Beta

সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে ডিসিদের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

১৪ জুলাই ২০১৯, ১৬:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসকদের ৩০ দফা নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই বঞ্চনার শিকার না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে নির্দেশ দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আজ রোববার সকালে তাঁর কার্যালয়ের শাপলা হলে পাঁচ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে ডিসিরা ছাড়াও বিভাগীয় কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিবাদ নির্মূল, চাঁদাবাজি বন্ধ, বাল্যবিবাহ রোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে ডিসিদের নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী কেন্দ্রীয় পর্যায় হতে তৃণমূল পর্যন্ত উদযাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে হবে।

সেবার মান বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন, সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সর্বক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরো সতর্কতার সঙ্গে এবং কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে আপনাদের ব্রতী হতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিতে হবে। দৈনন্দিন প্রয়োজনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে জেলার সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করতে হবে।

‘শিক্ষার সব স্তরে নারীশিক্ষার হার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার হ্রাস এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ভূমি রক্ষায় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধিতে সার, বীজ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ইত্যাদির সরবরাহ নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ভেজাল খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ প্রতিরোধে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ-সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় প্রশমনে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২’ এবং এ-সংক্রান্ত স্থায়ী নির্দেশনাবলি অনুসারে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ মানুষকে সহজে সুবিচার প্রদান ও আদালতে মামলার জট কমাতে গ্রাম আদালতগুলোকে কার্যকর করতে হবে। দপ্তরগুলোর বিদ্যমান সেবাসমূহ তৃণমূলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে তথ্যমেলা, সেবা সপ্তাহ পালনসহ ইত্যাদি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্পাঞ্চলে শান্তি রক্ষা, পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্ন করা এবং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পেশিশক্তি ও সন্ত্রাস নির্মূল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাজার ব্যবস্থার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। ভোক্তা অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পাচার, যৌতুক, ইভটিজিং ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।

সরকারপ্রধান বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনোদন ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংস্কৃতিবোধ ও বিজ্ঞানমনস্কতা জাগিয়ে তুলতে হবে।

‘প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণের পাশাপাশি এ অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, বনাঞ্চল, নদী-জলাশয়, প্রাণিসম্পদ এবং গিরিশৃঙ্গগুলোর সৌন্দর্য সংরক্ষণ করতে হবে। এ ছাড়া পর্যটনশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কুটিরশিল্পের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন,  বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে এ ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলার আকার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে সেই জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। কোনো ঢালাও পরিকল্পনা নয়, জেলার চাহিদানুযায়ী এবং তার প্রকৃতি ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন করা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জনগণের চাহিদা এবং উন্নত জীবন নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় সরকারের একটি মিনি স্টেডিয়াম করার উদ্যোগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিভিন্ন উপজেলায় স্কুল ও কলেজের খেলার মাঠটিকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেটি কিন্তু উদ্দেশ্য নয়, স্টেডিয়াম বলতে চারদিকে আবার ঘেরাও করে ফেলা নয়, প্রাকৃতিক পরিবেশটাও ঠিক রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গৃহহারা, ভূমিহীন এবং ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন—সরকার বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে এসব হতদরিদ্র মানুষকে পুনর্বাসন করছে। কিন্তু আবার নদী ভাঙছে এবং মানুষ গৃহহারা হচ্ছে। কাজেই যখনই এমন হবে, তখনই তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। কেউ ভিক্ষা করতে পারবে না। আর সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের কর্মসূচির তালিকা প্রণয়নকালে প্রকৃত দুস্থরাই যেন সহায়তা পেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া সরকারের সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণের প্রকল্পের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করে যে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করা হয়, সেটা যেন আর না করা হয়। সে জন্য সেখানে প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এরই মধ্যে মসজিদের জন্য স্থান নির্ধারণ করে কাজ শুরু করা হচ্ছে, সেটা যাতে ভালোভাবে হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

Advertisement