অনলাইন কেনাকাটায় সতর্কতা ও করণীয়

১০ জুন ২০১৮, ১৩:৫৪

রোদ, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রচণ্ড যানজট অতিক্রম করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন মার্কেট ও শপিং কমপ্লেক্সে ঘুরে ঘুরে ঈদের কেনাকাটা করার কথা মাথায় এলে যারা চোখে শর্ষে ফুল দেখেন, তাঁদের জন্য স্বস্তির অনেক বড় একটি জায়গা হচ্ছে অনলাইন শপিং। সম্প্রতি বাহারি পণ্য একেবারে ঘরের দরজায় পৌঁছে দেওয়া ক্যাশ অন ডেলিভারি সিস্টেমের কারণে খুব দ্রুত অনলাইন কেনাকাটার গ্রাহক, বিশেষ করে তরুণ গ্রাহকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত সেইসঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারিত হওয়া ভুক্তভোগীদের সংখ্যাও। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অনলাইন পেজে পণ্যের জন্য অগ্রিম টাকা প্রেরণ করে পণ্য না পাওয়ার ঘটনা কিংবা নিম্নমানের পণ্য পাওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে। এত বাজেভাবে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে যে অনলাইন শপিং অনেকের কাছেইএক বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত ও কাছের কিছু মানুষের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে পেয়েছি যে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখলে ও কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে খুব সহজেই এসব প্রতারণার ফাঁদ থেকে মুক্ত থেকে অনায়াসে অনলাইনে শপিং করা সম্ভব।

প্রথমত, যে পেজ থেকে পণ্য কেনার কথা ভাবছেন সেই পেজের মতামত বিভাগটি, অর্থাৎ রিভিউ সেকশনটি অবশ্যই চেক করা প্রয়োজন। অন্য ক্রেতারা সেই পেজ, সেলার এবং তাদের পণ্য সম্পর্কে কী মতামত দিচ্ছে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। অনলাইন পেজগুলোকে ৫ স্টার রেটিংয়ে রেট করা যায়। যে পেজগুলোর রেটিং ৪-৪.৮ এর মধ্যে অবস্থান করে, সেগুলোকে বিশ্বস্ত বলে ধরা যায়। একদম ৫-এ ৫ পাওয়া পেজ হলে সম্ভাবনা থাকে ফেইক রিভিউর, যেখানে বিক্রেতারা পেমেন্টের বিনিময়ে ভালো মতামত কিনে থাকেন। রিভিউ সেকশন নেই এ রকম পেজ থেকে পণ্য অর্ডার করা থেকে বিরত থাকা ভালো।

দ্বিতীয়ত, পণ্য হাতে পাওয়ার পূর্বে ফুল অ্যাডভান্স পেমেন্ট করা কখনই উচিত নয়। ক্যাশ অন ডেলিভারি, অর্থাৎ পণ্য হাতে পেয়ে টাকা পরিশোধ করবেন এ রকম অপশন সংবলিত পেজগুলো থেকে পণ্য অর্ডার করা। কেননা সে ক্ষেত্রে আপনার পণ্য সঠিক এবং মানসম্মত কি না, তা পরীক্ষা করে তবে আপনি বিল পরিশোধ করতে পারবেন। তবে এটা ঠিক যে অনেক বিক্রেতা তাদের কাসটম মেড বা ইম্পোর্টেড পণ্যের ক্ষেত্রে যেন লস না হয়, সে জন্য ২০% অ্যাডভান্স পেমেন্ট নিয়ে থাকেন এবং তাঁদের বিজনেসের নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে পণ্য ডেলিভারি করতে ফুল পেমেন্ট চেয়ে থাকেন। যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে হোম ডেলিভারি তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে করা হয় এবং কাসটম ড্রেস তৈরিতে বা বাইরের দেশের পণ্য ইম্পোর্টের ক্ষেত্রে সেলারদের এক্সট্রা ইনভেস্টমেন্ট থাকে, যা অর্ডার কেন্সেলেশনে তাদের লসের রিস্ক বাড়িয়ে দেয়, তাই অ্যাডভান্স পেমেন্ট দাবি করাটা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখা প্রয়োজন পেজটি বিশ্বস্ত কি না সেদিকে এবং তা নিশ্চিত করা সম্ভব রিভিউ সেকশন চেক করার মাধ্যমে। কোনো অবস্থাতেই পণ্য হাতে পাওয়ার পূর্বে ফুল পেমেন্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এলাকার বাইরে থেকে, অর্থাৎ আপনি নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা হলে ঢাকা থেকে অনলাইনে পণ্য অর্ডার না করাই ভালো। এতে রিস্ক সব সময় থেকেই যায়। এলাকার ভেতরে কোনো সেলার ফুল পেমেন্ট অ্যাডভান্স চাইলে সেটি নিশ্চিতভাবে একটি প্রতারণার ফাঁদ।

অনলাইনে শপিংয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে পণ্যের ছবি দেখে একদিকে পণ্যের মান বুঝতে না পারা এবং অপর দিকে ছবিটি পেজের নিজস্ব কি না তা বুঝতে না পারা। অহরহ অনেক ফেইক পেজ অন্য পেজের রিয়াল ছবি তাদের নিজস্ব বলে চালিয়ে দেয়। এই সন্দেহের অবসান করার একটি অত্যন্ত কার্যকরী উপায় হচ্ছে পেজের লাইভ ভিডিও চেক করা। সরাসরি লাইভ ভিডিও দেখে কাঙ্ক্ষিত পণ্য অর্ডার করলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে। লাইভ ভিডিও না থাকলে পণ্যের অন্তত সাধারণ ভিডিও দেখাতে বলতে পারেন সেলারকে। যদি আপনি যা অর্ডার করতে চাইছেন, ঠিক সে পণ্যটির ভিডিও সেলার কাছে নাও থাকে, তবে সে পেজের অন্য যেকোনো পণ্যের ভিডিও দিতে বলুন। এতে আপনি অন্ততপক্ষে পেজের পণ্যের ওভারঅল মান সম্পর্কে ধারণা পাবেন। কোনো সেলার কোনো প্রকার ভিডিও দিতে আপত্তি জানালে পণ্য অর্ডার করা থেকে বিরত থাকুন।

 

অধিকাংশ নাম করা ব্র্যান্ডের কসমেটিকস, মেকআপ আইটেম এবং ক্ষেত্রবিশেষে কাপড়ের ব্র্যান্ডের রেপ্লিকা এবং ডুপ্লিকেট অর্থাৎ একই নামে কম দামের প্রোডাক্টের ছড়াছড়ি রয়েছে বাজারে। ডুপ্লিকেট এবং রেপ্লিকার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে রেপ্লিকাসমূহ বাইরের দেশ থেকে আমদানি করা হয়, ফলে একদম অরিজিনাল না হলেও সেগুলোর মান চকবাজারে নিম্নমানের উপাদান দিয়ে তৈরি ত্বকের জন্য ক্ষতিকারক পণ্যগুলো থেকে উন্নত। তাই অবিশ্যই জানা উচিত আমরা আসল পণ্য কিনছি, রেপ্লিকা কিনছি নাকি চকবাজারের নকল পণ্য কিনছি বেশি দামে? জানার জন্য ব্র্যান্ডগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইট ঘুরে আসা উচিত আমাদের। অরিজিনাল পণ্যগুলো তারা কী দামে বিক্রি করে, তা দেখে আন্দাজ করা সম্ভব এ দেশে সে পণ্য ইম্পোর্ট করতে ভ্যাটসহ একজন সেলারের পাইকারি হারে কত দাম পড়তে পারে এবং রিজনেবেল লাভ করলে কত দামে তা সেল হতে পারে। বিক্রয় মূল্য যদি আমাদের আন্দাজ করা দামের কাছাকাছি হয় তবে পণ্যটি অরিজিনাল হওয়ার সম্ভবনা বেশি। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক। অরিজিনাল একটি ব্র্যান্ডের দাগ দূর করা একটি ক্রিমের মূল্য ব্র্যান্ডটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে ৫ ডলার। তাহলে পাইকারি দরে কোন সেলারের তা ইম্পোর্ট করতে একই দাম বা তার বেশি ৬/৭ ডলার পড়ে, আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ এবং ট্যাক্স পে করে। অর্থাৎ তার কেনা দাম পড়ে কমপক্ষে ৬ x ৮২ = ৪৯২ টাকা। এবার কোন সেলার যদি পণ্যটির বিক্রয়মূল্য ৬০০-৭০০ টাকা ঠিক করে তবে ধারণা করা যায় পণ্যটি রিয়াল। কিন্তু যদি কোন পণ্য ২০০/৩০০ টাকায় বিক্রি হয়, তবে সেটি অরিজিনাল নয়।

পরিশেষে যা না বললেই নয় তা হলো, ব্যবসা ব্যাপারটাই বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে এবং শেষ পর্যন্ত সে বিশ্বাস আপনাকে জোগাবে আপনি যার সাথে লেনদেন করছেন সে নিজে। তাই আপনার পক্ষ থেকে সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করার পাশাপাশি বিক্রেতার সাথে কথা বলে বুঝতে চেষ্টা করা যে তাকে বিশ্বাস করা যায় কি না তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেলারের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখুন, জানুন তিনি কোন এলাকায় থাকেন এবং অবশ্যই তার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করুন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এ রকম কিছু গ্রুপ রয়েছে, যারা অনলাইন সেলারদের কাছ থেকে রেগুলার ফি নেয় এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদেরকে নির্দিষ্ট একটি আইডি নম্বর প্রদান করে গ্রুপে তাদের পণ্যের প্রচারণা করতে দিয়ে থাকে। সে ধরনের গ্রুপ থেকে পণ্য অর্ডার করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, কেননা এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সেলারের ইনফরমেশন জোগাড় করা সম্ভব।

এই সতর্কতাগুলো অবলম্বন করে আমি নিজে প্রতারিত হওয়া থেকে বিরত রয়েছি এবং আশা করছি আপনারাও বিরত থাকতে পারবেন। আর হ্যাঁ, পণ্য ডেলিভারি করতে আসা ডেলিভারিম্যানকে বাসার ভেতরে ঢুকতে দেওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকা উচিত। সম্ভব হলে একা ডেলিভারিম্যানের সামনে না গিয়ে কাউকে সঙ্গে রাখা উত্তম। হাস্যোজ্জ্বল এবং নিরাপদ হোক আপনার ঈদ এবং ঈদের অনলাইন শপিং। ঈদ মোবারক।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।