Beta

শহীদ ড. জোহার জাতীয় স্বীকৃতি মিলবে কবে?

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২১:৪৩

মর্তুজা নুর

ঊনসত্তরের  ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক জান্তা আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। তিনিই দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হলেও এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি আজো। পাশাপাশি এই দিনটিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবিও দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত।

ঊনসত্তরের ২০ জানুয়ারি আসাদ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যাকাষবড গণআন্দোলনের তাপমাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবি এবং সার্জেন্ট জহুরুলের হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ডাকে। পরের দিন ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ওইদিন সকালে পাকিস্তানি স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে গিয়ে পূর্বপাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা।

১৯৭০ সালে প্রকাশিত আনিসুর রহমান সম্পাদিত ‘তিমির হননে’ শীর্ষক প্রকা্শনায় প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় পাওয়া যায়, কিভাবে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করা হয় ড. জোহাকে।

প্রকাশনাটিতে মুহম্মদ আবদুল খালেক একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কিভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবি এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে ১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি উত্তাল হয়ে ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বের হলে ভিসির সঙ্গে জরুরি বৈঠক ফেলে ছুটে যান ড. জোহা। ছাত্রদের বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনেন। তাতেই বিপত্তি ঘটে। প্রশাসন মনে করে, যে ব্যক্তি এক ডাকে ফেরাতে পারে সেই হয়তো তাদের রাস্তায় নামিয়েছে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সেদিন তার কথা কাটাকাটিও হয়। সেই মিছিলে আহত ছাত্রদের তিনি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেইদিনই রাত ১০টায় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সভায় ড. জোহা বলেন, ‘শুধু ছাত্ররা নয়, আমরা সবাই মিলে এই দানবীয় শক্তিকে রুখে দাড়াবো, মরতে যদি হয় আমরা সবাই মরবো।’

পরেরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে রাবি প্রধান ফটকের কাছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ। এ সময় সেনারা শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালাতে উদ্যত হলে সে সময়ের প্রক্টর ড. জোহা বলেন, ‘প্লীজ ডোন্ট ফায়ার আমার ছাত্ররা এখনই চলে যাবে এখান থেকে।’

অনুরোধ উপেক্ষা করে লেফটেনেন্ট বলেন, ‘ফায়ার অ্যান্ড কিল দেম’। গুলি চালাতে গেলে ড. জোহা নিজে এগিয়ে যান। তখন তার ওপরই গুলি চালায় সেনারা।

সেসময় আহত হন আরও দুজন শিক্ষক ড. মোল্লা ও মুহম্মদ আবদুল খালেক। এক বছর পর বের হওয়া স্মরণিকায় মুহম্মদ আবদুল খালেক লেখেন, ‘ড. মোল্লা ও আমার অবস্থা জানতেই তিনি যখন ছুটে আসছিলেন সেই মুহূর্তে তাকে বেয়নেট চার্জ করা হয়। রক্তে তার জামা ভিজে গেছে, জওয়ানদের হাতে আমি বন্দি। জওয়ানরা আমাকে হিড়হিড় করে মিলিটারি ভ্যানে তুলে ফেললো। আমি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ডেকে চিৎকার করে বললাম ড. জোহা মারা যাচ্ছেন, তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শামসুজ্জোহার আত্মোৎসর্গের দিনকে জাতীয় শিক্ষক দিবস ঘোষণার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে দাবি জানিয়েছে আসছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সেই স্বীকৃতি আজো মেলেনি।

যে চেতনা ও আদর্শের জায়গা থেকে ড. জোহা স্যার প্রাণ দিয়েছিলেন, ১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় স্বীকৃতি না দেয়ায় আমরা সেই চেতনা ও আদর্শের জায়গাগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ড. জোহা রক্ত দিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে যে সম্প্রীতি তৈরি করেছিলেন, তা হারিয়ে যাচ্ছে। সেদিন জোহা নিজের প্রাণ না দিলে শত শত শিক্ষার্থীদের প্রাণ দিতে হতো। কিন্তু জোহা নিজের প্রাণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। তার এই আত্মদানে স্বাধীনতার ভীত রচিত হয়েছিল। ‘শহীদ ড. শামসুজ্জোহার অসামান্য বীরত্ব আড়াল করা জাতির জন্য সম্মানজনক নয়। এত বছর পর আমাদের দাবি করতে হচ্ছে, ড. জোহার ওই স্মৃতিবিজড়িত মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের দিন ১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হোক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বারবার দিনটিকে জাতীয় ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে সেটা করা হয়নি। ড. জোহা ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে শহীদ হয়েছিলেন। রাজশাহীকে প্রান্তিক অঞ্চল ভেবে তার অবদানকে অবমূল্যায়ন করা উচিৎ নয়।

তাই ১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস ঘোষণা করা দরকার। এর ফলে দেশের মানুষ জানতে পারবে জোহার অবদানের কথা। তখন জোহার আদর্শে গড়ে উঠবে আরও অনেক শিক্ষক। ড. জোহার মতো মহান শিক্ষকের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য এবং তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দিনটি জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ড. জোহা ছিলেন প্রথম শহীদ। তার আত্মত্যাগ বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলন আরও বেগবান করেছিল। আমরা চাই, স্বাধীনতার পক্ষের সরকার জোহার এই আত্মদানকে স্বীকৃতি দেবে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement