অমর মিত্রের গল্প : স্বদেশযাত্রা

৩০ আগস্ট ২০১৮, ১৫:২৫

একটা গোটা ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফিরছে যোগেন সাধু, মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ব্রাঞ্চ অফিসের ক্যাশবাবু। সিজনে এই প্রথম, বেশ বড়সড় দেখেই কিনেছে। এবার বাংলাদেশের মাছ আসছে না, কাগজে তাই পড়েছিল, কিন্তু তাদের আনতে হয়, বর্ষায় যদি পদ্মার ইলিশ না খাওয়া পরল তো মাছের ব্যবসা কেন?

মাছটি বেশ পছন্দ হয়েছে যোগেনের। ছুঁচোল মাথা, চ্যাটালো পেট, চকচকে রুপো রঙের ভিতরে আবছা লাল আভা ছড়িয়ে আছে। দেড় কেজি ওজন হলো। ডিম নেই গ্যারান্টি দিয়ে বলেছে ননী। কেটেকুটে দেবে বলেছিল মাছওয়ালা। যোগেন কাটতে দেয়নি, গোটা একটা ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফেরার মেজাজই আলাদা। তারপর এক কাপ চা নিয়ে ইলিশ কাটা দেখবে সে। তার বউ অণিমা মাছ কাটে চমৎকার, বিশেষত ইলিশ। অণিমা কাটামাছ পছন্দ করে না। নিজে না কুটলে মাছের স্বাদই পাওয়া যায় না, এই হলো অণিমার মত। ধারালো বঁটিতে আড়াআড়িভাবে মস্ত ইলিশটা ছুঁইয়ে আচমকা পেটের কাল থেকে দুখণ্ড করে ফেলায় আসল আনন্দ। কাঁচা ইলিশের গন্ধও কি কম মধুর! তেল, রক্তের মিশেল দেওয়া কাঁচা কাঁচা বুনো বুনো গন্ধটা যখন ওঠে দুখণ্ড করা মাছ থেকে, অণিমা বলে, ইলিশের সব ভালো— এমন কী আঁশও। আঁশ ছাড়াতে কী ভালোই না লাগে তার। এক এক সময় পঞ্চাশ-উত্তীর্ণ যোগেন তার চল্লিশ পেরুনো বউকে বলে, তুমি আর জন্মে মেছুনি ছিলে, অভ্যাসটা ছাড়তে পারোনি।

অণিমা রাগে না, হেসে বলে, মেছুনির কাছেই তো বেশি ভিড় বাবুদের, ঘিরে একেবারে ভন ভন করে, হ্যাঁ গো তেমন মেছুনি আর আছে? 
নাকে নোলক, পায়ে রুপোর গোড়, মোটাসোটা কালো-কোলা পান চিবোন মাসি? না, কোথায় তারা? কবে যে উধাও হয়ে গেল এই শহর থেকে! যোগেন আর বাজারে বড় একটা দেখতে পায় না। 
ফিরতে ফিরতে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়তে হলো যোগেনকে। তার মেছুনি বউয়ের মুখ হারিয়ে গেল মাথা থেকে, ইলিশের থলের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে যোগেন ডাকল, এ লছমন, লছমন রাম। 
ডাকল কেন লছমনকে? ওই তো ভোজপুরের লছমন রাম ময়লা তুলছে দুচাকার ঠেলাগাড়িতে। ঠেলতে ঠেলতে ডাস্টবিন, সেখান থেকে ধাপা। ধাপার মাঠে ছড়িয়ে যাবে ময়লা। কপি, পালং, ভুট্টা, ডাঁটা লকলকিয়ে উঠবে। তার ডাক বোধহয় শোনেনি লোকটা, বুরুশ দিয়ে ময়লা ঠেলে একজায়গায় জড়ো করছে। কী ধপধপে ধুতি-গেঞ্জি দ্যাখো। ময়লা সাফাই করে বলে পরিষ্কার কাপড় বেশি পরতে হয়, যোগেনে মনে হয় তা। আবার ডাকল যোগেন। এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতে পেয়ে বুরুশ ফেলে তার দিকে হেঁটে আসছে লছমন। কী বলবে যোগেন? ডাকার পর মনে হলো, না ডাকলেই হতো। কী দরকার? নিজে থেকে জানবে না হয়। সে জানাবে কেন? এড়িয়ে যেতেই তো পারত যোগেন। এ কী বলার মতো কথা? ভাবলেই গা শিরশির করে উঠছে এখনো। লছমনকে দেখে যোগেনের মুখে করুণার ভাব জেগে ওঠে।

লছমন রাম এসে দাঁড়িয়েছে যোগেন সাধুর সামনে। প্রায় বুড়ো মানুষটি চোখেমুখে সম্ভ্রম ফুটিয়ে তার সামনে ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়েছে। লছমন এইরকম।
খুব ভীতু মানুষ, তায় যোগেন আবার ক্যাশবাবু, যোগেনের হাতে তার বেতন মেলে। কিছুই জিজ্ঞেস করবে না সে যোগেনকে, যতক্ষণ না যোগেন কিছু বলে। যোগেন যদি কিছু না বলে আবার হাঁটতে আরম্ভ করে বাড়ির দিকে, লছমন জিজ্ঞেসও করবে না সাধুজি ডাকছিল কেন। সে ফিরে যাবে তার কাজে, বুরুশ দিয়ে ময়লা ঠেলতে থাকবে। তার কোনো কৌতূহলও হবে না যোগেন সাধু আচমকা ডেকে চলে গেল কেন। সুতরাং যোগেনের কাছে সুযোগ, সে চলে যেতে পারে। ডেকেছিল, কিন্তু কথা নেই বলে ইলিশ হাতে ফিরতে পারে বাড়ি। অথবা সে লছমনকে জিজ্ঞেস করতে পারে ইলিশটা কেমন? জবাব যোগেন পাবে না জানে, লছমন হাসবে, হেসে ঘাড় কাত করবে, অস্ফুট গলায় বলে উঠবে, হুজুর! তার কাছে যোগেন যে মতামত চাইছে তাই-ই যথেষ্ট, মতামত দেওয়ার সে কে? 

যোগেন ভাবল চলে যায়। কিন্তু কথাটা যে না বললেই নয়। লছমনের কাছেই জানা যেতে পারে ভোজপুরের আরো খবর, সে তো ভোজপুরেরই মানুষ। ভোজপুরের মানুষকে সে ভোজপুরের খবরটা জানাবে না? যোগেন সাধু হলো কৌতূহলী মানুষ, কত দিকেই না তার কৌতূহল। কত কথাই না সে জানতে চায়; যাচাই করতে চায়। যোগেন কথা বলে খুব বেশি, যোগেন কথা বলতে ভালোবাসে: গ্রামে স্থানীয় ভূমিহারা ভূস্বামীদের গুণ্ডবাহিনী, রণবীর সেনার হাঙ্গামার খবর সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছে। খবরটা জানাবে না লছমনকে? লছমন তো আজ না-হোক কাল জানবেই। সে জানালে কী আর ইতর বিশেষ হবে? বরং লছমনের কাছে কিছু শোনা যেতে পারে। হাতে এখন সময় অনেক, যোগেন একটু দেরি করে অফিস যায়। যায় কেন না সকলেই তেমন যায় বলে। যোগেন সাধু অফিসে গিয়ে করবে কী? এক ঘণ্টাদেড়েক বসে থাকতে থাকতে সে হাঁপিয়ে উঠবে নিশ্চিত। ঘণ্টাদেড়েক কথা না-বলা মানে, দম বন্ধ হয়ে আসবে যোগেনের। 
লছমন দাঁড়িয়ে আছে, যোগেন এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, আমার নোংরা গলিটায় আবার জল জমতে শুরু করেছে, কোথায় যে আটকে যাচ্ছে জল, দেখতে হবে, নর্দমা সাফ হয়েছে, লছমন? 
লছমন শুনল, ঘাড় কাত করল, খুব নিচু গলায় বলল, না হইনি সাধুজি। 
থাক, ওসব কথা থাক, কী যেন বলতে ডাকলাম? যোগেন ইতস্তত করে। কী বলতে ডেকেছে সে তা লছমন জিজ্ঞেস করুক। তা করবে না, সে কৌতূহল নেই। যোগেন গলা খাঁকারি দেয়, বিড়বিড় করে বলল, হ্যাঁ রে তুই দেশে যাবি কবে?
পঁচিশ তারিখ, ক্ষেতি কাম-হুজুর।
ক্ষেতি কাম, ছেলে আসছে? 
হুজুর। লছমন ঘাড় কাত করল। 
দেশের খবর পেয়েছিস?
হুজুর। 
যোগেন সাধু টের পায় ভোজপুরের খবর পৌঁছয়নি লছমনের কাছে। এত বড় খবর। তার জিভ সুড়সুড় করে ওঠে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিচুগলায় সে লছমনকে বলে, দেশে যেতে হবে না, তোর ভোজপুরে চাষবাস নিয়ে খুব হাঙ্গামা লেগেছে, খবর পেয়েছিস? 
লছমনের দুই ঘোলাটে চোখ স্থির। সে যেন ভয় পেয়েছে কথাটায়। তাকিয়ে আছে যোগেনের মুখে, আরো কিছু শুনতে চায়। ভয় আর বিস্ময়ে তার কৌতূহল বাড়লেও তা প্রকাশ করার অভ্যাস লছমনের নেই। যোগেন সাধু যতক্ষণ বলবে, সে শুনবে। শুনবে কিন্তু প্রতিক্রিয়া চেপে রাখবে যতটা পারে। এইভাবেই সে অভ্যস্ত। যোগেন দেখল লছমন ঘাড় তুলে আকাশে চোখ রেখেছে। এতটা সময় যোগেন সাধুর চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাও যায় না। ঘাড় হেঁট করে থাকলে সব কথা যেন শোনা যায় না। যোগেনও আকাশে তাকায়। 

মেঘ আসছে। মেঘে মেঘে ঘন কালো হয়ে উঠছে মাথার আকাশ। এবার মৌসুম আগেই এসে গেছে। এই মৌসুম-বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা মেঘ মানে বীজ, ফসল। বর্ষা এবার সময়ে নেমেছে, দক্ষিণের মেঘ ভেসে গিয়ে উত্তরের পাহাড়, হিমালয়ে বাধা পেয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে উত্তরবঙ্গ, আসাম। পাহাড় না পেরোতে পেরে উত্তরগামী মেঘ পশ্চিমে ফিরে উত্তরে-পশ্চিমে গঙ্গার উপত্যকা ধরে এগিয়েছে, নমেছে বৃষ্টি বিহারের মালভূমি অঞ্চলে। গঙ্গার দুইকূলের জমিতে নেমে পড়ছে মানুষ। রোপণ শুরু হওয়ার মুখে। মৌসুমী মেঘ রাজমহল, ভাগলপুর, মুঙ্গের, নীলদা, বৈশালী, পাটনায় বৃষ্টি নামাতে নামাতে পৌঁছে গেছে ভোজপুর। ভোজপুর থেকে তা যাত্রা করেছে আরো উত্তর-পশ্চিমে। লছমন আকাশ দেখতে দেখতে বর্ষা প্লাবিত কৃষিক্ষেত্রের কথা ভাবছে নাকি, ভাবছে দেশে ফেরার দিন এগিয়ে আনবে, না পিছিয়ে দেবে?

চাষের সময় তাকে দেশে ফিরতে হয়। ফসল তোলার সময়ও ফিরতে হয়। তখন কলকাতায় নেই মানে তার দেশে হয় চাষ লেগেছে, নতুবা ফসল উঠছে। তখন এখানে চলে আসে মহেন্দর, লছমনের বেটা। সে লছমনের হয়ে কাজ করে। বেআইনি, তবু এমনই হয়। মেনে নিয়েছে লছমনের সুপারভাইজার, সরকার। বদলে সে লছমনের কাছ থেকে মাসোহারা পায়। মাস বেতন থেকে কিছুটা লছমন তার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত যে তার নামে, তার অনুপস্থিতিতে, মহেন্দর কাজ করতে পারবে সাফাইয়ে। লছমন যাবে এই শ্রাবণের আরম্ভে, ক্ষেতি কাম করে ফিরবে ভাদ্রের শেষে, আবার যাবে অঘ্রাণের মাঝামাঝি, ফসল পাকার খবর পেলে। খবর মনে মনেই পেয়ে যায় লছমন রাম। অঘ্রাণ মাসে গিয়ে ফসল তুলে ফিরতে ফিরতে তার মাঘের শেষ বা ফাল্গুনের আরম্ভ। এইভাবেই চলছে। ক্যাশবাবু যোগেন সাধু সব জেনেশুনেও তার নামের বেতন তার ছেলেকে দেয় টিপসই নিয়ে। যোগেনের কাছেও তাই লছমন কৃতজ্ঞ। ইচ্ছে করলেই যোগেন তার বেতন আটকে দিতে পারে। চাকরিও খেয়ে নিতে পারে। অথচ যোগেন তা করে না, বিনিময়ে লছমনের কাছ থেকে এক পয়সাও নেয় না। যোগেন বলে, আমাদের ফ্যামিলি কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো, কতকালের ব্যবসা আমাদের, আমি না-হয় ব্যবসা না করতে পেরে কর্পোরেশনে ঢুকেছি, তাই বলে পারিবারিক আভিজাত্য নেই, সাফাইমজুর লছমনের কাছ থেকে আমি নেব টাকা! এত অভাব পড়ে গেছে নাকি?
আগের ক্যাশবাবু নিত, যোগেন নেয় না। নেয় না বলেই লছমন যোগেনকে ভয় করে। যোগেন তা বোঝে। লছমন জানে, যোগেন ইচ্ছে করলেই তার অনুপস্থিতিতে তার বেতন বন্ধ করে দিতে পারে, চাকরি খেয়ে নিতে পারে। সে যখন দেশে যায়, কতবার যে অর্ধসমাপ্ত কথা বলে গেছে যোগেনকে হুঁজুর, সাধুজি, হামি ভোজপুর চলি, ক্ষেতি কাম—।
যোগেন শোনে, কোনো মন্তব্য করে না।
সাধুজি, মহেন্দর হামার কাম—।

যোগেন দেখে বাপের পিছনে সদ্য ভোজপুর থেকে আসা মহেন্দরের মুখ। মুখে ভোজপুরের ধুলো বাতাস লেগে। মাসখানেক এই শহরে থাকলে তা উবে যাবে। যোগেন তখন খবর নেয়। ওই দেশের, এ মহেন্দর, খবর সব ভালো?
মহেন্দর হাসে, হুঁজুর, ভালো।
ভূমিহার রাজ চলছে?
মহেন্দর হাসে, হাঁ সাধুজি।
মহেন্দরের বয়স বছর পঁচিশ। এর ভিতরে তিন সন্তানের জনক। সে তার বাবার মতো অতটা মুখচোরা নয়, কথা বলে একটু আধটু। জিজ্ঞেস করলে চুপ থাকে না, খবর দেয়। কিন্তু যোগেন যখন জিজ্ঞেস করে, চাষের সময় সে থাকে কেন দেশে, বুড়ো বাপকে ওখানে পাঠিয়ে সে চলে আসে কেন কলকাতায়? মহেন্দরের মুখে তখন আবছা অন্ধকার। যোগেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনেছে, রোয়া-কাটাইয়ের সময় লছমন দেশে না থাকলে কাজই হবে না, মহেন্দর থাকলে ধান ঘরে উঠবে না, জমিতে নামাই যাবে না। 
যোগেন সাধু বলল, মহেন্দর কবে আসছে? 
আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে লছমন বিড়বিড় করে, এক্কিশ তারিখ। 
যা তুই কাজে যা। যোগেন পা বাড়াল। ইলিশ নিয়ে দাঁড়ান যায় না বেশি সময়। কথাটা বলে দিয়েছে, এখন যা করার করুক লছমন। হনহন করে হাঁটে যোগেন।

যোগেনের মেছুনি বউ ইলিশ কাটতে পেরে খুব খুশি। তাকে ডাক দিচ্ছে, দেখে যাও কী রক্ত, ডিমও আছে পেটে । 
রাস্তার ধারের ঘরে খাটের ওপরে চায়ের কাপ নিয়ে যোগেন কাগজটা আবার দেখছিল। ভোজপুরের বাথানিয়াটোলার খবর ডিটেল ছেপেছে। খবরের কাগজের লোক পারে বটে, ঠিক চলে গেছে ওখানে। বাথানিয়াটোলার চাপা কান্না— পর পর শায়িত মৃতদেহের ছবিও ছেপেছে। অণিমার ডাকে যোগেনের পাঠভঙ্গ হলো, সে বলল, ডিম তো থাকার কথা নয়। 
রয়েছে, দেখে যাও, ডিমভরা ইলিশ, ইস কী সুন্দর গন্ধ! 
কাঁচা ইলিশের গন্ধেই যোগেনের বউ চনমন করে উঠেছে। এখন বাড়িতে যোগেন আর অণিমা।

মেয়েকে ভোরবেলা স্কুল বাসে তুলে দিয়েছে যোগেন। সে কাগজ রেখে চায়ের কাপ হাতে কলতলার দিকে এগোল, অণিমার ডাকে এমন মাদকতা আছে যে এখনো যোগেনের মাথা ঘোরে, আচমকা সে গরগর করে ওঠে। হাতে রক্ত মেখে অণিমা হাসছে, ডিম দেখছি! যোগেন বলল, ঠকাল ননী। 
ঠকালো কোথায় গো, কী সুন্দর মাছ, খুব তেল আছে। 
ডিমঅলা মাছে স্বাদ থাকে না। বলেই চমকে ওঠে যোগেন। গা শিরশির করে উঠে যে কেন তা যোগেন ধরতে পারে না। বাথানিয়াটোলার খবরটি মনে পড়ে গেল। অণিমাকে বলবে? মেয়েরা খুন হয়েছে বেশি। এক প্রেগন্যান্ট মহিলাকে ধর্ষণ করে গলা কেটে—। না, না ওসব ওকথা অণিমা শুনবে কেন? অণিমা তার কথায় হাসছে, দুখণ্ড মাছের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। রক্ত গড়িয়ে পড়েছে বটির ধারালো গা দিয়ে কলতলায়। তিন আঙুল দিয়ে ডিম বের করতে করতে অণিমা বলল, ডিমঅলা মাছও তো ছাড়ো না, তোমাকে আমি খুব জানি, পাজি!

 যোগেন দাঁতে ঠোঁট কাটে। জবাব দেয় না। কাগজ পড়ার পর থেকে জিভটা সুড়সুড় করছে। কথা না বললে পারে না, কিন্তু অণিমাকে কথাটা বলতে ভয় হচ্ছে। কেমন যেন লাগছে! কেন যে ইলিশ আনতে গেল আজ? দেখে এমন হলো। নতুন ইলিশ! আচ্ছা সে এসবই ভাবছে কেন, কী হয়েছে তার? কাগুজে খবর তো খবরই। তাই তো হয়। অণিমা শুনলে আর একপ্রস্থ রাগ করবে, সক্কালবেলায় আর কথা পেলে না, জমাদার, মেথরকে মাইনে দিতে দিতে যত নোংরায় তোমার চোখ।

কচু শাক ওঠেনি, ইলিশের মাথা দিয়ে রাঁধতাম। দু’হাতে ধরে মাথাটা দুখণ্ড করতে করতে রক্তমাখা হাতে অণিমা আবার বলল, কী তেল! 
যোগেন চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে যাবে। বাথানিয়াটোলার খবর তাকে টানছে। তার মনে হলো জানালায় কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। আলো আড়াল করেছে সে, তাই ঘর যেন অন্ধকার হলো একটু। নাকি মেঘ আরো ঘন হয়েছে। ঘরে ঢুকে যোগেন দেখল তার অনুমান সঠিক। জানালার ওপারে বিপন্ন মুখ। লছমন এসে দাঁড়িয়েছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে খাটে উঠে যোগেন হাসে, কী হলো?
হুঁজুর, সাধুজি। এখন যোগেনকে বুঝে নিতে হবে কী বলতে চায় লছমন। কথা না বলে বলে এমন হয়েছে ওর যে কী কথা বলবে তাই-ই ঠিক করতে পারে না। ওর ছেলে মহেন্দর এরকম নয়। মহেন্দর কথা বলে। বলে বলেই নাকি চাষের সময় দেশে থাকতে পারে না। ওর দেশে কথা বললে কাজ হয় না। হরিজন যত চুপ করে থাকবে তত নিরাপদ। ক্ষেতি কামে ফি-বছরই তো ঝুটঝামেলা লেগে থাকে। তাদের দু’বিঘা চাষ জমি আছে ধানের, বাকি যা পেয়েছিল মহাত্মা বিনোবা ভাবেজির ভূদানে চল্লিশ বছর আগে, তা টাঁড়, পাথুরে জমি, ঘাসও হয় না সেখানে। ভূমিহার রাজপুত, জমিনদারের কাছে হাতজোড় করে বিনোবাজি গরিব আদমির জন্য ওই জমি পেয়েছিলেন।

দু’বিঘে চাষ জমি ভূমিহার রাজা দশরথ সিংজির দাদাজি, ঠাকুদার মাখখন সিংজি দিয়েছিল মহেন্দরের ঠাকুর্দা চিটা রামকে হরসাল কাম কাজ করার জন্য। ও জমি দানের। ও জমি চাকরান সম্পত্তি। চাকরের পেটভাতা। বিনা খাজনায় ভোগের কিন্তু বদলে বেগার কাম করতে হবে। এখন ও জমির খাজনা আছে। সরকার নেয়। জমিদার খাজনা পায় না, কিন্তু চাকরান জমি বলে বেগার তো দিতে হয়ই। আইন যা হোক, ভোজপুরে এমন রীতি।

যোগেন সাধুর কত কৌতূহল! অবাক হয়ে সে চাকরান জমির কথা শুনেছে। আগে যেমন হতো, এখনো তেমন, ভূমিহার রাজের কাম করে দিলেই তবে চাষে নামা যায়।
লছমন ডাকে, হুঁজুর, সাধুজি। 
কী হলো লছমন? 
ভোজপুর—! লছমন কথা শেষ করে না অভ্যাসে। 
হ্যাঁ, ভোজপুরে রণবীর সেনা, আরে তোর দেশের লোকের নিজস্ব আর্মি আছে, কী জায়গারে লছমন, শুনেছিস কিছু? 
হুঁজুর! লছমনের চোখ পশ্চিমগামী মেঘের ছায়া ধরে। 
বিপদে পড়েছে যোগেন সাধু। কী কুক্ষণেই যে বলতে গিয়েছিল ভোজপুরের কথা! এখন তাকে বলতে হবে সব। চোখ ছলছল করছে লছমনের। টের পেয়ে গেছে। কখন তার দেশে জল নামবে তা যেভাবে টের পায় কলকাতার আকাশ দেখে, সেইভাবেই বোধহয়। আন্দাজ করেছে সবই হয়তো। যোগেন বলল, কিছু না, নকশালদের সঙ্গে লড়াই হয়েছে রণবীর সেনার, কী দেশ রে, জমির মালিকরা সেনাবাহিনী পোষে, রাইফেল স্টেনগান নিয়ে তারা খতমে বেরোয়, আইন নেই?
লছমন জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁপছে, কী হলো হুজুর? 
সবটা জিজ্ঞেস করতে ভয় পাচ্ছে লছমন । ভয় না হতেও পারে, হয়তো অভ্যাসে। কথা শোনা তার দেশ গাঁয়ের অভ্যাস, কথা বলা নয়। এই শহরে এসে তা বদলায়নি এতটুকুও। যোগেন বলে, ভোজপুর তো একটু জায়গা নয়, তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? 
হুঁজুর!

যোগেন বলে, কুড়ি টাকা করে মজুরি ঠিক হয়েছিল, তা মানবে না মালিক, এই যা কাগজে লিখেছে, ও লছমন বাথানিয়াটোলা জানিস? 
লছমন জানালার গরাদ ধরে ফেলেছে। যোগেনের চোখে বিভ্রম। গরাদ মুঠিতে ধরা লছমন রামকে আচমকা তার খাঁচাবন্দি মনে হয়। লছমনের পিছনে মেঘে ঢাকা পৃথিবীর ময়লা আলো, আকাশ, দূরে গাছগাছালির সবুজ, তবু যোগেনের বিভ্রম যায় না। সে উঠে নিজের ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেয়। লছমন গরাদে মুখ ঠেকিয়ে আছে। 
যোগেন বলে, যা, কিছু হয়নি, কাম কর, আমার বাড়ির পিছনের ময়লা গলিটা দেখিস তো।
লছমন বলে, আদমি মরা গিয়া?
সে তো মরবে।
হুঁজুর, গাঁওটা কী হলো?
ধীরে ধীরে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে লছমন রাম। বাথানিয়াটোলা বলে যোগেন অতি কষ্টে হাসে, ভোজপুর কত বড় জায়গা, কলকাতার বালিগঞ্জে ঝামেলা হলে এই টালায় কিছু বোঝা যায়?
লছমন রাম ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছে, হামার লেড়কির শ্বশুরঘর!
গায়ে রোঁয়া কাটল যোগেনের। কী বলছে লছমন? এমনও হয়? এতটা মিলে যায়? মেলে না বলেই তো জানে যোগেন। ভোজপুরে গণহত্যা হয়েছে, তার সঙ্গে ভোজপুরের লছমন রামের কোনো যোগ থাকবে না, এই তো স্বাভাবিক। তেমনই তো হয়ে থাকে, যোগেনের অভিজ্ঞতা তাই বলে। কলকাতা শহরেও তো কম ঘটনা ঘটে না, তার সঙ্গে যোগেনের কোনো যোগাযোগ থাকে? কলকাতায় বাস অ্যাকসিডেন্ট, পুলিশের গুলিতে, পার্টিতে পার্টিতে বোমা বাজির কারণে মানুষ তো মরে প্রায়ই। কলকাতার আশেপাশে মরে। কিন্তু যোগেনের চেনা, যোগেনের কোনো স্বজনআত্মীয় মরেছে ওইসব ঘটনায়? মরেনি। এত যে রেল দুর্ঘটনা, বিমান দুর্ঘটনা, কেউ মারা গেছে? শোনেনি যোগেন। সে খবরের কাগজ পড়েই খালাস। কাগুজে উত্তেজনা নিয়ে কদিন কাটিয়ে খালাস। হ্যাঁ, পঁচিশ বছর আগে, নকশাল আমলে তার দুই সহপাঠীর লাশ বেলেঘাটার রাস্তায় পড়েছিল ভোরবেলায়। পুলিশ আগের রাত্রে বাড়ি থেকে তুলেছিল তাদের। তখন কত মৃত্যু! পুলিশ না গুনে লাশ ফেলেছে এখানে ওখানে। সেই প্রথম যোগেন দেখেছিল যে চেনা মানুষও মরে ওভাবে। কিন্তু সে কতকাল আগের কথা! ভুলেই গেছে যোগেন তার সহপাঠীদের মুখ। আর তাদের ওপর তার যে খুব টান ছিল একথা কেউ বলতে পারবে না। নিবিড় বন্ধুত্ব ছিল না বলেই তো যোগেন এতদিন বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। মৃত সেই দুজন ছিল খুব অহংকারী, তাদের কথা যোগেন বুঝত না। সুতরাং সেই মৃত্যুও স্বজনের মৃত্যু নয়। তারপর তো সব শূন্য।

যোগেন অবাক হয়ে লছমন রামের দিকে তাকিয়ে আছে। এভাবে যে মিলে যাবে তা তার কল্পনাতেও আসে না। এভাবে কি মিলতে পারে? কতবড় ভোজপুর, তার ভিতরে ধূলিকণার মতো একটা গাঁ বাথানিয়াটোলা, সেখানেই কি না লছমনের মেয়ের শ্বশুরঘর! একে একে দুই হচ্ছে যে সব। যোগেন ভাবে, তার সামনে, গরাদের ওপারে কি তার মৃত সহপাঠীদের কেউ এসে দাঁড়াল? গা কাঁপছে যোগেন সাধুর। যে কাগুজে উত্তেজনা পোহানো তার অভ্যাস, সেই কাগজে যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। পুড়ে যাচ্ছে গা।
গরাদে মাথা ঠোকে লছমন, সাচ বাত হুজুর। 
সাচ বাত মানে বাথানিয়াটোলায় লছমনের মেয়ে সংসার করতে গেছে। কিন্তু বাথানিয়াটোলা কি ভোজপুরে একটা? আর নেই? কথাটা জিজ্ঞেস করতে যাবে যোগেন তো শুনল, লেড়কির খবর এসেছিল হুজুর, মহেন্দর গেল মাহিনায় চিঠিটি পাঠাল।
কী চিঠি? জিজ্ঞেস করতে হবে না যোগেনকে। সে টের পেয়ে যায় বিবাহিত কন্যার খবর পেয়েছিল লছমন। কী খবর আসতে পারে। হ্যাঁ তাই, লছমন বলছে, তার লেড়কির বাচ্চা হবে কার্তিক মাসে। সে এবার গিয়ে বিশ মাইল পশ্চিমে নাথানিয়াটোলা থেকে মেয়েকে ঘরে আনবে ক’দিনের জন্য। ক্ষেতি করে মেয়েকে শ্বশুরঘরে রেখে কলকাতা ফিরবে তাড়াতাড়ি, তারপর কার্তিক মাসে, ফসল পেকে ওঠার আগেই চলে যাবে। বড় পেয়ারের লেড়কি তার। বাচ্চা হওয়ার সময় তার বউকে পৌঁছে দেবে ওখানে। নিজেও থাকবে। মনে মনে সব ঠিক করে রেখেছে লছমন।

শুনতে শুনতে যোগেন সাধু অবাক হচ্ছিল। যে লছমন কথা বলে না, সেই লছমন গড়গড় করে বলে যাচ্ছে সব। আর তার নিজের কথাই গেছে বন্ধ হয়ে। লছমন বলছে, তার ছেলে লিখেছিল মজুরি নিয়ে খুব ঝামেলা শুরু হয়েছে এবার তার গাঁও সুরজপুরে ভি।
যোগেন বলল, তোর জামাই তো নকশাল করে না?
লছমন নিশ্চুপ। যোগেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। লছমনের দু’চোখ দিয়ে জল ঝরে যাচ্ছে। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। যোগেন ওঠে। উঠতে উঠতে ভাবে, তার কথাটা কি ঠিক হলো? কে নকশাল, কে নকশাল না, তা দেখে তো মানুষ মারেনি ভূস্বামীদের প্রাইভেট আর্মি। নকশালদের ওপর রাগ মেটাতে সাধারণ নিরীহ মানুষ মেরে গেছে। তাদের অপরাধ, তারা আগের মতো থাকতে চাইছে না। তারা আর হুজুর মা বাপ বলে বিনা মজুরিতে শ্রম দিতে চাইছে না। তাদের নাকি এসব শেখাচ্ছে নকশাল পার্টি। বাথানিয়াটোলায় যখন হাঙ্গামা হয় পুরুষেরা গাঁয়ে ছিল না, তারা কাজে গিয়েছিল। রণবীর সেনা মেয়েদের মেরেছে, ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে, শিশুদের সেই আগুনে জীবন্ত পুড়িয়েছে, বুড়োদের মেরেছে। হাতের কাছে যাদের পেয়েছে মেরেছে, ধর্ষণ করেছে গর্ভবতী বধূকে। সব কাগজের খবর। হত্যা করে তারা উল্লাস করতে করতে ফিরেছে। যোগেন আর কিছু ভাবতে পারছিল না। সে দাঁড়াতে চায় না লছমন রামের সামনে, বলে, উঠি, স্নান করতে হবে, অফিস না গেলে কি চলবে?

কথাটা বলে যোগেন ঘর থেকে বের হয়ে আসে। এ ঘর, ও ঘর বাড়ির সর্বত্র এখন সুস্বাদু ইলিশের গন্ধ মেঘের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইলিশের গন্ধ যেন তার ঘর ছাড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে চলে গেছে। ভাজা ইলিশের গন্ধ নিতে নিতে যোগেন একবার ঘুরে তাকায়, লছমন জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গন্ধটা তাকেও যেন মোহিত করেছে। যোগেন শেভিং সেট, তোয়ালে, শ্যাম্পু, সাবান নিয়ে স্নানের উদ্যোগ নেয়। অণিমা তাকে জিজ্ঞেস করে, কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
লছমনের সঙ্গে।
জমাদার? ডাকো ডাকো, গলিটা সাফ করতে বলো, জল আটকে রয়েছে কদিন ধরে।
যোগেন বলল, আজ থাক।
থাকবে কেন, দেখছ না কী রকম বর্ষা নামছে, মাগো! কী নোংরা ওদিকটা। অণিমা চট করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো লছমনকে ডাকতে ডাকতে, জমাদর অ্যাই জমাদার, কই নেই তো।
যোগেন চুপ করে থাকে। লছমন বোধহয় অণিমার ডাক শুনেই চলে গেছে, নাকি তার আগেই? সে জানালা দিয়ে রাস্তা দেখে, নেই লোকটা। অণিমা রাগ করে, পালিয়েছে, এমন চালাক যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না, আজ বাথরুম পায়খানাও পরিষ্কার করেনি।
যোগেন বলে, পরে আসবে হয়তো।
আর এসেছে। অণিমা গজগজ করতে থাকে, এখন আমাকে ওসব করতে হবে, বাথরুমটা কী পিছলা হয়েছে, কোন দিক দেখব আমি।
যোগেন বাথরুমের দিকে হাঁটল। একটু সাবধানেই না-হয় পা ফেলবে। দাড়ি কামিয়ে স্নান শেষ করতে তার আধঘণ্টা যাবেই, বেশি তো কম নয়। স্নানবিলাসী মানুষ সে, মাসে ছয় খানা সাবান একাই ক্ষয়ে ফেলে।

ইলিশের স্বাদ জিভে নিয়ে যোগেন অফিসে চলল। সঙ্গে খবরের কাগজটা নিল। আজ তেমন কাজ নেই। পেমেন্টের দিন তো নয়। এদিন সে ক্যাশবুক সারে। তার ক্যাশ পেমেন্টের জায়গা জালে ঘেরা খাঁচা। খাঁচায় বসেছে যোগেন বড় খাতা নিয়ে। কিন্তু মন কি বসে? চঞ্চল হয়েছে যোগেনের সর্বাঙ্গ। খবরের কাগজটা মেলে ধরেছে খাতার ওপর। একই খবর আবার পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক উত্তেজনা থেকে থেকে জেগে উঠেছে যোগেন সাধু। সিগারেটের পর সিগারেট ধরাচ্ছে। কাগজ বন্ধ করছে, আবার খুলছে। একবার ঢেকুর উঠল ইলিশের। গন্ধটা পেল যোগেন। আশ্চর্য! এ কখনো হতে পারে? এমন অভিজ্ঞতা তার কখনো হয়নি। খবরের কাগজের খবর মিলে যাবে তার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে, এ কেমনভাবে হতে পারে? যোগেন যে ভাবতেই পারে না অতদূর ভোজপুরে গণহত্যায় হত মানুষের স্বজন তার খুব চেনা। জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে প্রতিদিনই কথা বলে সে। লছমনের মেয়ের বিয়ে হয়েছে বাথানিয়াটোলা গাঁওয়ে। তার মেয়েও সন্তান ধরেছে পেটে। জন্ম দেওয়ার জন্য শিহরিত হতে হতে অপেক্ষা করছিল এক মধুমাসের জন্য। কার্তিকেও তা মধুমাস ছিমনের কাছে, তার কন্যার কাছে। এত মিল হয় কীভাবে? আচ্ছা, তার মেয়ের নাম কি ফুলমোতিয়া দেবী, যাকে হত্যা করেছে ভূমিহার জোতদারের সেনাবাহিনী?

যোগেনের তো মনে হয় এইসব দুর্ঘটনায়, হত্যাকাণ্ডে, ভূমিকম্পে, বন্যায় যারা মরে তারা বোধহয় কারো চেনা মানুষ নয়। তারা কারো স্বজন নয়, পুত্র নয়, পুত্রী নয়, পিতা নয়, মাতা নয়। তারা যেন স্বয়ম্বু। খবরের কাগজের রিপোর্টাররাই শুধু চেনে তাদের। গণহত্যায়, দাঙ্গায়, বানে, বন্যায় মরার জন্য, ধর্ষিতা হওয়ার জন্য, পোকার মতো আগুনে পুড়ে মরার জন্য কিছু মানুষের জন্ম হয় এই পৃথিবীতে। এই তাদের কাজ। তাদের সঙ্গে যোগেনের অতি পরিচিত লছমন রামের সম্পর্ক এত নিবিড় হবে কেন?

যোগেন কথাটা তুলতে চায়। কেউ শোনে না। শুনলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। যোগেনের সহকর্মীরা কেউই প্রাত্যহিক রসালো গল্পের ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে চায় না। সিনেমার নবীন নায়ক-নায়িকা, তাদের নানা কেচ্ছা, টিভি সিরিয়াল, ক্রিকেট নিয়ে গল্প করতে করতে কে শুনবে ভোজপুরের খবর? শুনে তারা করবে কী, আলোচনা কি এগোবে? তারা যে ভোজপুরের কোনো খবরই রাখে না। যোগেন যদি বলে তাদের ওয়ার্ডের সাফাই মজুরের মেয়ের বিয়ে হয়েছে ওখানে, তাতেও তারা বিচলিত হয় না, বলবে, এদিক থেকে তাড়া খেয়ে এদিকে গিয়ে জুটেছে নকশাল পার্টি, এমন তো হবেই।

যোগেন একা হয়ে যায়। কখনো তার মনে হয়। লছমন রাম ঠিক বলেনি। হতেই পারে না। লছমন কেন মিথ্যে বলবে তা যোগেন খুঁজে বের করতে পারে না। নানারকম ভাবছে যোগেন সাধু। ভোজপুরের যে খবর সে পেয়েছিল গেল শীতে, ফসল কাটার সময়ে মহেন্দরের কাছ থেকে তা মনে পড়ে যায়। সে জানে কেন লছমনকে চাষের সময়, ফসল কাটার সময়, ফসল তোলার সময় দেশে যেতেই হবে। এই বর্ষার ক'দিন বাদে শহর ভেসে যাবে। ভোজপুর থেকে আসা মহেন্দর যখন রাস্তার ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে জলে দাঁড়িয়ে জল সাফ করতে থাকবে তখন তার বাবা লছমন রাম ছ’মাস বাদে দেশে ফিরে ভূমিহার রাজ দশরথ সিংহের পায়ে একশো টাকার নোট রেখে, মাথা ঠেকিয়ে চাকরান জমিতে নামার অনুমতি চাইবে। চাকরান সম্পত্তি, তাই অনুমতি এখনো চাইতে হবে। লছমনের বাবা চাকর হয়েছিল মাখখন সিংহের কাছে। তার ফাইফরমাশ খাটত, কোঠি সাফ করত, ক্ষেতি জমিনে বেগার দিত, ভূমিহাররাজের পিছে পিছে হাঁটত, নয়া লেড়কি নিয়ে বাবু ফুর্তি মারলে দরজার বাইরে লাঠি নিয়ে বসে থাকত— এইজন্যই তো জমি পাওয়া। চাকরান জমি কত আছে? যে মুচি জুতো দিত তার জন্য জমি দিত ভূমিরাজ, যে লোক হাতিঘোড়ার দেখভাল করত, তাকেও জমি দিয়েছিল মাখ্খন সিংহ। এখন তাদের নামে, বাবা লছমন রামের নামে তবু বেগার দিতে হবে, চাকর খাটতে হবে। ভোজপুরের যা আইন সব ভূমিহাররাজের। সরকার নেই। পুলিশ নেই। সরকার, পুলিশ ভূমিহাররাজের আইন মানে।

মহেন্দর সব বলেছে একটু একটু করে। সে দশরথ সিংহের ফরমান মানে না, বেগার কাম করতে চায় না, তাই তার বাবাকে যেতে হয়। সে থাকলে চাষের জমিতেই নামতে পারবে না তারা। দশরথ সিংহ তাকে নকশাল বলে। মহেন্দর নকশাল চেনে না, কিন্তু তাদের কথা শুনেছে এর ওর মুখে। আরা টাউনের কাছে নকশাল পার্টি ঢুকে পড়েছে। এ গাঁ ও গাঁয়ে। মহেন্দর এক-একবার ভাবে তার গাঁও সুরজপুরে নকশাল পার্টিকে টেনে আনে। দশরথ সিংহ একবার তাকে নকশাল বলে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। খুব পিটাই করেছিল পুলিশ। শেষে বাবা লছমন রাম খবর পেয়ে দেশে ফিরে ভূমিহাররাজের পায়ে মাথা ঘষে তাকে খালাস করেছিল। একবার তার বাবা লছমনকে ধরে জুতো পিটাই করল দশরথজি, মহেন্দর তখন কত ছোট। আবছা মনে পড়ে। শুনেছে তারপর থেকে বাবা লছমন দশরথজির পা ধরে ফসল বোনা, ফসল কাটাই করে। চাকরান জমি, চাকর হয়ে থাকতে তো হবেই। চাকর না হয়ে থাকলে, সিংজি ফসল কাটাইয়ের সময় জমিনে দশটা ভৈষ ছেড়ে দিয়ে ফসল নষ্ট করে দেবে। কে কী বলবে? দরকারে ঘরের লেড়কি টেনে নিয়ে যাবে কোঠিতে, কে কী বলবে?

বেগার দিলে তবে হরিজন জমি চাষতে পারে, হরিজনের ঘরের ‘বহু, লেড়কি’র মনে শান্তি থাকে। 
যোগেনের সব মনে পড়ে যাচ্ছিল। মহেন্দরের কাহিনি সে গল্পের মতো করে তার বউ অণিমাকেও শুনিয়েছে। কাগুজে খবর যেভাবে শোনায়, সেইভাবে শুনিয়েছে। শুনতে শুনতে অণিমা হাই তুলে বলেছে, সব মিথ্যে, এমন হতে পারে নাকি, মহেন্দরটা খুব চালাক, কাজ না করার ফন্দি এসব, ওকে বলে দিয়ো প্রত্যেকদিন যেন গলি নর্দমা, বাথরুম সাফ করে, সেফটি ট্যাঙ্কটা লিক করেছে কেন কাল দেখে দিতে বলো তো। 

সত্যি, যোগেনেরও তো মনে হতো এসব রঙ চড়ানো গল্প। যেমন সিনেমায় হয়, তেমনই গল্প। জমিদারি আর আছে নাকি? মগের মুলুক! মহেন্দর একটু ঠেটা ছেলে। ডিউটির কাজ ছাড়া কিছুই করতে চাইত না। শুধু যোগেন সাধুর হাতে বেতন মেলে বলে, তার কাজটা মাথা নামিয়ে করে দেয়। লছমন তো বলেই, সে মরে গেলে জমি থাকবে না, আর কাউকে চাকরান দেবে ভূমিহাররাজ। 
সাধুজি হুঁজুর। 
যোগেন চমকে তাকায়, জালের ওপারে বুড়ো লছমন রাম। 
হুঁজুর সাধুজি! 
যোগেন উঠল। খাঁচামুক্ত হয়ে দ্রুত বের হয়ে এল। উত্তেজিত হয়েই আছে সে। তার গায়ে কখন যে কী জন্য রোঁয়া কাটে, জিজ্ঞেস করে, তোর বেটা মহেন্দর নকশাল? 
অবাক হয়ে যায় লছমন, মাথা ঝাঁকায়, নেহি হুজুর, নকশাল না হই, সব ঝুটা বাত। 
আয় বাইরে আয়। যোগেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে ডাকতে বেরিয়ে এল অফিস চত্বরের বাইরে, খবর পেলি, ও লছমন কেউ কিছু বলল? 
লছমন রাম হাসে, বলল, হুজুর সব ঠিক হই। 
ঠিক আছে! যোগেন অবাক, কী ঠিক? 
হামার বাথানিয়াটোলায় হাঙ্গামা হয়নি হুঁজুর সাধুজি, সুগরিবজি বলল। 
কে সুগরিবজি? 
দামাদের গাঁও বাথানিয়াটোলার পাশের গাঁও আন্ধারপুরের ভূমিহাররাজ চন্দেশ্বর সিংজির বেটা সুগরিব সিংজি, ভূমিহার হই, কলকাতার পোলিস হই, সল লেক পোলিস লাইনে আছে, ওনার কাছে চলি গেলাম, উনি বলল একথা, হামার ভোজপুরে তিন বাথানিয়াটোলা আছে হুজুর।

কী আশ্চর্য ঘটনা! যোগেন সাধুর নিজস্ব ধারণা, এতকাল ধরে লালিত কল্পনা আবার থিতু হচ্ছে। তাই তো হবে। এতকাল তাই-ই হয়েছে। যোগেন সাধুর বিশ্বাস হয় লছমন রামের কথা। এক নামে পাঁচ জায়গা থাকতেই পারে। এই তো টালার বেলগাছিয়া, আবার হাওড়ায় রয়েছে বেলগাছিয়া। যোগেন সাধুর যে জমি আছে ক্যানিং লাইনে, মৌজার নাম সীতাকুণ্ডু, একই নামের গ্রাম যোগেন সাধু বানতলা পেরিয়ে পেয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। তার নিজের তত্ত্ব প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার যোগেন সাধু কেমন হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। সিগারেট ধরিয়ে মৌজ করে টান দিল। টান দিয়ে লছমনের কথা শুনতে থাকে, লছমন বলছে, তার জামাইয়ের গ্রাম বাথানিয়াটোলায় যদি হাঙ্গামা হতো তো সুগরীব সিংহকে কলকাতায় পাওয়া যেত না। সে কলকাতায় বসে থাকত না। মানুষ খুন করবে কে? ঘরবাড়ি জ্বালাবে কে, কারা? যারা এসব করে তারা নানা জায়গায় পুলিশ, বিএসএফ, রেল পুলিশ-এ ঠিক করে। ভূমিহার, রাজপুত, কুর্মিরা যদি হরিজন, চামার, দুসাদের গাঁ জ্বালাবে ঠিক করে তো খত্ চলে যায় পঞ্জাব, ইউপি, বঙ্গাল, ওড়িশা, গুজরাট, মহারাষ্ট্রে। তারা সব উর্দি ছেড়ে ছুটি নিয়ে ভূমিহার, রাজপুত, কুর্মি যাদব হয়ে ফিরে যায় গাঁওয়ে। গাঁওয়ে ফিরে সবাই যে যার রণবীর সেনা, ব্রহ্মর্ষি সেনা, কুঁয়র সেনা, লোরিক সেনায় ঢুকে পড়ে। সুগরীব সিংহ যখন যায়নি, তখন তার জামাইয়ের গ্রামে হাঙ্গামা হয়নি, কিন্তু...।
কিন্তু কী?
সুগরিব সিংজি ফরমান দিল হুঁজুর, হাঙ্গামা হবে, খত্ এলেই সে চলে যাবে ছুট্টি নিয়ে।
কেন যাবে?
বহুৎ নকশালি উঠা হুজুর, হামার দামাদ বেগার দেয় না, ভূমিহাররাজের কোঠি সাফ করে না, তার পাও-এ শির লাগায় না, ওদিককার সব গাঁও এমন হয়ে যাচ্ছে, সমঝে দেবে ভূমিহাররাজ, হামার বেটার কথা ভি বলল সুগরিবজি।
মহেন্দর?
হাঁ, হুঁজুর, মহেন্দর যে কোনো সালে বেগার দেয় না, তা জানে সুগরিবজি, বিশ মাইল তফাতে থেকেও জানে মহেন্দর ভূমিহাররাজের পাও-এ শির লাগায় না, সব ভূমিহার সব ভূমিহারের খবর জানে হুঁজুর, সুগরিবজি বলল, মহেন্দর ভি খুন হয়ে যাবে তেমন করলে। বহু বাচ্চা সাফ হয়ে যাবে মজরির কথা উঠালে, কেউ বাঁচাতে পারবে না।

যোগেন সাধু তো জানে, কোন মানুষ মরে দাঙ্গায়, গণহত্যায়। জানে বলেই লছমনের এসব কথা তাকে স্পর্শ করছে না। যোগেন সাধু সকাল থেকে ধন্ধে ছিল। কীভাবে তার কল্পনা মিথ্যে হয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে। যোগেনের চা পিপাসা পেয়েছে। সে অফিস কম্পাউন্ড ছেড়ে বি.টি. রোডের দিকে পা বাড়ায়। আকাশের মেঘ এখন গঙ্গার উজানে উজানে ভারতবর্ষের দিকে যাত্রা করেছে, গঙ্গার কূল ধরে উত্তর পশ্চিমে এগিয়ে আরো বৃষ্টি নামাবে সে কৃষিক্ষেত্রে। খরাপীড়িত মাটি আকাশের দিকে চেয়ে আছে এখন। বীজ নিয়ে চাষি বসে আছে মেঘের অপেক্ষায়। যোগেন আকাশ দেখে আবার মাটিতে চোখ নামায়। তার পাশে লছমন রাম রয়েছে, ঈষৎ ন্যুব্জ তার দেহটি। লছমন রাম কথা বলেই যাচ্ছে, যোগেন জানে লছমনের ভয়ের কারণ অমূলক। যোগেনের কল্পনা তেমনই। তার ধারণা এত স্পষ্টভাবে মিলে যাবে তা সে ঘণ্টাখানেক আগেও ভাবতে পারেনি। বিশ্বাস টাল খেয়ে যাচ্ছিল। এখন তো যোগেন বুঝতে পারছে লছমনের গাঁও সুরজপুরে গণহত্যা হলেও সে আলাদা কোনো গাঁও হবে, যেমন হয়েছে বাথানিয়াটোলা। যেসব গ্রাম, গঞ্জ গণহত্যার সাক্ষী হয়, সেইসব গ্রামগঞ্জ যেন এই পৃথিবীর অংশ নয়, এই ভারতবর্ষের মানচিত্রের ভিতরে নেই। এইসব গ্রামগঞ্জ যেন গণহত্যা, গণধর্ষণের জন্য সৃষ্ট। কিছু মানুষ যেমন হতো হতে জন্মায়, ধর্ষিতা হতে জন্মায়, সন্তানহারা হয়ে কাঁদার জন্য জন্মায়, কিছু গ্রামগঞ্জও যেন ক্রমাগত রক্তপাতের জন্য পড়ে থাকে আকাশের নিচে। অনন্ত রক্তপাতের জন্যই সেইসব গ্রাম পত্তন করেছিল এই পৃথিবীর মানুষ কোনো এক দূর অতীতে। ফলে ওইসব মানুষের সঙ্গে যেমন, গ্রামগঞ্জগুলির সঙ্গেও এই ভারতবর্ষের মানুষ যোগেন সাধুর কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না। কোনোক্রমেই না। যেমন গড়ে ওঠেনি ভাগলপুর, অরোয়াল, জাহানাবাদ, সুরাট, লাতুর, মুম্বইয়ের সঙ্গে, যেভাবে অচেনা থেকে যাবে বাথানিয়াটোলা, ভোজপুর, সেইভাবেই আগামী দিনের সুরজপুর, আন্ধারপুর আরো এক বাথানিয়াটাটোলা।

হুঁজুর সাধুজি, হাম ক্যা করে, হামি ভোজপুর চলি ।
সে তো পঁচিশ তারিখ, মহেন্দর এলে তো যাবি। 
নেহি হুঁজুর, হামি আজই চলি ভোজপুর। 
কখন? 
রাত মে টিরেন হই হুজুর, গাঁও গিয়ে ভূমিহার রাজের জমিনে মহেন্দরকে দিয়ে বেগার কাম করাই, ওর শির ভূমিহার রাজের পাওয়ে লুটাই দিই, দামাদকে বলি মজরির কথা না উঠাতে, বেগার দিতে বলি। 
সত্যি বলছিস? 
হ্যাঁ হুজুর, হামি ভোজপুর চলি, ক'দিন হামি থাকবে না, মহেন্দর থাকবে না, বেতন কি পুরা মিলবে ও মাহিনায়?
যোগেন সাধু জিজ্ঞেস করল, তোর ডিউটি?
হামার ডিউটি রামু করে দিবে, হামি তো ওর ডিউটি করে দিয়েছি যখন ওর বাপ মরে গেল দেশে, সরকার সুপর জানে হুঁজুর, হামি বলে এসেছি, পাম্মিশন মিলে গেল, লেকিন বেতনের কথা বলতে পারল না, আপনি বেতন দিবেন, পুরা বেতন কি মিলবে হুঁজুর, ও হপ্তায় মহেন্দর এসে যাবে।
কেউ থাকিবি না? 
নেহি হুঁজুর, সুগরিব সিংজি বলল, খত। চিঠি এলেই ছুটি নিয়ে গাঁও চলি যাবে, বহুত নকশালি উঠা হুঁজুর, সাধুজি।
যোগেন কী বলবে ঠিক করতে পারে না। এরকম হয়, হয়ে থাকে। ভিন প্রদেশী মানুষ নিয়ে কাজ করতে গেলে এইসব অভিজ্ঞতা নিত্যনৈমিত্তিক। উঠল বাই তো কটক যাই। বাই উঠে গেলে কে আটকায়? হাওয়া আসে যেন আচমকা। সেই হাওয়ায় ভেসে যায় এরা। দেশ-গাঁ বউ ছেলেমেয়ের মুখ মনে পড়লে ছুটতে ছুটতে ট্রেনে গিয়ে ওঠে। স্নান নেই, খাওয়া নেই; বগলে পুটলি নিয়ে হাওড়া স্টেশন। যোগেনের মাসতুতো ভাই অদীশ থাকে সম্বলপুর। রেলের চাকরি। সে যে আচমকা কতবার চলে আসে। বলে, আছি বেশ আছি, চলছে, বেশ চলছে, তো একদিন সকালে আচমকা মনে হলো বাড়ি যাই, যেই না মনে হওয়া আর কে আটকায়– উঠল বাই তো কলকাতা যাই।

আচমকা ইলিশগন্ধী ঢেকুর ওঠে যোগেনের। আর তাতেই অণিমার মুখ। মনে পড়ে গেল সব। এখন ক’টা বাজে, তিনটে। আর কতক্ষণ? সন্ধ্যেবেলায় তো লছমনকে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে ঘুরতে হবে টিকিটের জন্য কিন্তু কাজটা কী হয়েছে? 
যোগেন জিজ্ঞেস করল, নর্দমাটা দেখেছিস, আমার বাড়ির পিছনে নোংরা গলি? 
লছমন চোখ পিটপিট করছে, নেহি তো হুজুর, সক্কাল থেকে টায়েম হলো না। 
আমি তাহলে নোংরায় থাকব? 
হুঁজুর সাধুজি । 
কাজ না করে দেশে চলে গেলে বেতন মিলবে কি না বলতে পারব না, তোমার সরকার তোমাকে বাঁচাতে পারবে না, লজ্জাও করে না তোর, এতবার বলছি! 
হুঁজুর! লছমন রাম হাত জোড় করে। তার মুখে আর কথা নেই। কথা যা বলছে যোগেন সাধু। সে তো লছমনের বেতন থেকে টাকা নেয় না, শুধু মাঝেমধ্যে বাথরুম ইত্যাদি ময়লা গলি সাফাই, তার জন্য যদি টাকা চায় লছমন দেবে। 
হুঁজুর! লছমন ঘাড় হেঁট করে হাঁটতে লাগল। বৃষ্টি এল। বৃষ্টির ভিতরেই লছমন রাম যাত্রা করল, না ভোজপুরের দিকে নয়, আপাতত যোগেন সাধুর গৃহাভিমুখে।