Beta

প্রাথমিক তদন্তে কয়লা গায়েবের সত্যতা পেয়েছে দুদক

২৩ জুলাই ২০১৮, ১৮:৪৩

কয়লা গায়েবের ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত শেষে দুদকের দিনাজপুরের উপপরিচালক বেনজীর আহম্মেদ আজ সোমবার বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ছবি : এনটিভি

প্রাথমিক তদন্তে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা গায়েবের সত্যতা পেয়েছে দুনীতি দমন কমিশন (দুদক)। আজ সোমবার বিকেলে দুদকের দিনাজপুরের উপপরিচালক বেনজীর আহম্মেদ সাংবাদিকদের কাছে এ কথা বলেন।

কয়লা গায়েবের ঘটনা তদন্ত করতে আজ বেলা পৌনে ৩টার দিকে কয়লা খনি পরিদর্শনে যান বেনজীর আহম্মেদসহ অন্য কর্মকর্তারা। প্রাথমিক তদন্ত শেষে বেনজীর আহম্মেদ বলেন, বাস্তবে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে এখন ১ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন কয়লা থাকার কথা। কিন্তু আমরা পেয়েছি মাত্র দুই হাজার মেট্রিক টন। পুরো তদন্ত শেষে সত্যতা পেলে মামলা করা হবে।

ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে তিনি এই তদন্তে আসেন বলেও জানান বেনজীর। তিনি বলেন, এরই মধ্যে তদন্তে তিনি যা পেয়েছেন, তা প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়েছে।

কয়েকদিন আগে দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে এক লাখ ৪২ হাজার মেট্রিকটন কয়লা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে খনির ইয়ার্ডে প্রায় দেড় লাখ টন কয়লা থাকার কথা ছিল। কিন্তু মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার টন কয়লা থাকে। অর্থাৎ এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লার হদিস নেই। কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে বিষয়টি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পেট্রোবাংলাকে জানায়। তখনই কয়লা উধাও হওয়ার ব্যাপারটি প্রকাশ্যে আসে। কয়লা সংকটের কারণে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন। গতকাল রোববার রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে চালু থাকা একটি ইউনিটের কাজও বন্ধ হয়ে যায়।

কয়লা গায়েবের ঘটনায় এরই মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপমহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড সিরাজগঞ্জে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। বড়পুকুরিয়া খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পেট্রোবাংলার পরিচালক আইয়ুব খানকে।  পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আজকে আমরা এইখানে যে দুই-তিনশ শ্রমিক আছি, এবং আমাদের পরিবারসহ মোটামুটি সবাই আমরা একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। এই কারণে সরকার যত দ্রুত সম্ভব এই প্রকল্প চালু করবে এটাই আমাদের কাম্য।’

এছাড়াও আরেক কর্মী বলেন, ‘আমি এই তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক। আজকে দুর্নীতির কারণে এই প্লান্ট অফ হয়ে গেল। আমি মনে করি, সরকার যেমন মাদকের ওপর অ্যাকশান নিছে, তেমনি এই কয়লা খনির দুর্নীতিবাজের ওপরও অ্যাকশন নিক। এইটা আমি মনে করি। আজকে দুই-তিনশ শ্রমিক মনে করেন যে, বেকারত্ব অবস্থায় আছে। তাদের পরিবার নিয়ে টেনশনে আছে। এবং এলাকায় বিদ্যুৎ নাই। সরকার যেন কঠিনভাবে অ্যাকশন নেয়, এইটাই আমি আশা করি আরকি।’

এছাড়াও স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে এনটিভি অনলাইনের কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা বহুদিন থেকেই বলছি যে, এই কয়লা খনি দুর্নীতিগ্রস্ত, অনেক সমস্যায় জর্জরিত। এখানে কাশেম প্রধানিয়া নামে যে সচিব তাঁর একটা বিরাট সিন্ডিকেট আছে। এবং সেখানে তারা দুর্নীতির একটা আখড়া তৈরি করেছে। হাবিব এমডিসহ তাদের দুর্নীতির কথাটা এখানে প্রকাশ পায় না। কারণ এখানকার লোকাল প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করার কোনো ক্ষমতা এদের নাই। লোকাল লোক, সাংবাদিক এরা গেলে তাদেরকে এরা আটকে রাখে, ভেতরে যেতে দেয় না। এবং এখানকার সঠিক ইনফরমেশনটা আমরা নিতে পারি না। আপনারা দেখেছেন, অনেক সাংবাদিককে উনারা ঢুকতে দেয় না। যাই হোক, এখানে অনেক সিন্ডিকেট আছে। যার জন্য এরা কয়লা বিক্রি সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে, সব কিছুতেই এদের সিন্ডিকেট আছে। যে কথাটা আমরা অনেকদিন বলেছি সাংবাদিকদেরকে, কিন্তু বিষয়টা স্পষ্ট হয় নাই। এবার এক লক্ষ ৪০ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে বিষয়টা সবার কাছে, দেশের কাছে, মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। যে এখানে কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার জন্যেই আজকে এই কয়লা সংকট দেখা দিয়েছে।এর ফলে বন্ধ হয়ে গেছে আজকের পাওয়ার প্ল্যান্ট। দেশের ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে দেশ আজ বিপর্যস্ত। আমাদের কর্তৃপক্ষ, সরকারের উচিত এই দুর্নীতি খতিয়ে দেখা।’

কয়লা খনির আরেক শ্রমিক বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও টিভি মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়াতে বলছে তারা যে, তিন মাসের কয়লা স্টক আছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, যে এক লক্ষ ৪২ হাজার টন কয়লার কোনো হিসাব  পাওয়া যাচ্ছে না। এই কয়লার কারণে অলরেডি দুইটা পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়াতে লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে উত্তরবঙ্গে। আর যে একটা চলছিল কয়েকদিন আগে, সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা কোনো কয়লা পাচ্ছে না। তারা যে কয়লা লোপাট করলো, এর শাস্তি হওয়া দরকার।’

Advertisement