Beta

নুসরাত হত্যা মামলা

‘শ্লীলতাহানি করতেই দোতালায় অফিস স্থানান্তর করেন অধ্যক্ষ সিরাজ’

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:১১

অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। পুরোনো ছবি : এনটিভি

ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাত হত্যা মামলায় শুনানিকালে বাদী পক্ষের আইনজীবী মো. আকরামুজ্জামান বলেন, ‘মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী কেনা যায়, কিন্তু পারিপার্শিক অবস্থা কেনা যায় না। নুসরাতকে আগুনে পোড়ানো ঘটনাস্থল সাইক্লোন সেন্টারের ছাদের চারপাশে অনেক উঁচু দেয়াল ছিল। এ কারণে সেখানে কেউ থাকলেও দেখা যায়না। তাছাড়া সেখানে মেয়েদের ওয়াশরুম থাকায় কে আসছে তা কেউ খেয়াল করেনা। অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা নিচতলা থেকে দোতালায় তার অফিস স্থানান্তর করে সেখানে ছাত্রীদের শ্লীলতাহানিসহ অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন।’

গত দুইদিন ধরে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্কের শুনানিতে এসব কথা বলেন আইনজীবী আকরামুজ্জামান।  

যুক্তিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী আকরামুজ্জামান নুসরাত হত্যাকাণ্ডে আসামিদের  ভূমিকা নিয়ে বলেন, ‘আদালতে মামলার পিবিআই এর তদন্তকারী কর্মকর্তা নুসরাতকে আগুনে পোড়ানোর আগে এবং পরে আসামিদের মোবাইলে কথোপকথনের অডিও ও নুসরাতের ডাইং ডিকলারেশনের যে ভিডিও ফুটেজ আদালতে উপস্থাপন করেছেন তা স্বাক্ষ্য আইনের ৩ ধারায় স্বাক্ষ্য হিসাবে গ্রহনযোগ্য। নুসরাত মৃত্যুর আগে হাসপাতালের ডাক্তারের সামনে যে ডায়িং ডিকলারেশন (মৃত্যুকালীন জবানবন্দি) দিয়েছে তা স্বাক্ষ্য আইনের ৩২ ধারা হিসাবে গ্রহনযোগ্য। আর  এটি ম্যাজিষ্ট্রেটের সামনে দিতে হবে এমন কথা নেই।’

আইনজীবী আরো বলেন,’ডাইং ডিক্লারেশন মুখে বা লিখিত বা ইলেকট্রনিক কোন ডিভাইসে ও হতে পারে। এ ডাইং ডিক্লারেশনে নুসরাত কারো নাম বলে নাই তাই এটা ইনটেনশনারি ডাইং ডিকলারেশন নয়। কারো নাম বললে শুধু মাত্র সে আসামি হতো। আসামি পক্ষের দাবী ঘটনার কোন প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী না থাকা প্রসঙ্গে তিনি আদালতে হাইকোর্ট বিভাগের একটি মামলার রায়ের উদাহরণ উপস্থাপন করেন। ওই মামলার ( এল আর-১১ রাষ্ট্র বনাম) রায়ে বলা হয়েছে- কোন প্রত্যক্ষদর্শী আদালতের কাঠগড়ায় এসে স্বাক্ষ্য দেবে এমন বাধাধরা নিয়ম নেই। পারিপার্শ্বিক অবস্থা হলো মূল বিষয়। প্রত্যক্ষদর্শী কেনা যায়; কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা কেনা যায়না। নুসরাতকে আগুনে পোড়ানো ঘটনাস্থল সাইক্লোন সেন্টারের ছাদের চার পাশে অনেক উঁচু দেয়াল ছিল। এ কারণে সেখানে কেউ থাকলে ও দেখা যায়না। তাছাড়া সেখানে মেয়েদের ওয়াশরুম থাকায় কে আসছে তা কেউ খেয়াল করেনা। অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা নিচ তলা থেকে দোতালায় তার অফিস স্থানান্তর করে সেখানে ছাত্রীদের শ্লীলতাহানী সহ অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন।’

অ্যাডভোকেট আকরামুজ্জামান আদালতে বলেন, ‘গত ২৭ মার্চ নুসরাতের শ্লীলতাহানির পর তাঁর মা, ভাই,এক পৌর কাউন্সিলর মাদ্রাসার অধ্যক্ষের কক্ষে এসে ঘটনার প্রতিবাদ করেন। এক পর্যায়ে নুসরাতের মা শিরিন আক্তারের সাথে অধ্যক্ষের কথা কাটাকাটি হয়। ঘটনা সামাল দিতে না পেরে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা মোবাইলে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি বর্তমান মামালার আসামি রুহুল আমিনকে মাদ্রাসায় যেতে বলেন। রুহুল আমিন সাথে কাউন্সিলর মকসুদ ও পুলিশের এক দারোগাকে নিয়ে আসেন। তাঁরা মাদ্রাসায় গিয়ে আগের ঘটনাগুলোর মত এ ঘটনাটিও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে তাঁরা সোনাগাজী থানায় গিয়ে ওসির সাথে আলোচনা করেন। এর মধ্যে নুসরাত,নুসরাতের মা ও ভাই থানায় গিয়ে মামলার করার আবেদন জানান। ঘটনা জানাজানি হলে সোনাগাজীর মানুষ ফুসে উঠে। ওসি বাধ্য হয়ে মামলা গ্রহন করে সিরাজ উদৌলাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর কাউন্সিলর মকসুদ আলম ও শাহাদাত হোসেম শামীম সিরাজ উদ-দৌলার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করে। এরপর সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা সিরাজ উদ-দৌলার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করে। ঘটনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে থাকলে সিরাজ উদ-দৌলা কারাগার থেকে শামীমের মাধ্যমে তাঁর অনুসারীদের সংবাদ দেয়, তারা যেন নুসরাত থেকে মামলা প্রত্যাহারের কাগজ আদায় করে নেয়।’

এর আগে বিচার শুরুর ৪৭ কার্য দিবসে ৮৭ জন সাক্ষী স্বশরীরে আদালতে এসে সাক্ষ্য দেন। মামলার অভিযোগপত্রে  ৯২ জন সাক্ষীর  নাম দিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

নথি থেকে জানা যায়, গত ৬ এপ্রিল সকালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত আলিমের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে দুর্বৃত্তরা তাকে ডেকে কৌশলে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। পরে তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল রাতে মারা যায়। পরদিন ১১ এপ্রিল বিকেলে সোনাগাজীতে তাঁর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে প্রধান আসামি করে আরো আটজনের  নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। পিবিআই ও পুলিশ এ মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে হত্যায় সরাসরি জড়িত পাঁচজনসহ ১২ জন আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

Advertisement