Beta

আহমদ ছফার উত্তর

০২ অক্টোবর ২০১৬, ১৪:২০

এই প্রথম দিনের সূর্য!

—‘সূর্য চিনিয়াছে রাতে, কি করুণ!
ইট্টু ধৈর্য ধরুন, ঠাকুর
তা হলে আমি কে?
যে লেখে নাকি কে লেখায় সে?
    —সাখাওয়াত টিপু

আমাদের এই ক্রমবর্ধমান ঢাকা শহরে অনেক খ্যাতিমান, নাতিখ্যাত এমনকি অতি অখ্যাতিমান লোকের নামেও দুই চারিটা পথঘাটের নাম রাখা হইয়াছে। অথচ মহাত্মা আহমদ ছফার নামে কোন গলিও নাই, অলিও নাই। এই জাতীয় নালিশ আমি কোন এক অজ্ঞান মুহূর্তে করিয়াছিলাম। শুনিয়া একজন বুদ্ধিজীবী আমাকে এক দিব্যঘণ্টা বক্তৃতা শোনাইলেন। নামে কি আসে যায়? ভদ্রলোকের নামটি আমি উপস্থিত মুহূর্তে আর মনে করিতে পারিতেছি না। ধরিলাম নামে কি আসে যায়?

বুদ্ধিজীবী ভর্ৎসনা করিয়া বলিতেছিলেন, বৎস, ভুল করিয়াছ। তুমি ভুল করিয়াছ। তুমি ভাবিয়াছ রাস্তা আঁকড়াইয়া মানুষের নাম বাঁচিয়া থাকে। বলিলাম, তাহা হইলে আপনার আদেশ? তিনি জানাইলেন মানুষের নাম লইয়াই রাস্তায় প্রাণের প্রতিষ্ঠা ঘটে। রাস্তা বাঁচিবে মানুষের নাম আঁকড়াইয়াই, কেবল রাস্তা আঁকড়াইয়া মানুষ বাঁচিবে না। তাহার আজ্ঞা পাইয়া প্রাণে সুখী হইলাম। তো আদব পুরা রপ্ত হয় নাই। পুনরায় জিজ্ঞাসিলাম, আপনি কি বাতলাইতেছেন উত্তরা বিমান বন্দরই হজরত শাহজালাল নাম—আল্লাহ তাঁহার মহত্ব অনুমোদন করিবেন—ধারণ করিয়া দীর্ঘজীবী হইতেছেন? তিনি ‘কাজ আছে’ বলিয়া চলিয়া গেলেন।

আমি আকৈশোর আহমদ ছফাকে ‘বুদ্ধিজীবী’ বলিয়া জানি। ততদিনে মানে ১৯৭২ সাল নাগাদ তিনি ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ নামে একটি এস্তেহারও প্রকাশ করিয়াছেন। এই এস্তেহারের প্রথম বাক্য পূর্ব বাংলায় অনুবাদ করিলে এমন কিছু হইবে—‘বুদ্ধিজীবীরা যাহা বলিতেন শুনিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হইত না’। প্রশ্ন হইতেছে, তাহা হইলে বাংলাদেশ স্বাধীন হইল কাঁহার কথা শুনিয়া? ইহা হইতে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত হইতে পারে। বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে বুদ্ধিজীবীদের কথা না শুনিয়া। অনুমান করিতেছি আহমদ ছফা ইহাই বলিয়া থাকিবেন। ইহা হইতে আরো একবাক্য সিদ্ধান্ত নামিতে পারে। আহমদ ছফা তাহা ভাবিয়াছেন কিনা ভাবি নাই। এমনও তো হইতে পারে হয়তো বাংলাদেশ স্বাধীনই হয় নাই। আমি সামান্য মানুষ। ভাবিতেই পারি না, বুদ্ধিজীবীর কথা না শুনিয়া দেশ স্বাধীন বা পরাধীন যাহাই হৌক কি করিয়া হইবে। অথচ কে না জানে বাংলাদেশ স্বাধীন করিবার যুদ্ধে যাঁহারা শহিদ হইয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী অনেকেই আছেন। তাহা হইলে আহমদ ছফা ইহার দ্বারা কি বুঝাইলেন? তিনি নিজেও তো বুদ্ধিজীবী গোত্রের লোক।

কলিকাতা হইতে মাত্র ফিরিয়াছেন তিনি। লিখিয়াছেন, ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস।’ তাঁহার সেই ‘বিতর্কিত’ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ বইয়ের ভূমিকা লিখিয়াছিলেন আরো খ্যাতিমান এক বুদ্ধিজীবী—বদরুদ্দীন উমর। ইনি জন্মস্থান বর্ধমান (অর্থাৎ শেষ বিচারে কলিকাতা) হইতে আসিয়াছিলেন। কাজেই তাঁহাকে আর স্বদেশে ফিরিতে হয় নাই। স্বদেশ ছাড়িয়াও স্বদেশেই আছেন তিনি। যতখানি মনে পড়ে, উমর সাহেব আহমদ ছফাকেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের একজন বলিয়া শনাক্ত করিয়াছিলেন। ইহা খুব ন্যায়ের কাজ হয় নাই বলিয়াই তখন আমার মনে হইয়াছিল। 

সত্য বলিতে আহমদ ছফার আসল মতলব ছিল অন্যকিছু। বাক্যের শেষাংশে পৌঁছিয়া ইহারই সাক্ষ্য পাইলাম। তিনি অধিক লিখিয়াছিলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা এখন (মানে ১৯৭২ সালে) যাহা বলিতেছেন শুনিলে দেশের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হইবে না।’ পাঠিকা এতদিনে বলিবেন, চল্লিশ বছরেও বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন হইয়াছে, না হয় নাই? যদি না হইয়া থাকে, তবে ইহার মধ্যে কি ভূমিকা বুদ্ধিজীবী কিংবা তাঁহার বুদ্ধিমান জীবনের?

বুদ্ধিজীবীদের মূল্য একটু বাড়াইয়া দেখিতেন আহমদ ছফা। ইহা আজ অস্বীকার করিবার বুদ্ধি আমার অন্তত নাই। আলী মনোয়ার নামে বাংলাদেশীয় এক ধুরন্ধর একদা নিউ ইয়র্ক নগরে বসবাস করিতেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি একদিন আমাকে বলিয়াছিলেন, ‘বাংলা ভাষায় বুদ্ধিজীবী বলিয়া কোন পদ নাই। কথাটি একান্ত আহমদ ছফার আবিষ্কার।’ এই ধুরন্ধরের প্রচার অনুসারে শুনিলাম আহমদ ছফা ছিলেন উনিশ শতকের বুদ্ধিজীবী। আমি মৃদু মাথা নাড়িলাম। বলিলাম বুদ্ধিজীবী বিশ শতকের মাল। উনিশ শতকে তো ‘বুদ্ধিজীবী’ বলিয়া কোন পদই ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল কিছু ‘ধুরন্ধর’।

বুদ্ধিজীবী
বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মধ্যে বুদ্ধিজীবীও এখন পড়িতেছে। এমত অবস্থায় কবি সাখাওয়াত টিপু একুশ শতকে আসিয়া বুদ্ধিজীবী নামক প্রাণীর পুনরাবিষ্কার সম্পন্ন করিলেন। ইহাতে আমার মনে হইল ঢাকা শহরের মশহুর ময়মনসিংহ রোড সংলগ্ন গলির নাম আহমদ ছফার নামে হইলেও যাহা হইত না আখেরে তাহার অধিক হইয়াছে। বাংলাদেশে এখন যাঁহারা ক্ষমতা ও সততা দুইটারই মালিক হইয়াছেন আহমদ ছফা তাঁহাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় নহেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত একটি পাঠশালা ছিল কখনো শাহবাগ আর কখনো বা পরিবাগে। আফসোসের কথা, ঢাকা শহর হইতে আজ তাহাও উঠিয়া যাইবার পথে বসিয়াছে। 

এমতাবস্থায় সন্দেহ হয় সাখাওয়াত টিপু না বুদ্ধিজীবী জাতীয় প্রাণী আবিষ্কার করিয়া আমাদের কাছে আবার নয়া আহমদ ছফা হইয়া উঠিতেছেন। ভাবিয়া দেখিতে হয় এই সাখাওয়াত টিপুটি কে। তিনি কোথা হইতে বা নাজেল হইলেন?

কবি কোথা হইতে আসেন—আজ পর্যন্ত আঁক কষিয়া কেহ কসম বলিতে পারেন নাই। নৈহাটির বঙ্কিমচন্দ্র ডেপুটি ছিলেন। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বাহির হইয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও বড় কবি। তিনি জমিদারবাড়ি হইতে পয়দা হইয়াছিলেন। বলিতে পারিতাম তিনিই দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্ম কবি। সেই কথা অন্তত আজিকালি কেহ বলেন না। সাখাওয়াত সম্পর্কেও তাই আমি তাই জাতপাতের কথা তুলিব না। তবে তাঁহার শ্রেণীর কথা না বলিলে বড় দোষের হইবে। কি সাহস তাঁহার?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লইয়া হাসেন!
এই প্রথম দিনের সূর্য!
—সূর্য চিনিয়াছি রাতে, কি করুণ!
ইট্টু, ধৈর্য ধরুন, ঠাকুর
তা হলে আমি কে?
এই জিজ্ঞাসা তিনি করেন কোন দুঃখে? কবিতার নাম ‘বাবা-বেটি দু’জনেই লেখে’। দুঃখ করিয়া ভাবিতেছিলাম, তিনি কেন কোন দুঃখে এই কথা লেখেন—
কি?
—মোদের শ্রেণীর নাম জানা নাই আর
 ঠাঁই কেন হয় দিন তার
 কেন পঁচিশের নয়, কেন হৈ ২৪ ঘণ্টার?
 কেন তা পঁচিশের নয়
 আজ মনে জাগে ভয়। 

একটু হুবহু তুলিয়া দিলাম। বুঝাইতে চাহিলাম সাখাওয়াত টিপু ঠিক আহমদ ছফার কথার পুনরাবৃত্তিও করিতেছেন না। আহমদ ছফার কাছে বুদ্ধিজীবীর কুশপুত্তলিকা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর সাখাওয়াতের আকাশে আগুন ধরিয়াছে। তিনি পণ করিয়াছেন এই কুশপুত্তলিকা পোড়াইয়া ছাই করিবেন। ঠাকুরের ‘মেলেনি উত্তর’ আর ‘পেল না উত্তর’ সজোরে ছুঁড়িয়া পূর্বাকাশে লাল তারার পেছনে ফেলিয়াছেন তিনি। আরেকটু পিছনে সরিলে চিনদেশ দেখা যাইবে। পড়েন তো দেখি—

অমন আঁধার কি জিনিস বাপু?
—আধারে আঁধার নামিতেছে, চোখে।
অই যে অরুণ করুণ তরাশে যাইতেছে হেসে
মোরা জাগিতেছি কার্ল মার্কসের বেশে
আহ্ কি তরুণ আকাশ
আমাদের অগ্নিমাখা শ্বাস কে কে নিতে আছে টানি
কারা অহরহ টানে এটমিক ঘানি?
এই প্রথম দিনের সূর্য! 
আহমদ ছফা হইতে সাবধান। বাণী উচ্চারণ করিবার পরও টিপু সাখাওয়াতকে বলিতে শুনিলাম:
হৃদয় আজিকে জাগিয়ে রাখিনু, তফা
আমার গুরুর নাম আ-হ-ম-দ ছ-ফা।
এই অবাক্যে আমার পুলক হয় কিন্তু পোড়া চোখে ঘুম আসে না। আজ পূর্ব আকাশেও পারমাণবিক বোমার ঘনঘটা। আর দক্ষিণ আকাশেও তাহার রামধনু দেখা দিয়াছে। জঙ্গ লাগিল লাগিল রে।

কোথায় আহমদ ছফা
সাখাওয়াত টিপুর সর্বশেষ বাক্যগ্রন্থ ‘বুদ্ধিজীবী দেখ সবে’ বিশেষ হইয়াছে ‘আহমদ ছফা’ কবিতা দিয়া। ইহার শুরুতেই বাঁকা ছাদের হরফে বয়ান করা হইয়াছে—
হে প্রশ্ন, তিনি যে নাই
তাহারে কেমনে জিগাই?

এই প্রশ্নের কি উত্তর নাই? সত্য সত্য নাই? তাঁহারে কেমনে জিগাই? তিনি এখন কোথায়? না। বিনয় না করিয়াই বলিব, প্রশ্নই উত্তর নয়। তবে প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর ছাপানো রহিয়াছে। ছাপানো মানে লুকানো। ভাবিয়াছিলাম জিজ্ঞাসা করিব, আহমদ ছফার ‘উত্তর’ (মানে তাঁহার ‘পর’) কি হইবে এই ভূ-বাংলাদেশে। ‘উত্তর’ (মানে ‘জবাব’) আকারে পাইলাম, উত্তর দিয়াই উত্তর কিনিতে হয়। ‘হে প্রশ্ন, তিনি যে নাই’—এই আর্তচিৎকারের মধ্যেই আমি তাঁহাকে দেখিতেছি।

‘আমি সব সময় মিছা কথা কহিয়া থাকি।’ বলিবেন কি পাঠিকা, আমি আপনাকে কি কহিতেছি? আহমদ ছফার ‘পর’ যদি সাখাওয়াত টিপুই হইয়া থাকেন তবে আহমদ ছফার ‘অপর’ কে? এই অপরও কি স্বয়ং তিনিই নহেন? আর আহমদ ছফার ‘জবাব’ যদি সাখাওয়াত টিপুও হইয়া থাকেন তবে তাঁহার উত্তর সাখাওয়াত টিপু বটেন। তিনি যদি তাঁহার ‘পর’ হইয়া থাকেন তবে তিনি তাঁহার ‘অপর’। আর যদি তাঁহার ‘অপর’ হইয়া থাকেন তবে তিনি তাঁহার ‘পর’। এই পরাৎপরের ভাববাদীদ্বয় কোন বাণী বহন করিয়া আসিতেছেন? আসিয়া দেখিয়া আসিবেন?

আট নয়। পাক্কা নয় নয়টি বছর আগের একদিন মরিবার সাধ হইয়াছে বলিয়া আহমদ ছফা মরিয়া গিয়াছিলেন। তাই বুঝি সাখাওয়াত লিখিয়াছেন, ‘তিনি যে নাই, তাহারে কেমনে জিগাই?’ থাকিলে তিনি ‘আছেন’ আর না থাকিলে তিনি ‘নাই’। আমরি বাংলা ভাষা! আপনার কি অপূর্ব রোশনাই! থাকিলে মান থাকে, না থাকিলে কিসের মান! কিসের অপমান! কিন্তু হায় রে অবোধ মানব-হৃদয়, যুক্তিশাস্ত্রের বিধান দেখি তোমাতে বহু বিলম্বেও প্রবেশ করে না!

আমরা অনেক আগেই দেখিয়াছি সাখাওয়াত টিপু বেশ মহাত্মা লোক। কারণ আহমদ ছফার অমৃত সমান বিতরণ করিয়া যাঁহারা বুদ্ধিজীবী হইয়াছিলেন পাছে লঘু হইয়া যান এই ভয়ে তাঁহারা গুরুর গুরুত্ব স্বীকার করেন না। টিপু কিন্তু মহীশূরের সুলতানের মতো অকপট এবং সাহসী। তাই তিনি অকাতরে লিখিতে পারেন—
হৃদয় আজিকে জাগিয়ে রাখিনু, তফা

আমার গুরুর নাম আ-হ-ম-দ ছ-ফা।

বাহবা বাহবা। অভিধানে দেখিলাম—পুরাপুরি বুঝিয়াছি কিনা কে জানে?—আরবি ‘তোহফা’ (তুহঃফহ্) শব্দটি ইরানের পথ পার হইতে গিয়া বাংলায় ‘তোফা’ হইয়াছে।

অভিধানে লেখে ইহার অর্থ বেশ, চমৎকার, সুন্দর, দুর্লভ। ‘তিনি যে নাই’—এই নাতিদীর্ঘ শ্বাসের মধ্যেই তিনি তোহফা ব্যক্ত হইতেছেন। তা তিনি নাই কিন্তু কোথায় নাই। সৈয়দ আলাওল কতদিন আগে লিখিয়া গিয়াছেন এই কথা। তাহা হইতে হরেন্দ্র চন্দ্র পালের ‘বাঙলা সাহিত্যে আরবী-ফারসী শব্দ’ নামের অভিধানেও দুই লাইন ধরা আছে:
হাদিয়ারে তোহফা আরবী ভাষে বলে।

মহতেরে দেয় ডালি দিব্য বস্তু হৈলে॥

আহমদ ছফা ‘নাই’ হইবার পর আমাদের এই দুই দিনের দুনিয়ায় আরো দুই চারি ঘটনা ঘটিয়াছে। যাত্রীবাহী বিমানের ধাক্কায় নতুন দুনিয়ায় বিত্ত-বেসাতের রাজধানী ধ্বসিয়াছে। অপরাধ ক্ষমাহীন হইয়াছে। আর এদিকে আমাদের পদ্মা যমুনা সুরমা মেঘনার মোহনায় সাখাওয়াত টিপু হাঁটু মুড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছেন। কবি বুদ্ধিজীবী হইয়াছেন। কে জানে কোন ঘটনার কি নাম! কতই বা তাহার দাম?

বলি বলিভিয়া ফের রবি রাগ থু’য়া
নিখিলের কথা শিখিতেছি হলুদিয়া
সাত সাত কাণ্ড কারখানার মুল্লুকে
কততুন পাড়ে ডাক মার্কিন উল্লুকে।
ইতরের প্রেমে মজে টিপু ডাকিলাম
লাজে কার লাগে হরি শ্রেণীসংগ্রাম॥

বিশেষ খণ্ড এয়ুরোপে বিগত তিরিশ বছরের যুদ্ধ শেষ হইবার পর আমরা ইতরেরা ভাবিয়াছিলাম—মানে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হইয়াছিলাম—আমরা স্বাধীন হইয়াছি। উপনিবেশ ব্যবসায়ের দিন গত হইয়াছে আর স্বাধীনতা ব্যবসায়ীর দিন আগাইয়া আসিয়াছে। অথচ কি কাণ্ড! হজরত ইসার দুই হাজার বছর পার হইবার আগেই দেখিলাম, আগুন!

আবার আগুন লাগিয়াছে। যাঁহারা পাততাড়ি গুটাইয়াছিলেন, তাঁহাদের নতুন নেতা মার্কিনদেশের যুক্তরাষ্ট্র আকারে আবার উপনিবেশ বসাইবার জন্য এটমিক ঘানি লইয়া আমাদের ঘাড়ে বসিতেছেন। পরাধীনতা ব্যবসায়ের গায়েও এখন নতুন জামা। তাহাতে লেখা মানবাধিকার, নারীর মর্যাদা, সুশাসন ও সুশীল সমাজ। আরও কত কি!

সাখাওয়াত টিপু গাহিয়াছেন : ‘আজ আছি কাল নাই’ দু’দিনের দুনিয়ায়। আর সেখানে আবারও আগুন। কোথায় যে যাই!

দ্রিম দ্রিম দ্রিম ছোটে যখন তখন
মম চক্ষু জুড়ে জ্বলিতেছে বেবিলন
কবির চোখ কি এই আগুনেই অন্ধ হইয়া যাইবে? যদি অন্ধই না হইত তবে কি করিয়া ‘দালাল ফপর সুশীল বৈশাখে’ কবিতা লিখিত?
আমাগোর দেশ আজিব চিড়িয়াখানা
ময়ূরের পিঠে সজারু তাহার উপরে হায়না
এইখানে কার মুখ কেউ সহজে দেখে না! 

তাই বলিতেছিলাম, আহমদ ছফার মুখ তাঁহারা দেখিবেন না। যে মানুষ আহমদ ছফার সামনে খাড়াইতে পারে না সে মানুষ এখনও খাড়ায় নাই, দাঁড়ায় নাই। সে ধনুর্মুক্ত শরের ন্যায় লম্বা হইয়া আছে। কার্ল মার্কস মহাশয়ের নব্যবাক্য ধার করিয়া সাখাওয়াত টিপু বলিয়াছেন, ‘মানুষ যখন নিজের সামনে খাড়ায় তখন আদতে সে অপর মানুষের সামনে খাড়ায়।’

আজ বাংলাদেশে—সুতরাং আমাদের এই পৃথিবীতেই—বুদ্ধিজীবীরা কি করিতেছেন? ভিয়েতনাম যুদ্ধের দিনে—১৯৬০ সালের দশকে—বার্ট্রান্ড রাসেল ও জাঁ-পল সার্ত্র গণহত্যার বিচার করিয়া রায় দিয়াছিলেন। আজ বুদ্ধিজীবীরা ‘প্লেবয়’ পড়িতেছেন। মনে ভক্তি, পকেটে টাকা। এ জীবন লইয়া কি করিবেন তাঁহারা? পাহারা দিবেন? টিপু বলিতেছেন, তাঁহারা এখনো বঙ্কিমবাবুর দেশেই আছেন। বঙ্কিমবাবুর দেশ যে কোন সন্দেশ? যে দেশে আহমদ ছফা নাই সেই দেশ? আহমদ ছফা যে সত্য সত্যই নাই তাহা নয়। হইলে টিপু কি করিয়া লিখিতেন—

হায় রাম কোন পায়ে
রাখিনু প্রণাম
সারাদেশে কাঁটাতার
বন্দে মাতরম?

সকলেই জানেন আহমদ ছফা শেষযাত্রায় যাইবার আগে ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ বলিয়া এক বঙ্কিম-বন্দনা লিখিয়াছিলেন। যে দুর্বুদ্ধিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একদা ‘বন্দে মাতরম’ লিখিয়াছিলেন দুর্ভাগ্যের দ্বিতীয় দিনে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথও তাহার পাড় ছাড়াইয়া যাইতে পারেন নাই।

সেকালের জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে আহমদ ছফা আপনকার ‘গুরু’ বলিয়া আনন্দ পাইতেন। তিনি নালিশ করিয়াছিলেন, বাংলার মাটি বাংলার জল লিখিয়াছেন যিনি তিনিও বাংলার ভাগ্যবঞ্চিত সংখ্যাগুরু মানুষের ভাগ্যবদলের লড়াইকে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলিয়া তুচ্ছ করিতে কসুর করেন নাই। দুঃখের মধ্যে, এমনকি আহমদ ছফা পর্যন্ত ইহার তাৎপর্য ধরিতে সক্ষম হয়েন নাই। দরবিগলিত টিপু হরিজন। তিনি ঠাহর করিয়াছেন, ‘বঙ্কিমবাবুর দেশে কোন প্রেমিকাই নাই।’ ঘৃণার মধ্যে ঘুমাইয়া পড়ি, ঘৃণার মধ্যে জাগি। এমন দেশে আবার প্রেমের বাণী! 

বেবিলনের আগুনের আঁচ তিনি বাগদাদে—চামড়ার দাদে—পাইতেছেন, চোখেও ফোস্কা পড়িতেছে। তাঁহার আক্ষেপ বঙ্কিম গোরা, রবি গোরা, কবি গোরা, সকলি গোরা, প্রভুও গোরা। চোখে তাঁহার আহামরি ‘রঙিন মার্বেল’।

গোরাদের চোখ দেখে দেখে
আমরাও কি হতেছি অন্ধ
কে দেবে গো চোখ?
না দেখার দিনে
এমন কি লোক
রঙিন মার্বেল কিনে
বসাবে দু’চোখ!

বাংলা ভাষায় যাহার এক চোখ নাই তাহাকেই লোকে ‘কানা’ বলে। লোকে হয়তো ভাবে চোখের অভাবটা কানের বাড়তি ভাব দিয়া পুরায়। তাই তো একচোখা লোককে অন্য লোকে কানা বলে। এই স্তুতি কিন্তু বিশুদ্ধ ব্যাজস্তুতি হয় নাই। ইহাকে ‘লক্ষণা’ বলাতেই বরং আনন্দ। রাতকানা লোকের ভালোমন্দ ইহাতেই নিহিত আছে। বুদ্ধিজীবী বলিতে সাখাওয়াত টিপু কি এই কানামণ্ডলির দিকেই অঙ্গুলি হেলান নাই? ফকির লালন ধরিয়াছেন বাংলা মুলুকের এই লঘু কবি। তাহাকে কি বলিব? একুশ শতকের জাতীয় কবি?
এক কানা কয় আর এক কানারে
চলো যাই ভব পারে
নিজে কানা পথ চেনে না
পরকে ডাকে বারে বার 
এখন বুদ্ধিজীবী মানে তাই আর ‘শহিদ’ বুঝাইতেছে না। বুঝাইতেছে ‘কানা’। জমানা বদল হইয়াছে। ইনসান আর ইনসান হইয়া জন্মাইতেছে না। সব সুনসান। পেটে বাচ্চার বদলে এখন বোমা। ১৯৭১ কি ১৯৭২ সাল আসিয়াছে। সাখাওয়াত টিপু মাত্র জন্মিয়াছেন কি জন্মাইবেন জন্মাইবেন কিলবিল করিতেছেন। আর এতদিনে তিনি খবর পাইয়াছেন, বিলাপ করিতেছেন ‘যেন শহীদের কোন স্মৃতি নাই, যেন সব উরুসন্ধি।’

জার্মানদেশের প্রখ্যাত এয়াহুদি বুদ্ধিজীবী টিয়োডোর আদর্নো একদা কহিয়াছিলেন, ‘আয়য়ুশবিৎসের পর আর কবিতা সম্ভবপর নহে।’ ‘দুই দিনের দুনিয়া’ কবিতায় সাখাওয়াত টিপু দেখিতেছি তাঁহার সহিত দুই মত হইয়াছেন। লিখিয়াছেন, ‘কাল থাকা দরকার’ এই দুই দিনের দুনিয়ায়।

হঠাৎ থমকে দেখি ধলা ভগবান
গুচ্ছ গুচ্ছ তুচ্ছ তবে
বোমা বাহিরে উড়িতে
কার ভাগ্যে বেহিসেবে
মৃত্যু বাটোয়ারা হবে
প্রসব করিছ ঘৃণা ধর ভাইবোন

বুদ্ধিজীবীরা তাহার পরও—আয়য়ুশবিৎস আর বাগদাদের পরও—কবিতা কিন্তু লিখিতেছেন। শান্তির ঘোড়ার ডিম বেচিয়া ঝিম মারিতেছেন। কাহারও কাহারও ধারণা কবিতা লিখিলে বুঝি শুদ্ধ বলিতে হয় ‘আজ আছি কাল নাই’। সাখাওয়াত টিপুর কথাটা, তাঁহারা বলিবেন, কবিতাই হইল না। হায় কপাল! লিখিলেন তিনি দফায় দফায়—

দু’দিনের দুনিয়ায়
তিন বেলা কারা খায়
এই ‘কারা’ শব্দের অর্থ কোথায়? ‘কাহারা’য়? না ‘কারা’গারে, জিঞ্জিরখানায়? এখানে ‘চোর দেখে রাত যায়, হায় কবে রে বসন্ত’। দুনিয়া বদলাইয়া গিয়াছে। মানুষ দাস হইয়াছে। প্রভুও হইয়াছে। সব সাচ হইয়াছে। কেহ এখনো মানুষ হয় নাই। দাস ও প্রভুর এই লড়াইয়ের মধ্যে কানার মতো যাঁহার আবির্ভাব হইয়াছে তাঁহার নাম ‘বুদ্ধিজীবী’। সাখাওয়াত টিপুর মধ্যে তাই বলিতেছিলাম আহমদ ছফা আবার জীবন ধারণ করিতেছেন। বুদ্ধিজীবী শব্দের এক অর্থ তাই এখন উকিল, বেশ্যা কিংবা দালাল প্রভৃতি শব্দের নিকট পৌঁছিয়া গিয়াছে। অথচ তাঁহারা ভাবেন তাঁহারা ‘মানুষ’ হইয়াছেন। বুদ্ধিজীবী পদের আরেক অর্থ এখনো ‘শহিদ’ মানে সাক্ষী। সাখাওয়াত টিপু সাক্ষী বনিয়াছেন।

বুদ্ধিজীবীরা এখন কে কোথায়?
আলোস্য বদনে তবে
বাতাসে বসিয়া সবে
আলোক ধানের তকতা বানায়। 

রাজনীতিচোরা বুদ্ধিজীবী
সাক্ষী বলিয়া সাখাওয়াত টিপু লঘু হয়েন নাই। তাঁহার গুরু আহমদ ছফা। বুঝাইয়া বলিব? ইঁহাদের সামান্য আগে নতুন দুনিয়ার আরেক দেশে দুই বেলা ভুট্টার রোটি খাইয়া বাঁচিয়া ছিলেন আরেক কবি। মধ্য আমেরিকা মহাদেশের অন্তঃপাতী ক্ষুদ্র দেশ গুয়াতেমালার কবি অতো রেনে কাস্তিয়ো (১৯৩৬-১৯৬৭)। ১৯৬৭ হজরত ঈসায়ি সনে গেরিলা যুদ্ধে ধৃত হইয়া পীড়িত ও নিহত হইয়াছিলেন। তাঁহার এক অবিস্মরণীয় কবিতা আমাদের যুগে সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। 

সকলেই জানেন স্পেন হইতে গিয়া যাঁহারা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা জবরদখল করিয়াছিলেন তাঁহাদের বংশধরেরাই এখনো সেই সকল দেশে রাজত্ব করিতেছেন। তবে তাঁহারা নানান রাষ্ট্র আকারে সংগঠিত আছেন। এয়ুরোপ হইতে নির্গত এই ধলা ভগবানদের অত্যাচারে সেই পুরাতন দেশের নাম যেমন বদলাইয়াছে তেমনি বিগড়াইয়াছে তাহার ক্ষমতার, সম্পদের ও মালিকানার বিতরণ। গুয়াতেমালার নতুন রাষ্ট্রপতি এয়াকোবো আরবেন্স একদা—১৯৫২ সালে—বড় বড় জমিদারদের দখলে পড়িয়া থাকা পতিত জমি ক্ষতিপূরণ বা দক্ষিণা দিয়া রাষ্ট্রের দখলে লইয়াছিলেন। ইহার জন্য জাতীয় সংসদে প্রথা মতো আইনও পাশ করানো হয়। সেই জমি উদ্ধার করিয়া যাঁহাদের নামে জমিজিরাত ছিল না তাহাদের মধ্যে বাঁটিয়া দেওয়া হয়।

সেই সময় ঐ দেশের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি রাজত্ব করিত। ফলের বাগান হইতে শুরু করিয়া নগর বন্দর পর্যন্ত সকলই ছিল তাঁহাদের নিয়ন্ত্রণে। রাষ্ট্রপতি আরবেন্সের সংস্কারকর্ম বিদেশি পুঁজির একচেটিয়া ব্যবসায় হইতে জাতীয় ধনের শরিকানা কাড়িয়া লইল। আপন দেশের গরিব চাষি ও সামান্য মজুরদের ভাগ্য ফিরাইতে মনস্থ করিল। ইহা ১৯৫৪ সালের কথা। কুবাদেশের বিপ্লবখ্যাত তরুণ আর্নেস্তো গেবারা ওরফে চে মাতৃভূমি আর্হেন্তিনা হইতে মোটর সাইকেলে চাপিয়া সেদেশে গিয়াছিলেন। খবর লইয়াছিলেন এই ঘটনার।

গুয়াতেমালায় ভূমি সংস্কার আইন পাশ হইয়াছিল ১৯৫২ সালের ১৭ জুন তারিখে। দুই বছরের মাথায় ১৯৫৪ সালের ২৭ জুন তথাকথিত সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁহাদের ক্ষমতা ছাড়িতে হইল। এই সামরিক অভ্যুত্থানের খাস অর্থাৎ প্রকৃত নায়ক মার্কিন দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। আরবেন্সের সংস্কার মার্কিন দখলদার ব্যবসায়ী এয়ুনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির গায়ে বিশেষ হাত দেয় নাই। তবুও যাহাকে বলে বিড়াল মারিতে হয় পহিলা রাতেই। তাহাই মারিলেন তাঁহারা। অতো রেনে কাস্তিয়ো এই ১৯৫৪ সনের পর দেশের প্রাণ উদ্ধারের রাজনীতিতে নাম লিখাইলেন। সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সদস্য হইলেন। তাঁহার কবিতা এখানে তর্জমা করিয়া দিতেছি। ৩০ বছর বয়স্ক কবির শাহাদাত বরণের পর প্রকাশিত ‘বামোস’ বা ‘চলো যাই’ সংকলনে এই কবিতা স্থান পাইল। তারপর বহু সংকলনেই ঢুকিয়া পড়িয়াছে এই অমোঘ আলেখ্য। এই কবিতার নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘ইনতেলেক্তুয়ালেস আপলিতিকোস’ বা ‘রাজনীতিচোরা বুদ্ধিজীবী’।

একদিন
আমার দেশের
রাজনীতিচোরা
বুদ্ধিজীবীদের
জেরা করিবেন
আমাদের দেশের
সহজ সরল জনসাধারণ।
তাঁহাদের প্রশ্ন করা হইবে
তাঁহাদের দেশখানি যেদিন
ধীরে ধীরে
মিঠমিঠা আগুনের মতন
খুদে আর একেলা একেলা
মরিয়া গেল তাঁহারা কি করিয়াছিলেন।
তাঁহাদের কেহই জিজ্ঞাসা করিবে না
বাহারি জামা ও কাপড়ের কাহিনী
দুপুরে খাবার পর
টানা ঘুমের গল্প
শূন্যতা লইয়া তাঁহাদের নিষ্ফল ঝক্ড়ার
কি হইল সে কথা জানিতে চাহিবে না কেহ
পুঁজিবাজারে খেলার পদার্থবিদ্যায়
কাহারও মাথাব্যথা হইবে না।
গ্রিক পুরাণে কে কতটা দক্ষ ছিলেন
কিংবা সেদিন
তাঁহাদের কেহ কেহ আত্মগ্লানির নরক অনলে পুড়িয়া
কাপুরুষের মৃত্যুবরণ করিলেন কি করিলেন না—
না, কোন পরীক্ষায় আসিবে না সেইসব প্রশ্ন।
ডাহা ডাহা মিছার 
ছায়ায় তাঁহারা
উদ্ভট সাফাই
গাহিবেন
না, এই প্রশ্নও করা হইবে না তাঁহাদের।
সহজ সরল মানুষ
সেদিন আসিবেন।
রাজনীতিচোরা বুদ্ধিজীবীদের
কেতাবে আর কবিতায়
জায়গা জোটে নাই যাহাদের
রোজ রোজ যাহারা
যোগাইয়াছে তাঁহাদের রোটি আর দুধের আহার
তাঁহাদের ভুট্টার পিঠা, তাঁহাদের ডিম
দরজির রিপু আর
গাড়োয়ানি যাহারা করিয়াছে
কুকুরপোষা, বাগানতোলার
কাজে গাধার খাটুনি খাটিয়াছে যাহারা
    তাহারা বলিবে
‘গরিবেরা
দুইবেলা না খাইয়া থাকিল যেদিন
প্রেম-ভালোবাসা, মোহাব্বত, শেষ নিঃশ্বাস
পুড়িয়া ছাই- সেদিন কি করিতেছিলে তোমরা?’
আমার সোন্দর দেশের
রাজনীতিচোরা বুদ্ধিজীবী হে
মগর কোন উত্তরই দিতে পারিবে না তোমরা সেদিন।
চুপচাপ এক শকুনি আসিবে সেদিন
ছিঁড়িয়া ফাড়িয়া খাইবে তোমাদের নাড়িভুঁড়ি!
তোমাদের যাহার যাহা কিছু গ্লানি তাহারাও আসিবে
কলিজার বোঁটায় ঠোক্কর মারিবে
আর তোমাদের কিছুই কহিবার থাকিবে না
একদম চুপ মারিয়া থাকিবে তোমরা। নিশ্চুপ।

আছেন কোন ভাষায়
অতো রেনে কাস্তিয়োর এই কবিতাটি কি কারণে কবিতা হইল? ইহাকে তো এস্তেহারও বলা যাইবে। তারপরও দাবি ফুরাইবে না। কবিতাও বলিতে হইবে। কেন? আমার তর্জমায় ইহার সবকটি গুণ টানিতে পারি নাই। ইহার ভাষা আর ভঙ্গিও তাঁহার—মানে আমার—দেশের ‘সহজ সরল জনসাধারণের মতন’। টিপুর কবিতা কি রকম? শুনিয়াছি সাখাওয়াত টিপুর ‘বুদ্ধিজীবী দেখ সবে’ বইটির আলোচনা লিখিবার অবসর বেশি মানুষের হয় নাই। যাঁহারা লিখিয়াছেন তাঁহারাও ইহার ভাষার মধ্যে ‘পরিকল্পিত নৈরাজ্য’ দেখিয়াছেন। আমি বলি এই মন্তব্য যথাযথ। ইহা ছাড়া উপায় কি? উপায় কোথায়? কোন দেশে?

আম্রা কালা জমানার
বোমভোলা মাগনার
    পুত!
তোম্রা বুদ্ধিজীবী অতি
ডান পাশে রাখে সতি
মগুজে টেকার নোট
বামে থিকা বারটায়
জ্ঞান কাণ্ড কেরা খায়
অ্যাঁ কমরেড সেল্যুট
বুদ্ধিজীবীরা এখন কে কোথায়?

হায়, হা মীম! ইহাই গাত্রধর্ম। সাখাওয়াত টিপুর এই ‘নৈরাজ্য’ রাজ্যের গায়ে নতুন কাঁথা জুড়াইবার অনিবার্য বর্ম মাত্র। তাঁহার ভাষার আরও সমর্থন পাইলাম পশ্চিম দুনিয়ার ঈর্ষা, মার্তিনিকের কবি, এমে সেজেরের কথায়। হাইতিদেশের কবি—ইনিও কালোসোনা—রনে দেপেস্ত্রর সহিত আলাপে তিনি একদিন কহিতেছিলেন, ‘আমি তো কবিতা বর্জন করিয়াই মাত্র কবি হইয়াছি—প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য কথা ইহাই। কথাটার মর্ম বুঝিয়াছেন? সেকালে চলিত ফরাশি কবিতার ভাষা আমার গলা যেভাবে চাপিয়া ধরিয়াছিল তাহাতে বাঁচিবার পথ খোলা ছিল একটাই। ঐ পথের নাম কবিতা।’ ইহার পর আর কথা বাড়াইবার দরকার আছে কি? কবি টিপু দাবি করিয়াছেন—
যা কিছু জরুরি আজ জিহবা দিয়া বোঝা যায়
গত অধ্যাপকদের কবরে রঙিন টিভি চাই
যেন বুদ্ধিজীবীদের মুখ বাজারে দেখিতে পাই।

অতীত ও ভবিষ্যৎ
এখন হইতে কিছু বেশি সাত বছর আগে সাখাওয়াত টিপুর আবির্ভাব হয় ‘এলা হি বরষা’ পুচ্ছধারী এক বাক্য গ্রন্থ ভর করিয়া। সেই আবির্ভাব ছিল তিরোভাবের নিকটতম তুলনা, করুণ রাতের সূর্যের মতো। তখন আহমদ ছফা আর নাই। আফগানিস্তান হইতে বোমার স্প্রিন্টার আসিতেছে। নরবাদিনীর সঙ্গে লিঙ্গ লইয়া কথা কহিতে কহিতে যে কৃত্রিম উত্তেজনা হয় তাহাও নাই। সেই দুর্দিনের কথা ভাবি, আর আমার হাত পা শীতল হইতে থাকে। সেই দিন হইতে আমিও ভবিষ্যদ্বাণী আকারে বসবাস করিতেছি। তখনো অসাধু ভাষা ছাড়িতে পারি নাই। আজকের অজানা এক লজ্জাপাত্রে সেদিন লিখিয়াছিলাম, ‘আমার ভবিষ্যদ্বাণী সচরাচর ভুল হয়। সেই ঝুঁকি অক্ষুণ রেখেই আরেকবার বললাম—মারহাবা, বাংলা ভাষা। মারহাবা তোমার জাতীয় সাহিত্য, মারহাবা তোমার গাঁ (গ্রাম) ও গতর (শহর)। এলা হি বরষা—আপনি বঙ্গের জাতীয় ভরসা।’ 

আজ প্রায় দুই বৎসর হইতে চলিল ‘বুদ্ধিজীবী দেখ সবে’ বাজারে আসিয়াছে। পড়িয়া বুঝিলাম ঐ অতীতবাণী ষোল আনা ভুল হয় নাই। সাখাওয়াত তাঁহার কেতাবের পর্দায় নিজের মুখচ্ছবি লাগাইয়াছেন। তাঁহাকেও বেশ বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী লাগিতেছে। আমি ঠিক কেন যেন ঠাহর করিতে পারি না, বুদ্ধিজীবী লইয়া কি করিব? আমার বান্ধবী বলিলেন, ‘আজ্ঞে, আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিও। বুদ্ধিজীবীরা তোমাকে লইয়া কি করিবে, তাহাই বরং বল।’ সে আমাকেও বুদ্ধিজীবী বলিয়া দুদণ্ড শান্তি অথবা শাস্তি দিল।
নাটোরের হাওয়া লাগিল। বলিলাম, ‘বুদ্ধিজীবী দেখ সবে’ কথাটা বেশ। তাই না! ‘সবে’ মানে কি? ‘সকলে’—সে বলিল। আমি বলিলাম, ‘এইমাত্র’। সে যুক্তিবাদীনি। বলিল, ‘বৈকি।’ আমি বলিলাম, ‘আজ্ঞে’। এই প্রথম আলো ফেলিলাম—‘বুদ্ধিজীবী দেখ সবে’। বলিলাম, বুদ্ধিজীবী মানে কি?’ সে বলিল বুদ্ধিজীবী মানে ‘শহিদ’। আমি বলিলাম ‘এখন বুদ্ধিজীবী মানে যে বুদ্ধি বিক্রয় করিয়া জীবন ধারণ করে, অর্থাৎ বেশ্যা, উকিল প্রভৃতি। বুদ্ধিজীবী মানে উত্তেজনা প্রশমনকারী। কেহ বলিবেন বিবৃতি দাতাগণই বুদ্ধিজীবী।’ সাখাওয়াত টিপুও কি বুদ্ধিজীবী? না কি একমাত্র রবীন্দ্রনাথই এই পদবীর উপযোগী? তাহা হইলে আমার মুখবন্ধের নাম ‘আহমদ ছফার উত্তর’—ইহার অর্থ কি? সে বলিল ‘আহমদ ছফার জবাব’। আমি কহিলাম ‘আহমদ ছফার পর’।

তাঁহার সহিত উনচল্লিশ বছর পর দেখা। মেজাজ বিগড়াইয়া সে বলিল, ‘তোমার কথা বলিবার ঢক দেখি এতদিনেও বদলাইল না।’ তর্ক বহালই থাকিল। এখনো আছে। আমি ভগবান বুদ্ধকে স্মরণ করিলাম। চুপ করিয়া থাকিলাম। আমার স্বভাব একটুও বদলায় নাই। বান্ধবী বলিল, ‘আহমদ ছফার উত্তর আর কিছু নয়, তোমার মাথা।’ তাহাতেও আমার মাথা কিন্তু নড়িল না।

ঢাকা ২০১১

দোহাই

১.    সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী (ঢাকা : আগামী প্রকাশনী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০১০)।

২.    সাখাওয়াত টিপু, বুদ্ধিজীবী দেখ সবে (ঢাকা : অনঘ প্রকাশনী, ২০০৯)।

৩.    সাখাওয়াত টিপু, এলাহি বরষা, ২য় সংস্করণ (ঢাকা : অনঘ প্রকাশনী, ২০১০)।

৪.    হরেন্দ্র চন্দ্র পাল, বাঙলা সাহিত্যে আরবী-ফারসী শব্দ (ঢাকা : বাঙলা ও সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৭)।

৫.    Aimé Césaire, ‘Interview with René Deprestre,’ in Discourse on Colonialism, trans. Joan Pinkham, reprint (New York: Monthly Review Press, 2000).

৬.    Jean Bricmont, Humanitarian Imperialism: Using Human Rights to Sell War, trans. Diana Johnstone (New York: Monthly Review Press, 2007).

৭.    Martin Espada, ed., Poetry like Bread: Poets of Political Imagination from Curbstone Press, new and expanded ed. (Willimantic, CT: Curbstone Press, 2000).

(পরিবর্ধিত ২০১৬)

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement