আমজাদ হোসেনের ‘জীবন থেকে নেয়া’

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ২০:১৬

মাজহার বাবু
আমজাদ হোসেন

১৯৭০ সালে মুক্তি পায় জহির রায়হানের ধ্রুপদি চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে প্রভাতফেরির একটি দৃশ্য এই চলচ্চিত্রের অনেক বিখ্যাত দৃশ্যের একটি। এমন দৃশ্যায়ন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরলই বলতে হয়। এই চলচ্চিত্রে বাড়ির চাকরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আমজাদ হোসেন। শুধু অভিনয় নয়, এই ছবির চিত্রনাট্যও রচনা করেছিলেন তিনি। এই ভাষার মাসে সেই সময়কার স্মৃতি ও চলচ্চিত্রে আন্দোলন-সংগ্রাম বিষয়ে এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা আমজাদ হোসেন।   

এনটিভি অনলাইন : ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির গল্প কীভাবে তৈরি হলো?

আমজাদ হোসেন : এফডিসির পরিচালক সমিতির প্রতিদিনের আড্ডায় একদিন এসে হাজির জহির রায়হান। আমাকে বললেন, আমার জন্য একটা গল্প লিখে দাও। গল্পের শুরুতে দেখা যাবে একটি মেয়ে আরেকটি মেয়েকে নিজ হাতে গ্লাসে করে দুধ খাইয়ে দিচ্ছে। আর গল্পের শেষে এরাই একজন আরেকজনকে বিষ খাইয়ে দেবে। গল্পে একটা যুদ্ধ থাকবে-চাবি নিয়ে। বাড়ির কর্তা হবে নারী, আর তার স্বামী থাকবে ঘরজামাই ধরনের। আমি তো গল্প শুনে চিন্তায় পড়ে গেলাম। সারা রাত ভেবে গল্প লেখা শুরু করলাম এভাবে-দুই বোনের গল্প, বড় বোন পিছু পিছু ছুটছে দুধভাতের থালা নিয়ে। আবার গল্পের প্রয়োজনে দুই বোনকে এক বাড়িতে বিয়ে না দিলে চাবি নিয়ে খেলাটা জমবে না। এভাবেই গল্প করতে করতে তৈরি হয় ‘জীবন থেকে নেয়া’। 

এনটিভি অনলাইন : শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার একটি দৃশ্য আছে। এই দৃশ্য রাখার কারণ কী ছিল? 

আমজাদ হোসেন : বাড়ির কর্তা হচ্ছে নারী। সে জিজ্ঞেস করে- খালি পায়ে কোথায় গিয়েছিলে? এভাবে ছোট লোকের মতো শহীদ মিনারে কেন গিয়েছিলে? এমন একটা দৃশ্য দিয়েই বুঝিয়ে দেওয়া যায় বাড়ির কর্তা ছবিতে আসলে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সারা দেশের মানুষ এখন যেভাবে প্রভাতফেরি করে এই আমেজটাও তৈরি করা হয় সচেতনভাবে। পাকিস্তানি শাসকদের মনোভাব দেখাতেই ওই দৃশ্য রাখা হয়। 

এনটিভি অনলাইন : ছবিতে কিছু সুন্দর গান ব্যবহার হয়েছে। এই প্রসঙ্গে কিছু বলবেন?

আমজাদ হোসেন : ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’-এই গানটি আমরা ব্যবহার করি মানুষকে দেশপ্রেমে জাগ্রত করার জন্য। বাংলাদেশের দৃশ্য দেখে মনের আবেগ থেকে গান গায় আনোয়ার হোসেন। এই যে প্রেম, এই যে আবেগ এটা দেশের জন্য। একই জায়গাতে আবার প্রেম করছে সুচন্দা-রাজ্জাক।  তারাও আবার ‘আমার সোনার বাংলা গান গাইছে’। গানটি পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করা হয়। আরেকটি গান ছিল ‘কারার ওই লৌহ কপাট’।

এই গানের মাধ্যমে আবার আন্দোলনের কর্মীদের গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিতে গানের প্রয়োজন আগে তৈরি করা হয়েছে, তারপর গান ব্যবহার করা হয়েছে। খান আতা ছাদের ওপরে গিয়েও গাইতে পারেন না। ‘এ খাঁচা ভাঙ্গবো আমি কেমন করে’ গানের মাধ্যমে আমরা দেখাতে চেয়েছি নিজের বাড়িতে আমরা কীভাবে অবরুদ্ধ। আমরা যে কী রকম পরাধীন তা এই ছবির প্রতিটি দৃশ্যে আছে। পোস্টার লাগানোর পর নিজেদের হাতেই আমরা তা তুলে ফেলেছি আবার কেউ স্বীকার করছি না কে পোস্টার লাগিয়েছি। আসলে আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের তখনকার প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা। 

এনটিভি অনলাইন : স্বাধীনতার পর ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমাদের কোনো চলচ্চিত্র নেই কেন?

আমজাদ হোসেন : বাংলাদেশে চলচ্চিত্র যখন যাত্রা শুরু করে, তখন ছবিতে ইতিহাস নিয়ে কাজ করার চেয়ে আন্দোলন জোরদার করাই ছিল লক্ষ। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় যত ধরনের ঘটনা হয়েছে, তারপরে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই ছবি হয়েছে বেশি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত গল্প আমাদের নিজেদের জীবনেই আছে যে সারা জীবন ছবি বানালেও শেষ হবে না। আমাদের মাথায় আসলে আসেনি বিষয়টি। ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমাদের কোনো চলচ্চিত্র নেই এটা লজ্জার ব্যাপার। সরকার আশা করি বিষয়টি বিবেচনা করবেন। আমার জোর দাবি থাকবে, জাতীয়ভাবে চলচ্চিত্রের জন্য যে অনুদান থাকে, তাতে ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর জন্য কোটা নির্ধারণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যদি কোটা থাকে, শিশুতোষ ছবি নিয়ে যদি কোটা থাকে, তাহলে ভাষার জন্য কেন কোটা চাইতে হবে?   

এনটিভি অনলাইন : মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের চলচ্চিত্রের পরিবেশ কেমন ছিল?

আমজাদ হোসেন : ভাষা আন্দোলনের পর শুরু হয় ’৬৯-এর আন্দোলন। আমরাও এখান থেকে আন্দোলন করেছি, আমাদের আন্দোলন ছিল চলচ্চিত্র দিয়ে। প্রতিদিন এফডিসিতে আলোচনা দেশের এখন কী অবস্থা, আমাদের কী করণীয়, এখান থেকেই গল্প শুরু আর গল্প থেকেই চলচ্চিত্র। প্রতিদিনই আমরা আড্ডা দিতাম এফডিসির পরিচালক সমিতিতে। খান আতা আসত মগবাজার থেকে, জহির রায়হান মোহাম্মদপুর থেকে, আমি ট্রেনে চড়ে প্রতিদিন আসতাম নারায়ণগঞ্জ থেকে। এফডিসিতেই আড্ডা, সেখানেই ফিল্ম। সে একটা সময় ছিল। সুন্দর সময়।