জিয়া চ্যারিটেবল মামলা

যে ১০ কারণে কারা অভ্যন্তরের আদালতে আপত্তি

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:১৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলা কারাগার চত্বরে স্থাপনের পর দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রমে উপস্থিত হননি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষ এই আদালতের বিচারককে চিঠিতে জানিয়েছেন, তিনি আদালতে আর আসবেন না।

আজ বুধবার দুপুরে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার চত্বরে বসানো আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিনের কার্যক্রমে বিএনপির চেয়ারপারসনের পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে অনুপস্থিত থাকলেও আজ দুজন আইনজীবী মামলার কার্যক্রমে অংশ নেন এবং খালেদা জিয়ার জামিন বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেন।

আদালত খালেদা জিয়ার জামিন বৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার দিন রেখেছেন। এ দিন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম চলতে পারে কি না, সে বিষয়েও শুনানি হবে। আজ আদালত আরো জানিয়েছেন, এ মামলার আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান জামিনে থাকবেন।

আদালত দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে শুরু হয়ে সোয়া ১টা পর্যন্ত চলে। মুলতবি ঘোষণার আগে বিচারক ড. মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমার কাছে একটি চিঠি এসেছে। এতে খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি আর আদালতে আসবেন না।’ এ অবস্থায় প্রধান আসামির অনুপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম চলতে পারে কি না, সে ব্যাপারে আইনগত ব্যাখ্যা হাজির করার জন্য আসামিপক্ষের আইনজীবীদের নির্দেশ দেন আদালত।

খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া ও আমিনুল ইসলাম। এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কারা অভ্যন্তরে স্থাপিত আদালতে কেন তাঁদের আপত্তি সেই সম্পর্কিত ১০টি কারণ উল্লেখ করেন। কারণগুলো হচ্ছে-

১. যেহেতু জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকার বকসিবাজারে আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত আধাপাকা টিনসেড ভবনকে অস্থায়ী আদালত ঘোষণা করা হয় এবং ওই স্থানে মামলা পরিচালনার জন্য জনাব ড. মো. আখতারুজ্জামানকে স্পেশাল জজ নিয়োগপূর্বক গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

২. যেহেতু উপরোক্ত গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি থাকা অবস্থায় ওই এলাকায় নিরাপত্তার কারণ প্রদর্শনপূর্বক ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে কারাগারের প্রশাসনিক ভবন ৭ নম্বর কক্ষটিকে বর্তমান আদালত ঘোষণা করে মামলার বিচারকাজ পরিচালনার নির্দেশ জারি করা হয়।

৩. যেহেতু ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক পার হয়ে বর্তমান স্থাপিত আদালতে প্রবেশ করতে হয়।

৪. ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে বিপুল পরিমাণে কারারক্ষী সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন এবং ফটকটি সার্বক্ষণিক তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। সেই কারণে কারা কর্তৃপক্ষ তথা কারারক্ষীদের অনুমতি ব্যতীত অত্র আদালতে প্রবেশের সুযোগ নেই।

৫. মামলায় নিয়োজিত আইনজীবীদের কারারক্ষীদের অনুমতি নিয়েই প্রবেশ করতে হয়, সেই ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের অত্র আদালতে প্রবেশের কিংবা বিচারকাজ দেখা বা শোনার কোনোরূপ সুযোগ নেই।

৬. আদালতে প্রবেশের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ গজ দূরে আইনজীবীদের গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। সেই ক্ষেত্রে অত্র মামলার ভারি ফাইলপত্র এবং বই, পুস্তক ইত্যাদি বহন করে আইনজীবীদের পক্ষে আদালতে আসা সম্ভব নয়।

৭. আদালত কক্ষটি ১২ ফিট বাই ২৪ ফিট আয়তনের। এই ছোট্ট কক্ষে বিচারকের আসন, আইনজীবীদের বসার স্থান, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, সাক্ষী ও বিচার প্রার্থীদের বসার স্থানসহ আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইত্যাদি সবার একত্রে আদালত কক্ষে অবস্থান বিচার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কোনোভাবে সম্ভব নয়।

৮. এরূপ একটা কক্ষকে কোনোভাবেই উন্মুক্ত আদালত বলার অবকাশ নেই।

৯. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের আর্টিক্যাল ৩৫ (৩) এবং ফৌজদারী কার্যবিধি ৩৫২ ধারা মোতাবেক আদালত বলতে একটি উন্মুক্ত আদালতের কথা বলা হয়েছে, যেখানে যেকোনো পাবলিকের সাধারণভাবে প্রবেশের অধিকার থাকে। কিন্তু অত্র কক্ষটি সংবিধানের আর্টিক্যাল ৩৫ (৩) এবং ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৫২ ধারা মোতাবেক কোনো উন্মুক্ত আদালত নয় বা হতে পারে না। সেখানে পাবলিক তো দূরের কথা আসামিদের নিয়োজিত আইনজীবীরা, আত্মীয়স্বজন কিংবা দলীয় নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার দলীয় নেতা-নেত্রীদের প্রবেশ এবং আদালতের কার্যক্রম দেখা বা শ্রবণ করার কোনো সুযোগ নেই। আদালত কক্ষটি গুহার মতো স্যাঁতস্যাঁতে, এখানে স্বাভাবিক শ্বাস-নিশ্বাস নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। এই মামলার নিয়োজিত আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আদালত কক্ষে কিছু সময় অবস্থান করলে দমবন্ধ হওয়ার কারণ রয়েছে মর্মে আশংকা করা হচ্ছে।

১০. বেআইনিভাবে গঠিত অত্র আদালত ও বিচারিক কার্যক্রম স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় বরাবরে একটি আবেদন পেশ করা হয়েছে। এরূপ অবস্থায় আইন সম্মত আদালত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অত্র মামলার কার্যক্রম ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্থগিত রাখা আবশ্যক।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় মোট আসামি চারজন। খালেদা জিয়া ছাড়া অপর তিন আসামি হলেন—খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন মোট ৩২ জন। ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করা হয়।

গত ৪ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে মামলার কার্যক্রম খালেদা জিয়া যেখানে বন্দি আছেন, সেই কারাগার চত্বরে আদালত বসানোর তথ্য জানানো হয়। পরের দিন ৫ সেপ্টেম্বর মামলার কার্যক্রমে আইনজীবীরা না গেলেও খালেদা জিয়া হুইলচেয়ারে করে আদালতে আসেন।