Beta

সুন্দরবন রঙ্গ

আলোকিত পশু চাই

১৯ অক্টোবর ২০১৫, ১৪:১৯

নূর সিদ্দিকী

আলোকিত পশুর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন আলোকিত বন। মানুষ এখনো মানুষই রয়ে গেছে। আরে বাবা, তোদের মানুষ থাকতে বলেছে কে? একবার একটু পশু হয়ে দেখ না, কত মজা। মজার দুনিয়ায় মানুষেরই কোনো মজা নাই। এই যে আমরা পশুরা কত সুখে আছি, সুখের কি শেষ আছে এখানে? এখানে মানে আমাদের সুন্দরবনের (বাংলাদেশ অংশ) কথা বলছি। গণতন্ত্র টানটান অবস্থায় আছে। কোনো হরতাল নাই, অবরোধ নাই, হেফাজতের উটকো ঝামেলা নাই, সাগর-রুনির মামলা নাই, বিশ্বজিতের মরণ নাই, শেয়ারবাজারের কেলেঙ্কারি নাই, তত্ত্বাবধায়ক নাই, অন্তর্বর্তী সরকার নাই। এই যে এত কিছু নাই বললাম, তার মানে কি আমরা ধ্বংস হয়ে গেছি, আমরা কি মানুষের মতো সুখে নাই? গাছের ছায়ায় যখন আরাম করে বসে একটু মন খুলে গান ধরি, তখন কি আমাদের সুখের শেষ থাকে? থাকে না। আবার ধরেন, যখন নদীতে ডুব মেরে কুমিরের সঙ্গে জলকেলি করে সময় কাটাই, তখন কি আমাদের একবারের জন্য হলেও মনে কষ্ট থাকে? থাকে না তো। কারণ, আমরা মহাসুখে আছি। হাজার বছর ধরেই তো আমরা সুখে আছি।

আমাদের সুখ-শান্তি দেখে শিক্ষা নেওয়ার জন্য প্রতিবছরই তো হাজার হাজার মানুষ আসে আমাদের কাছে। ছবি তোলে, রাত্রিকালে গান গায়, আমাদের দেখে ভেংচিও কাটে কেউ কেউ। কিন্তু তারা যেটা নিতে এখানে আসে, সেটাই নিতে পারে না। শিক্ষা নেওয়ার নাম করে তারা হাজার হাজার টাকা খরচ করে, কিন্তু সেই শিক্ষা তারা নিতে পারে না। এর জন্য কি আমরা দায়ী? মোটেও না। আমরা মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বুক বাড়িয়ে দিয়ে রাখি সব সময়, আমাদের বইগুলোও তো মানুষ বিনামূল্যে নিয়ে যায়; কিন্তু তা পড়ে দেখে না। তাহলে শিখবে কীভাবে। এ জন্য শুরুতেই তো বলেছি, মানুষ এখনো মানুষই রয়ে গেছে, পশু হতে পারল না।

তবে একটা বিষয়ে আমরা মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে পারছি না। কেবল আমরা কেন, আমাদের পরের যত প্রজন্ম আসবে এই সুন্দরবনে, তারাও কোনো দিন মানুষের কাছে তাদের ঋণ স্বীকার করে শেষ করতে পারবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৩ বছর পর এই যে সুন্দর উদ্যোগটি মানুষ নিয়েছে, তা তার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের অশেষ মোবারকবাদ।

আমরা অন্ধকারে আছি। সুন্দরবনে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা দেখেছেন ঘন গাছপালা থাকায় দিনের বেলাতেই চলতে কষ্ট হয়, আর রাতের বেলায় কী অবস্থা হতে পারে তা দু-একজন গাছচোরের সঙ্গে আলাপ করলেই বুঝতে পারবেন। যদিও গাছচোরেরা রাতে খুব একটা আসে না, দিনের বেলায়ই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে, কারণ গাছ রক্ষায় তো আর পশু-পাখিদের কোনো বাহিনী নেই যে তারা চোরদের রুখে দেবে। যে বাহিনী আছে, সেটা মানুষের। মানুষের বাহিনীর চরিত্র তো আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বনের মধ্যে আবার আছে ম্যানগ্রোভ নাকি একটা ফাউলটাইপের গাছ। খালি আমাদের পায়ের তলায় খোঁচা মারে, গায়েও যে মারে না তা কিন্তু না। এত ঝক্কি-ঝামেলা এড়িয়ে দিন-রাত অন্ধকারে থাকাটাই আমাদের একমাত্র ‍দুঃখ। এই দুঃখটা কেউ বুঝতেই পারেনি, মোচন করার চেষ্টা তো ‍দূরের কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ডিজিটাল সরকার তো তাই বলে বসে থাকতে পারে না, বাংলাদেশের বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রধান শরিক দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই ছিল সুন্দরবনের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটানো। আরে, আরব দেশে আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগও তো দূর হয়েছে একসময়। কেবল আমরাই পড়ে আছি সেই অন্ধকার যুগে। যাক, বর্তমান সরকারের কাছে তাই কৃতজ্ঞতা হাজার-কোটিবার।

আগের সরকার খালি খাম্বা বসাইত বলে শুনেছি। বিদ্যুৎ না দিয়া খাম্বা দিলে কী কাজ হয়? এই সাধারণ জ্ঞানের বিষয়টি আগের সরকারের আমলের মানুষ বুঝতে পারে নাই। এই সরকার বুঝছে। আর তাই তারা খাম্বা বসানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা জানে, খাম্বা দিয়ে হাম্বা হাম্বা করলে জনগণ ভোট দেবে না। ভোটের জন্য বিদ্যুৎ দিতে হবে। এ জন্য বিদ্যুতের কল বসাতে হবে।

সুন্দরবন। মানে আমরা যেখানে থাকি, সেটা যেহেতু রাজধানী ঢাকা থেকে অনেক দূর, তাই ঢাকা থেকে ফ্ল্যাক্সিলোডের মাধ্যমে এতদূরে বিদ্যুৎ আনা সম্ভব নয় বলে সরকার আমাদের ঘরের মধ্যেই কল বসানোর কাজ শুরু করেছে। আর কয়টা দিন অপেক্ষা করলেই সুন্দরবন হবে বিশ্বের সবচেয়ে আলোকিত বন। এমন বন তো পৃথিবীতে নাই, যেখানে বিদ্যুৎ আছে। ফলে সরকারের এ উদ্যোগ যদি সফল হয়, তাহলে পৃথিবী অবাক তাকিয়ে থাকবে আমাদের দিকে। আর বিদ্যুতের আলোয় আমরাও সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারব।

আগেই বলেছি, কিছু মানুষ এখনো মানুষই হতে পারে নাই। তারাই সরকারের এই মহতী উদ্যোগের বিরোধিতা করে চলেছে। আরে ভাই, তোমরা তো থাকো শহরে। বিদ্যুতের নহরের মধ্যে। এসি-ডিসির বাতাস খাও তোমরা। আর আমাদের জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা হচ্ছে শুনেই মেজাজ তিরিক্ষি হয় তোমাদের। তোমরা নাকি ঢাকা থেকে লংমার্চ করে সুন্দরবনে আসবা, আসো, এমন খাবলা দিবো না যে চক্ষে চড়কগাছ দেখবা। লংমার্চ প্রতিরোধে আমাদের পিঁপড়া বাহিনী, তেলাপোকা বাহিনী, মশা বাহিনীই যথেষ্ট। বাঘ-মামুর পায়ের ছাপ দেখেই যে মানুষেরা ভয়ে পেটের মধ্যে হিস্যু করে, সেই মানুষ নাকি আবার সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে।

আমরাও স্লোগান ঠিক করেছি—সরকার তোমার ভয় নাই, যেমনই হোক বিদ্যুৎ চাই, লংমার্চ করে যারা খাঁটি মানুষের বাচ্চা তারা... স্যাম্পল হিসেবে এই দুইটাই বললাম। বাকিগুলো শোনার অপেক্ষায় থাকেন। এখনো সময় আছে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা না করে মানুষ থেকে পশুতে পরিণত হওয়ার সুযোগ নেন। আমাদের ‘আলোকিত পশু চাই’ কর্মসূচিতে বাধা দিলে আর বনে নয়, রাজপথে আন্দোলন শুরু হবে। সো, বি কেয়ারফুল!

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement