Beta

মানবিকতার প্রতীক এখন বাংলাদেশ

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৮:২৫ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৮:২৮

মর্তুজা নুর

আবদুল মোতালেব। বয়স ২৬ বছর। কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঈদের আগের দিন মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের এলাকায় গুলি শুরু করে। জীবন বাঁচাতে সেখানকার মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু । হঠাৎ একটি গুলি মোতালেবের পায়ে লাগে। রক্ত ঝরতে থাকে । বোনের সহায়তায় পরিবার-পরিজন নিয়ে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে এসে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরিবারের লোকজন ও নিজের জীবন বাঁচাতে পারলেও গুলিবিদ্ধ পা হারাতে হয়েছে তাঁকে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে এভাবেই রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। অমানবিক নির্যাতন, খুন, ধর্ষণসহ নানা রকম নির্যাতন চলছে রোহিঙ্গাদের ওপর। জীবন বাঁচাতে তাই নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফ পথে বাংলদেশে আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘের তথ্যমতে এখন পর্যন্ত দুই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা চিকিৎসাধীন রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

মিয়ানমারের গণহত্যা যখন অসহনীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্ব বিবেক চুপ থেকে ছিল, কিন্তু মানবতার দেশ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো করে চুপ থাকতে পারেনি। আর তাই রোহিঙ্গা সংকটে বিশ্বের মানবিকতার প্রতীক এখন বাংলাদেশ। 

কিন্তু প্রতিবেশী ভারত ও চীন এগিয়ে আসেনি এই রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায়। ১০০ কোটি লোক, বিশাল আয়তনের ভারত যখন তার দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়, যখন পরাক্রমশালী চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিপীড়ক মিয়ানমার সরকারের পাশে দাঁড়ায় এবং যখন ইসরায়েল অস্ত্র দিয়ে মিয়ানমারকে সহায়তা করে; তখন বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ।

রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গণহত্যার শিকার হয়ে কোনো মতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা মানুষদের অনেককে ফিরিয়ে দিলেও লাখো রোহিঙ্গাকে এরই মধ্যে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশ নিজেই নানাবিধ অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তারপরও মানবিকতার প্রশ্নে বাংলাদেশ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, সেটি এশিয়ায় তো বটেই, সারা বিশ্বেই বিরল।

আগে থেকে রোহিঙ্গার বোঝা বইছে বাংলাদেশ। এবার আসা নতুন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে আছে। ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা কুতুপালং ও নয়াপাড়ায় নিবন্ধিত দুই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যরা বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। অগণিত রোহিঙ্গা এখন সীমান্তে আটকে পড়ে আছে। নতুন করে পালিয়ে আসাদের থাকার ব্যবস্থা করতে টেকনাফে নতুন ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে।

নতুন আশ্রয়কেন্দ্র করতে পাহাড়ি এলাকায় ৫০ একর জায়গা বরাদ্দ চেয়েছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন। পালিয়ে আসাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ ও অন্য আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছেন বাংলাদেশের চিকিৎসকরা। আবার আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি উদ্যোগে খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ যখন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিচ্ছে, তখন রাখাইনে জাতিসংঘের সব দাতব্য সংস্থার খাদ্য, পানি ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। শুধু জাতিসংঘই নয়, অক্সফাম, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ ১৬টি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অভিযোগ করেছে, মিয়ানমারে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

একটি বিপদগ্রস্ত জাতির দুঃসময়ে বাংলাদেশ যে ধৈর্য আর সহমর্মিতার পরিচয় দিচ্ছে, সেটি কূটনীতি আর রাজনীতির খেলার বাইরে একটি অনন্য উদাহরণ যা তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে বা হয়েছে প্রতিবেশী অন্য দেশগুলো।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। ফলে বাংলাদেশের মানুষ জানে, শরণার্থী হওয়ার যন্ত্রণা কেমন। সেই অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, পকেটে পয়সা কম থাকলেও সে অভুক্তকে খাওয়াতে পারে, নিজের ঘর দুর্বল হলেও বিপদগ্রস্তকে সে আশ্রয় দিতে পারে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন

Advertisement
0.79262399673462