অভিমত : সাংসদ ইউসুফের মানবেতর জীবন ও রাজনীতির নীতিহীনতা

০৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১৩:০৮ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১৩:২৯

মো. নাঈম হোসেন

চট্টগ্রাম-৭ আসনের সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউসুফের মানবেতর জীবন ও চিকিৎসাহীনতায় ভোগার করুণ দৃশ্য আমাদের অশ্রু বিসর্জন দিতে বাধ্য করেছে। জাতির সূর্যসন্তান রণাঙ্গনের লড়াকু এ বীর সৈনিক একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করলেও আমরা বাঙালিরা তাঁকে হারিয়ে দিয়েছি জীবনযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর টানা ২০ বছর টায়ারের তৈরি জুতা দিয়ে পথচলা, সাংসদ থাকাকালীন বাসে করে যাতায়াত, রাজনীতির জন্য শেষ সম্বল ভিটেমাটিটুকুও বিসর্জন দেওয়া আমাদের সততার সংজ্ঞা শিখিয়ে দিলেও শেষ জীবনে তাঁর করুণ পরিণতি নতুন প্রজন্মকে ভাবিয়ে তুলেছে রাজনীতির নীতি সম্পর্কে।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সাবেক এ সাংসদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধার পাশে দাঁড়াতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। তবে চিরসংগ্রামী এ কর্মবীরের শেষ জীবনে পাশে দাঁড়িয়েছেন মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। চিকিৎসার সব দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সাবেক এ সাংসদকে ভর্তি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। এ ছাড়া আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য মোহাম্মদ ইউসুফকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করার অফিশিয়াল কার্যক্রমও এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে চলছে মারাত্মক সেফটিসেমিয়া রোগে আক্রান্ত সাবেক এই এমপির চিকিৎসা কার্যক্রম, যা আমাদের মাঝে আশার আলো সঞ্চারিত করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শুধু সাবেক এ আইন প্রণেতার চিকিৎসার দায়িত্বই নেননি, তিনি পুরো জাতিকে রক্ষা করেছেন বিশাল এক কলঙ্কের হাত থেকে। তবে হতাশার বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘ ১৫ বছর চিকিৎসাহীনতায় ভুগলেও স্থানীয় রাজনীতিবিদরা বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে এনে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছেন, যা বর্তমান রাজনীতির নীতিহীনতা ও দায়িত্ববোধের অভাবের বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধানের পক্ষে দেশের অগণিত নেতাকর্মীর অবস্থা, দুরবস্থার খবর রাখা সম্ভব না। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের মাধ্যমে সাবেক এই জননেতার মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চত করা। সেখানে তাঁরা সবাই ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁদের এ ব্যর্থতাই আমাদের বর্তমান সমাজের স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা ও নৈতিকতার অভাব থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউসুফের প্রতি আমাদের ব্যর্থতা আগামীতে সকলকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেবে। একজন সংসদ সদস্য হয়েও প্রাসাদসম অট্টালিকা, বিলাসবহুল গাড়ি না থাকা, জনগণের কল্যাণে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার এ দৃষ্টান্ত আমাদের চলমান রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনবে বলেও সবার প্রত্যাশা।

আমাদের মনে রাখতে হবে,  ইউসুফদের কাছ থেকে আমরা শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হলে বাঙালির ওপর একদিন নেমে আসবে অমানিশার অন্ধকার। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ইউসুফরা বেঁচে থাকবেন তাঁদের কর্মে হাজার বছর ধরে কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে। তাঁদের দেখানো পথ ধরেই একদিন নির্মিত হবে স্বপ্নের সোনার বাংলা, জন্ম নেবে এক মানবিক বাংলাদেশ।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।