Beta

রাজশাহীতে এত সাপ কেন, উপায় কী

১০ জুলাই ২০১৭, ২২:০৮

রাজশাহী মহানগরীর বুধপাড়া, তানোরের এবার দুর্গাপুরে বিষাক্ত গোখরা সাপ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ১৮৩টি গোখরা সাপ মিলল।

আজ সোমবার দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার দুই বাড়িতে ৩১টি গোখরা সাপ এবং ৯০টি ডিম পাওয়া যায়। ৩১টি গোখরার মধ্যে ৩০টি বাচ্চা সাপকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। ডিমগুলোও ভেঙে ফেলা হয়েছে। একটি বড় আকারের সাপ ধরে নিয়ে গেছেন সাপুড়ে।

হঠাৎ করে রাজশাহী অঞ্চলে বসতবাড়িতে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। গবেষকরা বলছেন, কৃষি জমি সম্প্রসারণের কারণে সাপের নিরাপদ আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। সেচের কারণে মাটি ভেজা থাকায় এবং প্রচুর বৃক্ষরোপণের কারণে পরিবেশ ছায়া সুশীতল থাকছে। ভূ-প্রকৃতির এই পরিবর্তনের কারণে ডিমপাড়ার জন্য মানুষের ঘরমুখী হচ্ছে এই সরীসৃপ প্রাণী।

গত ৪ জুলাই রাজশাহী মহানগরীর বুধপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাজদার আলীর বাড়িতে ২৭টি গোখরা সাপের বাচ্চা মারা হয়। এর পরের দিন ওই বাড়িতে পাওয়া যায় আরো একটি সাপের বাচ্চা। এর দুই দিন পর তানোর উপজেলার ভদ্রখণ্ড গ্রামের কৃষক আক্কাস আলীর রান্নাঘরে মেলে ১২৫টি গোখরা সাপের বাচ্চা। পাওয়া যায় ১৩টি সাপের ডিম। সাপগুলোকে পিটিয়ে মারা হয়, ডিমগুলোও ধ্বংস করা হয়।

সাপের উপদ্রবের ব্যাপারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এম খালেকুজ্জামান বলেন, শহর কিংবা গ্রাম বলে কোনো কথা না, কম-বেশি সবখানেই সাপ আছে। সাপেরা সাধারণত ঝোপঝাড়ের ভেতর ইঁদুরের গর্তে ডিম পাড়ে। কিন্তু প্রতিনিয়ত ঝোপঝাড় কমছে। ফলে সাপেরা বসতবাড়ির ইঁদুরের গর্তে গিয়ে ডিম পাড়ছে।

এম খালেকুজ্জামান বলেন, তাঁরা গবেষণা করে দেখেছেন- মিলনের পর পুরুষ সাপ অন্য জায়গায় চলে যায়। আর মা সাপ গর্তে গিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম দেওয়া শেষ হলে সেও অন্য কোথাও চলে যায়। ৬০ দিন পর সাপের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এর এক সপ্তাহ পর বাচ্চা সাপগুলোর খোলস বদল হয় এবং চোখ ফোটে। এর পরই প্রায় সব সাপ একসঙ্গে গর্ত থেকে বের হতে শুরু করে।

রাবি শিক্ষক আরো বলেন, সাপ মানুষকে প্রচণ্ড ভয় পায়। কিন্তু বাধ্য হয়ে তারা মানুষের বাড়িতে গিয়ে ইঁদুরের গর্তে ডিম পাড়ছে। তিনি বলেন, সাপ যেকারো বাড়িতে থাকতেই পারে। তবে সাপ নিজে আক্রান্ত না হলে কাউকে কামড় দেয় না। সাপের আতঙ্ক থাকলে বাড়িতে কার্বলিক অ্যাসিড রাখা যেতে পারে। এতে বাড়িতে সাপ যাবে না।

সাপ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে গবেষণা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক আবু রেজা। তিনি বলেন, কৃষিজমিতে সেচ এবং বৃক্ষরোপণের কারণে রাজশাহী অঞ্চলে সাপের বিচরণ বেড়েছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছর থেকে বন্যার পানিতে ভারত থেকে ভেসে এসে রাজশাহীর চরাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল রাসেল ভাইপার (চন্দ্রবোড়া) নামের একটি বিষাক্ত সাপ। সাপটি এখন মানুষের আবাসস্থলে ঢুকে পড়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক আ ন ম আমিনুর রহমান বলেন, সাধারণত মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গোখরা সাপের প্রজনন মৌসুম। এই সময়ে এদের বেশি দেখা যায়। মাটির ঘরে, বিশেষ করে চুলার পাশে একটু উষ্ণ থাকে বলে রান্নাঘরের আশপাশে থাকতে এরা পছন্দ করে। এ ছাড়া রান্নাঘর বা মাটির ঘরে ইঁদুরের গর্ত থাকে। এই গর্তগুলোয় সাপেরা তাদের প্রিয় খাদ্য ইঁদুর শিকার করতে আসে। পরে এসব গর্তেই তারা বাসা করে ডিম দেয়।

অনেক দিন ধরেই নিজের বাড়িতে সাপ সংরক্ষণ ও পালন করছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার যুবক বোরহান বিশ্বাস রোমন। বুধপাড়ায় মাজদারের বাড়িতে ২৭টি সাপ মেরে ফেলার পরের দিন তিনি ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন। খুঁজেছিলেন আর কোনো জীবিত সাপ আছে কি না। তবে তিনি কোনো সাপ পাননি।

সাপগুলো মেরে ফেলায় মর্মাহত রোমন। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীর বাঁচার অধিকার আছে। এতগুলো সাপের একসঙ্গে মৃত্যু দেখে খুব খারাপ লাগছে। সাপগুলো দেখার পর আমরা যারা সাপ নিয়ে কাজ করি তাদের খবর দেওয়া যেত। আমরা সাপগুলোর জীবন বাঁচাতে পারতাম। বাড়ির লোকজনকেও নিরাপদে রাখতাম। যেভাবে সাপ মারা হয়েছে সেটাও একটা ঝুঁকি।’

রাজশাহীর সহকারী বন সংরক্ষক এ কে এম রুহুল আমিন বলেন, গত তিন বছরে রাজশাহীসহ সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে রাসেল ভাইপার ও গোখরা সাপ অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অচিরেই তারা জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেবেন। এতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে বলে মনে করেন বনবিভাগের এই কর্মকর্তা।

Advertisement
0.91121792793274