Beta

সাক্ষী দিলেন তিন বাড়িওয়ালা, ‘জঙ্গিরা ছদ্মনাম ব্যবহার করত’

১৭ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:০২

আদালত প্রতিবেদক

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলায় তিনজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। ওই তিনজনই রাজধানীর তিনটি বাড়ির মালিক। জঙ্গি হামলার সঙ্গে জড়িতরা ওই তিনটি বাসায় অবস্থান নেয় বলে জানা যায়।

আজ বুধবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের আদালতে ওই তিনজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে আছেন জাহাজ বাড়ির মালিক মমতাজ পারভীন। অন্য দুই বাড়িওয়ালা হলেন রীনা সুলতানা ও আনোয়ারুল আজিম।

আনোয়ারুল সাক্ষ্য দিয়ে আদালতকে বলেন, ‘মিরপুর মধ্য পাইকপাড়া ১৫৯ নং আমার নিজের বাড়ি। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি হাসানসহ পাঁচজন আমার বাড়িতে থাকবে বলে ভাড়া নেয়। হাসানের সঙ্গে ইশতিয়াক আহমেদ, সুনীল রায়, রুবেল হোসেন এবং অজ্ঞাত আরো একজন ওঠে। তাদের তেমন কোনো জিনিসপত্র ছিল না। তারা ফ্লোরে থাকত। তাদের কাছে মাঝেমধ্যে যুবক বয়সের কিছু লোকজন আসত এবং অনেক সময় থাকত। আবার চলেও যেত। ওই লোকগুলো সম্পর্কে হাসানকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলত, তারা তাদের সঙ্গে লেখাপড়া করে। আবার কখনো বলত আত্মীয়। এভাবে তারা প্রায় পাঁচ মাস ভাড়া থেকে বাসা ছেড়ে দেয়।’

আজিম আরো বলেন, ‘কিছু দিন পর জঙ্গিরা গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায়। জঙ্গি হামলায় দেশি-বিদেশি অনেক লোক নিহত হয়। পাঁচজন জঙ্গিও সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত হয়। মিডিয়া এবং পুলিশের দেখানো ছবি দেখে চিনতে পারি আমার বাসায় যারা ভাড়া থাকত এবং যারা আসা যাওয়া করত তাদের মধ্যে জঙ্গিরা কেউ কেউ ছিল। পরে পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি, জঙ্গিরা আমার বাসায় ৪র্থ তলায় ভাড়া থেকে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিত। জঙ্গিরা ছদ্ম নাম ব্যবহার করে আমার বাসায় ভাড়া উঠেছিল। হাসানের প্রকৃত নাম রাকিবুল হাসান রিগ্যান বলেও জানতে পারি।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ এ সাক্ষ্যের বিষয়ে এনটিভি অনলাইনকে নিশ্চিত করেছেন।

ফারুক আহম্মেদ জানান, এছাড়া আজ আদালতে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ীর মালিক মমতাজ পারভীনও আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মমতাজ পারভীন সাক্ষ্যে বলেন, ‘২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাত ১২টার পর আমার বাসার পঞ্চম তলায় পুলিশ অভিযান চালায়। পঞ্চম তলায় বিভিন্ন ভার্সিটির ছেলেরা থাকত। আমি শুনেছি ওই অভিযানে ১১ জন ছাত্র মারা গেছে। পঞ্চম তলা থেকে রিগ্যান নামের একজন লাফ দেয়। আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে আটক করে। পরে পুলিশ একদিন আমার বাসায় এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে এ বাড়ির বাড়িওয়ালা কে।  তখন আমি অসুস্থ, দরজার এক পাল্লা খুলে বলি আমি বাড়িওয়ালা।’

তিনি বলেন, ‘এরপরে পুলিশ আমাকে বলে আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করব। আমাকে এরপরে থানায় নিয়ে যায়। থানায় আমার ওষুধের বক্সও নিয়ে যায়। বলে আপনাকে জিজ্ঞাসা করে ছেড়ে দেব। পরে আমাকে সাড়ে চার মাস জেলে রাখা হয়।’

অপরদিকে রিনা সুলতানা সাক্ষ্যে বলেন, ‘২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি চারজন ছাত্র আমার বাসায় ভাড়া ওঠে। তারা বাইরে খুব একটা বের হতো না। আমি একদিন তাদের বাসায় গিয়ে বলি তোমরা তোমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ছবি দেবে। আমি রাত ১১টার দিকে এসে দেখব তোমরা কী কর। দুইদিন পর গিয়ে দেখি ওরা চলে গেছে। এরপর পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি আমার বাসায় যারা ভাড়া ছিল তারা গুলশানের হামলার সঙ্গে জড়িত।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘এ মামলায় এ নিয়ে ৩১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। আগামী ২৪ এপ্রিল এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন আদালত।’

এদিকে আজ এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ উপলক্ষে কারাগারে থাকা ছয় জঙ্গিকে হাজির করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন- জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র‌্যাশ, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ও হাদিসুর রহমান সাগর।

গত ২৬ নভেম্বর আলোচিত মামলাটির বিচার শুরুর নির্দেশ দেন একই আদালত।

গত ২৩ জুলাই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর গুলশান হামলা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়। পরে অবশ্য হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস।

এ মামলায় অভিযোগপত্রে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন আসামি বিভিন্ন অভিযানে ও পাঁচজন হলি আর্টিজানে অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া জীবিত আটজনের মধ্যে ছয়জন কারাগারে এবং বাকি দুজন পলাতক। পলাতক দুই আসামি হলেন শহীদুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।

অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গি হলেন রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

এ ছাড়া বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানে নিহত আটজন হলেন—তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। হামলার পর রাতেই তারা ২০ জনকে হত্যা করে।

সেদিনই উদ্ধার অভিযানের সময় বন্দুকধারীদের বোমার আঘাতে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরের দিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজনের মৃত্যু হয়।

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির মুখপাত্র ‘আমাক’ হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে বলে জানায় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’।

এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। মামলার পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে দুই দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে, এ মামলায় কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে আটক রাকিবুল হাসান রিগ্যানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি এ মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

Advertisement