Beta

সাদত হাসান মান্টো ও দাঙ্গার ইতিহাস

১২ মার্চ ২০১৬, ১৬:০৪ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০১৬, ১৬:১২

তাহমিদাল জামি

মান্টো প্রথম গল্প লেখেন ১৯ বছর বয়সে, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে। সে বৈশাখী উৎসবে শিখ, মুসলমান, হিন্দু, সকলেই ছিল। পাঞ্জাবের একটি সমন্বয়বাদী ইতিহাস আছে, শিখ ধর্মের আদি ইতিহাসে কিংবা পাঞ্জাবে সুফিবাদের আদি পর্যায়ে সে ঐতিহ্য আছে। কিন্তু ১৯১৯ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ খর-প্রখর হয়ে উঠল এবং শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাবকে যখন দুই ভাগ করতে হলো, তখন হিন্দু, মুসলিম, শিখ পরস্পরের বিরুদ্ধে খুন-ধর্ষণ-লুটতরাজে মেতে উঠল।

১৯৪৭ সালের এই দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মান্টোর লেখার অন্যতম প্রধান বিষয়। মান্টো দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প লেখক। তবু আর সবকিছু ছেড়ে দিলেও দেশভাগবিষয়ক লেখার কারণে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আমরা আজও মান্টোর যুগেই বাস করছি। দেশভাগের দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িকতা, অখণ্ড ভারততত্ত্ব ও দ্বিজাতিতত্ত্ব, ইত্যাদি প্রশ্ন আজও উপমহাদেশে জীবন্ত ও সক্রিয়। ১৯৪৭ সালও ’৪৭ সালেই শেষ হয়ে যায়নি। ১৯৭১ ছিল ’৪৭-এর একটি প্রতি-মীমাংসা। কিন্তু উপমহাদেশে তবু ’৪৭-এর সংকট নিঃশেষ হয়নি।

মান্টো দাঙ্গা বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শুধু চিত্রই আঁকেননি, তার কারণ উদ্ঘাটনেও মনোযোগী হয়েছেন। দাঙ্গার বিচার-বিশ্লেষণ যাঁরা করেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িক চেতনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কথাও উল্লেখ করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ আয়েশা জালাল পাঞ্জাবের দাঙ্গার রূপ বিচার করে বলেছেন সম্পদ, জমি ও নারীর ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা দাঙ্গার ঘটনাবলির নির্ধারক ছিল। বাংলাদেশেও দাঙ্গার কারণ, দাঙ্গাকারীদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য এবং দাঙ্গার ফলাফল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থগুলোকে তুলে আনা হয়েছে। তথাপি ধর্মচেতনা ও সাম্প্রদায়িকতার গোড়ার সংকটটি স্বীকার না করে উপায় নেই।

সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে সমাজ যখন শুধু বিভক্ত নয়, বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে, তখন সে সমাজে দাঙ্গার পূর্বশর্ত মজুদ থাকে। উপমহাদেশে দেশভাগকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার গোড়ায় এই বিচ্ছিন্নতা ও ভেদবুদ্ধি জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। ১৯২০ সালে সওগাত পত্রিকায় পুরাতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক নলিনীকান্ত ভট্টশালী ‘কবি কায়কোবাদের মহাশ্মশান’ প্রবন্ধে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক নিয়ে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘প্রায় হাজার বছর ধরিয়া পাশাপাশি বাস করিতেছি, এখনও কি পরস্পরকে বুঝিবার সময় উপস্থিত হয় নাই?’ ভট্টশালীর এই কথার প্রতিধ্বনিস্বরূপ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের আক্ষেপও শোনার যোগ্য :

“ভারতবর্ষে যখন মুসলমানগণ শাসক ও অধিকারী বেশে আসিলেন, তখন রক্ষণশীল ভারতবাসীগণ এই নূতন আকৃতি-প্রকৃতি এবং সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্ম, সমাজ, রীতি-নীতি, আচার, আদর্শ-বিশিষ্ট জাতির অধীনে নিজদিগকে সম্পূর্ণ অসহায় বোধ করিল। শাসক-শাসিতের মধ্যে সমঝোতা পারস্পরিক জানাজানি অপরিহার্য হইয়া উঠিল। ফলে ধর্ম সমন্বয়ের জন্য ‘অল্লোপনিষত’ রচিত হইল। দাদু, নানক, কবীর, চৈতন্যদেব প্রমুখ সাধকগণ এ পথে জীবন উৎসর্গ করিলেন। আকবর হইতে মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত অনেক রাষ্ট্র সাধকও এ ব্যাপারে কম চেষ্টা করেন নাই। বাংলা দেশে চরম বাণী প্রচারিত হইল,

“নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ-দুধ।

জগত ভরমিয়া চাহিলাম একই মায়ের পুত।।

অথবা “সবার উপরে মানুষ সত্য—তাহার উপরে নাই”।

দুই সমাজেই স্বাতন্ত্র্-প্রয়াসী স্বধর্মানুগ অপর একটি দল ছিল। তাহারা সর্বত্রই মিলন-মুখী সাধনার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া আসিয়াছেন। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় বাঙ্গালাদেশেও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে এই দুই ধারার সাধনা চলিয়াছে চিরকাল। আধুনিক সাহিত্যে তো আপনারা তাহা দেখিতেছেন। শেষ পর্যন্ত স্বাতন্ত্র্-বাদীরাই জয়ী হইয়াছে। শেষ পর্যন্ত হিন্দু-মুসলমান পৃথক হইলেও পৃথক থাকিতে বাধ্য হইয়াছে। অসংখ্য সমন্বয় সাধকের সকল সাধনা ব্যর্থ হইয়াছে।”

সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেদবুদ্ধি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কীভাবে দেশভাগ অনিবার্য করে তুলল, সে কথা মান্টো দেখিয়েছেন ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ নামক গল্পে। আমার মনে হয়, এই গল্পটিকে একটি রূপকালেখ্য বা এলিগরি বলা যেতে পারে। দুজন প্রতিবেশী ছেলেমেয়ে—একজন হিন্দু আরেকজন মুসলমান—তাদের মধ্যে ভালোবাসা আছে, কিন্তু একের ধর্মের প্রতি অপরের অবজ্ঞার কারণে শেষ পর্যন্ত মিলন-মঙ্গল আর ঘটতে পারে না। গল্পের ক্লাইমেক্সে দুজনের মধ্যে একটা দরকষাকষি হয়। মুসলিম ছেলে হিন্দু মেয়েটিকে মুসলিম হতে বলে, আর হিন্দু মেয়ে মুসলিম ছেলেকে ধর্মান্তর করতে বলে। প্রশ্নটা দাঁড়ায় কে নিজের ধর্মের লঘুত্ব ও অপরের ধর্মের গুরুত্ব মেনে নেবে কিংবা পরস্পর মিলিত হওয়ার স্বার্থে আত্মপরিচয় বিসর্জন দেবে, অর্থাৎ কে একপ্রকার সংখ্যালঘুর ভাগ্য বরণ করবে। শেষ পর্যন্ত তাদের বনিবনা হলো না। আলাদা হয়ে যেতে হলো। দেশভাগ হলো।  

মিলনের স্বার্থে আত্মপরিচয় বিসর্জন দেওয়ার রাজনৈতিক প্রশ্নটি শুধু দেশভাগের বেলায় ওঠেনি। এটি আধুনিক রাষ্ট্রের একটি গোড়ার প্রশ্ন। এ প্রসঙ্গে মার্ক্সের ‘ইহুদি প্রশ্ন’ নামক প্রবন্ধটি স্মরণীয়। এই প্রবন্ধের অনেকে অপব্যাখ্যা করে থাকেন। যাঁরা সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের জন্য সমাজের সংখ্যালঘুর আত্মপরিচয় আঁকড়ে ধরাকেই দায়ী করেন, তাঁরা মার্ক্সকে উকিল ধরতে চাইলে সেটা মিথ্যাচারে পর্যবসিত হয়। তাঁদের উকিল হলেন ব্রুনো বাউয়ের, যিনি মনে করতেন জার্মানির সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যদি রাজনৈতিক অধিকার চায়, তাহলে আগে তাদের স্বধর্ম বিসর্জন দিতে হবে। মার্ক্স ইঙ্গিত করেছেন যে রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নাগরিকতার শর্ত হিসেবে, রাজনৈতিক সমাজে তার অন্তর্ভুক্তির শর্ত হিসেবে তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে বাতিল করাকে শর্ত হিসেবে আরোপ করে, তখন রাষ্ট্র নিজেই সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। ফরাসি বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লবের প্রক্রিয়ায় নেপোলিয়ন চার্চের সঙ্গে শান্তি আপস করেছিলেন এবং সংখ্যাগুরুর ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ফ্রান্স রেখে দিয়েছিল, যদিও সেটা সাংবিধানিক রাষ্ট্র ছিল। এর ফলে ফ্রান্সে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পরিপূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করেনি। মার্ক্স যাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলেছেন, তাকেই আমরা ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক নীতি হিসেবে অভিহিত করতে পারি। রাষ্ট্রের সংবিধান যদি ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে নাগরিকের অধিকার স্বীকার না করে, অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ এবং সে সঙ্গে জনগোষ্ঠী নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে সে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না।

যাঁরা বলেন, গণতন্ত্র থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা লাগে না, তাঁরাও ব্রুনো বাউয়েরের মতো যুক্তি দিচ্ছেন। কেউ যদি বলেন, সমাজে অর্থনৈতিক শোষণ দূর হলে ধর্মনিরপেক্ষতা লাগবে না, সেটিও হবে এমনই অপযুক্তি। সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নকে রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হবে, কিন্তু রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পর্যবসিত করা চলবে না। সাম্প্রদায়িকতা স্বয়ং একটি সংকট। সাম্প্রদায়িকতা দুষ্ট রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বারা ওভারডিটারমাইন্ড বা অতিনিরূপিত হয়ে দাঙ্গার যুক্তি ও চরিত্র গঠন করে।

দাঙ্গা নিয়ে লেখা ‘বোম্বের অপরাধীরা’ প্রবন্ধে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির সঙ্গে কীভাবে রাজনৈতিক স্বার্থ মিলিত হয়ে দাঙ্গা সম্ভাবিত করে, সেটা মান্টো দেখিয়েছেন। মান্টো বলেন :

“আমি অমৃতসরের নোংরা অলিগলিবাজার থেকে পালিয়ে বোম্বেতে দাখিল হই। ভেবেছিলাম অমৃতসরে যে সাম্প্রদায়িক বিরোধ দেখেছিলাম, বোম্বের এই সুন্দর উদার ঠিকানায় তা থেকে মুক্ত থাকতে পারব। ভুল ভেবেছিলাম।

এখানে আসার ক’মাস যেতে না যেতেই হিন্দু মুসলিমে লড়াই বেঁধে গেল, সে লড়াই আর থামল না, চলতে লাগল।

লড়াইয়ের কারণ নতুন কিছু নয়, ঐ একটাই—মন্দির, মসজিদ... জানেনই তো। সে কারণে কত মানুষের প্রাণ বলি হল! এই পাশবিকতা আমি সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করেছি, কিন্তু নিজের বেদনা নিজের অনুভব নিজের অন্তরের ভেতরেই লুকিয়ে রেখেছিলাম।

তারপর আমি কলম তুলে নিলাম। এবং বোম্বের অনন্য অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে এই আবেদনটি রচনা করলাম। ফলাফল দাঁড়াল আমাকে শায়েস্তা করতে আমাদের সম্মানিত মুসলমানেরা উঠেপড়ে লাগল। কিভাবে আমি তাঁদের ধোলাই থেকে পিঠ বাঁচালাম, সে অন্য গল্প)।

শেষ পর্যন্ত যা ভয় করা গিয়েছিল তাই ঘটল। জনসমাগমে ঘৃণার উদ্গীরণ ঘটল এবং বোম্বের বাতাস বিষাক্ত হয়ে গেল।

আর তারপর ভয়াবহ এমনকি নারকীয় এসব দৃশ্য দেখতে বাধ্য হল আমাদের চোখ...

ছুরি মারা হল, পাথর ছোঁড়া হল, লাঠিসোটা নিয়ে পুরুষালি বিক্রম দেখানো হল। বাড়িঘর পাড়ামহল্লায় হামলা হল। অচিরেই আমার বোম্বের রাস্তাঘাট কোনাকাঞ্চি রক্তের ছিটায় লাল হয়ে গেল।

স্বাধীনতার উদয়ের মুহূর্তে ভারত এভাবে নিমজ্জিত হল, অন্ধকার, অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হল। 

যারা মুক্তির মূল্য বোঝেন, এবং এই যুগের ঘটনা ও ইতিহাস জানেন, তাঁরা জানেন ধর্মের নামে লড়াই যত বিধ্বংসী হতে পারে তেমন কমই আছে। মুক্তির এত সন্নিকটে এই ঘটনায় তাঁদের মুষড়ে পড়া তাই স্বাভাবিক। 

... কেন বোম্বের আকাশ এই অবিরাম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী? যদি এই খুনের জন্য কে দায়ী সে প্রশ্নের মীমাংসা করতে হয় তবে অবশ্যই আমাদের ঘটনা বিচার করে দেখতে হবে।

দুনিয়াটা ভাল মানুষেই ভরা, কিন্তু এমন কিছু মানুষও নেই তা নয় যাদের দিন কাটে খুরে তলোয়ারে শান দিয়ে। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে যেন সেসকল খুর-তলোয়ার তারা দিকে-দিকে ছড়িয়ে দিতে পারে যাতে হত্যালীলার বিস্তারের থেকে তারা লাভবান হতে পারে।

... তারা ভারতের স্বাধীনতা চায় না। তারা বেইমান, শুধু দেশের বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে বেইমানিতে তাদের সময় ব্যয় হয়। তাদের নিঃশ্বাসে নরকের আগুনের শিখা হল্কা দিয়ে বের হয়।

তারা আমাদের নেতা, আমাদের জনপ্রতিনিধি।

তারা মার্জারের থাবার ন্যায়। উপর থেকে দেখলে নরম, পশমি। নিচ থেকে দেখলে তীক্ষ্ণ, ভয়ানক। তাদের কথা শুনলে আপনার মনে হবে জগতের ব্যথাবেদনা তারা বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই ভান টেকে কতক্ষণ?

তাদের দরদ, ধার্মিকতা, মানবিকতা—সবই খলের ছল মাত্র। এহেন বদমায়েশির সাথে যে আমরা একই দুনিয়ায় বাস করছি ভাবলেও ভয় হয়।

বোম্বের সহিংসতা চাইলে রোধ করা যেত। হিন্দু মুসলিম পরস্পরের প্রতি যে মনের ঝাল ও তিক্ততা অনুভব করে তার উপর সদুপদেশের মলম দেওয়া যেত। একটু ধৈর্য, একটু সংযমের পরামর্শ দেওয়া যেত।  

নেতারা যদি জনতার আবেগে ভেসে না গিয়ে সমস্যার সমাধানে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখত, শান্তি আনা অসম্ভব হত না। কিন্তু তারা তা করেনি।

... যে নেতারা ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে ঘৃণা জাগিয়ে তোলেন, তাদের আমি এই দাঙ্গার জন্য দায়ী মনে করি। ... ধর্মীয় অপপ্রচারের শয়তানিতে যারা মাতে, ভারতের স্বাধীনতার সৌধ তাদের হাতে গড়া হতে পারে না। তারা শুধু আমাদের স্বাধীনতার শত্রু নয়, মানবজাতির শত্রু।

তাদের চিহ্নিত করতে হবে, তাদের মুখে চুনকালি দিতে হবে।

নইলে জাতির তরুণসমাজ যারা অচিরেই স্বাধীন হতে চলেছে তাদের ঘাড়ের উপর এই শয়তানদের কর্মকাণ্ডের বোঝা দীর্ঘদিন চেপে থাকবে।”

অন্যায় হত্যা ও দাঙ্গার বড় সমস্যা হলো দাঙ্গা শেষ হইয়াও হয় না শেষ। বরং তার মধ্যে চক্রাকারে আবর্তনের সম্ভাবনা নিহিত থাকে। দাঙ্গার সহিংসতার এই দুষ্টচক্র স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই রকম প্রভাবই রাখতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ মান্টোর ‘শরীফন’ গল্পটিতে সহিংসতার দুষ্টচক্রের প্রত্যক্ষ চিত্র উঠে এসেছে। গল্পের শুরুতে এক মুসলমান বাবা দাঙ্গা করে ঘরে ফিরে দেখে তার স্ত্রী শুধু নয়, অল্পবয়সী কন্যাকেও হত্যা করা হয়েছে। সে কুড়াল নিয়ে বের হয়ে কতিপয় হিন্দুকে হত্যা করে। তারপর একটি ঘরে ঢুকে একটি অল্পবয়সী মেয়েকে হত্যা করে। অতঃপর সেই নিহত মেয়ের হিন্দু পিতা ঘরে ফিরে ঘটনা দেখে তলোয়ার নিয়ে প্রতিশোধ নিতে বের হয়ে পড়ে। প্রতিশোধ কীভাবে শুধু প্রতিশোধ ডেকে আনে, সেটাই মান্টো এঁকেছেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রতিশোধ যেমন প্রত্যক্ষ সহিংসতার কারণ হয়, তার বাইরেও থাকে দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। সমাজের অন্তরে দাঙ্গা যে অমানবিকতা, যে ক্ষত, যে ক্ষতি সৃষ্টি করে, তার প্রভাব বহুকাল থাকতে পারে এবং তার ফলাফল ফিরে আসতে পারে আরো বৃহৎ আকারে। মান্টো বলেছেন ’৪৭-এর সহিংসতা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং সমাজের অন্তরে শেকড় গেড়েছে, ডালপালা মেলে বিষবৃক্ষ হয়ে উঠল বলে : 

 “আমরা ভেবেছিলাম দেশভাগের সময় যা কিছু ঘটেছে তাতে মানবতার মান-ইজ্জত ধুলায় লুটিয়েছে—অসহায় নারীর বেআব্রু অপমান, লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা, হাজার হাজার ধর্ষণ। ভেবেছিলাম সংকট যা হওয়ার তা আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। দেশভাগের মধ্য দিয়ে আমরা ঘৃণা ও সহিংসতার কারণটাকেই ছেড়ে আসতে পেরেছি। কিন্তু আজ আমরা বুঝতে পারছি যে ঘৃণা খালাস হয়ে যায় নি। বরং শনৈ শনৈ ডালপালা মেলে বিকশিত হয়ে চলেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় যা কিছু ঘটেছে সেটাকে তখন সংঘবদ্ধ কর্মকাণ্ড হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু এখন পরিষ্কার যে সহিংসতার শেকড় আমাদের ভেতর গেড়ে বসেছে... দাঙ্গায় যারা খুনোখুনি করেছেন তারা পাকা, অভ্যস্ত খুনি ছিলেন না, বরং পরিস্থিতি তাদের বদলে দিয়েছে... আমার ভয়টা হল পরিস্থিতি ভাল হবে না, আরও খারাপের দিকে যাবে। পাকিস্তানে বর্বরতার যুগ শুরু হবে। হবে? না, কথাটা শুদ্ধ করে বলি, বর্বরতার যুগ শুরু হয়েছে। ... এহেন পরিস্থিতিতে দাঙ্গাবাজদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে নই আমি, এমনকি জেলের পক্ষেও নই। আমার মতে জেল মানুষকে শোধরায় না। বরং তাদের স্বাভাবিক মানুষ হিসাবে ফের গড়ে তোলার পক্ষে আমি। আমরা মাঝেমাঝে এমন সাধক ও মুরুব্বিদের কথা বলি যারা নরাধম ব্যক্তিকেও এককথায় অনুশোচনা করান।... মানুষের আত্মাকে প্রভাবিত করা সম্ভব।”

(মান্টো : একটি খুনের খবর)

১৯৭১ সালে ’৪৭-এর এই বিষয়টি একভাবে হাজির হয়েছিল। বাংলাদেশে পাকবাহিনী যে সহিংসতা করেছে তার মধ্যে ঔপনিবেশিক, সামরিক-দখলদারি, বর্ণবাদী চরিত্র তো ছিলই, সেইসাথে দেশভাগের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের রেশও কিয়দংশে থাকতে পারে। ’৭১-এ সচেতনভাবে ’৪৭-এর স্মৃতি ও যুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছে পাকিস্তান সরকার। সে কারণে পাকিস্তান সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, পুরাতন ‘ধর্ম বিপন্ন’ স্লোগান তুলেছে, বাঙালি জাতিকে দমন করার যুদ্ধকে জেহাদ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তানের ভেতরের বিবিধ জাতিগোষ্ঠী যেমন বালুচ ইত্যাদির সামনে এই যুদ্ধকে সাম্প্রদায়িক লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে, আবার বাঙালিরা বিহারিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা করছে এই অভিযোগ তুলেছে। মোটাদাগের এই প্রচারণা অবশ্য আখেরে ফল প্রসব করেনি, কিন্তু যতদিন যুদ্ধ চলেছে, ততদিন তাদের প্রচারণা চলেছে। পালটা যুক্তি মুক্তিযুদ্ধ দিয়েছে। যেমন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আলমগীর কবির এই যুদ্ধ যে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা নয়, বাঙালি-বিহারি বা বাঙালি-উর্দুভাষী দাঙ্গা নয়, বরং পাকিস্তানি সামরিক-আমলাতান্ত্রিক-পুঁজিপতি শাসক চক্রের বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণের জাতীয় মুক্তি ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সেটাই তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ তাই অতীতের দাঙ্গার বিরুদ্ধবাদ।  

দেশভাগ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সাম্প্রদায়িক পরিচয়ভিত্তিক ভেদজ্ঞান শুধু দেশের মানচিত্র ভাগ করে ক্ষান্ত হয়নি। সাহিত্যের মানচিত্র, সংস্কৃতির মানচিত্র ভাগাভাগি করতেও ব্যস্ত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে মান্টো নাকি এক চিঠিতে লিখেছিলেন : ‘তাইলে অবিভক্ত ভারতবর্ষে যা কিছু লেখা হয়েছে সেগুলোর কী হবে? সেগুলোও কি ভাগ করা হবে?’ বাংলার প্রেক্ষাপটে মান্টোর এই প্রশ্ন তুলে বলা যায় : রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলকে কি সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ করা যাবে? বাঙালি লেখক অন্নদাশংকর রায় একদা লিখেছিলেন : ‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে/ ভাগ হয়নি কো নজরুল’।  

১৯৯৮ সালে একবাল আহমেদ* দিল্লিতে ‘ভারতবর্ষের দেশভাগ—ইতিহাস, স্মৃতি ও ক্ষতি’ নামে একটি বক্তৃতা দেন। বক্তৃতার বয়ান আমি দেখিনি, তবে তার কিছু খণ্ডাংশ ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেখানে একবাল বলেন, দেশভাগের পর মান্টো, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো লেখকদের যে ভাগ করার চেষ্টা হয়েছে, সেটা শোচনীয়। যে জাতীয়তাবাদ এহেন ভাগাভাগির কারণ, সে জাতীয়তাবাদ কিন্তু খুব ঠুনকো হতে পারে। পাঞ্জাবিরা ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ছিল, বাঙালিরা পক্ষে ছিল; কিন্তু ১৯৭১ সালে পাঞ্জাবিরা সেনাবাহিনী নিয়ে বাঙালিদের ওপর হত্যা চালিয়েছে।

উপমহাদেশে সাংস্কৃতিক ভেদবুদ্ধি আজও জাগ্রত। বাংলাদেশে নজরুল চর্চার ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সাহিত্যের একাংশ একদা এড়িয়ে যাওয়া হত। তেমনি পাকিস্তানে মান্টোকে পাঠ্যপুস্তকে কোথাও কোথাও স্থান দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাঁর লেখায় সেন্সরের কাঁচি চালানো হয়েছে, যাতে তাঁর অসাম্প্রদায়িক মনোভাব বোঝা না যায়। ভারতের পাঞ্জাবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচিতে নাকি মান্টোকে রাখা হয়নি। হয়তো তাঁকে অ-ভারতীয় বলে বাতিল করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মান্টো যদি কাশ্মীর বা পাঞ্জাব বা বোম্বের মানুষ হন, তাঁর সাহিত্য বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক কি না। কিংবা কেউ কেউ আছেন, যাঁরা বাংলাদেশের স্বজাতীয় সংস্কৃতির নামে উনবিংশ শতাব্দীর নবযুগকে ভাগ করে অপর পারে পার করে দিতে চান। নজরুল, মান্টো বা একবাল আহমেদ এহেন ভাগাভাগির বিরুদ্ধে।

একবাল বলেন, ভাগাভাগির এই উপমহাদেশে আজও সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষিত নয়। এমনকি গণতন্ত্র যে সংখ্যাগুরুর দ্বারা সংখ্যালঘুর ওপর পীড়নের ব্যবস্থা হতে পারে, সে বিপদও থাকে। অর্থাৎ একবাল বলছেন, গণতন্ত্রের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক নীতি অপরিহার্যভাবে যুক্ত।  

উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করার ভেতর মান্টোর লেখক জীবনের সূচনা এবং তিনি স্বাধীনতার পক্ষে লিখেছেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের সৃষ্টিতে তিনি উদ্দেশ্য সাধন হয়েছে বলে মনে করেননি। যে নেতাদের হাতে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব ছিল, তাঁদের ওপর মান্টো তত ভরসাবান ছিলেন না।

“বেশ কিছুদিন থেকে শুনে আসছি ভারতকে এটা থেকে বাঁচাও, ওটা থেকে বাঁচাও, ইত্যাদি। সত্যি কথা হল ভারতকে বাঁচানো দরকার এই বাঁচাও-বাঁচাও বলনেওয়ালাদের থেকেই।

এসকল লোক এরকম কথা বেশ বানিয়ে বানিয়ে বলতে পারে সন্দেহ কি! কিন্তু তাঁরা আর যা কিছুই হোন, সততা তাঁদের চরিত্রে নেই।

সারাদিন জ্বালাময়ী বক্তৃতা ও নীতিবাগীশ নিন্দামন্দ করে এসে তাঁরা যখন বিলাসবহুল খাস কামরায় ঢোকেন, তাঁদের মাথায় আমাদের বাঁচানোর কথা মোটেই থাকে না।   

...

বিষয়টা হাসিরই হত, যদি এত হাস্যকরুণ না হত। 

এরা—এই নেতারা—ধর্ম ও রাজনীতিকে একটা খোঁড়া পঙ্গু লোকের মত মনে করেন। তাঁরা এই খোঁড়াকে দেখিয়ে ফেরি করে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করেন। তাঁরা এর লাশ কান্ধে নিয়ে ঘোরেন আর যারা উপর থেকে বর্ষিত যাবতীয় কথাই বিলক্ষণ বিশ্বাস করতে প্রস্তুত তাদের কাছে আবেদন করেন। তাঁরা দাবি করেন তাঁরা আপন কায়দাকসরতে এই লাশকে ফের জীবনদান করছেন।

কিন্তু সত্য কথা হল ধর্ম যা ছিল তাই আছে, চিরকাল তাই থাকবে। ধর্মের আদি মর্মবস্তু অক্ষুণ্ণ ও বহালতবিয়তে আছে। সে বস্তুতে বদল আনা সম্ভব নয়, নদীর ঢেউ যেমন পাহাড়ে ক্ষয় করতে পারে না।

এই নেতারা যখন কুম্ভীরাশ্রুপাত করে বিলাপ করেন যে ‘মজহাব খাত্রে মে হ্যায়’ অর্থাৎ ধর্ম বিপন্ন,  সেটা নিতান্তই ভুয়া, বাজেকথা বৈ নয়। ঈমান এমন জিনিস যার বিপন্ন হওয়ার কিছু নেই। যদি কিছু আসলেই কিছু বিপন্ন হয়ে থাকে, তাহলে বিপন্ন এই নেতারা যারা ধর্মের বিপদের ধুয়া তুলে নিজেদের রক্ষা করতে ব্যতিব্যস্ত।”

রাজনীতির স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার প্রসঙ্গে মান্টোর কথার প্রতিধ্বনি মার্ক্সের ‘ইহুদি প্রশ্নে’ লেখাটিতে পাওয়া যায় :

“ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের কাছে ধর্ম হল উদ্দেশ্য সাধনের উপায় মাত্র, ফলে সে রাষ্ট্র চরিত্রগতভাবেই কপট। রাষ্ট্র যখন ধর্মকে তার ভিত্তি হিসাবে ঘোষণা করে, তখন ধর্ম ত্রুটিপূর্ণ রাজনীতিতে পর্যবসিত হয়। তথাকথিত ধর্মরাষ্ট্র ধর্ম ছাড়া যেন নিজের রাষ্ট্রসত্তা সম্পূর্ণ করতে পারে না। কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তথা প্রকৃত রাষ্ট্রের নিজের রাজনীতি গঠনের জন্য ধর্মের দরকার পড়ে না। তথাকথিত ধর্মরাষ্ট্র ধর্মকে বিচার করে রাজনীতি দিয়ে আর রাজনীতিকে বিচার করে ধর্ম দিয়ে। রাষ্ট্রকে সে একটা ধোঁকাবাজি প্রদর্শনীতে পর্যবসিত করে, আর তা করতে গিয়ে ধর্মকেও ধোঁকাবাজির জায়গায় নামিয়ে আনে।”

মান্টো জিন্নাহকে উঁচু নজরে দেখতেন না। নেতাদের যে সমালোচনা তিনি করেছেন, তা মান্টোর অনুবাদক আকার প্যাটেল বলেছেন মূলত জিন্নাহর বিরুদ্ধে ছিল। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি, যেটা তাঁর নানা প্রবন্ধে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ ‘আল্লাহর রহমতে’ নামক প্রবন্ধে তিনি পাকিস্তানে শিল্প-সাহিত্যের ওপর, নারীর ওপর, শ্রমিকের ওপর তথা সমাজের ওপর যে দমন-পীড়ন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন। ‘নয়া পাকিস্তানে পায়চারি’ নামক লেখায় মান্টো একটা রামরাজ্য নয়, একপ্রকার রাবণরাজ্য বা ডিসটোপিয়ার মাইক্রো, খণ্ডচিত্র এঁকেছেন। আর ‘স্যাম চাচার কাছে চিঠি’তে তিনি পাকিস্তানের মার্কিন পছন্দ পররাষ্ট্রনীতি শুধু নয়, ব্রিটিশ পতনের পর মার্কিনদের বিশ্বমোড়ল হিসেবে আবির্ভাবের আলোচনা তুলেছেন।

অন্যদিকে নিজের দেশোয়ালি কাশ্মীরি নেহরু সম্পর্কেও তিনি সমালোচনা করেছেন। ১৯৫৪ সালে ‘পণ্ডিত নেহরু বরাবর পণ্ডিত মান্টোর চিঠি’তে তিনি দেশভাগের জন্য যেমন নেহরু-প্যাটেলকে দায়ী করেছেন, তেমনি স্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্রনীতিরও সমালোচনা করেন :

“কাশ্মিরের গুণের কথাই যদি বলি, রাজনীতির ক্ষেত্রে আমি আপনার নাম গর্বের সাথেই বলতে পারি কারণ আপনি নিজের কথা নিজেই উল্টানোর রাজনীতি-গুণটি ভালই জানেন। কাশ্মিরীদের কুস্তিতে আজ অবধি কে হারাতে পারে? কবিতাতেই বা কে আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ? কিন্তু আমি শুনে ভারি তাজ্জব হয়েছি যে আপনি দুই দেশের ভেতর নদীর পানির স্রোতকে চলতে বাধা দিচ্ছেন। পণ্ডিতজি, আপনি তো স্রেফ নেহরু, নহরের পাশে বাসা বেঁধেছিলেন আপনার পূর্বপুরুষেরা তাই। ... দেশ তো ভাগ হয়ে গেছে। র‍্যাডক্লিফ প্যাটেলকে এই কাজে লাগিয়েছিলেন। আপনি বেআইনিভাবে জুনাগড় দখল করেছিলেন, যেটা একজন কাশ্মিরী কোনদিন করতে পারত না যদি না তার উপর একজন মারাঠার প্রভাব – তথা প্যাটেলের প্রভাব – থাকত। ... সেসময় র‍্যাডক্লিফ তো ভারতটাকে একই পাউরুটির দুই টুকরার মত ভাগ করলেন। দুই টুকরা এখনো সেঁক দেওয়া হয় নি ততটা। তা ভাল, আপনি আপনার দিক থেকে বেশ সেঁক দিচ্ছেন, আর আমরা এপাশ থেকে বেশ সেঁক দিচ্ছি। তবে সেঁকার আগুনের তাপটা আসছে বাইরে থেকে।” 

আগুনের তাপ আজও বাইরে থেকে আসছে আর উপমহাদেশে সেঁকাসেঁকি থামেনি। নদীর জল আজও রুদ্ধ হয়। মান্টো বলেছিলেন, মান্টো নামের অর্থ দেড় সেরি; যদি তিনি দেড় সেরি না হয়ে প্রকাণ্ড একটি পাথরখণ্ড হতেন তো অমনি নেহরুর নহর তথা নদীতে ঝুপ করে নেমে পানি নিয়ে রাজনীতি গোলমাল করে দিতেন।

টোবা টেক সিং নামক গল্পটি মান্টোর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পের মধ্যে পড়ে। বিষাণ সিং নো ম্যানস ল্যান্ডে দুই কাঁটাতারের মধ্যবর্তী স্থানকে টোবা টেক সিং বানিয়ে মৃত্যুতে ঢলে পড়ে। সিঙের মৃত্যু দেশভাগের বাস্তবতা যেমন তুলে ধরে, তেমন আজ তা ফেলানী খাতুনের মৃত্যুতেও অনুরণন তোলে।

নজরুলও স্বরাজ যদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, সে স্বরাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায়। স্বাধীনতার চেতনা জীবন্ত রাখতে হলে মুক্তিসংগ্রামের মূল আশা-আকাঙ্ক্ষা, চেতনা, এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্নশীলতা জারি রাখা অপরিহার্য বটে।  

মান্টো নিতান্ত ঠোঁটকাটা ছিলেন। তাঁকে কেউ কেউ উর্দু সাহিত্যে বিদ্রোহী লেখক বলেন, আমরা যেমন নজরুলকে বিদ্রোহী কবি বলি। এমন বিদ্রোহী বা ঠোঁটকাটা যে হজম করা কঠিন। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকের উত্তর ভারতের জোলা ও সন্ত কবীরের মতই ঠোঁটকাটা ছিলেন। কবীর কিংবা নজরুলের মতোই তাই তাঁকে নিজ চিন্তার জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

গালিবের মতই তিনি নিজ সমাধিলিপি মৃত্যুর ছয় মাস আগে লিখেছিলেন। মান্টো নিজের জন্য যে সমাধিলিপি লিখেছিলেন, সেটা তাঁর কবরে নেই, কারণ সেটি সেখানে উৎকীর্ণ করলে পরলোকগত মান্টোকে হয়ত পুনরায় কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো।

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এখানে শায়িত আছেন সাদাত হাসান মান্টো এবং তাঁর সাথেসাথে কবরচাপা হয়ে শায়িত আছে গল্পকথা বলা কলার যাবতীয় গূঢ় রহস্য ... রাশিরাশি মাটির নিচে তিনি শেষ বিশ্রামে শুয়ে এটাই জল্পনা করছেন যে গল্প রচনায় কে বেহতর, তিনি নাকি খোদাতা’লা?”  

মান্টো প্রগতিশীল রাজনীতির কাছেও নিজের বিবেক বন্ধক দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। শিল্পের বা সাহিত্যের কাজ নয় রাজনীতির কাছে বিবেকবুদ্ধি বন্ধক রাখা। রুশ রাজনীতিবিদ ট্রটস্কি সাহেব বলেছিলেন, ‘শিল্প-সাহিত্য নিজস্ব পথ ধরেই এগোবে, আর তার উপায়ও সে নিজেই খুঁজে নেবে।’ মান্টো সত্য বলায় বিশ্বাস করতেন। তাই তাঁর নিন্দুকের সংখ্যা কম নয়। বামপন্থি ও ডানপন্থি, দুইপক্ষই তার ওপর সমালোচনার খড়গের ধার পরীক্ষা করেছে। নজরুল যেমন লিখেছিলেন :

“মৌ-লোভী যত মৌলভী আর 'মোল-লারা' ক'ন হাত নেড়ে,

'দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!'

ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও,

যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!

'আম পারা'-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!'

হিন্দুরা ভাবে, 'পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা'ত-নেড়ে!

আনকোরা যত ননভায়োলেন্ট নন্-কো'র দলও নন্ খুশী।

'ভায়োলেন্সের ভায়োলিন' নাকি আমি, বিপ্লবী -মন তুষি।

'এটা অহিংস', বিপ্লবী ভাবে,

'নয় চরকরা গান কেন গা'বে?'

গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কনফুসি!

স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের অঙ্কুশি!”

মান্টোকেও সকল পক্ষ আক্রমণ করেছে :

“একদা আমাকে প্রগতিশীল হিসাবে স্বীকার করা হত। তারপর হঠাৎ আমাকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসাবে চিহ্নিত করা হল। এখন ফতওয়া-দেনেওয়ালারা আবার ভেবেচিন্তে আমাকে পুনরায় প্রগতিশীল তকমা দিতে উদ্যত হয়েছে। আর সবসে বড় ফতওয়াবাজ সরকার আমাকে মনে করে প্রগতিশীল, অর্থাৎ কমুনিস্ট। প্রায়ই সরকার খেপে যায়, আমাকে অশ্লীলতার দায় অভিযুক্ত করে এবং আদালতে আমার বিরুদ্ধে বিচার বসায়। আবার ঐ একই সরকার তার প্রকাশনায় বড়গলায় বলে যে সাদাত হাসান মান্টো আমাদের দেশের বড় লেখক যার লেখা সাম্প্রতিক টালমাটাল দিনগুলোতেও থেমে যায় নি। আমার ভারাক্রান্ত মনে একটা শংকা জেগে ওঠে যে কোনদিন হয়তো এই দোদুল্যচিত্ত সরকার আমার উপর প্রসন্ন হওয়া শুরু করবে এবং আমার কফিনের ওপর চাই কি একটা পদকও অর্পণ করে ফেলতে পারে। সেটা হবে আমার বিশ্বাসের প্রতি আমার অঙ্গীকারের প্রতি মস্ত বড় অপমান।”

নজরুল ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় লিখেছিলেন :

“বন্ধু! তোমরা দিলেনাক' দান,

রাজ-সরকার রেখেছেন মান!

যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব'লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু

শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরেছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?”

নজরুলকে শাস্তি দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। মান্টোকে ব্রিটিশ আর পাকিস্তানি দুই সরকারই হেনস্তা করেছে। মিলের মধ্যে, দুজনই সরকারের কাছে অন্তিমে করুণ রসিকতার মতো স্বীকৃতি লাভ করেছেন। তবে স্বীকৃতি যখন খণ্ডিত হয়, তখন তা হয় অপমানের শামিল।

নজরুলের স্বীকৃতি নিয়ে আহমদ ছফার ‘নজরুল জন্মজয়ন্তী : ফলহীন প্রতর্ক’ লেখায় আলোচনা আছে। ২০১২ সালে পাকিস্তান সরকার মান্টোকে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ পদক দেয়। মুনীর চৌধুরীকে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৬ সালে এই পদক দিয়েছিল, আর ১৯৭১ সালে সেই সরকারই তাঁকে হত্যা করে। মান্টো পাকিস্তানে বেশিদিন বাঁচেননি। আর মৃত্যুর অনেক দিন পর নিষ্ঠুর পরিহাসের শামিল পুরস্কারটি পেলেন।

*‘``India's partition - history, memory and loss'' organised by the Centre for the Study of Developing Societies (CSDS)।

https://groups.google.com/forum/#!searchin/soc.culture.indian/manto/soc.culture.indian/eM4v-NOs0s4/lpG8cXUy9FwJ

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement