Beta

ছুটির দিনে

২৮৫ টাকায় দুই ঘণ্টায় মিনি কক্সবাজারে

০২ এপ্রিল ২০১৭, ১৬:৩৮ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০১৭, ১৮:৪০

তানভীন আহমেদ ফাহাদ

ঢাকার খুব কাছেই নবাবগঞ্জ, দোহার উপজেলার, কার্তিকপুরে, মৈনটঘাটের অবস্থান। নগরজীবনের ব্যস্ততা ও কর্মব্যস্তময় টানা সপ্তাহ কাটানোর পর একটু প্রশান্তির  জন্য  প্রকৃতির খুব কাছ  থেকে  পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউ উপভোগ ও নৌকায় ভ্রমণ করতে  চাইলে  আপনি ঘুরে আসতে পারেন পরিবার, বন্ধুবান্ধবসহ  মৈনটঘাট থেকে। পদ্মার অপরূপ বিস্তীর্ণ জলরাশি এবং নদীর বুকে জেলেদের সারি সারি নৌকার  ছুটে চলা   দেখলে মনে হবে আপনি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অবস্থান করছেন।

মৈনটঘাটের কিছু কথা

এই মৈনটঘাটের কথা  আগে তেমন কেউ জানত না। এখন ভ্রমণপিপাসু সকল পর্যটকদের মুখে মুখে মৈনটঘাটের নাম শোনা যায়। বর্তমানে জনপ্রিয় পর্যটন স্থানে পরিণত হয়েছে মৈনটঘাট। খুব সকালবেলা আসলে দেখতে পাবেন পদ্মার বুক থেকে সারারাত ধরে জেলেদের ধরা ইলিশ মাছসহ বিভিন্ন প্রকার মাছের বাজার। আপনি চাইলে সেই তরতাজা টাটকা মাছ কিনতেও পারবেন।

মৈনটঘাটের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করবার উপযুক্ত সময় হলো বর্ষাকাল।তবে শুকনা মৌসুমেও এর সৌন্দর্যের কমতি নেই। চিরচেনা সেই উত্তাল পদ্মা দেখা না গেলেও এখন দেখা যাবে পদ্মা নদীর শান্ত রূপ। সন্ধ্যায় পদ্মার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করলে আপনার মৈনটঘাটে আসা সার্থক মনে হবে। মূলত এ কারণেই হয়তো অনেকে মৈনটঘাটকে মিনি কক্সবাজার বলে থাকেন।

মৈনটঘাটে কীভাবে আসবেন

ঢাকা শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকেই গুলিস্তান যাওয়ার সরাসরি বাস পেয়ে যাবেন। গুলিস্তানের গোলাপ শাহর মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনটঘাটের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ছেড়ে যায় যমুনা পরিবহন। ভাড়া জনপ্রতি ৯০ টাকা । ঢাকা থেকে বাসে মৈনটঘাট যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।

এ ছাড়া ঢাকার বাবুবাজার ব্রীজ এর গোড়া থেকে  কদমতলীর উদ্দেশে  লোকাল সিএনজি নিয়েও যাওয়া যায় । জনপ্রতি ১৮০-২০০ টাকা ভাড়া। কার্তিকপুর বাজার পর্যন্ত আসে । এরপর অটোরিকশাতে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়ায় সোজা মৈনটঘাট। রিকশায় গেলে ২০ টাকা। প্রাইভেট কার বা মাইক্রো বা বাইক নিয়েও যাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কদমতলী থেকে নবাবগঞ্জের রুট ধরে টিকরপুর-গালিমপুর হয়ে দোহারের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন।

আর ব্যক্তিগত বাহন হলে তো আপনার স্বাধীন মতোই চলে যেতে পারবেন। আর যদি কেউ একেবারে ব্যাকপ্যাক ভ্রমণ করতে চান তাহলে ২০০-৩০০ টাকায়ও ঘুরে আসা সম্ভব মৈনটঘাটে থেকে। মৈনটঘাটে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রো পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা আছে।

মৈনটঘাটে যা দেখবেন

বাস বা গাড়ি থেকে মৈনটঘাটে নেমে কিছু সময় নিয়ে একটু ঘুরে নিতে পারেন মৈনটঘাটের পরিবেশ ও সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণে। আমার মনে হয় সময়ের অভাবে যারা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যেতে পারেন না তাদের একবার হলেও এই জায়গায় আসা দরকার। এত সুন্দর জায়গাটার বর্ণনা লিখেও হয়তো সেভাবে বোঝানো যাবে না।

এখানে খোলা চরের নানান জায়গায় বনজ ঘাসও আছে। মনে হয় সুনিবিড় একটি স্থান। ফরিদপুরের চর ভদ্রাসনে- সময় কাটানোর পর বেশ ফ্রেশ লাগবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

ঢাকার পাশে হওয়ার কারণে প্রচুর মানুষ এখানে ঘুরতে আসে। খেয়ানৌকা, ট্রলার অথবা স্পিডবোট নিয়ে বিশাল পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারবেন আপনি। ঘাটের পাশাপাশি দেখে যেতে পারবেন নবাবগঞ্জের জজবাড়ি, উকিলবাড়ি, আনসার ক্যাম্প, খেলারাম দাতারবাড়িসহ আরও কিছু দর্শনীয় স্থান।

ঘাটে গিয়ে একটু এগোলেই দেখতে পাবেন অত্যন্ত সুন্দর ভাবে গোছানো সারি সারি নৌকা বেঁধে রাখা আছে। পদ্মার মাঝে অপার সৌন্দর্য নিয়ে জেগে ওঠা চরে যাওয়ার জন্য। মূলত জেগে ওঠা চরই আসল সৌন্দর্য। আর তাই ফরিদপুরের চর ভদ্রাসন যাওয়ার জন্য নৌকা দরদাম করে উঠে পড়ুন, এক ঘণ্টা চুক্তিতে খেয়ানৌকা ছোট ৩০০-১০০০ টাকা বা ট্রলার ৬০০-১৫০০  টাকা আর স্পিডবোট ১৮-২০ মিনিটের জন্য ২০০০ টাকা । আর ১০ মিনিটের জন্য ১০০০ টাকা। অবশ্যই দামাদামি করে নেবেন।

এ ছাড়া স্পিডবোটে মৈনটঘাট থেকে ফরিদপুরের চর ভদ্রাসন যেতে হলে জনপ্রতি ১৬০ টাকা করে গুনতে হবে। ১০ থেকে ১২ জন নিয়ে চলতে পারবে। কয়েকজন মিলে শেয়ারে ভাড়া করলে সবচেয়ে ভালো হবে।

কোথায় থাকবেন

পর্যটকদের থাকার জন্য মৈনটঘাটের আশপাশে এখনো কোনো যাত্রী ছাউনি, আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, বোর্ডিং তৈরি করা হয়নি। এককথায় থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় কোনো বাসিন্দার বাড়ি ম্যানেজ করতে না পারলে দিনে এসে দিনেই ফিরে যেতে হবে। তাই ঢাকা বা দেশের যেকোনো স্থান থেকে বেড়াতে গেলে মৈনটঘাটে থাকার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

কোথায় খাবেন

মৈনটঘাটে এসে রুপালি ইলিশ খাওয়ার স্বাদ নিতে ভুলবেন না। বেশির ভাগ মানুষেরই ইচ্ছে থাকে পদ্মার তীরে বসে পদ্মার রুপালি ইলিশ খাওয়ার। মৈনটঘাটের পাশেই বেশ কিছু রেস্তোরাঁ রয়েছে বা ভাতের হোটেল আছে। হোটেল গুলোর নাম হলো পদ্মা বিলাস, পদ্মা রোজ নিউ খাবার হোটেল, পদ্মা গড়াই চৌধুরী হোটেল, পদ্মা ফুড কেয়ার ফাস্টফুড অ্যান্ড মিনি চাইনিজ। এসব খাবার দোকানে বড় সাইজের রুপালি ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে। প্রতি পিস ইলিশের দাম ৬০-৯০ টাকা, বোয়াল ৮০-১০০ টাকা, চিংড়ি ৬০-৮০ টাকা, পদ্মার নদীর বিভিন্ন ধরনের গুড়া মাছ ৬০-৯০ টাকা। প্রতি প্লেট ভাত ১০ টাকা। আর চাইলে কার্তিকপুর বাজারে শিকদার ফাস্টফুড নামক একটা খাবারের দোকানে গিয়েও খেতে পারেন এবং ঢাকা হোটেলসহ আরো কিছু ভাতের হোটেলও আছে। নৌকা জার্নির পর খাওয়াটা এককথায় অসাধারণ লাগবে। 

কার্তিকপুরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খেতে ভুলবেন না, এখানকার মিষ্টি বিদেশেও পাঠায় অনেকে। কার্তিকপুর বাজারে অবস্থিত সেই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানের নামগুলো হলো  নিরঞ্জন মিষ্টান্নভান্ডার, মুসলিম সুইটস, রণজিৎ মিষ্টান্নভান্ডাসহ আরো কিছু মিষ্টির দোকান আছে।

রণজিৎ মিষ্টান্নভান্ডার মালিক রণজিৎদার ভাষ্যমতে তার দোকানের মিষ্টির নাম ও মিষ্টির দাম উল্লেখ করা হলো- ছানার জলসিরা রসগোল্লা ১৮০ টাকা কেজি ও প্রতি পিস ১৫ টাকা। সাধারণ রসগোল্লা ১৫০ টাকা কেজি ও প্রতি পিস ১৫ টাকা। ছানার আমিত্তি ২৫০ টাকা কেজি ও প্রতি পিস ৫০ টাকা। আমিত্তি ১২০ টাকা কেজি ও প্রতি পিস ১০ টাকা। ছানার চমচম ২০০ টাকা ও প্রতি পিস ২০ টাকা। চমচম ও কালোজাম ১৬০ টাকা কেজি ও প্রতি পিস ১৫ টাকা। ছানার বোরফি ৪০০ টাকা কেজি ও প্রতি পিস ৩০ টাকা। বালুশা ১৪০ টাকা কেজি ও প্রতি পিস ৮ টাকা। জিলাপি ১০০ টাকা কেজি। রসমালাই ৩০০ টাকা কেজি। দই ১৪০ টাকা কেজি। আপনি চাইলে আসার সময় এসব ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কিনে আনতে পারেন।

যেভাবে ঢাকায় আসবেন

ঢাকা থেকে অনায়াসেই দিনে গিয়ে দিনেই আবার ফিরে আসা যাবে মৈনটঘাট থেকে। মৈনটঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যদি আপনি ৬টায় বাসে চড়েন রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে ঢাকায় ফিরে যেতে পারবেন।

সতর্কতা

মৈনটঘাট এখন যথেষ্ট কোলাহলময়। তবে হ্যাঁ এখানে  ছিনতাই হওয়ার মতো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম। তবুও সতর্কভাবে থাকাই ভালো। সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় বেশি গভীর পানিতে যাবেন না। খাবারের প্যাকেট অথবা সিগারেট প্যাকেট, পানির বোতল বা ড্রিংন্সের বোতল অথবা যেকোনো প্রকার ময়লা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। প্রকৃতির বন্ধু পাখি মারা থেকে বিরত থাকুন। কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করবেন না এবং যেকোনো ধরনের সাহায্যের জন্য মৈনটঘাটের পাশেই অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়িতে যোগাযোগ করতে পারেন।

Advertisement
Advertisement