম মুক্ত। বিদ্রোহী কবি নজরুলের শেষ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবার সময় আজ এখন :

নামাজ-রোজার শুধু ভড়ং,

ইয়া উয়া প’রে সেজেছ সং,

ত্যাগ নাই তোর এক ছিদাম!

কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কর জড়,

ত্যাগের বেলাতে জড়সড়!

তোর নামাজের কি আছে দাম?

লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।