Beta

যে মামলা তাড়িয়ে বেড়াত এরশাদকে

১৪ জুলাই ২০১৯, ১৪:২৯

সাবেক মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার ঘটনায় কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৮ বছর। এ মামলার প্রধান আসামি ছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ মামলায় রায়ের জন্য বহুবার দিন ধার্য হলেও রায়ের আগে আবার অধিকতর তদন্তের জন্য সময় চাওয়া হয়। এরপর পরিবর্তন হয়ে যায় বিচারক।

এভাবে ১৯৮১ সালে হত্যার পর মামলা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। মামলা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর গত ২৪ বছরে নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ২২ জন বিচারক বদলি হয়েছেন। মঞ্জু হত্যার দীর্ঘ ৩৮ বছরেও রায় হয়নি এ হত্যা মামলার; বরং এ মামলাকে ব্যবহার করে এইচ এম এরশাদ হয়ে যান রাজনীতিতে ‘তুরুপের তাস’।    

সর্বশেষ গত ২৭ জুন মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার কথা থাকলেও সিআইডির পক্ষ থেকে তা জমা দেওয়া হয়নি। পরে আগামী ২৬ আগস্ট নতুন করে তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।

এ মামলার বর্তমান বিচারক ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ শরীফ এ এম রেজা জাকের নতুন এ দিন ধার্য করেন। পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অস্থায়ী আদালতে এ মামলার কার্যক্রম চলছে।

এরশাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ মামলা থেকে অব্যাহতি পাবেন এইচ এম এরশাদ। মামলার সরকারপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আসাদুজ্জামান রচি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘মামলাটি অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য রয়েছে। তবে এইচ এম এরশাদ মারা যাওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। এতে করে মৃত্যুর পর মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পাবেন।’

২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। মামলার ভয়ে এরশাদ ২০০৫ সালে মহাসমারোহে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন।

২০০৭ সালের এক-এগারোর কিছু আগে সমীকরণ আবার পাল্টে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেন। ২০০৯ সাল তিনি এবং তাঁর দল ক্ষমতার ভাগিদার হন।

১৯৯০ সালে ক্ষমতাচ্যুতির পর নানা মামলায় হাত-পা বাঁধা ছিল এরশাদের। তারপরও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জেলে বসে তিনি পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। জাতীয় পার্টি সেই ভোটযুদ্ধে ৩৫টি আসনে বিজয়ী হয়।

১৯৯৬ সালে দায়ের করা মঞ্জুর হত্যা মামলাটি তখনো বিচারাধীন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনেও এরশাদ কারাগারে বসে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। তবে কারামুক্ত হয়ে এরশাদ জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী ও সুসংহত করতে কার্যকর, দূরদর্শী ভূমিকা রাখতে পারেননি। এতে দলটি ভাঙনের মুখে পড়ে। দলের অনেক নেতা তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তিনি জেল খেটে অর্থদণ্ড দিয়ে বের হন এবং ওই সময় তিনি চারদলীয় জোটও ছাড়েন।

কঠিন বিপর্যয়ের মুখেও ২০০১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৪টি আসন লাভ করে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হওয়ায় পরদিনই এরশাদ দেশের বাইরে চলে যান। পরিবেশ অনুকূলে এলে দেশে ফিরে দল গোছানোর কাজে হাত দেন। সেই নির্বাচনের আগেও জাতীয় পার্টি আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়ে।

২০০৬ সালে বাতিল হওয়া নির্বাচনের আগে নানা নাটকীয়তা ও শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার মধ্যে প্রধান দুদলই এরশাদকে কাছে টেনেছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে তিনি যখন পল্টনের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের মঞ্চে উঠলেন, তখন ১৪ দল মহাজোটে পরিণত হয়।

ওয়ান-ইলাভেন পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটে প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি আবারও দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। মহাজোট সরকারের অংশীদারও হয়, তিনি হন প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দূত। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ঘিরে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, নানামুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ জাতীয় পার্টিকে আরেক দফা বিপর্যয়ে ফেলে। মৃদু ভাঙনও দেখা দেয় দলে। তবুও সংসদে বিরোধীদল ও সরকারের অংশীদারত্ব পায় জাতীয় পার্টি।

একই ধারা অব্যাহত ছিল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও। তবে এবার আর সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়নি জাতীয় পার্টি, চলে যায় বিরোধী দলের আসনে। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজে বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব নেন এরশাদ।

মঞ্জুর হত্যা মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। তখন চট্টগ্রাম সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ছিলেন আবুল মঞ্জুর।

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর আত্মগোপনে যাওয়ার পথে মঞ্জুরকে আটক করে পুলিশ। এরপর ওই বছরের ২ জুন মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও মৃত্যুর সনদ পেতে দেরি হওয়ায় ঘটনার ১৪ বছর পর ১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুরের ভাই আবুল মনসুর আহমেদ চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা করেন। ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ পাঁচজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

দীর্ঘ ১৯ বছর মামলাটি বিভিন্ন কারণে ঝুলে ছিল। বিচার চলাকালে পর্যায়ক্রমে ২২ জন বিচারক বিচারিক কার্যক্রমে নিয়োজিত ছিলেন। এর মধ্যে ২২ জন বিচারক বিভিন্ন কারণে বদলি হয়েছেন। ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি মামলার ২৩তম বিচারক হিসেবে ঢাকা প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হোসনে আরা আক্তার মামলাটির রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার কার্যক্রম শেষ হয়।

এদিকে, মামলার অন্য দুই আসামি মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল লতিফ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) শামসুর রহমান শমসেরের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত আছে। এ মামলায় অভিযোগপত্রের ৪৯ সাক্ষীর মধ্যে ২৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে।

সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২০১২ সালের ২ অক্টোবর আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন প্রধান আসামি এরশাদ। এর সমর্থনে আদালতে লিখিত বক্তব্যও দাখিল করেছেন ।

Advertisement