Beta

ভারত থেকে মালয়েশিয়া, কোথায় কেমন আছে রোহিঙ্গারা

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২১:০৬

অনলাইন ডেস্ক
মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের কয়েকজন। ছবি : রয়টার্স

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর ‘জাতিগত নিধনের’ নৃশংসতায় নড়েচড়ে বসেছে সারা বিশ্ব। সম্প্রতি এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীটির ওপর অত্যাচার মাত্রাছাড়া আকার নিলেও, অনেকদিন ধরেই কিন্তু মিয়ানমার ছাড়ছে রোহিঙ্গারা। স্ব-ভূমি থেকে বিতাড়িত এই মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন দেশে। প্রাণে বাঁচতে নিজ দেশ ছাড়লেও ভিনদেশে কিন্তু খুব একটা ভালো নেই রোহিঙ্গারা।

গত কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি দেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। সেখানে কেমন দিন কাটছে দেশ থেকে বিতাড়িত এই মানুষগুলোর, তা প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি প্রোগ্রেস। চলুন দেখে নেওয়া যাক একনজরে :  

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ার জাতিসংঘের নথিভুক্ত রোহিঙ্গা রয়েছে মোটামুটি ৫৬ হাজার রোহিঙ্গা। এ ছাড়া হিসাবের বাইরে দেশটিতে বসবাস করছে আরো ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় কোনো কাজের সুযোগ পায় না। কারণ দেশটির আইনে শরণার্থীদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

মালয়েশিয়ায়  রোহিঙ্গারা বসবাস করে বিভিন্ন বস্তি ও ঘিঞ্জি এলাকায়। দু-মুঠো খাবার জোগাড় করে থাকেন এমন সব কাজ যেগুলো মালয়েশিয়ার বাসিন্দারা সাধারণত করে না। তবু মিয়ানমারে প্রতিমুহূর্ত মৃত্যুর ছায়ায় বেঁচে থাকার থেকে মালয়েশিয়াকে অনেক নিরাপদ মনে করছে তারা।

বিভিন্ন কাজের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়াতে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি ইউএনএইচসিআর কার্ডের অধীনে রোহিঙ্গাদের সস্তা কর্মক্ষেত্রে হায়রানির হাত থেকে বাঁচানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে ওই উদ্যোগ তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি বলে অভিযোগ ওঠে।

নেপাল

খাতা-কলমের হিসাবে ২০১২ সালে থেকে মিয়ানমারে শুরু হয় রোহিঙ্গা নিধন। তখন থেকে কমবেশি ২৫০ জন রোহিঙ্গা নেপালে আশ্রয় নেয়। দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডুর কাছেই ‘রামশকল’ শরণার্থী শিবিরে বাস করছে তারা। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় তাদের।

শিবিরটিতে ছোট্ট একটি ঘর রয়েছে। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার আগে সেখানে কোরআন শিখতে যায়। ফাঁক পেলে রোহিঙ্গা পুরুষরাও জড়ো হন সেখানে। মিয়ানমার থেকে ফোন, টেলিভিশন ও রেডিওতে পাওয়া আত্মীয়দের খবর নিয়ে চলে তাদের আলোচনা।

নেপালে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা দিনমজুর হিসেবে কাজ করে। অনেকেই আবার রাজমিস্ত্রি ও বিভিন্ন জিনিসপত্র মেরামত করে দিন চালায়। দেশটিতে তাদের সম্মুখীন হতে হয় ভাষা সমস্যার। অনেকেই অভিযোগ করেছে, ঠিকমতো মজুরি দেওয়া হয় না তাদের। এ ছাড়া নিজ দেশের প্রতি একটা টান তো আছেই।

তবে অনেক রোহিঙ্গা জানিয়েছে, স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংস্থা বাড়ি বানাতে টিন ও বাঁশ দিয়ে সাহায্য করে তাদের। ভালো-খারাপ মিলিয়ে নেপালে বেশ শান্তিতেই আছে তারা।

ভারত

ভারতে রোহিঙ্গাদের অবস্থা অতটাও ভালো না। দেশটির বর্তমান বিজেপি সরকার এরই মধ্যে দেশটিতে বসবাসকারী ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে হুমকি দিয়েছে।

ভারতজুড়েই ছড়িয়ে আছে রোহিঙ্গারা। তবে এদের মধ্যে মাত্র ১৬ হাজার ৫০০ জন জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার নথিভুক্ত।

প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ নিয়ে বেশ সচেতনভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত সপ্তাহে মিয়ানমার ভ্রমণে যান তিনি। সেখানেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি।

পরবর্তী সময়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয় রোহিঙ্গাদের নিয়ে শঙ্কিত ভারত। এ ছাড়া রোহিঙ্গা নিধন বন্ধের আহ্বান জানানো হয় মিয়ানমারের প্রতি।

এদিকে গত মাসেই ভারত সরকার দেশটি থেকে রোহিঙ্গাসহ শরণার্থীদের বের করে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এ প্রস্তাবের পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে যুক্তি দেখাতে বলেছেন। আদালতের রায় সরকারের পক্ষে গেলে দেশটিতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের বেশ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ভারতের জম্মু রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে করুণ জীবনযাপন করছেন ছয় হাজার রোহিঙ্গা। ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় জানিয়েছে, সরকারের কাছ থেকে শরণার্থীদের বের করে দেওয়ার অনুমতি পেলে ‘রোহিঙ্গাদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হবে’।

দিল্লি, হায়দরাবাদসহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী রোহিঙ্গারাও একই ধরনের শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হামিদুল হক নামের এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমি সরকারকে বলব আমাদের হত্যা করেন, তবু মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেবেন না। এখানে অন্তত মৃত্যু হলে আমাদের কবর দেওয়া হবে।’

মিয়ানমারে চলছে সহিংসতা

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গাদের’ সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে। এ ঘটনার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। সেখান থেকে পালিয়ে আসার রোহিঙ্গাদের দাবি, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গ্রামের পর গ্রামে হামলা-নির্যাতন চালাচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

মিয়ানমার সরকারের বরাত দিয়ে জাতিসংঘ গত ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, মিয়ানমারে সহিংসতা শুরুর পর গত এক সপ্তাহে ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৭০ জন ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’, ১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, দুজন সরকারি কর্মকর্তা এবং ১৪ সাধারণ নাগরিক।

মিয়ানমার সরকারের আরো দাবি, ‘বিদ্রোহী সন্ত্রাসীরা’ এখন পর্যন্ত রাখাইনের প্রায় দুই হাজার ৬০০ বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এখনো রাখাইন রাজ্যে থাকা মুসলিমদের মধ্যে মাইকে প্রচার চালাচ্ছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

Advertisement
0.78429102897644