Beta

মায়ের জমানো টাকা হাতিয়ে নিতে অপহরণ নাটক!

০৭ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৪৩

মাসুদ রায়হান পলাশ
পুলিশী তদন্তের সময় গাজীপুরে রেক্সি মার্ক রোজারিও। ছবি : সংগৃহীত

রেক্সি মার্ক রোজারিও (৩২) কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। রাজধানীর গুলশানের শাহজাদপুরে মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। বিভিন্ন কারণে ১৪ লাখ টাকা ঋণ আছে তাঁর। আর সেই ঋণ পরিশোধ করতে মায়ের নামে ব্যাংকে থাকা ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে নিজের নামে অপহরণের নাটক সাজান। খিলগাঁও থানায় একটি অপহরণের মামলাও করেন। আসামি করেন অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনকে।

এরপর গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তে নামে খিলগাঁও থানা পুলিশ। টানা পাঁচদিন তদন্ত করে সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজসহ নানা আলামত ঘেটেও ঘটনার কোনো প্রমাণ পায়নি পুলিশ। পুরো তদন্ত মনিটরিং করেন খিলগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার মো. জাহিদুল ইসলাম সোহাগ। তদন্তের পর পুলিশ নিশ্চিত হয়ে যায়, এটি পুরোপুরি সাজানো নাটক!

তদন্ত শেষে রেক্সি মার্ক রোজারিওকে সত্য কথা বলার চাপ দেয় পুলিশ। চাপের মুখে অপহরণ নাটকের কথা স্বীকার করেন রেক্সি মার্ক। তবে পুলিশকে অযথা হয়রানি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ নষ্ট করায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছে খিলগাঁও থানা পুলিশ। এই পুরো ঘটনাটি জানিয়েছেন সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. জাহিদুল ইসলাম সোহাগ।

জাহিদুল ইসলাম জানান, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে রেক্সি মার্ক রোজারিও খিলগাঁওয়ের শেখের জায়গা নামক স্থান থেকে অপহৃত হয়েছেন বলে মুঠোফোনে তাঁর স্ত্রীকে জানান। স্ত্রীকে জানানোর পর তাঁর স্ত্রী গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর ১ মার্চ খিলগাঁও থানায় গিয়ে রোজারিও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর একটি অপহরণের মামলা করেন।

মামলার এজাহারে রেক্সি মার্ক রোজারিও জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে নিজ বাসা গুলশানের শাহজাদপুর থেকে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরের অফিসের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। সকাল সোয়া ৯টার দিকে খিলগাঁও থানাধীন নাসিরাবাদের শেখের জায়গায় আমিন গ্রুপের অফিসের সামনের রাস্তায় পৌঁছান। তখন একজন অজ্ঞাতনামা মোটরবাইক আরোহী তাঁকে বলেন, ‘আপনার নম্বর প্লেট খুলে পড়ে যাচ্ছে।’ বলা মাত্রই রেক্সি রাস্তার পাশে দাঁড়ান। এর পরই অজ্ঞাত পরিচয় চার-পাঁচজন তিনটি মোটরবাইক ও একটি মাইক্রোবাসে এসে তাঁকে ঘিরে ধরে। এরপর তাঁকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে ক্যাপ দিয়ে মুখমণ্ডল মুড়িয়ে নিয়ে যায়।

এজাহারে রেক্সি মার্ক রোজারিও আরো বলেন, এরপর অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আমার কাছ থেকে আমার স্ত্রীর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন স্ত্রীর কাছ থেকে। এরপর গাজীপুর শহরের ঝাঝর নামক স্থানে আমাকে নামিয়ে দেয়। নামানোর আগে গাজীপুর জেলার যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের এটিএম বুথ থেকে আমার কার্ড ব্যবহার করে টাকা তুলে নেয় অপহরণকারীরা। নামিয়ে দেওয়ার পর উল্লেখিত স্থান থেকে ১০০ থেকে ১৫০ গজ দূরে আমার মোটরবাইক দেখতে পেয়ে নিশ্চিত হই যে এটা আমার মোটরবাইক। পাশেই আমার মোটরবাইকের চাবি এবং মোবাইল ফোনসেট ফেলে রেখে তারা বিকেল ৪টার দিকে পালিয়ে যায়।

অপহরণ নাটকের কারণ

অপহরণের বর্ণনা যে নাটক ছিল সেটা সহকারী পুলিশ কমিশনার জাহিদুল ইসলাম সোহাগের কাছে স্বীকার করেন রেক্সি মার্ক রোজারিও। তাঁর বরাত দিয়ে জাহিদুল ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘রেক্সি মার্ক রোজারিও একজন জুয়াড়ি ও মাদকাসক্ত। ১৪ লাখ টাকা ঋণ আছে তাঁর। এদিকে তাঁর মা সরলা ক্লারা রোজারিওর ফিক্সড ডিপোজিট (স্থায়ী আমানত) আছে ১০ লাখ টাকা। এই টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন রেক্সি। মূলত মায়ের জমানো টাকা হাতিয়ে নিতেই তিনি এই নাটক সাজিয়েছেন। নাটক সাজিয়ে তিনি তাঁর মোবাইল নম্বর থেকেই স্ত্রীর কাছে ফোন করে অপহরণের কথা জানান। মুক্তিপণ না দিলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে বলেও স্ত্রীকে জানান রেক্সি। তিনি ভেবেছিলেন স্ত্রী তাঁর শাশুড়ির (রেক্সির মা) কাছে অপহরণের ঘটনা জানাবেন। কিন্তু রেক্সির বাবা অসুস্থ থাকায় স্ত্রী শাশুড়িকে না জানিয়ে জানান তাঁর অফিসের সহকর্মীকে। তখন অফিস থেকে রেক্সির ব্যাংক হিসাবে এক লাখ টাকা পাঠানো হয়। টাকা পাঠানোর ৩০ মিনিটের ভেতরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে রেক্সি জানান।’

সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘রেক্সি মার্ক রোজারিও হয়তো জানতেন না বা বুঝতে পারেননি আমরা এতটা সিরিয়াস অপহরণের বিষয়ে। তিনি মামলাও করতে চাননি। কিন্তু যখন সবাই এই অপহরণের কথা জেনে যান। তখন আর তাঁর মামলা না করার কোনো পথ ছিল না।’

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রেক্সি মিথ্যা মামলা দিয়ে রাষ্ট্রীয় টাকা অপচয় করিয়েছেন। আমাদের হয়রানি করিয়েছেন। আমি ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এই মিথ্যা ঘটনার পেছনে অনেক সময় নষ্ট করেছি। এতে অনেক প্রয়োজনীয় সময় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ হয়েছে। তার চেয়ে বড় কথা এটি করে তিনি রীতিমতো বড় অপরাধ করেছেন। তাঁর অসুস্থ বাবা ঘটনা জানলে তো মারাও যেতে পারতেন! এর জন্য রেক্সির শাস্তি হওয়া উচিত। দণ্ডবিধির ২১১ ধারা মোতাবেক আমরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আদালত তাঁর বিচার করবেন।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জুয়েল মিয়া এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘রেক্সি মার্ক রোজারিওর বাসা থেকে বের হওয়া, তাঁকে জোর করে গাড়িতে তোলা এবং অপহরণ থেকে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত তাঁর মুখের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী সব স্থানে আমি গিয়েছি। সব স্থানের সিসিটিভির ফুটেজ দেখেছি কিন্তু কোথাও এই অপহরণের ঘটনার প্রমাণ পাইনি। এ ছাড়া ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে তাঁর কথার মিল পাইনি অনেক সময়। নাটক সাজালে যা হয় আর কি। তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এসআই জুয়েল মিয়া বলেন, ‘রেক্সি আমাদের প্রচুর সময় নষ্ট করেছে। শুধু সময় নষ্ট নয়, কথিত অপহরণের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পাঁচ রাত ঘুমাতেও পারিনি, স্যারকেও (সহকারী পুলিশ কমিশনার জাহিদুল ইসলাম সোহাগ) ঘুমাতে দেইনি।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে এনটিভি অনলাইনের পরিচয় দিয়ে রেক্সি মার্ক রোজারিওর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আই অ্যাম নট রেডি টু টক টু ইউ অ্যাবাউট দিস। হু আর ইউ?’

Advertisement