Beta

অভিমত

আর নয় আশ্বাস, চাই শুধু ঘোষণা

১৯ মার্চ ২০১৭, ১১:৪৬

রিক্তা রিচি

‘আর নয় আশ্বাস, চাই শুধু ঘোষণা’, ‘ছয় মাস পার হলো দাবি আদায়ের কী হলো?’, ‘একটাই দাবি ইনস্টিটিউট চাই’—নীলক্ষেতের মোড়ে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের ছাত্রীদের সম্মিলিত কণ্ঠে কয়েক দিন আগে ধ্বনিত হয়েছিল এই দাবি আদায়ের আন্দোলন। গত ১৩ মার্চ সোমবার থেকে নীলক্ষেত মোড়ের দিকে লক্ষ করলেই দেখা যাচ্ছে স্লোগানমুখর পরিবেশ। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থীদের মিলিত কণ্ঠস্বর। সাহসিকতার সঙ্গে তাঁরা উচ্চারণ করে যাচ্ছে অধিকার আদায়ের দাবি। ছাত্রীদের ভাষ্যমতে, ছয় মাস আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তাই তাঁরা আন্দোলনে রাজপথে নেমেছেন। আন্দোলনরত ছাত্রীরা আরো জানান, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট হিসেবে ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের এই আন্দোলন চলতে থাকবে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলছে আন্দোলন। উপরিমহল নানাভাবে দিয়ে যাচ্ছে সান্ত্বনা; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বারবার বেদনাভরা হৃদয় নিয়ে ঘরে ফিরে যান শিক্ষার্থীরা। প্রতিশ্রুতি দিয়েও উপরিমহল তা রক্ষা করছে না।

উল্লেখ্য, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজটি ১৯৬১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এবং তখন থেকেই এই কলেজের কারিকুলাম নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদ। এ ছাড়া ২০১৪ সালে হোম ইকোনমিকস ইউনিট নামে স্বতন্ত্র ইউনিট খোলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং হোম ইকোনমিকসের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে অন্যান্য কার্যের দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, হোম ইকোনমিকস ইউনিট করা হলেও কি আদৌ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটছে ঠিকভাবে? পুরোনো সিলেবাসের পাতায় চোখ রেখেই কাটছে শিক্ষার্থীদের জীবন। তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন সঠিক দিকনির্দেশনা থেকে। বঞ্চিত হচ্ছেন প্রাপ্য অধিকার থেকে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো এই কলেজের বিষয়সমূহের কোনো নির্দিষ্ট বই নেই! বড় আপুদের নোট, শিট, শিক্ষকদের লেকচার সংগ্রহ করেই চলছে বর্তমান শিক্ষার্থীরা। যোগ্যতা থাকলেও ছাত্রীরা সুযোগ পাচ্ছে না ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের, সুযোগ পাচ্ছে না এমফিল করার। কেনই বা বঞ্চিত হবে না, যেখানে এই কলেজটি সরকারি সমন্বিত এবং একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজ, অর্থাৎ একদিকে এই কলেজটি সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্যদিকে এই কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।

সুনির্দিষ্ট কারো কাছেই পাচ্ছে না আশ্রয়। একদিকে যেমন সরকারের অবহেলা, অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবহেলা। এরই মাঝে দোদুল্যমান সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কিত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ।

এবার আসুন জানা যাক, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সাবজেক্টগুলো কতটা আধুনিক ও সময়োপযোগী। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে পাঁচটি বিষয়ে বিএসসি অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশিপ বিভাগ, শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগ, বস্ত্র ও বয়ন শিল্প বিভাগ, আর্ট ও ক্রিয়েটিভ স্টাডিজ বিভাগ। এই প্রতিটি বিভাগ অত্যন্ত আধুনিক এবং যুগোপযোগী। সঠিক ব্যবস্থাপনা পেলে প্রতিটি বিভাগে সৃজনশীলতার দারুণ পরিচয় দিতে পারবে শিক্ষার্থীরা।

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সাবজেক্টগুলো শুধু মেয়েদের জন্য, এটা যাঁরা ভাবে তাঁরা নিঃসন্দেহে বোকার স্বর্গে বাস করে। কারণ, জ্ঞান অর্জন করার অধিকার ছেলেমেয়ে উভয়ের রয়েছে। আর এই সাবজেক্টগুলো  শুধু মেয়েদের, এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসার সময় এসেছে। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। বলা হয় এগ্রিকালচার ইজ দি ইনভেনশন অব ওমেন। এই বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সমাজব্যবস্থার উদ্যান কৃষিনির্ভর সময়ে। মেয়েরা একসময় উদ্যানকৃষির সূচনা করে, যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ কৃষিতে পরিণত হয়। কালক্রমে কৃষি নাম শুনলেই মনে করা হতো এটা ছেলেদের অধ্যয়নের বিষয়। অথচ বর্তমানে কৃষিতে মেয়েছেলে উভয়ই পড়াশোনা করছে, গবেষণা করছে এবং উত্তরোত্তর অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছিয়ে আছে শুধু গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থীরা সমাজের অন্যরা এর সঠিক প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে পারেনি বলে। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ছেলেরা অনায়াসে পড়াশোনা করতে পারবে, যদি এটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ছিল লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা আর্ট কলেজ, সমাজকল্যাণ কলেজ। বেশ আগেই লেদার টেকনোলজি, ঢাকা আর্ট কলেজ এবং সমাজকল্যাণ কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট করা হয়েছে। লেদার টেকনোলজি বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি নামে সুপরিচিত, ঢাকা আর্ট কলেজ সুপরিচিত চারুকলা ইনস্টিটিউট নামে এবং সমাজকল্যাণ কলেজ বর্তমানে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রাপ্য মর্যাদায় ভূষিত; কিন্তু এত বছর হয়ে গেল তবুও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের মেয়েদের আন্দোলন যেন কারো চোখেই পড়ছে না। বিষয়টা সত্যিই দুঃখজনক!

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট করার দাবি নিয়ে যে শিক্ষার্থীরা রোদে পুড়ে পুড়ে আন্দোলন করছে, ক্লাস পরীক্ষা সবকিছু বর্জন করেছে তাদের দোষটা কোথায়? তাঁরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চায়। উচ্চজ্ঞানের প্রত্যাশা, মানসম্মত শিক্ষালাভের প্রত্যাশা করার অধিকার যে কারো আছে। সেখানে গার্হস্থ্য অর্থনীতির মেয়েরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোম ইকোনমিকস ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট করার দাবি তারা জানিয়েছে, অন্যায় কিছু তো করেনি। কারণ এভাবে বছরের পর বছর মানহীন পড়াশোনা তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দিকে। কর্মক্ষেত্রে তারা পাচ্ছে না যথাযথ মর্যাদা।

সরকারের কাছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে মোটকথা উপরিমহলের কাছে একটাই আবেদন, ছাত্রীদের এই দাবি যেন অনতিবিলম্বে আপনাদের বিবেচনায় আসে। মোটকথা তারা পরিচয়হীনতায় ভুগছে। তাদের এই দাবি মেনে নিয়ে সুন্দর, শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হোক।

লেখক : শিক্ষার্থী, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ।

Advertisement
0.77423214912415