আজিজ মার্কেটেও কমেছে বইয়ের দাপট

২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:৩৭

শুরুটা ১৯৮৭ সালে। পাঠক সমাবেশ নামে একটি ছোট দোকান দিয়েই বই প্রবেশ করেছিল শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে। ধীরে ধীরে দোকান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বই মার্কেট হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে আজিজ সুপার মার্কেট। নব্বই দশকের মাঝামাঝি এ মার্কেটের নিচতলার প্রায় পুরোটা জুড়েই বইয়ের ছোট ছোট দোকান স্থাপিত হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই ৬০টির অধিক বইয়ের দোকান গড়ে ওঠে এই মার্কেটে। দেশি-বিদেশি বইয়ের বিশাল সংগ্রহ আকৃষ্ট করে পাঠকগোষ্ঠীকে। 

ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে, জাতীয় জাদুঘরের পাশে অবস্থিত এ মার্কেট। নব্বই দশকের মধ্যভাগ থেকেই আজিজ সুপার লেখক, সাহিত্যিক ও প্রকাশকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বইয়ের দোকানগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে আড্ডা। দু-একটা রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠায় এই আড্ডা হয়ে ওঠে আরো জমজমাট। সন্ধ্যা হলেই বইপ্রেমী মানুষ, লেখক ও পাঠক ছুটে আসেন এখানে বইয়ের গন্ধে; সঙ্গে চলে চায়ের কাপে চুমুক। 

তবে এই শতকের শুরু থেকে একটু একটু করে বদলে যেতে শুরু করে আজিজ মার্কেটের চিত্র। বইয়ের দোকান না বেড়ে বাড়তে থাকে রেস্তোরাঁ আর পোশাকের দোকান। বইয়ের ব্যবসা সরিয়ে রেখে পোশাক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন অনেক প্রকাশনী সংস্থার মালিক। জামাকাপড়ের দোকান থেকে ভাড়া বেশি পাওয়ায় কোণঠাসা হয়ে পড়ে কম ভাড়ার বইয়ের দোকানগুলো। ক্রমাগতই বেশি ভাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে হয় বইয়ের দোকানের। অথচ বই তেমন বিক্রি হয় না, যেমনটা হয় জামাকাপড়। তাই পোশাকের দাপট সহ্য করতে না পেরে অনেকেই দোকান ছেড়ে চলে যান অন্য কোনো মার্কেটে। বইয়ের দোকানসংখ্যা ৬০ থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসে ২০-এর ঘরে। 

২০০৫ সাল থেকে পোশাক ব্যবসার প্রসার ঘটতে শুরু করে এই মার্কেটে। কাপড়ের ব্যবসার প্রসার ঘটায় এ মার্কেটে দোকানের চাহিদা বেড়ে যায়। যার ফলে দোকান মালিকরা দোকান ভাড়া ও জামানত বাড়াতে উৎসাহী হয়ে পড়েন এবং পাশাপাশি বই বিক্রি কমে আসে আগের তুলনায়। ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশির ভাগ দোকানি বাধ্য হন দোকান ছেড়ে দিতে অথবা অন্য কোনো ব্যবসা করতে।

প্যাপিরাস-এর ম্যানেজার শাজাহান এনটিভি অনলাইনকে বলেন, 'সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য মানুষ বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। একটা সময় ছিল, মানুষ প্রচুর বই কিনত, বই পড়ত। এখন বইপোকাদের সংখ্যা কমেছে অনেক। দোকান ভাড়া হয়েছে আকাশচুম্বী। বই বিক্রিতে লাভ সীমিত, বিক্রিও হয় কম। তাই সবাই এই ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় মন দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমানে যে বইয়ের দোকানগুলো আছে, তাও বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'

শাজাহান আরো বলেন, 'আগে বছরে তিন থেকে চারবার বিদেশি বই আমদানি করতাম। এখন বছরে একবার, আবার কোনো বছর তাও আনা হয় না।'

বই কিনতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গৌতম রায় বলেন, ‘অন্য মার্কেট থেকে এখানে বেশি বইয়ের সংগ্রহ আছে। দেশি-বিদেশি সব বই এখানে পাওয়া যায়। যেহেতু আমার ক্যাম্পাসের পাশেই এ মার্কেট, তাই আমি এখানে বই কিনতে এসেছি।’ তবে রাজধানীর নিউমার্কেটের মতো আজিজ মার্কেটেও বইয়ের দোকান কমছে বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

গত কয়েক বছরে আজিজ সুপার মার্কেট পোশাকের জন্য তরুণ-তরুণীর সবচেয়ে পছন্দের স্থান হয়ে উঠেছে। বইয়ের দোকানিদের আক্ষেপ, মানুষ যে হারে কাপড় কেনে, সেটার অর্ধেকও যদি বই কেনা হতো, তাহলে জাতি আরো শিক্ষিত হতো। এই মার্কেটে অবশ্য অন্য রকম কিছু বইয়ের দোকান রয়েছে, যেগুলো চিকিৎসাশাস্ত্র ও প্রকৌশলবিদ্যার মতো বিভিন্ন উচ্চতর শিক্ষার জন্য ব্যবহৃত বইয়ের নকল বিক্রি করে। সৃজনশীল বইয়ের দোকানগুলোর তুলনায় এসব দোকানের বিক্রি অবশ্য মন্দ নয়।