Beta

কৃষকের জন্য,কৃষির জন্য এসেছে ‘মৃত্তিকা’

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৭:১৯ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ২১:০৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

কৃষক মাটি পরীক্ষা করেছেন। এরপর ওই মাটির গুণাগুণ একটি সফটওয়্যারে দেওয়া হলো। সফটওয়্যার বিশদ পরামর্শ দিল, ওই মাটিতে কী কী সার, কতটুকু পরিমাণে প্রয়োজন হবে। আর এতে কৃষকের যেমন সাশ্রয় হলো, তেমনি ফলন হয়েছে প্রত্যাশা অনুযায়ী।

অন্য কোথাও নয়, বাংলাদেশের কৃষকরাই ব্যবহার করেছে এমন প্রযুক্তি। রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকায় কৃষকরা চাষাবাদের জন্য এক ধরনের সফটওয়্যারের সাহায্য নিচ্ছে। ‘মৃত্তিকা’ নামে ওই সফটওয়্যারে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য দিয়ে পরামর্শ সেবা পাচ্ছে কৃষকরা। গ্রামীণ ইন্টেল সোশ্যাল বিজনেস এ সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছে।  

মিঠাপুকুর এলাকায় রহিম আফরোজ রিনিউয়েবল এনার্জি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে দেখা যায়, কম্পিউটারের সাহায্যে গ্রামীণ ইন্টেলের ‘মৃত্তিকা’ ব্যবহারের পর চারজন কৃষক গড়ে ২১ শতাংশ করে বেশি ফসল ঘরে তুলতে পেরেছেন, আর তাঁদের সারের খরচ কম হয়েছে ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ওই চার কৃষক তাঁদের জমি পরীক্ষা করে এবং মৃত্তিকা ব্যবহারের পর প্রতি শতাংশে ৮ কেজি করে অতিরিক্ত ধান পেয়েছেন। অথচ তারা প্রায় অর্ধেক পরিমাণ সার দিয়েছিলেন জমিতে।

এ ব্যাপারে গ্রামীণ ইন্টেলের চিফ অপারেটিং অফিসার পাভেল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো কৃষি কাজ করা হয় পুরনো প্রযুক্তি আর গতানুগতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। ফলে মাটির উর্বরতা পরীক্ষা করে যথাযথ ও সঠিক পরিমাণ সারের ব্যবহার, কীটনাশক বা বীজ বাছাই এসবের কোনটিই আমরা করি না। কিন্তু শুধু যথাযথ আর সঠিক পরিমাণ সারের প্রয়োগ করেই কৃষকরা কৃষিকাজের খরচ কমিয়ে আনতে পারেন, বাড়াতে পারেন ফলন। আর এ জন্য গ্রামীণ ইন্টেল নিয়ে এসেছে ‘মৃত্তিকা’ নামের একটি সফটওয়্যার, যা মাটি পরীক্ষা করে অতি সাধারণ মানের কম্পিউটার, ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়।’

পাভেল হক জানান, মৃত্তিকা একটি মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ ও সার সুপারিশ সংক্রান্ত সফটওয়্যার। এর ব্যবহারের ফলে কৃষক পরিমিত সার ব্যবহার করে সারের খরচ কমিয়ে আনতে পারে এবং উৎকৃষ্ট ফলন নিশ্চিত করে জীবন মানের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। স্থানীয় সার সরবরাহকারীর তালিকা ও সারের দামও জানা যায় মৃত্তিকার মাধ্যমে।

পাভেল হক বলেন, ‘যেকোনো শিক্ষিত মানুষ শুধু একটি প্রশিক্ষণের পর মাটি পরীক্ষা করতে পারবে। খোলা শুকনো জায়গা থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাটি সংগ্রহ করে তা রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে মাটি পরীক্ষা করা হয়। এতে ওই মাটিতে কী কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ কম বা বেশি আছে তা জানা যায়। রাসায়নিকের পরিমাণ ঠিকমতো বা যথাযথ থাকলে সেই মাটি উর্বরতা আর না থাকলে সার দিয়ে উর্বরতা ফিরিয়ে আনা যায়।’

পাভেল হক জানান, বিষয়টা অনেকটা অসুস্থ রোগীর রক্ত পরীক্ষার মতো যা দেখে ডাক্তার ওষুধ লিখে দেন। বছরের পর বছর একই জমিতে একই ধরনের ফসল ফলানোর জন্য জমির উর্বরতা শক্তি কমে যায়। আবার অতিরিক্ত সার ব্যবহার করার জন্যও ফসলের ক্ষতি হয়। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার পর তার ফলাফল কম্পিউটার/স্মার্ট ফোনে ঢুকিয়ে মাটির গুণাগুণ যাচাই করা হয়। তবে এর সঙ্গে কৃষিজমির পরিমাণ, সেচ ব্যবস্থা, মৌসুম, কোনো ফসল ফলাতে চায় তার বিবরণও দিতে হয়।’

সরকার প্রকাশিত সার সুপারিশ নীতিমালায় দেশের সব এলাকার মাটির উর্বরতা পরীক্ষা করে সেখানে কোন ফসলের জন্য কতটুকু পুষ্টি দরকার তার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। গ্রামীণ ইন্টেল সেই তালিকাটি আরো আধুনিক করে মৃত্তিকা সফটওয়্যারের মাধ্যমে সারের সুপারিশ দেয়।

মৃত্তিকা শুধু কোন ফসলের জন্য কোন সার কতটুকু ব্যবহার করতে হবে তা জানায় না, পাশাপাশি এই সার কখন কখন প্রয়োগ করতে হবে সেটাও বলে দেয়। একেক স্থানের জমির উর্বরতা একেক রকম, তাই একেক জমিতে একেক ধরনের ফসল চাষে সারের ধরন এবং পরিমাণও বদলে যায়। মৃত্তিকা খুব সহজে এই সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে।

গ্রামীণ ইন্টেলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (পি আর অ্যান্ড কমিউনিকেশন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মৃত্তিকা ব্যবহার করার জন্য খরচের জায়গা তিনটি- কম্পিউটার বা স্মার্টফোন, মাটি পরীক্ষার সরঞ্জাম এবং সফটওয়্যার কেনা। কোনো গ্রাম বা ইউনিয়নে একজন উদ্যোক্তা এই তিনটি জিনিস কিনেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। তিনি একটি মাটি পরীক্ষার যন্ত্র দিয়ে অন্তত ১০০ জন কৃষককে সেবা দিতে পারবেন।’

আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রতিজনের কাছে ২০০ টাকা করে নিলে একজন উদ্যোক্তা মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। মাটি পরীক্ষার সরঞ্জামের দাম পড়ে ১৫ হাজার টাকার মতো, তবে শুধু রাসায়নিক কিনতে দাম পড়ে  আট হাজার টাকা। সফটওয়্যারের জন্য বছরে খরচ প্রায় দুই হাজার ৫০০ টাকা। মৃত্তিকা সফটওয়্যার কৃষকের সব রকম তথ্য রেখে দেয় ভবিষ্যতে আবার ব্যবহার করার জন্য।

যেকোনো উদ্যোক্তা দেশের যেকোনো স্থান থেকে গ্রামীণ ইন্টেলের সেবা কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে এবং নিজে লাভবান হতে পারে। পাশাপাশি সারা দেশে ব্যবসায়িক অংশীদারদের মাধ্যমেও মৃত্তিকার সেবা দেওয়া হয়। বর্তমানে ৪০টিরও বেশি উপজেলায় মৃত্তিকা কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে।

এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘একজন উদ্যোক্তা মৃত্তিকা ব্যবহার করতে চাইলে তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পাশাপাশি মৃত্তিকার লাইসেন্স নিতে হবে।’ তিনি জানান, তা ছাড়া গ্রামীণ ইন্টেলের সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করছে তার মধ্যে আছে, হেলভেটাস, প্রাকটিক্যাল অ্যাকশন, সলিডারিডারড নেটওয়ার্ক এশিয়া, এসিআই ফার্টিলাইজার, রহিমআফরোজ রিনিউয়েবল এনার্জি, রুরাল রিকন্সট্রাকশন ফাউন্ডেশন, গণ উন্নয়ন কেন্দ্র ইত্যাদি। তবে আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার কথা চলছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও কম্বোডিয়ার কৃষকরা মৃত্তিকা ব্যবহার করছে।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement