এরদোয়ান কি স্বৈরশাসক হয়ে উঠবেন?

২৫ জুন ২০১৮, ১৫:২১

তুরস্কে সাংবিধানিকভাবে শাসন কাঠামোতে পরিবর্তন আনার পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি বিজয়ী হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন এরদোয়ান। নির্বাচনী কর্মকর্তারা বলেন, এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে একদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি হচ্ছে, অন্যদিকে এরদোয়ানই হচ্ছেন দেশটির প্রথম কার্যনির্বাহী প্রেসিডেন্ট। এরদোয়ান সর্বোচ্চ বিজয় অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ধেকেরও অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন। এই ফলাফলের পর এরদোয়ান জনগণের উদ্দেশে জানিয়েছেন, ‘আমাদের গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে, জনগণের ইচ্ছা জিতেছে, তুরস্ক জিতেছে।’

২০১৯ সালে এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও এরদোয়ানের ইচ্ছাতেই নির্বাচন এগিয়ে আনা হয়। নানা কারণে এবারের নির্বাচন ছিল তুরস্কে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী এরদোয়ানের জন্য সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে আইন করার পর এটি দেশটির প্রথম নির্বাচন হওয়ায় প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নির্বাচনে ছিল ভিন্ন এক ফ্লেভার। শঙ্কা, সম্ভাবনা মিলেই ছিল নির্বাচনের যাত্রা। বিশেষ করে প্রসিডেন্ট এরদোয়ানের সামনে ছিল চ্যালেঞ্জ। প্রেসিডেন্টের হাতে ‘কুক্ষিগত ক্ষমতাকে’ তুরস্কের সাধারণ জনগণ কোন চোখে দেখে, তা-ও এই নির্বাচনের অন্যতম নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। অনানুষ্ঠানিক ফলে স্পষ্টত এগিয়ে থাকার পর নিজের বাসভবনে দেওয়া এক ভাষণে এরদোয়ান বলেন, ‘অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে পরিষ্কার হয়েছে যে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে জাতি আমার ওপরই আস্থা রেখেছে।’

বিগত সময়ে দেশটিতে নির্বাচনে এমন তীব্র লড়াই কখনো দেখা যায়নি। আর এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে এরদোয়ান নতুন উদ্যম ও শক্তি অর্জন করবে, এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তুরস্কের রক্ষণশীলরা দেশটিকে দলটিকে অভিজাততন্ত্রের ধারক-বাহক হিসেবে দেখে এসেছে। অন্যদিকে কুর্দিরা দলটিকে দেখেছে বলপ্রয়োগকারী একনায়কতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে। কিন্তু এখন যাঁরা এরদোয়ানের বিরোধিতা করছেন, তাঁরা সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পক্ষে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন।

২০১৪ সালে এরদোয়ান প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে টানা ১১ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। গত ১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় রয়েছে তাঁর দল একে পার্টি। ২০১৬ সালের এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর নিজের ক্ষমতা সংহত করার পদক্ষেপ নেন এরদোয়ান। তখন থেকে জরুরি অবস্থায় রয়েছে তুরস্কে। মূলত ২০১৬ সালের ক্যু-এর পর তুরস্কের শাসন নীতি বদলে যেতে থাকে। পুরাতন ধারা থেকে নতুন ধারার দিকে তুরস্ক ধাবমান হয়। নতুন যুগের নতুন তুরস্কের প্রকৃত সংস্কারক হিসেবে এরদোয়ান আবির্ভূত হন। পার্লামেন্টারি থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমে প্রবর্তিত হয়।

নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে এরদোয়ানের হাতে যেসব ক্ষমতা যাবে, সেগুলো হলো : ১. মন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্টসহ সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা; ২. দেশের আইনি ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা; ৩. জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা। এ নির্বাচনের পর এরদোয়ান নতুন সংবিধান অনুযায়ী দেশ শাসন করবেন। নতুন সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর পদ বাতিল করা হবে এবং প্রেসিডেন্ট হবেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

এরদোয়ান এরই মধ্যে ভিশন ২০২৩-এর রূপরেখা দিয়েছেন। তিনি বিশ্বের সেরা ১০টি আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ দেশের মধ্যে স্থান করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই প্রস্তাবে যোগাযোগ, কৃষি, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতে এরই মধ্যে প্রচুর উন্নয়ন হয়েছে। আর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিশ্রুত উন্নয়ন কর্মসূচি শেষ করতে চান। বিরোধী দল এরূপ বিস্তারিত কোনো উন্নয়ন কর্মসূচি দিতে পারেনি।

সমালোচকরা যুক্তি দিয়ে বলছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে এরদোয়ানের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে। তুরস্কের ক্ষেত্রে ফ্রান্স বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো নির্বাহী প্রেসিডেন্সিতে যে ভারসাম্য আছে, তাতে ঘাটতি দেখা যাবে। এতে স্বৈর ক্ষমতার সৃষ্টি হবে কি না, সেটি নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। নানাবিধ শঙ্কা ও সংকট ঘনীভূত হচ্ছে মনে হলেও এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। মূলত শাসনব্যবস্থা যেমনই হোক, শাসকের সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করবে ন্যায়ের শাসন। এ কারণেই বলা যায়, এরদোয়ান কীভাবে শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, তার ওপরই দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে।

লেখক : ড. সুলতান মাহমুদ রানা, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল স্টাডিজ।