Beta

মাছ ক্রেতা ও বিক্রেতার ডিজিটাল হাট ‘ফিশ বাংলা’

১৩ জুলাই ২০১৯, ২১:১২

নিজস্ব প্রতিবেদক
অনুষ্ঠানে কথা বলেন ফিশ বাংলার উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান। ছবি : এনটিভি

দেশের এক প্রান্তের মাছ চাষী অপর প্রান্তের ক্রেতার কাছে মাছ বিক্রি করবে কোনো মধ্যস্বত্তভোগী ছাড়াই। মাছ চাষী এবং ক্রেতাকে একত্রিত করছে ডিজিটাল মাছের হাট ‘ফিশ বাংলা’ নামের অ্যাপস। এ অ্যাপস ব্যবহার করে মাছচাষী নিজেই সরাসরি ক্রেতার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। ন্যায্য মূল্যে পেয়ে লাভবান হবে চাষী;তাজা মাছ খেয়ে উপকৃত হবে ক্রেতা!

আজ শনিবার বিকাল চারটায় ডেইলি স্টার এ.এস মাহমুদ সেমিনার হলে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্ল্যাটফর্মটি উদ্বোধন করেন এর উদ্যোক্তারা। ফিশ বাংলা অ্যাপটি বর্তমানে গুগল প্লে স্টোরে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মাছের আড়ৎদার, চাষী,জেলে এবং ক্রেতা-বিক্রেতারা মাছ নিয়ে তাদের বিভিন্ন  অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

কারওয়ান বাজারের আড়ৎদার আব্দুল কাদের বলেন, ‘বাজার থেকে মাছ কেনার সময় সুযোগ হয় না অনেকের। মাছ কিনলেও তাজা মাছ পাওয়া যায় না। ফরমালিনের কারণে মাছ কেনাই বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকেই। বাজারে মাছ আসার পর মাছে গুনাগুন ভেদে দাম নির্ধারন হয়। একই মাছ কোনো দোকানদার ২৮০ টাকা বিক্রি করছে; কোনো দোকানদার ২২০ টাকায়, কেউবা ৩০০ টাকায় বিক্রি করছে। মাছ সতেজ থাকলে একরকম দাম রাখা হয়; আবার পঁচন ধরলে দাম অন্যরকম বেড়ে যায়। তাই মাছ সতেজ থাকা অবস্থায় বিক্রি করতে পারলে ক্রেতা-বিক্রেতা মধ্যস্বত্বভোগী সবাই লাভবান হবে। আজকে ফিশ বাংলার মাধ্যমে দেশের মাছ ব্যবসায় নতুন প্লাটফর্ম তৈরী হলো।’

বাগেরহাটের মাছ চাষী সোহাগ বলেন, ‘আমি পড়াশোনার পাশাপাশি মাছ চাষ করছি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মাছ বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়ায় ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হবে। তারা ন্যায্য দাম পাবেন।’

নারীদের অভিজ্ঞতা

বাগেরহাটের মাছ চাষী ফারজানা আক্তার তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি একজন ছাত্রী। আমি পড়ালেখার পাশাপাশি মাছের চাষ করি। মাছের চাষ করেই আমি সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি। পরিবারকে সহযোগিতা করছি। এক্ষেত্রে আমার বাবা-মা আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করছে। কিন্তু আমি যখন মাছ বিক্রি করতে আড়তে যাই তখন আমাকে নানামুখী কটু কথা শুনতে হয়। অবিবাহিত হওয়ার কারণে এ কুটুক্তির পরিমাণ আরো বেশি। এছাড়া মাছের আড়ৎদাররা  মেয়ে হওয়ার কারণে আমাকে মূল্য আরো কম দিতে চায়।’

একই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পারমা নামের অপর মাছ চাষী বলেন, ‘নারী হিসেবে বাজারে মাছ বিক্রেতা হওয়া কঠিন। অনেকের কথা শুনতে হয়। বিবাহিত হলে স্বামী, শাশুড়ী,আশপাশের লোকজনের কটুক্তি আবার মাছ বিক্রির পর স্বামীকে টাকা দিয়ে দিতে হয়। এতে করে ব্যবসার মূলধন বাড়ে না। কিন্ত ডিজিটাল মাছ হাট তাদের নতুন সুযোগ করে দিয়েছে। এখন আর আড়ৎদারের কাছে যেতে হয়না। ফিশ বাংলার মাধ্যমে মাছ বিক্রি করা যায়।’

চিংড়ির ওজন বাড়াতে জেলি!

অনুষ্ঠানে বাগেরহাটের অনেক মাছ চাষীরা জানান, চাষীদের থেকে চিংড়ি কিনে নিয়ে মধ্যস্বত্ব ব্যবসায়ীরা চিংড়ির ওজন বাড়াতে জেলি ব্যবহার করছে। এক কেজি মাছের মধ্যে জেলী ব্যবহারের কারণে ওজন ২০০ গ্রাম থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত বেড়ে যায়। এতে করে ক্রেতা ঠকছে। এবং বিদেশে এ মাছ চাষ রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। চাষীদের দাবী এর থেকে মুক্তির জন্য ‘ফিশ বাংলা’ অ্যাপস ব্যবহার করলে মাছ সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাবে ক্রেতা। এতে করে জেলিসহ নানা ধরণের ভেজাল মুক্ত মাছ পাওয়া যাবে।   

৪৪ কেজিতে মণ!

বাগেরহাটের মাছ চাষী শহিদুল ইসলাম মাছ বিক্রিতে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার এলাকায় আড়ৎদারের কাছে যখন চিংড়ি মাছ বিক্রি করতে গেলাম তখন বলা হলো ৪৪ কেজিতে এক মণ! কিন্তু মূল্য পাবো ৪০ কেজির। এটা আমার জন্য অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা। এক মণ চিংড়ি বিক্রি করে প্রতি মণে আমাকে ৪ কেজি চিংড়ি ফ্রি দিতে হচ্ছে। এক হাজার টাকা করে কেজি হলে প্রতি মণে ৪ হাজার টাকা আমাকে বেশি গুণতে হচ্ছে। এক প্রকার জিম্মি হয়ে দীর্ঘদিন এ সমস্যার সমাধান খুঁজছি। কিন্তু পাইনি। অবশেষে ফিশ বাংলার মাধ্যমে আড়ৎদারদের থেকে মুক্তি পেয়েছি। এ জন্য ফিশ বাংলা কর্তৃপক্ষের নিকট অনেক কৃতজ্ঞ।’    

ফিশ বাংলার উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান এসব সমস্যার সমাধান তুলে ধরে বলেন, ‘ফিশ বাংলা অ্যাপের মাধ্যমে মাছ বিক্রেতারা ও ক্রেতারা মাছ কেনা-বেচার সুযোগ পাচ্ছেন। অনলাইন ভিত্তিক মাছ বিক্রেতা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মেট্রো এলাকার পাশাপাশি দেশের যেকোনো এলাকায় কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে মাছ পৌঁছে দেবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক,সরাসরি মাছ চাষী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পক তৈরি করে দেয়।’

এ নিয়ে অনেকদিন ধরে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করা হয়েছে। তারা তাজা ও সতেজ মাছ সরবরাহ নিশ্চিত করছেন। ক্রেতাকে চাষীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে। ক্রেতারা আগে ফরমাশ দিলে ফিশ বাংলা তা নিশ্চিত হয়ে বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। বিক্রেতার অর্থ পরিশোধ করবে ফিশ বাংলা। এর বাইরে রান্নার উপযোগী মাছের মতো বাড়তি সুবিধা যুক্ত করবে ফিশবাংলা।      

অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘ফিশ বাংলা অ্যাপস ব্যবহার করে এবং কল সেন্টারের মাধ্যমে মাছ চাষী,ক্রেতা ও বিক্রেতারা লাভবান হবেন। চাষীরা অ্যাপসে মাছের মূল্য, নমুনা দেওয়া থাকবে কোন আড়ৎদার বা ক্রেতা যদি মাছে জন্য অর্ডার করেন তাহলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বা বেশি হলে দেড় দিনের মধ্যে তাকে তাজা মাছ পৌঁছে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে চাষীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে;মাছকে কীভাবে তাজা রাখা যায়। এক্ষেত্রে বলা যায়, মাছ ধরার আগে  কমপক্ষে ২৪ ঘন্টা আগে খাওয়ার দেওয়া বন্ধ করতে হবে। মাছ ধরার সঙ্গে সঙ্গে বাক্সে ঢুকিয়ে ফেলতে হবে। প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে সহযোগিতা করছে ওয়ার্ল্ড ফিশ,ইউএসএআইডি। ফিশবাংলা থেকে মাছের অর্ডার দেওয়া যাবে  www.fishbangla.com ও ফিশবাংলা অ্যাপ থেকে।

Advertisement