Beta

‘আমৃত্যু কারাগারে থাকলে তো কারাগারে বৃদ্ধাশ্রম বানাতে হবে’

০৯ মে ২০১৯, ১৪:১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘সারা দেশের কারাগারগুলোতে পাঁচ হাজার ৫৩৭ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন। যাঁরা যাবজ্জীবন মানে কত বছর, এ-সংক্রান্ত রিটের রায়ের অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।’ এ-সংক্রান্ত রায় নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাঁরা ও তাঁদের পরিবার বুঝতে পারছেন না, কত দিন কারাগারে কাটাতে হবে।

আজ বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের বেঞ্চে ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড’ এ-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ শুনানিকালে রিভিউ আবেদনকারীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমৃত্যু কারাগারে থাকলে তো কারাগারে বৃদ্ধাশ্রম বানানো ছাড়া উপায় নেই।’

শুনানি শেষে এ মামলায় অ্যামিকাস কিউরিদের (আদালত বন্ধু) বক্তব্য শোনার জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ। যাঁরা ওই মামলায় অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে বক্তব্য দেবেন তাঁরা হলেন—ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, আইনজীবী আবদুর রেজাক খান, আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন।

এদিকে, আজ রিভিউ শুনানিতে অংশ নিয়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতকে বলেন, ‘ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে যাবজ্জীবন কত দিন হবে, তা উল্লেখ করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও দণ্ডবিধিতে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়টি আমাদের দেশের সঙ্গে ওই সব দেশের মিল রয়েছে।’
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এসব দেশে যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যুর কোনো বিধান নেই। কিন্তু আমাদের দেশে একটি মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু বলে রায় দিয়েছেন, যা দেশীয় দণ্ডবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমৃত্যু কারাগারে থাকলে তো কারাগারে বৃদ্ধাশ্রম বানানো ছাড়া উপায় নেই। অথচ উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত আসামিদের একটা পর্যায়ে প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার  বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এসব বিধান নেই। ফলে আমাদের আইনি কাঠামোতে আমৃত্যু সাজার বিধান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ’

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, আবদুর রেজাক খান উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ১১ এপ্রিল ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড’ এ-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ শুনানিতে ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস’ হবে কি না, সে বিষয়ে আইনি মতামত তুলে ধরতে চার সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু) হিসেবে নিয়োগ দেন আদালত। এই চার আইনজীবী হলেন—ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান ও মুনসুরুল হক চৌধুরী। পরে মুনসুরুল হক চৌধুরীকে বাদ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিনকেও এই মামলায় অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেওয়া হয়।

আজ শুনানিকালে মুনসুরুল হক চৌধুরী আদালতকে বলেন, ‘মাই লর্ড, আমি এ মামলায় আপিলকারীর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত ছিলাম। সুতরাং অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে থাকা ঠিক হবে না।’ এরপর আদালত এ মামলা থেকে তাঁকে বাদ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিনকে নিয়োগ দেন। 

২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর একটি হত্যা মামলায় দুই আসামি আতাউর মৃধা ওরফে আতাউর ও আনোয়ার হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে। এসব আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। হাইকোর্টের সে রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল আবেদন জানান।

২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালত যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাসসহ সাত দফা অভিমত দেন। এরপর আপিলের ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।

Advertisement