Beta

অভিমত

রোহিঙ্গা সংকটে ভারত ও চীনের অবস্থান

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:৫৩

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব সহজে  মেলানো  যায়  না। সাম্প্রতিক মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বব্যবস্থায় এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সবসময়ই নিজেদের স্বার্থ, আধিপত্য ঠিক রেখে তাদের নিজ নিজ অবস্থান বজায় রাখে। অনেক সময় কৌশলগত ভূমিকা রাখতেও দেখা যায়। রাজনীতির অন্যতম উপাদান স্বার্থ হওয়ায় জাতীয়  ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে এ বিষয়টি সর্বদা লক্ষ করা যায়। রাখাইন রাজ্য ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের অবস্থানে চীন ও ভারত অনকেটা একাত্মতা রেখেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুকে মিয়ানমার যেভাবে দেখছে, তারাও হয়তো সেভাবেই দেখছে। সঙ্গত কারণেই ভারত ও চীনের অবস্থানটি মিয়ানমারের পক্ষে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ভারত ও চীন বিশ্বের দুটি বড় শক্তি। আয়তনে, জনসংখ্যায় তো বটেই, এমনকি শক্তি-সামর্থ্যে, প্রভাব বিস্তারেও তারা সারা বিশ্বে যথেষ্ট প্রভাব রাখে। বিশ্ব রাজনীতিতে এ দুটি দেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অঞ্চলে তারা বড় ভাই হিসেবেই পরিচিত। রাষ্ট্র দুটি সবসময়ই নিজেদের প্রভাব  ও আধিপত্যের অঙ্কটি ঠিক রাখার চেষ্টা করে। বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের ঠান্ডা লড়াই বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অবস্থানে অনেক সময় অভিন্নতাও লক্ষ করা যায়। যেমনটি কিছুটা রোহিঙ্গা ইস্যুতে লক্ষ করছি। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীনের অবস্থান এবং বাংলাদেশের অবস্থানে ভিন্নতা রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের যে অবস্থান সেই অবস্থান থেকে ভারত ও চীনের অবস্থান ভিন্ন। বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে ভারত ও চীন নেই। তবে ভারত ও চীন আছে না কি নেই এমন ধুম্রজালও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট।

ভারত সরকার মনে করে, এই রোহিঙ্গারা তার দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই রোহিঙ্গাদের দলে ভেড়াতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার এরই মধ্যে অবৈধ রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের কোনো অনুরোধ-আবেদনও তারা গায়ে মাখছে না। জাতিসংঘ বলেছিল, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র দেওয়া যায় কি না, তা ভাবতে। ভারত এ ধরনের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য মনে করছে। উল্লেখ্য, রাখাইন রাজ্যে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করছে ভারত। মিজোরাম থেকে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত সড়ক বানানোর একটি পরিকল্পনাও ভারতের আছে। আমরা লক্ষ করছি, ভারত মিয়ানমার বিষয়ে যেকোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক, বিশেষ করে কোনো পক্ষ যেন সে অবস্থানকে ‘রোহিঙ্গাপন্থী’ বলে ব্যাখ্যা না করে।

এবার দেখা যাক চীনের অবস্থানটা। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। কী সেনা আমল, কী গণতান্ত্রিক আমল, সব সময়ই এ সম্পর্ক অটুট ছিল। বলা যায়, মিয়ানমারের পরীক্ষিত বন্ধু চীন। মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ যে দেশটির, তা হচ্ছে চীন। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩০ বছরে মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পশ্চিমা দেশগুলোর বিনিয়োগ মিলিয়ে এর ধারেকাছেও নেই। উত্তর কোরিয়া হাজার অন্যায় করেও যেমন সমর্থন পায় চীনের, মিয়ানমারও তেমনি সব কাজে চীনের ভালোবাসা পেয়ে থাকে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একাধিকবার রাখাইন প্রদেশের অবস্থা নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েও শুরু করতে পারেনি শুধু চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতায়।

চীন বা ভারত তাদের স্বার্থে মিয়ানমারকে হয়তো এখনই কোনো চাপ দিতে রাজি হবে না। কিন্তু এই দেশ দুটি এটাও জানে যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বাংলাদেশ যে বিপদের মধ্যে পড়েছে, তার কোনো দায় দেশটির নেই। মিয়ানমারকে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কূটনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার একাধিক কারণও রয়েছে। রাখাইন রাজ্যের কিয়াকফু এলাকায় বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায় চীন। অবস্থান জোরদার করতে চায় ভারত মহাসাগরে। দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও দুই দেশের আলাপ-সালাপ হচ্ছে। অবশ্য ভারত প্রথম দিকে মিয়ানমারের প্রতি সরাসরি সমর্থন জানালেও সংকটের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধীরে ধীরে অবস্থান অস্পষ্টতায় রূপ নিয়েছে। রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চলাকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন। অং সান সু চির সঙ্গে মোদির বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন দেবেন বলে ঘোষণা করলে মোদি তীব্র সমালোচনার মধ্যে পড়েন। রোহিঙ্গাদের ওপর এত অত্যাচার, নির্যাতন চলবে আর নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির হিসাবে চুপচাপ কিংবা কৌশলগত অবস্থানে কোনোভাইে ইতবাচক রাজনীতির সঙ্গে যায় না। ভারত ও চীন শক্ত অবস্থান নিলে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের বিদ্যমান মানসিকতা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। 

রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনেকেই বাংলাদেশকে ভারত ও চীনের সঙ্গে পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনায় নেমেছে। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ অবশ্যই কোনো পক্ষ নয়, এটি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ইস্যু। বাংলাদেশের ভূমিকা এখানে কিছু বিপন্ন মানুষকে সহায়তা দেওয়া মানবিকতার, আশ্রয় দাতার। এর বাইরে বাংলাদেশ এখানে সম্পুর্ণ তৃতীয় পক্ষ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীনের ভূমিকা যেমনটিই হোক না কেন মূলত বাংলাদেশের সঙ্গে সার্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবেই জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র, কিন্তু তারাও এ ইস্যুত চীন কিংবা মিয়ানমারের পাশেই থাকছে। ভারত ও চীন নিজস্ব স্বার্থ বা এজেন্ডা আমাদের অজানা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের দুর্দশা ও বাংলাদেশের ভোগান্তির কথা একেবারেই ভুলে যাওয়াও তাদের উচিত হবে কি না, সেটি বিশেষভাবে ভাবতে হবে। 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement
0.83432197570801