Beta

প্রবীণদের মানসিক সমস্যায় করণীয়

১১ জুন ২০১৫, ১৭:২৬

তানজির আহম্মদ তুষার
এ বয়সে মানুষের মধ্যে অভিমান বেড়ে যায়। তাঁদেরস সঙ্গে বাড়তি সচেতনতা নিয়ে কথা বলা উচিত। ছবি : ব্লগ ডট পেরিনক

মানুষের জীবন বিকাশের প্রতিটি ধাপের মতো বৃদ্ধ বয়সেও কিছু মানসিক সমস্যা রয়েছে। তবে প্রবীণদের মানসিক সমস্যাকে বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে পারে না বা ভুল বোঝে। অনেকে প্রবীণদের মানসিক সমস্যাগুলো না জানার কারণে নিজেও কষ্ট পান, আবার তাঁদেরও কষ্ট দিয়ে ফেলেন। আবার অনেকে বুঝতে পারলেও অতটা গুরুত্ব দিতে চান না। ফলে প্রবীণদের মানসিক সমস্যাগুলো আরো বাড়ে। অথচ একটি পরিবারের জন্য একজন প্রবীণ ব্যক্তি বটগাছের মতো। তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান পরিবারকে অনেক সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, তাঁরা সবার আবেগীয় আশ্রয়স্থল। আসুন জেনে নিই বয়োবৃদ্ধদের মানসিক সমস্যাগুলো।

বিশ্বে বর্তমানে ৬০ বছরের ওপরের ব্যক্তিদের সংখ্যাও বাড়ছে। মৃত্যুহার ও জন্মহার কমের কারণে বৃদ্ধদের অনুপাত বাড়ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ চলনক্ষমতা হারাচ্ছে। এদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যক্তি মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকে। বয়োবৃদ্ধদের মানসিক সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে বিষণ্ণতা ও ডিমেনসিয়া (স্মৃতিভ্রম)। এ ছাড়া দুশ্চিন্তাও তাঁদের কম ভোগায় না।

বিষণ্ণতা

বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিরা শারীরিক অবস্থা, একাকিত্ম, পারিবারিক সমস্যার কারণে এবং জীবনে কিছুই করতে পারলাম না মনে করে বিষণ্ণতায় বেশি ভুগে থাকে। প্রায় ৭ শতাংশ প্রবীণ ব্যক্তিরা বিষণ্ণতায় ভুগে থাকেন। বিষণ্ণতার উপসর্গগুলো অন্য বয়সী মানুষদের মতোই। মন খারাপ থাকা, কোনো কাজে আগ্রহ না পাওয়া, মানুষের সাথে মেলামেশা এড়িয়ে চলা, একাকী থাকতে চাওয়া, রেগে যাওয়া, হতাশামূলক কথা বলা, ঘুমের পরিবর্তন হওয়া, ক্লান্তি অনুভব করা, ক্ষুধা ও ওজন কমে যাওয়া, অপরাধবোধে ভোগা, মৃত্যু বা আত্মহত্যার কথা বলা বা চিন্তা করা ইত্যাদি বিষণ্ণতার উপসর্গ।

অনেক সময় প্রবীণরা মন খারাপের অনুভূতি বুঝতে পারেন না। সে ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে এই সমস্যা থাকতে পারে। অকারণে মনে ব্যথা পেলে, দুশ্চিন্তা, হতাশা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, ব্যক্তির কথা ও কাজের গতি কমে আসা, বিরক্ত হয়ে থাকা, পছন্দের কাজগুলোতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, নিজের প্রতি অবহেলা করা ইত্যাদি উপসর্গ থাকলে তাঁর মধ্যে বিষণ্ণতা থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃদ্ধ বয়সের বিষণ্ণতায় ওষুধ ও সাইকোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। সাইকোথেরাপিতে বিষণ্ণতার জন্য দায়ী মনোসামাজিক কারণগুলো নিয়ে কাজ করা হয়। তবে অনেক সময় ব্যক্তি এতটাই হতাশার মধ্যে থাকেন যে সাইকোথেরাপি নিতেও আগ্রহ পান না। তখন অবশ্যই ওষুধ গ্রহণ করতে হয়।

তবে ব্যক্তি যদি নিজেকে ব্যস্ত রাখেন, নিজের শরীরকে কার্যকর রাখেন, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে থাকেন, আনন্দদায়ক কাজে অংশগ্রহণ করেন, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেন, স্বেচ্ছাসেবা বা সহযোগিতামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেন ও বৃদ্ধ বয়সের জীবনকে মেনে নিয়ে সব পরিস্থিতিতে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করেন, তবে তিনি নিজেকে অনেকখানি বিষণ্ণতা থেকে বের করে আনতে পারেন।

ডিমেনসিয়া

ডিমেনসিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো মনে না থাকা। ছোটবেলার সব স্মৃতি ভালোভাবে মনে থাকলেও কয়েক ঘণ্টা আগে কী করেছেন তাই হয়তো মনে করতে পারা দুষ্কর হয়ে যায়। এই কারণে পরিবারের লোকজন ভুল বুঝে থাকে। তারা মনে করে যে ব্যক্তিটি ইচ্ছা করে তাদের কষ্ট দেওয়ার জন্য এমনটি করছেন। যেমন : একজন ব্যক্তি তাঁর ছেলেকে বললেন তিনি সকাল থেকে কিছু খাননি। তখন ছেলের বউ বা বাড়ির অন্য সদস্যরা মনে করেন যে তাকে তাঁর ছেলের সামনে ছোট করার জন্য বলছেন। আসলে তা নয়, ডিমেনসিয়া শুরু হলে ব্যক্তি স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি বা নতুন স্মৃতিগুলো মনে রাখতে পারেন না। এ ছাড়া তাঁর জ্ঞানীয় প্রক্রিয়াতেও ক্ষয় দেখা যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, মাঝে মাঝে তাঁর চিন্তা ও কথার মধ্যে কিছু অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হতে পারে। কারো কারো মধ্যে অস্থিরতা যায়। এটি বয়সকালের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বৃদ্ধ বয়সে শরীরের অন্যান্য কোষের মতো মস্তিষ্কের কোষেরও ক্ষয় বা মৃত্যু হয়। এর ফলেই ডিমেনসিয়া হয়ে থাকে।

ধারণা করা হয়, সারা পৃথিবীতে ৩৫.৬ মিলিয়ন ব্যক্তি ডিমেনসিয়াতে আক্রান্ত এবং এই সংখ্যা প্রতি ২০ বছরে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। ডিমেনসিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেশি পড়ে। কারণ ডিমেনসিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির যে ধরনের পরিচর্যা, পথ্য ও চিকিৎসা দরকার হয়, তা এসব দেশে আর্থিক ও অসচেতনতার কারণে উপেক্ষিত হয়।

ডিমেনসিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে সহায়তা করতে হলে পরিবারের মানুষকে আগে সহায়তা করা প্রয়োজন। কেন না তারা যদি ভুল বুঝে মনের গভীরে কষ্ট পোষণ করে থাকে, তাহলে তাদের পক্ষে প্রবীণ ব্যক্তিকে সাহায্য করা সম্ভব নয়। এ জন্য তাদের মনের গভীরের কষ্টগুলো বের করে এনে তাদের ডিমেনসিয়ার লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে সচেতন করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকেও কিছু সহায়ক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তাদের স্মৃতির সমস্যাটি দূর করা যেতে পারে। যেমন : বিভিন্ন বিষয় তারা হাতের ডায়েরি, দেয়ালের বোর্ডে, মোবাইল ফোন বা ট্যাবে লিখে রাখতে পারেন। যেমন প্রতি বেলার ওষুধ খাওয়ার পরপর একটি ডায়েরিতে লেখা থাকলে ওষুধ খাওয়া  হয়েছে কি না সেই দ্বন্দ্বে থাকতে হবে না। এ ছাড়া সুষম খাবার ডিমেনসিয়া প্রতিরোধ করতে পারে। শরীরকে সচল রাখা, স্বাভাবিক ঘুম, সামাজিকভাবে মেলামেশা, অন্য প্রবীণদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বা দেখা-সাক্ষাৎ রাখার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে ভালো রাখতে পারে।

দুশ্চিন্তা

বৃদ্ধ বয়সে নানা ধরনের দুশ্চিন্তা মানুষের জীবনে আসতে পারে। আয় কমে যায়, চিকিৎসার খরচ বাড়ে, বীমা সুবিধা চলে যায়, সন্তানরা দূরে চলে যায়, সমবয়সী কারো মৃত্যু, অসুস্থতা, মৃত্যুভয়, নিজের কাজ করার ক্ষমতা কমে যাওয়া, অন্যের ওপর নির্ভরতাসহ বিভিন্ন কারণে তাঁদের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা যায়। দুশ্চিন্তার সঙ্গে ডিমেনসিয়া থাকলে ব্যক্তির নিজের পক্ষে এখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়। এ সময়ে তাঁদের অত্যন্ত সহমর্মিতার সঙ্গে সহযোগিতা করতে হয়। তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে ও সমস্যার সমাধান করতে এমনভাবে সাহায্য করতে হয় যেন তাঁরা শেষ হয়ে গিয়েছেন এমনটি অনুভব না করেন। এ বয়সে মানুষের মধ্যে অভিমান বেড়ে যায়। তাই তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় অন্যদের বাড়তি সচেতনতা নিয়ে কথা বলা উচিত যেন তাঁরা কষ্ট না পান। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

তানজির আহম্মদ তুষার : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement