Beta

ইউনেসকোর স্বীকৃতি

বাউলসংগীত থেকে শীতলপাটি

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:৫৯

মর্তুজা নুর

একটা সময় ছিল, যখন শীতলপাটি কেবল বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ ছিল। কিন্তু গতকাল (বুধবার) সেই সময়টা শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের শীতলপাটি এখন আন্তর্জাতিক সম্পদের মর্যাদা লাভ করেছে। বিশ্বস্বীকৃতি লাভ করছে বাংলাদেশের শীতলপাটি। সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যগত শীতলপাটিকে বিশ্ব নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (Intangible Cultural Heritage) অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেসকো। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা বুধবার এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অসংখ্য উপাদান। সংশ্লিষ্ট দেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসব উপাদান যাচাই-বাছাই ও সুনির্দিষ্ট করে বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরার কাজ করে ইউনেসকো। সুরমা নদীর পাশাপাশি নদীবিধৌত সিলেটের খালবিলের পাড়ে জন্ম নেওয়া মুর্তা গাছ দিয়ে তৈরি করা নয়নাভিরাম এই শীতলপাটিকে বিশ্বঐতিহ্য ঘোষণা করায় আবারও বিশ্ব দরবারের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করল বাংলাদেশ।

শীতলপাটি নাম শুনেই বোঝা যায় এর গুরুত্ব। এই পাটি তৈরির কৌশলই এমন যে, গরমের মধ্যেও এ পাটিতে শীতল পরশ পাওয়া যায়। শীতলতার পাশাপাশি নানা এ পাটির নকশা, রং ও বুনন কৌশল মুগ্ধ করে সকলকে। একটি শীতলপাটি বুননে কখনো কখনো চার থেকে ছয় মাস সময়ও প্রয়োজন হয়ে থাকে। যত জটিলতর নকশা, বুননে তত বেশি সময়। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় পাটিতে ফুটে ওঠে ফুল-ফল, প্রকৃতি, পশুপাখি ও প্রিয়জনের অবয়ব। কখনো কোনো ঐতিহাসিক বা প্রাকৃতিক দৃশ্যও ফুটিয়ে তোলেন শিল্পী।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির আকার-আকৃতিতে ও নকশায় রয়েছে বৈচিত্র্য। পাখি, ফুল, লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা, মসজিদ, চাঁদ, তারা, পৌরাণিক কাহিনীচিত্র, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, শাপলা, পদ্ম—কী নেই? সুযোগ আছে প্রিয়জনের নাম লেখার। বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন শীতলপাটি। মুর্তা বা বেতগাছের বেতি থেকে বিশেষ বুনন কৌশলে শিল্পরূপ ধারণ করে এ লোকশিল্প। সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, বরিশাল, ঝালকাঠি, কুমিল্লা, ঢাকা, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল ও নেত্রকোনায় এই গাছ পাওয়া গেলেও এ পাটির বেশির ভাগ শিল্পীই বৃহত্তম সিলেট বিভাগের বালাগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জের। সিলেট অঞ্চলের এ পাটির শতবর্ষী ঐতিহ্য রয়েছে। এখানকার একশ গ্রামের প্রায় চার হাজার পরিবার এ কারুশিল্পের সঙ্গে জড়িত।

তবে বাংলাদেশের কোনো ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এটাই প্রথম নয়। গত ৩০ অক্টোবর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো। অবশ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ধারা শুরু হয়েছিল বাউলসংগীতের মধ্য দিয়ে। ইউনেসকোর প্রথম স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশের বাউলসংগীত। পরে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি বুননশিল্প লাভ করে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। গত বছর মঙ্গল শোভাযাত্রাও একই স্বীকৃতি লাভ করে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাটির স্বীকৃতি লাভের মধ্য দিয়ে দেশের ওই উপাদানের আঁতুড়ঘর হিসেবে বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠি হয়, মর্যাদা লাভ করে। এ-সংক্রান্ত সনদে স্বাক্ষর করা সব দেশে প্রতিবছর নিজেদের যেকোনো একটি উপাদানের স্বীকৃতি চেয়ে ইউনেসকোতে আবেদন করতে পারে। এ বছর ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করে বাংলাদেশ।

স্বীকৃতিদানের মূল কাজটি করে ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিটি ফর দ্য সেফগার্ডিং অব দ্য ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ। কমিটির দ্বাদশ সম্মেলন এখন চলছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। ১২ সপ্তাহব্যাপী সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে যোগ দিয়েছে আট সদস্যের প্রতিনিধিদল। জাতীয় জাদুঘরের সচিব শওকত নবীর নেতৃত্বে দলে আরো আছেন জাদুঘরের কিপার ড. শিখা নূর মুন্সী, ডেপুটি কিপার আসমা ফেরদৌসী। প্র্যাকটিশনার হিসেবে সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন সিলেটের দুজন প্রসিদ্ধ পাটিশিল্পী গীতেশ চন্দ্র দাশ ও হরেন্দ্র কুমার দাশ। তাঁদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর।

মানবজাতির উল্লেখযোগ্য মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনে ২০০৩ সালে ইউনেসকো একটি সমঝোতা চুক্তি অনুমোদন করে। এই সমঝোতা চুক্তির অধীনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৭১টি রাষ্ট্র এই সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ২০০৯ সালের ১১ জুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। ২০১২ সাল থেকে সরকারের পক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় মানবজাতির মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য উপাদান পাঠানো শুরু করে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ একসময় সংস্কৃতিতে ভরপুর ছিল। কালের বিবর্তনে সেগুলোর অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও এখনো গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে আমাদের। বিশ্ব দরবারে সেগুলোর কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা দরকার। অবশ্য সেই কাজটি ভালোভাবেই সরকার করছে বলে মনে হয়। কারণ, গত কয়েক বছরেই আমরা একে একে বাউলসংগীত থেকে শীতলপাটিতে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন করতে পেরেছি।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Advertisement
1.0234959125519