‘আসামির পরিবারের কটূকথায়’ স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা

১৮ মে ২০১৯, ০৯:২৬

প্রতিবেশি মুকুল হোসেনের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল নবম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আকতার। এরপর বান্ধবীর সহায়তায় তাঁকে অপহরণ করে মুকুল। পরে স্থানীয় লোকজন অচেতন অবস্থায় সুমাইয়াকে পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আসামির পরিবারের সদস্যরা এলাকায় সুমাইয়ার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। এসব অপমান সহ্য করতে না পেরে বাবা-মাকে চিঠি লিখে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আত্মহত্যা করে সুমাইয়া। ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার।

বাবা-মাকে লেখা চিঠিতে সুমাইয়া লিখেছে, ‘নিজের লজ্জার কথা বারবার সবাইকে বলতে বলতে আমি নিজের কাছে অনেক ছোট হয়ে গেছি। প্রতিদিন পরপুরুষের কাছে এসব বলতে বলতে আমি আর পারছি না। অপরাধীকে শাস্তি দিলেই তো আর নিজের মানসম্মান ফেরত পাব না। তাই আমাকে ক্ষমা করো।’ বৃহস্পতিবার বিকেলে শোবার ঘর থেকে সুমাইয়া আকতারের (১৪) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে প্রতিবেশি আনিস উদ্দিনের ছেলে মুকুল হোসেন (২০) সুমাইয়াকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। রাজি না হওয়ায় গত ২৩ এপ্রিল প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় সুমাইয়াকে ‘অপহরণ’ করেন মুকুল। এ কাজে সহযোগিতা করে সুমাইয়ার এক বান্ধবী।

মুকুল, সুমাইয়ার মুখে রুমাল চেপে তাকে অপহরণ করেন। ওই দিন স্থানীয় লোকজন খানপুর বাগবাজার এলাকায় সুমাইয়াকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করে মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় স্কুলছাত্রী সুমাইয়ার বাবা বাদী হয়ে মোহনপুর থানায় মুকুল ও সুমাইয়ার বান্ধবীর নাম উল্লেখসহ আরো দু-তিনজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ ২৭ এপ্রিল মুকুল হোসেন ও সুমাইয়ার বান্ধবীকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আসামির পরিবারের লোকজন প্রতিনিয়ত সুমাইয়া ও পরিবারের লোকজনকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে।

সবশেষ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে সুমাইয়া পুকুরে গোসল করতে যায়। এ সময় আসামিপক্ষের লোকজন তাকে দেখে কটূক্তি করতে থাকে। সুমাইয়া বাড়ি ফিরে বিষয়টি পরিবারকে জানায়।

এরপর বিকেল ৪টার সময় খাতায় একটা চিঠি লিখে রাখে। মা-বাবার উদ্দেশে লেখা চিঠিতে সুমাইয়া লিখেছে, ‘তোমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছি, অনেক আদর, অনেক ভালোবাসা কিন্তু একটা মেয়ের কাছে তার মানসম্মান সবচেয়ে বড়।’ বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ শোবার ঘরে বাঁশের আড়ার সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় সুমাইয়ার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে।

সুমাইয়ার বাবা আবদুল মান্নান বলেন, ‘বাইরে বের হলেই আমার মেয়েকে বাজে কথা শুনতে হতো। আমাদেরও বাজে কথা শুনতে হতো। মেয়ে বলত বাবা, আমার জন্য তোমাদের বাজে কথা শুনতে হচ্ছে। আমার কারণে নাকি আমার বোনদের বিয়ে হবে না।’

খবর পেয়ে মোহনপুর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তিরা হলেন মুকুল হোসেনের নানি সকিনা বেগম, খালাতো ভাই রাব্বি ও খালু রাসেল।

মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হোসেন জানান, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিন আসামিকে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে গতকাল শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।